আজ ৩০শে নভেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ২৫শে রবিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি
মাসিক নেয়ামত

জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ, ঢাকা-এর মুখপত্র

প্রতিষ্ঠাতা: মুজাহিদে আযম আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ.

ইলমেরও একটি নীতি আছে

ইলমেরও একটি নীতি আছে

আল্লামা সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.

ভাষান্তর : মাওলানা হেদায়েতুল হক

 

সঠিক পথের প্রয়োজন

প্রিয় তালিবুল ইলম ও দ্বীনি ভাইগণ, আপনারা হয়তো জানেন—কারও হয়তো জানা না—ও থাকতে পারে, তবে যারা তাফসীর পড়ছে, তাফসীরের কিতাব পড়া শুরু হয়েছে অথবা কমপক্ষে সূরা বাকারার অনুবাদ ও তাফসীর পড়েছেন তারা জানেন—জাহেলী যুগে যারা হজ করত তাদের একটা রীতি ছিল। এটা ছিল তাদের মনগড়া রীতি। শরীয়তের কোনো বিধান নয়। তারা নিজেরাই নিজেদের ওপর এ বিধান আরোপ করেছিল। তাদের নিয়ম ছিল এমন, যখন তারা হজের কাজ শুরু করত তখন থেকে হজ পালন শেষ হওয়া পর্যন্ত সময়ের মধ্যে কোনো কারণে ঘরে আসার প্রয়োজন হলে, স্বাভাবিক প্রবেশপথ দিয়ে ঘরে প্রবেশ করত না। কারণ, তারা এখনো আল্লাহর ঘর থেকে নিয়ম অনুযায়ী হজ শেষ করে আসেনি। এ অবস্থায় নিজের ঘরে স্বাভাবিক নিয়মে প্রবেশ করা তাদের মতে ছিল বে—আদবী। তাই তারা ছাদের ওপর দিয়ে বা দেয়ালের পেছন দিয়ে ঘরে এসে প্রয়োজন পূরণ করে চলে যেত। এটাকে তারা বাইতুল্লাহ শরীফের প্রতি আদব ও সম্মান প্রদর্শন মনে করত। অনেক সওয়াবের কাজ মনে করত। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَلَیْسَ الْبِرُّ بِاَنْ تَاْتُوا الْبُیُوْتَ مِنْ ظُهُوْرِهَا وَلٰکِنَّ الْبِرَّ مَنِ اتَّقٰی  ۚ وَاْتُوا الْبُیُوْتَ مِنْ اَبْوَابِهَا.

পেছন দিয়ে ঘরে আসা কোনো নেক কাজ নয়। নেক কাজ হলো আল্লাহকে ভয় করা। সুতরাং তোমরা দরজা দিয়েই ঘরে প্রবেশ করো।—সুরা বাকারা (২) : ১৮৯

এটাই হলো সাধারণ নিয়ম। যে—কোনো স্থানে স্বাভাবিক প্রবেশপথ দিয়ে প্রবেশ করাই হলো সুষ্ঠু বিবেক—বুদ্ধি ও পরিশীলিত রুচিবোধের দাবি। আর প্রকৃতির বিধানও এটাই।

কোরআন মাজীদ ‘জীবনে’র গ্রন্থ। জীবনের সকল (মৌলিক) দিক—নির্দেশনা তাতে আছে। সকল শ্রেণি—পেশার মানুষের জন্য, জীবনের সকল ক্ষেত্রে কোরআন মাজীদ হলো সংবিধান। প্রতিটি বিষয়ে তা মানুষকে দিক—নির্দেশনা দেয়। وَاْتُوا الْبُیُوْتَ مِنْ اَبْوَابِهَا (দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করো) কোরআনের এই ছোট্ট বাক্যটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ। এই বিধানের সম্পর্ক সমগ্র জীবনের সঙ্গে। মানব জীবনের জন্য এক প্রজ্ঞাপূর্ণ নির্দেশনা তাতে দেওয়া হয়েছে। এটি শুধু ঘরে প্রবেশ—সংক্রান্ত বিধান নয়, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তা প্রযোজ্য। যে—কোনো কাজে তার স্বাভাবিক প্রবেশপথে যাওয়া চাই।

