প্রতিষ্ঠাতা: মুজাহিদে আযম হযরত মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.

জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ, ঢাকা-এর মুখপত্র

প্রতিষ্ঠাকালঃ ১৯৩৭ ঈসায়ী

আল্লাহ পাকের যিকির থেকে গাফেল না হই

আল্লাহ পাকের যিকির থেকে গাফেল না হই

মাওলানা আব্দুল কুদ্দুছ


 

আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন কোরআনে কারীমে ইরশাদ করেন,

وَ عِنْدَهٗ مَفَاتِحُ الْغَیْبِ لَا یَعْلَمُهَاۤ  اِلَّا هُوَ ؕ وَ یَعْلَمُ مَا فِی الْبَرِّ وَالْبَحْرِ ؕ وَمَا تَسْقُطُ مِنْ وَّرَقَۃٍ  اِلَّا یَعْلَمُهَا وَلَا حَبَّۃٍ  فِیْ ظُلُمٰتِ الْاَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَّ لَا یَابِسٍ  اِلَّا فِیْ کِتٰبٍ مُّبِیْنٍ ﴿۵۹﴾

তাঁরই কাছে আছে অদৃশ্যের কুঞ্জিসমূহ। তিনি ছাড়া অন্য কেউ তা জানে না। স্থলে ও জলে যা কিছু আছে, সে সম্পর্কে তিনি অবহিত। (কোনো গাছের) এমন কোনো পাতা ঝরে না, যে সম্পর্কে তিনি জ্ঞাত নন। মাটির অন্ধকারে কোনো শস্যদানা অথবা আর্দ্র বা শুষ্ক এমন কোনো জিনিস নেই যা এক উন্মুক্ত কিতাবে লিপিবদ্ধ নেই।-সূরা আনআম (৬) : ৫৯

এ আয়াতে আল্লাহ পাকের কুদরতের কথা বলা হয়েছে। পৃথিবীর সবকিছুর মালিক আল্লাহ। ইলম আল্লাহ পাকের দান। তিনি সকল ইলমের অধিকারী। তিনি যাকে চান ইলম দান করেন। নবী-রাসূলগণকে আল্লাহ পাক ইলমে নবুওয়ত দান করেছেন। আল্লাহ পাক যতটুকু চান ততটুকু দান করেন। আল্লাহ পাক না চাইলে কারও পক্ষে ইলম হাসিল করা সম্ভব নয়। হযরত জীবরাঈল আ.-এর মাধ্যমে আল্লাহ পাক কোরআন নাযিল করেছেন। দীর্ঘ ২৩ বছরে ধীরে ধীরে কোরআন নাযিল হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ২৩ বছরের নবুওয়াতী জিন্দেগীতে হযরত জীবরাঈল আ. বহু বার নবীজির কাছে ওহী নিয়ে আগমন করেছেন। এ নবুওয়তী জিন্দেগীর প্রায় শেষদিকে একবার হযরত জিবরাঈল আ. নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে আগমন করলেন মানুষের বেশে। সাহাবায়ে কেরামের মজলিসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দ্বীনের মৌলিক কয়েকটি বিষয়ে প্রশ্ন করেছেন। এ হাদীসটি ‘হাদীসে জিবরাঈল’ নামে প্রসিদ্ধ। হযরত জিবরাঈল আ. শেষ প্রশ্ন করেছিলেন কেয়ামত সম্পর্কে। কেয়ামত কখন হবে? নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তরে বলেছিলেন,

ما المسؤول عنها بأعلم من السائل.

এ বিষয়ে প্রশ্নকারীর তুলনায় যাকে প্রশ্ন করা হয়েছে সে বেশি কিছু জানে না।

তো কেয়ামত কবে হবে, এর সুনির্দিষ্ট সময়কাল কেউ বলতে পারে না। কারণ, আল্লাহ পাক তা কাউকে জানাননি। এমনকি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও হযরত জিবরাঈল আ.-ও জানেন না। বোঝা গেল, আল্লাহ পাক ইচ্ছা করলে মানুষকে ইলম দান করেন। তিনি না চাইলে কেউ ইলম অর্জন করতে পারে না।

এ আয়াতে আল্লাহ পাক বলেন,

وَ عِنْدَهٗ مَفَاتِحُ الْغَیْبِ لَا یَعْلَمُهَاۤ  اِلَّا هُوَ.