যেমন, কেউ কোনো কাজ শিখতে চাইলে বা কোনো পেশায় নিজেকে নিয়োজিত করতে চাইলে তাকে সে কাজ ও পেশার স্বাভাবিক নীতি অনুসরণ করতে হবে। সে যদি শিক্ষকের কাছে ওই কাজ না শেখে, ওই পেশার সাধারণ নিয়ম—নীতি অনুসরণ না করে, তার প্রয়োজনীয় উপকরণের ব্যবস্থা না করে, ধীরে ধীরে নিয়মতান্ত্রিকভাবে (ঝঃবঢ় নু ঝঃবঢ়) তার ধাপগুলো অতিক্রম না করে, এমনকি সে পেশার নির্ধারিত ইউনিফর্ম পরিধান না করে, তাহলে সে ওই কাজ আয়ত্ত করতে পারবে না। লোহার কাজ যারা করে তাদের স্বতন্ত্র ইউনিফর্ম আছে। পানি বিতরণকারীদের ভিন্ন পোশাক আছে। সৈনিকের ইউনিফর্ম ভিন্ন। ডাক্তারের ইউনিফর্ম ভিন্ন। ওই ইউনিফর্ম অনেক সময় জরুরি হয়ে পড়ে। কেউ এগুলো গ্রহণ না করলে নিজ পেশায় সফল হতে পারবে না। ওই পেশা তার রপ্ত হবে না। ওই কর্ম তার শেখা হবে না।

কেউ বলতে পারে, ‘এগুলো বেহুদা কথা। আমরা কর্মকারের কাজ শিখব বা সেনাবাহিনীতে ভর্তি হব, ইউনিফর্ম নিয়ে ঝগড়া করব কেন? এটা পরা যাবে না, ওটা পরতে হবে, লেফট—রাইট করতে হবে, এগুলো ফালতু কথা। আমরা নিজের বুদ্ধি ও বিবেচনাশক্তি কাজে লাগাব। নতুন কোনো পন্থার উদ্ভাবন করব। আধুনিক কোনো পথ অবলম্বন করব।’

এমন ব্যক্তি অকর্মণ্যই থেকে যাবে, সৈনিক হতে পারবে না। এই নীতি অনুসরণ না করলে সে কর্মকার বা মিস্ত্রি হতে পারবে না। এসব ক্ষেত্রে—ও وَاْتُوا الْبُیُوْتَ مِنْ اَبْوَابِهَا (দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করো) এর নীতি মেনে চলা আবশ্যক। দরজা দিয়েই আসতে হবে। এই বিধান দ্বীন—দুনিয়া সর্বক্ষেত্রে প্রযোজ্য। আল্লাহ তাআলা যে নীতি নির্ধারণ করেছেন, মানব—প্রকৃতি ও সুস্থ বিবেক—বুদ্ধি বছরের পর বছর অভিজ্ঞতার আলোকে প্রতিটি কাজের যে নীতি নির্ধারণ করেছে, প্রতিটি কাজের যে প্রবেশ ও বহির্গমন পথ নির্ধারণ করেছে, কেউ যদি এর তোয়াক্কা না করে, একে গুরুত্ব না দেয়, তাহলে সে সফল হতে পারবে না। এসব নীতি না মেনে নিজের লক্ষ্যে পেঁৗছতে পারবে না।

কেউ যদি বলে, ‘হুরুফে তাহাজ্জী বা বর্ণমালার আলাপ—আলোচনা বড়ই অদ্ভুত ব্যাপার। প্রথমে আলিফ, বা, তা পড়তে হবে কেন? আমি সরাসরি বই পড়া শুরু করে দেব।’

এই ব্যক্তি যত মেধাবীই হোক না কেন, আলিফ, বা, তা (তথা বর্ণমালা) না চিনলে কোনো দিনই বই পড়া শিখতে পারবে না। যে অ. ই. ঈ. উ জানে না, সে এক সেকেন্ড ইংরেজিতে কথা বলতে পারবে না। আপনি যে—কোনো সময় তা পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। এ যুগের কোনো হিপোক্রেটিস বা সক্রেটিস (এর মতো প্রখর মেধাবী ব্যক্তি), যে পড়তে—লিখতে জানে না, তাকে আপনি আরবী, উদুর্, ইংরেজি বা আপনাদের কর্নাটকের কন্নড় ভাষার একটি বই দিন। তাকে বলুন, এক রাত নয়, আপনাকে এক মাসের সময় দিলাম। এ সময়ে আপনার কাছে কেউ আসবে না। বইসহ আপনাকে তালাবদ্ধ করে দেব। খাবার—দাবার জানালা দিয়ে পেঁৗছে দেব। প্রয়োজনীয় সবকিছু আগে থেকেই রুমে ব্যবস্থা করা আছে। এক মাস নয়, আপনাকে ছয় মাস সময় দেওয়া হবে। আপনি এই রুমে থাকবেন। এই বইয়ের একটি পৃষ্ঠা আমাকে পড়ে বুঝিয়ে দেবেন। সে যদি বর্ণমালার পরিচয় লাভ না করে থাকে তাহলে আপনি নিশ্চিত থাকুন, লোকটি প্রবেশ করার সময় যেমন জাহেল ছিল, তেমনই জাহেল বেরিয়ে আসবে। কেননা, সে وَاْتُوا الْبُیُوْتَ مِنْ اَبْوَابِهَا (দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করো) এর নীতি অনুসরণ করেনি।

হুরুফে তাহাজ্জী বা বর্ণমালা একেবারে সাধারণ বিষয়। এর তেমন কী গুরুত্ব আছে? বাচ্চাদেরকে আলিফ, বা, তা পড়ানো হয় মকতবে। কিন্তু যুগশ্রেষ্ঠ ইমাম গাযালী রহ., ইমাম রাযী রহ.—ও এর মুখাপেক্ষী। তাঁরাও প্রথমে হুরুফে তাহাজ্জী পড়েছেন, তারপর ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন, তাফসীরে রাযী পর্যন্ত পৌঁছেছেন। হুরুফে তাহাজ্জী না পড়লে তাঁরা কখনো ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন, তাফসীরে রাযী পর্যন্ত পৌঁছতে পারতেন না। এভাবে প্রতিটি বিদ্যা, প্রতিটি শাস্ত্র, প্রতিটি বিভাগেরও একটি নীতি আছে। বিদ্যা শিখতে হলে ওই নীতি মানতে হবে। আমরা যে ইলম শিখতে এসেছি, শুধু পড়াশোনা বা জ্ঞানার্জনের দৃষ্টিকোণ থেকে এটাও অন্যান্য জ্ঞান ও ইলমের মতোই। আমরা অনেকে মনে করি, আমাদের পৃথিবী আর তাদের পৃথিবী ভিন্ন। অথচ আপনি লক্ষ করলে দেখবেন, দ্বীনি ইলম ও দুনিয়াবী জ্ঞান অর্জনের বহু বিষয় এক ও অভিন্ন। যেমন শ্রেণি হিসেবে অধ্যয়ন, শিক্ষকের কাছে পাঠ গ্রহণ, মেহনত করা, শিক্ষককে সম্মান করা ইত্যাদি সবই এক ও অভিন্ন।

 

ইউরোপের শিক্ষক ছাত্র

অনেকে মনে করেন, ইউরোপ তথা পাশ্চাত্যের লোকেরা শিক্ষককে সম্মান করে না। আপনারা বিষয়টি নিজের দেশের কলেজ—ভার্সিটির সঙ্গে তুলনা করবেন না। এরা তো প্রাচ্য—পাশ্চাত্য কোনোটারই অনুসারী নয়। এগুলোতে না দ্বীন আছে, না দুনিয়া আছে। আপনাআপনি বেড়ে ওঠা আগাছার মতো।