গায়েবের চাবিকাঠি একমাত্র তাঁর কাছেই। তিনি ছাড়া গায়েব আর কেউ জানে না।

ইলমুল গায়েবের যে সকল বিষয়ের সংবাদ আল্লাহ আমাদের জানিয়েছেন তার ওপর আমাদের ঈমান আনা জরুরি। তবে নিজ থেকে গায়েব সম্পর্কে কোনো কিছু জানা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। এর চাবিকাঠি একমাত্র আল্লাহর কাছে। গায়েবের মধ্যে কী কী আছে তা আল্লাহ পাকই জানেন। আমরা গায়েব তো দূরের কথা, পৃথিবী সম্পর্কেই বা কতটুকু জানি বা জানতে পারি। আল্লাহ বলেন,

وَ یَعْلَمُ مَا فِی الْبَرِّ وَالْبَحْرِ.

স্থলভাগে ও জলভাগে যা কিছু আছে তা তিনি জানেন।

পৃথিবীর এক ভাগ মাটি আর তিন ভাগ পানি। তো মাটির অংশে কী আছে,  কোথায় আছে, কীভাবে আছে, তার সবই তিনি সুস্পষ্টভাবে জানেন। এমনইভাবে পানিতে কী আছে তাও তিনি জানেন। একেবারে সাধারণ একটি পোকা, যা আমরা হয়তো দেখি না। চলতে গিয়ে পায়ের নিচে পিষে ফেলি। সে পোকার খবরও আল্লাহ পাক জানেন। সে পোকার নড়াচড়াও তিনি দেখেন ও জানেন। আল্লাহু আকবার!

পানিতে কত কী আছে। মানুষ কি সব আবিষ্কার করে শেষ করতে পেরেছে? সাগরের গভীরে আল্লাহ পাক কত কিছু সৃষ্টি করে রেখেছেন। কত বিচিত্র রকমের প্রাণী সৃষ্টি করেছেন। বিশাল বিশাল মাছ ও প্রাণী বসবাস করে সাগরের নিচে। এ সবকিছুর প্রতি মুহূর্তের খবর আল্লাহ পাক জানেন।

আল্লাহ পাকের সৃষ্টিজগতের তুলনায় এ পৃথিবী কত ক্ষুদ্র। মহাকাশ ও আসমানের কোনো সীমা-পরিসীমা আমাদের জানা নেই। এরপর ওপরে কী আছে তা-ও জানি না। এসব তো বহু দূরের বিষয়, আমরা যে পৃথিবীতে বসবাস করি সে পৃথিবীর বহু জায়গা রয়েছে যা সম্পর্কে মানুষ কিছুই জানে না। এ প্রসঙ্গে হযরত তামীম দারী রাযি.-এর ঘটনা উল্লেখযোগ্য। হযরত তামীম দারী রাযি. প্রথম জীবনে খ্রিষ্টধর্মের অনুসারী ছিলেন। তিনি ফিলিস্তিনের অধিবাসী ছিলেন। মুসলমান হওয়ার আগে এক বিস্ময়কর ঘটনার মুখোমুখি হয়েছিলেন তিনি। যা তিনি নিজে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে শুনিয়েছেন। ঘটনা হলো, একবার তিনি ত্রিশ জনের এক কাফেলার সঙ্গে সমুদ্রপথে সফর করছিলেন। সামুদ্রিক ঝড়ের কবলে পড়ে তাদের জাহাজ পথ হারিয়ে ফেলে। বাতাস তাদের এক মাস বিভিন্ন পথ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে এক দ্বীপের কাছে গিয়ে পৌঁছে। সে দ্বীপে নেমে তারা আজব ধরনের এক প্রাণী দেখতে পান। যার মাথা থেকে পা পর্যন্ত সমগ্র দেহ চুলে আবৃত।  ফলে প্রাণীটির সম্মুখ দিক কোনটি আর পশ্চাৎ দিক কোনটি তা তারা বুঝতে পারেননি। পরিচয় জানতে চাইলে প্রাণীটি বলল, আমি জাস্সাহ। তারা জানতে চাইলেন, জাস্সাহ কী? সে বলল, তোমরা ওই গৃহে চলে যাও। সেখানে একজন আছে। সে তোমাদের জন্য গভীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।