আমি ইউরোপ গিয়েছি। সেখানকার ভার্সিটিগুলো দেখেছি। ক্যামব্রিজ, অক্সফোর্ড গিয়ে আমি অবাক হয়েছি। আপনাদের অবগতির জন্য শুধু বলছি, সেখানে আজও উস্তাদ—শাগরেদ সিস্টেম বিদ্যমান। প্রতিটি ছাত্রের জন্য আবশ্যক একজন শিক্ষককে নিজের গুরু (সার্বিক বিষয়ে যার দিক—নির্দেশনা মেনে চলবে) বানাতে হবে। আপনি যে—কোনো অফিসে চলে যান। বিএ বা এমএ যে বিভাগে ভর্তি হতে যাবেন, আপনাকে জিজ্ঞাসা করা হবে আপনার শিক্ষাগুরু কে? কে আপনার পরামর্শদাতা? তখন আপনাকে বলতে হবে, অমুক স্যার আমার শিক্ষাগুরু। অমুক প্রফেসরের তত্ত্বাবধানে আমি জ্ঞান অর্জন করব। তারপর ওই শিক্ষকের সঙ্গে পীর—মুরীদের মতো গভীর সম্পর্ক হয়ে যায়। ছাত্র ওই শিক্ষাগুরুর পরামর্শে বই—পুস্তক অধ্যয়ন করতে থাকে। তাঁকে নোট করে দেখাতে হয়, যেন তিনি বুঝতে পারেন, শিষ্য এই বইয়ের সঠিক গুরুত্ব বুঝেছে। বইয়ের মূল বিষয় ও সারনির্যাস সে আত্মস্থ করতে পেরেছে। তারপর সে নিজে নিজে প্রবন্ধ প্রস্তুত করে। ওখানে তাদের মধ্যে সম্পর্ক এত গভীর হয়ে যায়, যেমন প্রথমযুগে আমাদের মাদরাসাগুলোতে হতো। তখন প্রত্যেক শিক্ষকের সঙ্গে কিছু ছাত্র থাকত। ওই ছাত্ররা সর্বাবস্থায় উস্তাদের সঙ্গে সংযুক্ত থাকত।

ওই যুগে কবিদের অবস্থা পর্যন্ত এমন ছিল যে, তাদের রাবী বা বর্ণনাকারী থাকত। সাহিত্যের ইতিহাসে পাওয়া যায়, অমুক অমুক কবির রাবী। অর্থাৎ সে ওই কবির সকল কবিতা তার কাছ থেকে শিখেছে এবং পুরোপুরি আয়ত্ত করেছে। এখন সে তার পক্ষ থেকে অন্যদেরকে কবিতা শোনাতে পারে। কখনো কবি নিজে ঘোষণা করতেন, অমুক আমার রাবিয়া। এখন আমি কবিতা শোনাব না, তার কাছ থেকে শুনে নিন।

এভাবে আমাদের যুগ পর্যন্ত ছাত্ররা উস্তাদগণের মধ্যে বণ্টন হয়ে যেত। চারজন ছাত্র একজন উস্তাদের সঙ্গে জুড়ে যেত। তারা ওই উস্তাদের খাদেমও। প্রয়োজনে চা বানাবে। উস্তাদের আরামের প্রতি লক্ষ রাখবে। বাজার থেকে প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে এনে দেবে। আমাদের ওখানে তো এমন রীতি ছিল যে, উস্তাদের হিসাব—কিতাবের দায়িত্বও ছাত্রকে দিয়ে দিতেন। তিনি তাকে দিয়ে লেখাতেন। বিভিন্ন প্রবন্ধ বের করতেন। আমরা সবাই এভাবেই পড়েছি। ইউরোপে গিয়ে জেনেছি, ওখানের উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রগুলোতে, বড় বড় ভার্সিটিতে আজও এই ধারা বিদ্যমান। এ ছাড়া কোনো ছাত্রকে গ্রহণ করা হয় না। ভর্তি করার পূর্বে অবশ্যই আপনাকে বলতে হবে, আপনার শিক্ষাগুরু কে? যার সঙ্গে আপনি সর্বাবস্থায় যুক্ত থাকবেন। যার পরামর্শে আপনি চলবেন। আমাদের দ্বীনি জ্ঞান অর্জনের পন্থাও এমনই।

 

দ্বীনি ইলমের বৈশিষ্ট্য

কিছু বিষয় তো উভয় শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে একই। তবে এর পর একটি সীমা আসে, একটি রেখা আসে, যেখান থেকে আমাদের আর তাদের পথ ভিন্ন হয়ে যায়। তা হলো, আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি কামনা, ইখলাস, আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করা, হে আল্লাহ, আমি তো সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করছি। আসল ইলম দেওয়ার মালিক তো আপনিই।