কথামতো তারা সেখানে গিয়ে জিঞ্জিরে আবদ্ধ এক ব্যক্তিকে  দেখতে পান।  সে তাদেরকে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামসহ আরও কয়েকটি বিষয়ে প্রশ্ন করে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন মদীনায় হিজরত করে গিয়েছিলেন।

তারা পরিচয় জানতে চাইলে সে বলল, আমি দাজ্জাল, আমার বের হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে। সময় হলে আমি বের হব। সমগ্র পৃথিবী ৪০ দিনে সফর করব। শুধু মক্কা-মদীনায় প্রবেশ করতে পারব না।

হযরত তামীম দারী রাযি. মদীনা শরীফে গিয়ে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এ ঘটনা শুনিয়েছেন। পরে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবায়ে কেরামকে শুনিয়েছেন ঘটনা শুনিয়েছেন। বলেছেন, আমি দাজ্জাল সম্পর্কে তোমাদের যা বলি, তার সঙ্গে এ ঘটনার মিল রয়েছে।-সহীহ মুসলিম : ২৯৪২; জামে তিরমিযী : ২২৫৩

এর থেকে বোঝা যায়, দাজ্জাল পৃথিবীতেই কোনো একটি দ্বীপে আবদ্ধ আছে। কিন্তু সে দ্বীপ কোথায় তা আজও কেউ বলতে পারে না। তো পৃথিবীতে এমন আরও বহু কিছু আছে যা সম্পর্কে আমরা অবগত নই। যার সন্ধান আমাদের জানা নেই। কিন্তু আল্লাহ পাক সবকিছু জানেন।

وَ یَعْلَمُ مَا فِی الْبَرِّ وَالْبَحْرِ.

স্থলভাগে ও জলভাগে যা কিছু আছে তা তিনি জানেন।

এরপর আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,

وَمَا تَسْقُطُ مِنْ وَّرَقَۃٍ  اِلَّا یَعْلَمُهَا.

তাঁর অবগতি ব্যতীত গাছের একটি পাতাও ঝরে না।

সুবহানাল্লাহ! পৃথিবীতে গাছের সংখ্যা কত? আমাদের এ ঢাকা শহরেই তো কত গাছপালা। গ্রামে গেলে কত ধরনের গাছপালা আমরা দেখি। তো পুরো বাংলাদেশে হিসাব করলে ছোট-বড় কতগুলো গাছ আছে, এর সঠিক পরিসংখ্যান কারও কাছেই নেই। আর পুরো পৃথিবী হিসাব করলে তার সংখ্যা কত হবে! বন-জঙ্গলগুলো কত হাজার রকমের গাছপালায় ভরপুর! পৃথিবীতে কী পরিমাণ গাছ আছে তা-ই কারও পক্ষে বলা সম্ভব নয়। আর গাছের পাতা! একটি গাছেই তো কত পাতা থাকে। তাহলে সমগ্র পৃথিবীর সব গাছের পাতার পরিমাণ কত হবে! আমাদের পক্ষে তার হিসাব বের করা সম্ভব নয়। অথচ আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীনের কাছে এ সবেরই পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব আছে। কেবল হিসাব আছে এমন নয়; বরং পৃথিবীর যে-কোনো প্রান্তে যে-কোনো গাছের একটি পাতাও ঝরে—তাও তিনি জানেন। প্রতি মুহূর্তে পৃথিবীর কোন কোন প্রান্তে কোন কোন গাছের কয়টি পাতা ঝরল, তা আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন জানেন। আল্লাহু আকবার!

এরপর আল্লাহ পাক বলেন,

وَلَا حَبَّۃٍ  فِیْ ظُلُمٰتِ الْاَرْضِ وَلَا رَطْبٍ وَّ لَا یَابِسٍ  اِلَّا فِیْ کِتٰبٍ مُّبِیْن.