হযরত ইমাম শাফেয়ী রহ. এর কবিতা মনে রাখবেন,

شَكَوْتُ إلَى وَكِيعٍ سُوءَ حِفْظِي … فَأوْصَانِى إلَى تَرْكِ المعَاصِي

فَإِنَّ العِلْمَ نُوْرمِنْ إِلهِي …

وَنُوْرُ اللهِ لَا يُعْطَى لعَاصِي

আমি আমার উস্তাদ ইমাম ওয়াকী রহ. এর কাছে আমার স্মরণশক্তির দুর্বলতার কথা বললাম। তিনি আমাকে বললেন, গোনাহ থেকে বেঁচে থাকো। কেননা, ইলম হলো আল্লাহপ্রদত্ত নূর। আর আল্লাহ তাআলার নূর কোনো পাপীকে দেওয়া হয় না।

এখানে এসে আমাদের ও তাদের পথ ভিন্ন হয়ে যায়। তারা সিনেমা দেখতে গেলে, চারিত্রিক অবক্ষয়ের শিকার হলে বা কুপথে চললে কিছু যায় আসে না। যদিও আমার মত হলো তাদের ক্ষেত্রেও এসবের প্রভাব পড়ে। ধরুন, মেনে নিলাম, তাদের ওপর এসবের কোনো প্রভাব পড়ে না। এভাবেই তারা ফাস্টর্ ডিভিশনে ফাস্টর্ হয়ে যাবে, চাকুরি পেয়ে যাবে। পক্ষান্তরে আমাদের এখানে ইলমের ওপর এসবের সুস্পষ্ট প্রভাব পড়ে। যে উস্তাদকে সম্মান করে, উস্তাদের দুআ লাভ করে, তাঁর কাছে গোলামের মতো হয়ে থাকে, ইতিহাস পড়লে আপনি জানতে পারবেন, কখনো কখনো একজন ছাত্র তার কোনো উস্তাদের সঙ্গে এমনভাবে জীবন কাটিয়েছেন যে, অবশেষে তিনি উস্তাদের মতো হয়ে গেছেন। উস্তাদের জ্ঞান এমনভাবে শুষে নিয়েছেন, যেমন কোনো পানপাত্র থেকে কেউ পান করে নেয়। এভাবে উস্তাদের ইলম পান করে তা পরবর্তী  শাগরেদের মধ্যে পুরোপুরি নিংড়ে দিয়েছেন।

 

ইলমের আদব

প্রিয় তালিবুল ইলম, আমাদের এই ইলমের কিছু আদব আছে, যে ইলম আমরা অন্বেষণ করছি, যার জন্যই এ জামিয়া প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এটা বাহুবলে অর্জন করার বিদ্যা নয় যে, কেউ বলবে, উস্তাদ আবার কে? কিতাবের আদব আবার কী? কীসের প্রাচীন কাহিনি শোনাচ্ছ? আল্লাহ তাআলা আমাকে মেধা ও স্মৃতিশক্তি দিয়েছেন, আমার মেহনত করার সামর্থ্য আছে, শারীরিকভাবে সুস্থ—সবল আছি, আমি যা খুশি করে দেখাব। এভাবে চিন্তা করার সুযোগ নেই। অনেক মানুষ যোগ্যতা কম থাকা সত্ত্বেও এমন সফল হয়েছেন যে, বিশ্বব্যাপী তাদের সুনাম—সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে।

একটি ঘটনা আমার মনে আছে। লাহোরে এক লোক ছিলেন। তিনি ভুল পথ ধরেছিলেন। কলেজে পড়াতেন। প্রখর মেধার অধিকারী ছিলেন। যুক্তিবিদ্যায় খুবই পারদর্শী ছিলেন। এমনকি ড. ইকবালও (আল্লামা ইকবাল রহ.) তাকে শ্রদ্ধা করতেন। কিন্তু তার দ্বারা যে ফায়েদা হওয়ার কথা ছিল, ইলম ও সুন্নতের যে গবেষণা হওয়ার কথা ছিল, তা হয়নি। তিনি বলেন, মৌলভী হুসাইন আহমাদ মাদানী আমাদের ক্লাসে ছিল। সে ক্লাসের মেধাহীন ছাত্রদের তালিকায় ছিল। সেখানে তাঁর বিশেষ কোনো কৃতিত্ব ছিল না। আর তিনি খুবই মেধাবী ছাত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কিন্তু এত মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও তার দ্বারা কী ফায়েদা হয়েছে?