মাটির অন্ধকারের শস্যদানা এবং ভেজা ও শুকনো এমন কোনো কিছু নেই যা সুস্পষ্ট এক কিতাবে লিপিবদ্ধ করা নেই।

ফল, ফসল, গাছপালা উৎপন্ন হওয়ার জন্য বীজ বুনতে হয়। মাটির নিচের সে বীজ ও শস্যদানার অবস্থাও আল্লাহ পাক জানেন। একটি বীজও এমন নেই যার সম্পর্কে তিনি জানেন না। পৃথিবী ভেজা বা শুকনো পাতা বা শস্য যা কিছুই আছে, সবকিছুর খবরই আল্লাহ পাকের আছে। সুবহানাল্লাহ।

আল্লাহ পাকের কুদরতের বিবরণ দিয়ে শেষ করা যাবে না। তাঁর প্রশংসা করেও কেউ শেষ করতে পারবে না। তিনি এতই বড়, এতই মহান। আল্লাহ পাক স্বয়ং কোরআনে কারীমে ইরশাদ করেছেন,

وَلَوْ اَنَّ مَا فِی الْاَرْضِ مِنْ شَجَرَۃٍ  اَقْلَامٌ وَّ الْبَحْرُ یَمُدُّهٗ  مِنْۢ بَعْدِهٖ سَبْعَۃُ  اَبْحُرٍ مَّا نَفِدَتْ کَلِمٰتُ اللهِ     ؕ اِنَّ اللهَ عَزِیْزٌ حَکِیْمٌ ﴿۲۷﴾

অর্থাৎ পৃথিবীতে যত গাছ আছে তার সব যদি কলম হয়ে যায়, আর পৃথিবীর সব সাগর-মহাসাগর এবং তার সঙ্গে আরও সাত সমুদ্র যোগ করে তার সবই যদি কালি হয় আর আল্লাহ পাকের কথা লেখা হতে থাকে, তাহলে সে কলম ও কালি ফুরিয়ে যাবে, কিন্তু আল্লাহ পাকের কথা লিখে শেষ করা যাবে না।-সূরা লুকমান (৩১) : ২৭

এরপর আল্লাহ পাক বলেন,

مَا خَلْقُكُمْ وَلَا بَعْثُكُمْ  اِلَّا کَنَفْسٍ وَّاحِدَۃٍ        ؕ  اِنَّ اللهَ سَمِیْعٌۢ  بَصِیْرٌ

তোমাদের সকলকে সৃষ্টি করা ও পুনর্জীবিত করা (আল্লাহর পক্ষে) একজন মানুষ (-কে সৃষ্টি করা ও পুনর্জীবিত করা)-এর মতোই। নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছু জানেন, সবকিছু দেখেন।-সূরা লুকমান (৩১) : ২৭

এ আয়াতেও আল্লাহ পাকের কুদরত ও ক্ষমতার বিবরণ দেওয়া হয়েছে। পৃথিবীর সবাই মিলে চেষ্টা করলেও, সকল সামর্থ্য ব্যয় করলেও একজন মানুষ কেউ সৃষ্টি করতে পারবে না। আল্লাহ পাক বলেন, তোমাদের সবাইকে সৃষ্টি করা এবং মৃত্যুর পর আবারও সৃষ্টি করা আমার কাছে একজনকে সৃষ্টি করা ও পুনরায় জীবিত করার মতোই। আল্লাহর কাছে বিষয়টি একেবারেই সহজ।

আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন কোরআনে কারীমে এভাবে তাঁর কুদরতের বিবরণ দিয়েছেন। মানুষ যেন তাঁর প্রতি ঈমান আনে। তাঁর ইবাদত-বন্দেগী করে। তাঁর হুকুম-আহকাম মেনে চলে। আমাদের দুনিয়ার এ জীবনই তো শেষ নয়। সামনে আমাদের জন্য আখেরাতের অনন্তকালের জীবন অপেক্ষা করছে। আখেরাতের তুলনায় এ দুনিয়ার জীবন কিছুই নয়। আখেরাতের জীবনের শুরু আছে, শেষ নেই। মাটি থেকে নিয়ে আসমান পর্যন্ত সমগ্র পৃথিবী যদি সরিষা দানা দিয়ে পূর্ণ করে ফেলা হয় আর এখান থেকে বছরে একটি করে সরিষা দানা সরানো হয়, তাহলে একদিন এ পৃথিবীভর্তি সরিষা দানা শেষ হয়ে যাবে। কিন্তু আখেরাতের জীবন কখনো শেষ হবে না। অতএব সে অনন্ত জীবনের সুখ-সমৃদ্ধির জন্য দুনিয়ার জীবনেই নেক কাজ করে যেতে হবে। যারা নেক কাজ করবে না, আল্লাহর নাফরমানী করে জীবন কাটাবে, তারা মৃত্যুর সময় বড় আফসোস করবে। বলবে, আল্লাহ আমাদেরকে আর কিছুদিন সময় দিন, আমরা পূর্ণ নেককার হয়ে যাব। কোরআনে কারীমে বিষয়টি আল্লাহ পাক এভাবে তুলে ধরেছেন,

وَ اَنْفِقُوْا مِنْ مَّا  رَزَقْنٰكُمْ مِّنْ  قَبْلِ اَنْ یَّاْتِیَ  اَحَدَكُمُ  الْمَوْتُ فَیَقُوْلَ  رَبِّ لَوْ لَاۤ  اَخَّرْتَنِیْۤ  اِلٰۤی  اَجَلٍ قَرِیْبٍ ۙ فَاَصَّدَّقَ وَ اَكُنْ  مِّنَ الصّٰلِحِیْنَ ﴿۱۰﴾  وَ لَنْ  یُّؤَخِّرَ اللهُ  نَفْسًا  اِذَا جَآءَ اَجَلُهَا ؕ وَ اللهُ  خَبِیْرٌۢ  بِمَا تَعْمَلُوْنَ ﴿۱۱﴾

অর্থাৎ আমি তোমাদের যে রিযিক দিয়েছে তা থেকে তোমরা (আল্লাহর রাস্তায়) ব্যয় করতে থাকো, সেদিন আসার পূর্বে যেদিন তোমাদের কারও মৃত্যু উপস্থিত হবে আর সে বলবে, হে আমার রব, আমাকে যদি একটু সুযোগ দিতেন। তাহলে আমি দান-সদকা করব এবং নেককার বান্দা হয়ে যাব। কারও নির্দিষ্ট সময় হয়ে গেলে তাকে আর সুযোগ দেওয়া হবে না। আর তোমরা যা কিছু করো আল্লাহ পাক তা জানেন।-সূরা মুনাফিকুন (৬৩) : ১০, ১১

হযরত ইবরাহীম ইবনে আদহাম রহ. বলখের বাদশাহ ছিলেন। একসময় তিনি বাদশাহি ছেড়ে দিয়ে আল্লাহ পাকের ইবাদত-বন্দেগীর জন্য শহর ছেড়ে চলে গেলেন। একেবারে সাধারণ রাখালের পোশাক পরে জঙ্গলে বসবাস করতে থাকেন।

একদিনের ঘটনা। তিনি নদীর পারে বসে আছেন। এ সময় তার রাজ্যের এক ব্যক্তি তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এল। হযরত ইবরাহীম আদহাম রহ. কে বলল, মান্যবর বাদশাহ, আপনার এ কী অবস্থা! আপনি বলখের বাদশাহি ছেড়ে এখানে এভাবে বসবাস করছেন! আপনি এমন কী পেলেন যে রাজত্ব ছেড়ে চলে এলেন?

হযরত ইবরাহীম আদহাম রহ. তখন পকেট থেকে একটি সুঁই বের করে নদীতে নিক্ষেপ করলেন। এরপর আল্লাহ পাকের কাছে দুআ করলেন, হে আল্লাহ, আমার একটি সুঁই আমি নদীতে ফেলে দিয়েছি। আপনি তো সবকিছুর মালিক। জমিনেরও মালিক। নদী-সাগরেরও মালিক। আপনি দয়া করে আমার সে সুঁই আমার কাছে ফেরত আসার ব্যবস্থা করে দিন। দুআর পর দেখা গেল, নদীর হাজার হাজার মাছ মুখে একটি করে সুঁই নিয়ে ওপরে ভেসে উঠল। হযরত ইবরাহীম আদহাম রহ. নিজের সুঁই বেছে নিয়ে বললেন, এ হলো আমার রাজত্ব। এ রাজত্বের তুলনায় তোমাদের দুনিয়ার সে রাজত্বের কোনো মূল্য নেই।