এমনইভাবে এক লোক বলছিলেন, আরে মৌলভী ইলিয়াসের কথা আর কী বলব, যখনই দেখো, নফল পড়ছে। ছাত্র জমানায় তিনি নফলের পাবন্দি করতেন। এই মৌলভী ইলিয়াস কী করে দেখিয়েছেন? সমগ্র বিশ্ব হেলিয়ে দিয়েছেন। আমেরিকা, আফ্রিকাতেও তাঁর দাওয়াত—পদ্ধতি ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে।

আমি আমার দীর্ঘ অভিজ্ঞতার কথা আপনাদের বলছি। অল্প যোগ্যতায়, وَاْتُوا الْبُیُوْتَ مِنْ اَبْوَابِهَا (দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করো) এর ওপর আমল করে, মানুষ সে অবস্থানে পৌঁছতে পারে, যেখানে ওইসব মেধাবীরাও পৌঁছতে পারে না, যারা নিজের মেধা, মেহনত ও বিস্তৃত অধ্যয়নের ওপর গর্ব করে। তাদের পঠন ও পাঠদানে কোনো বরকত হয়নি। মানুষ তাদের ইলম দ্বারা উপকৃত হয়নি। তাদের দ্বারা উম্মতের মধ্যে সুন্নতের প্রচলন, বিদআত নির্মূল, গোনাহের প্রতি ঘৃণা সৃষ্টি, নেক কাজের প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হয়নি। মানুষের মধ্যে নূর আসেনি। এগুলো তখনই হবে যখন মানুষ উল্লিখিত পদ্ধতি অনুসরণ করবে। উস্তাদের অনুকরণ করবে।

শামের একজন বড় আলেম ছিলেন আল্লামা বাইতার। তিনি বলেন, একবার প্রচণ্ড শীত ছিল। আমরা আমাদের উস্তাদের কাছে যেতে পারিনি। শামে অনেক শীত পড়ে। কখনো কখনো তুষারপাত হয়। আমরা অপারগ ছিলাম। নির্ধারিত সময়ে যেতে পারিনি, তাই অন্য সময় গেলাম।

আমরা যাওয়ার পর উস্তাদ জিজ্ঞাসা করলেন, তখন কেন আসোনি?

আমরা বললাম, প্রচণ্ড শীত ছিল।

তিনি আমাদের ওপর এক কলস পানি ঢেলে দিলেন। বললেন, এটা কোনো শীত হলো?

আমরা সহ্য করলাম, কিছু বললাম না। তারপর এভাবেই চলে গেলাম।

এই কষ্ট সহ্য করে তিনি আল্লামা বাইতার হয়েছেন। ঘটনাটি আল্লামা বাইতার নিজে শুনিয়েছেন বা তাঁর কোনো এক সঙ্গী শুনিয়েছেন। এই ছিল ওই যুগের পন্থা। উস্তাদ খেদমত নিতেন, পড়াতেনও। উস্তাদ কেবল একজন উস্তাদই হতেন না, একজন পীর ও শায়খও হতেন। শাগরেদ তাঁর কাছে থেকে নামায পড়া শিখত। নামায কেমন হবে? নামাযের খুশু—খুযু কেমন হবে? নামাযে সুন্নতের গুরুত্ব কতটুকু? মসজিদে প্রবেশের সময় প্রথমে কোন পা রাখতে হয়? বের হওয়ার সময় প্রথমে কোন পা বের করতে হয়? এ সবই শিখত। এখন এসব বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

 