এরপর হযরত ইবরাহীম আদহাম রহ. মক্কা শরীফে গেলেন। বাইতুল্লাহর তওয়াফ করলেন। মক্কা শরীফ থেকে চলে গেলেন সিরিয়ায়। নির্জনে ইবাদত-বন্দেগীর জন্য গহীন জঙ্গলে প্রবেশ করলেন। সেখানে একাকী ইবাদতে মগ্ন হলেন। এক রাতে নিয়মমতো ইবাদতে মগ্ন ছিলেন। প্রচণ্ড শীতের রাত ছিল। শীত নিবারণের মতো তেমন কিছু ছিল না। প্রচণ্ড শীত অনুভব করলে আল্লাহ পাকের কাছে দুআ করলেন। হঠাৎ অন্ধকারে শরীরে জড়ানোর মতো কিছু একটা পেলেন। শরীরে জড়িয়ে নিলেন। শীত দূর হয়ে গেল। আরামে বিশ্রাম করলেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন, শরীরে বিশাল এক সাপ জড়িয়ে আছে। এ সাপ হযরত ইবরাহীম আদহাম রহ.-কে সারা রাত শীতের কষ্ট থেকে রক্ষা করেছিল। সুবহানাল্লাহ! এ হলো বাদশাহি। কেউ যখন আল্লাহর জন্য হয়ে যায় তখন দুনিয়ার সবকিছু তার হয়ে যায়।

তো আমাদেরকে হায়াত থাকতে থাকতে আখেরাতের পুঁজি সংগ্রহ করতে হবে। নেক আমল করতে হবে। দুনিয়া যেন আমাদেরকে আল্লাহ থেকে, আখেরাত থেকে গাফেল করে না রাখে। আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন বান্দাদের সতর্ক করে দিয়ে ইরশাদ করেছেন,

یٰۤاَیُّهَا  الَّذِیْنَ  اٰمَنُوْا  لَا تُلْهِكُمْ اَمْوَالُكُمْ  وَ لَاۤ  اَوْلَادُكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللهِ ۚ وَ مَنْ یَّفْعَلْ  ذٰلِکَ  فَاُولٰٓئِکَ هُمُ الْخٰسِرُوْنَ.

হে ঈমানদাররা, তোমাদেরকে যেন তোমাদের সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল করে না রাখে। এমনটা যারা করবে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।-সূরা মুনাফিকুন (৬৩) : ০৯

দুনিয়া আমাদেরকে আল্লাহর যিকির থেকে গাফেল করে দেয়। সম্পদের পেছনে মানুষ জীবন শেষ করে দেয়। সন্তানদের জন্যও অনেক-সময় মানুষ দ্বীন থেকে দূরে সরে যায়। এ বিষয়ে আমাদের খুব সতর্ক থাকতে হবে। কোনোভাবেই যেন সময় নষ্ট না হয় সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। প্রতিদিন নিয়ম করে কিছু যিকির করতে হবে। আল্লাহ পাকের নামের যিকিরের অনেক ফায়েদা। আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন বলেন,

الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا وَتَطْمَئِنُّ قُلُوْبُهُمْ بِذِكْرِ اللهِ    ؕ    اَلَا بِذِكْرِ اللهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوْبُ.

যারা ঈমান আনে এবং তাদের অন্তর আল্লাহর যিকির দ্বারা শান্তি লাভ করে। জেনে রাখো, আল্লাহর যিকির দ্বারাই অন্তর শান্তি পায়।-সূরা রা’দ (১৩) : ২৮

 

দিলের শান্তি ও প্রশান্তির মাধ্যম হলো আল্লাহ পাকের যিকির। আল্লাহর যিকিরের মাধ্যমে যার কলব প্রশান্ত থাকবে তার মৃত্যুর সময় আল্লাহ পাক তাকে সম্বোধন করে বলবেন,

یٰۤاَیَّتُهَا النَّفْسُ الْمُطْمَئِنَّۃُ ﴿٭ۖ۲۷﴾  ارْجِعِیْۤ  اِلٰی  رَبِّکِ رَاضِیَۃً  مَّرْضِیَّۃً ﴿ۚ۸۲﴾  فَادْخُلِیْ  فِیْ عِبٰدِیْ ﴿ۙ۹۲﴾ وَ ادْخُلِیْ جَنَّتِیْ ﴿۰۳﴾

হে প্রশান্ত আত্মা, তুমি তোমার রবের কাছে ফিরে চলো এমতাবস্থায় যে, তুমিও তার প্রতি সন্তুষ্ট আর তিনি তোমার প্রতি সন্তুষ্ট। আমার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাও এবং আমার জান্নাতে প্রবেশ করো।-সূরা ফাজর (৮৯) : ২৭-৩০

অতএব প্রতিদিন আমরা কিছু কিছু যিকির করব। সুফিয়ায়ে কেরাম ১২ তাসবীহ ও ছয় তাসবীহের আমলের কথা বলেছেন। ১২ তাসবীহ হলো : প্রথমে ২০০ বার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়ব। এরপর ইল্লাল্লাহ ৪০০ বার। এরপর আল্লাহু আল্লাহ ৬০০ বার। এ হলো মোট ১২০০। এরপর শেষে আবার আল্লাহ নামের যিকির করব ১০০ বার। এ বারো তাসবীহ আদায় করতে ৩৫ মিনিট থেকে ৪৫ মিনিট লাগতে পারে। দ্রুত পড়লে ৩৫ মিনিট, আর মনোযোগ দিয়ে পড়লে ৪৫ মিনিট।

এরপর ছয় তাসবীহের আমল করব। ছয় তাসবীহ হলো, প্রথমে ১০০ বার পড়ব,

سُبْحَانَ اللهِ وَالْحَـمْدُ للهِ وَلَا اِلٰهَ اِلَّا اللهُ وَاللهُ اَكْـبَـرُ.

এরপর দুরূদ শরীফ ১০০ বার। বড় দুরূদ শরীফ পড়ার সুযোগ না হলে ছোট কোনো দুরূদ শরীফ পড়ে নিলেও হবে। যেমন :

صَلّٰى اللهُ تَعَالٰى عَلَيْهِ وَاٰلِه وَاَصْحَابِه وَسَلَّمَ.

এরপর আসতাগফিরুল্লাহ ১০০ বার।

এই হলো ছয় তাসবীহ। এরপর ১০০ বার পড়ব,

سُبْحَانَ اللهِ وَبِحَمْدِه.

এ তাসবীহগুলো আদায় করতে বেশি হলে ২৫ মিনিট লাগবে।

আমরা একটু চিন্তা করে দেখি, দৈনিক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কত সময় অনর্থক কার্যকলাপে নষ্ট করি। অযথা কথাবার্তায় নষ্ট করি। এ সময়গুলোর জন্য আমাদের একদিন আফসোস করতে হবে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ১ ঘণ্টা সময় কি আমরা আল্লাহ পাকের যিকিরের জন্য দিতে পারি না? আমরা সকলেই নিয়ত করি, কোনো অবস্থাতেই যিকির ছাড়ব না। কোনো সময় সকালে করতে না পারলে দুপুরে হলেও তা আদায় করে নিই। আর কোনো দিন একেবারেই না করা হলে তার জন্য নিজের ওপর কিছু জরিমানা ধার্য করে নিই যে, এক বেলা যিকির ছুটে গেলে আমি এত রাকাত নফল নামায পড়ব কিংবা এত টাকা দান করব। এভাবে জরিমানা ধার্য করলেও ফায়দা পাওয়া যায়। আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে জীবনের অবশিষ্ট সময়টুকু কাজে লাগানোর তাওফীক দান করুন। আমীন।

[২৫ রমযান ১৪৪৩ হিজরী মোতাবেক ২৭ এপ্রিল ২০২২ ঈসায়ী জোহরের নামাযের পর ইতিকাফকারীদের উদ্দেশে হযরত মুহতামিম সাহেব হুযুর এ বয়ান করেন। রেকর্ড থেকে বয়ানটি পত্রস্থ করেছেন, মাওলানা আব্দুল মুমিন, সহকারী সম্পাদক]

Avatar

zobayer

একটি কমেন্ট করুন