সুযোগ্য ব্যক্তির সংকট

বর্তমানে দেখুন, কোনো বড় ব্যক্তি, সাধারণ পর্যায়ের চেয়ে উঁচু মানের মনীষী, কোনো আল্লামা, বিরাট কোনো ব্যক্তিত্ব তৈরি হচ্ছে না। এ সময়ে কোনো ইমাম মুযানী রহ., ইমাম নববী রহ., শায়খুল ইসলাম ইবনে আব্দুস সালাম রহ., হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী রহ. যদি হতে না পারে, তাহলে কোনো হাফেয ইবনে হাজার হাইতামীই রহ. হোক না। তাঁর মতো না হলে কমপক্ষে দ্বিতীয় তৃতীয় স্তরের আদীব হোক। কিন্তু তা—ও হচ্ছে না। একসময় মিশরে অনেক মহান ব্যক্তি তৈরি হয়েছেন। ওই যুগে জামিয়া আযহার অনেক বড় বড় ব্যক্তিত্ব জন্ম দিয়েছে। গভীর ইলমের অধিকারী মনীষী জন্ম দিয়েছে। এখন মিশরও শূন্য হয়ে গেছে। সেখানেও আজ প্রচণ্ড খড়া চলছে। রাজনৈতিক স্বার্থ মিশরের প্রভাব—প্রতিপত্তি বিলীন করে দিয়েছে। সেখানেও আজ মনীষী ব্যক্তিত্ব তৈরি হচ্ছে না। সকলেই অনুভব করছে, আজ আর কোথাও মনীষী ব্যক্তিত্ব তৈরি হচ্ছে না। এর জন্য করণীয় হলো দরসের প্রতি মনোযোগী হওয়া, উস্তাদের সম্মান করা, গভীর অধ্যয়ন করা, সামনের সবক মুতালাআ করা ব্যতীত দরসে না যাওয়া।

হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ. বলেন, সামনের সবক মুতালাআ না করে দরসে যাওয়া, সবকের পর না পড়া এখন তালিবে ইলমের স্বভাবে পরিণত হয়েছে। দরসের পূর্বে মুতালাআ করে দরসে যাওয়া এবং দরসের পর বারবার পড়ার আগ্রহ এখন বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

এ কয়েকটি কথাই নিবেদন করার ছিল। দীর্ঘ গল্প করব না। এই কথাগুলোর ওপর আমল করলে আজও আল্লাহ তাআলার নীতি তা—ই যা পূর্বে ছিল। আলহামদুলিল্লাহ, আজও কিছু কিছু মেধাবী মানুষ তৈরি হচ্ছেন।

আমাদেরকে আল্লাহ তাআলা পর্যাপ্ত খাবার দিচ্ছেন। পূর্বের যুগে মানুষ কী খেত? আর সেগুলো খেয়ে তাদের মেধা কী বাড়বে? সপ্তাহ মাস চলে যেত বেচারারা ঘি চোখে দেখত না। না তেল ছিল, না গোশত বা ফল। শুকনো রুটি খেয়ে তাঁরা এমন কাজ করেছেন যে, সবাই হতবাক। কেউ কেউ তো এমন ছিলেন যে, রুটির দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন, রুটি তন্দুরে রাখার পর যে ঘ্রাণ পেয়েছেন, তাতে তিনি কিছু শক্তি পেয়েছেন। তারপর গিয়ে পড়া শুরু করেছেন।

কথা হলো, وَاْتُوا الْبُیُوْتَ مِنْ اَبْوَابِهَا (দরজা দিয়ে ঘরে প্রবেশ করো)। অর্থাৎ ইলমের ঘরে স্বাভাবিক দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে হবে। ইলমের দরজা দিয়ে প্রবেশ করার মর্ম হলো, এসব নিয়ম—নীতি মেনে চলা। আদব—সম্মান রক্ষা করা। শৃঙ্খলা মেনে চলা। অধ্যয়ন করা ও মেহনত করা।

প্রিয় ভাইয়েরা, এগুলো করলে তোমরাও ইলমের আকাশে তারকা হয়ে জ¦লজ¦ল করবে, ইনশাআল্লাহ। তোমাদের নাম উজ্জ্বল হবে। দেশ ও জাতির নাম তোমরা উজ্জ্বল করবে। অন্যথায় একটি মাসআলা বলাও কঠিন হয়ে পড়বে। কোনো কিতাব পড়ানো বা কোনো ইলমী খেদমত করাও মুশকিল হয়ে পড়বে।

আমি মনে করি, এ কথাগুলোই যথেষ্ট। আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করি, তিনি যেন আমাদেরকে সকল বিপদ—আপদ থেকে রক্ষা করেন। ইখলাস দান করেন। নিজের কালামের (কোরআনের) ও কালামের ধারকদের আদব ও সম্মান বজায় রাখার তাওফীক দান করেন। আমীন।

وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين

 

 

editor

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন x