প্রতিষ্ঠাতা: মুজাহিদে আযম হযরত মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.

জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ, ঢাকা-এর মুখপত্র

প্রতিষ্ঠাকালঃ ১৯৩৭ ঈসায়ী

ইসলামে পশু-পাখির অধিকার

ইসলামে পশু-পাখির অধিকার

হাকীমুল উম্মত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ.

মাওলানা আশেক ইলাহী বুলন্দশহরী রহ.


 

[পূর্বপ্রকাশের পর]

হাদীস নং : ১৬

عَنْ أَنَسٍ – رَضِيَ اللهُ عَنْهُ – قَالَ: إِنْ كَانَ النَّبِيُّ – صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – لَيُخَالِطُنَا حَتَّى يَقُولَ لِأَخٍ لِي صَغِيرٍ: يَا أَبَا عُمَيْرٍ مَا فَعَلَ النُّغَيْرُ؟ كَانَ لَهُ نُغَيْرٌ يَلْعَبُ بِهِ فَمَاتَ.  مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ.

قال في المرقاة: في الحديث إباحة لعب الصبي بالطيورإذا لم يعذبه.

হযরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের সঙ্গে অকৃত্রিম আচরণ করতেন, এমনকি আমার ছোট ভাইকে লক্ষ করে (মজা করে) বলতেন, আবু উমায়ের, তোমার নুগায়র লাল পাখির কী খবর? কারণ, তাঁর একটি লাল পাখি ছিল, যা নিয়ে সে খেলায় মেতে     থাকত। এক সময় সেটি মারা যায়।-বুখরী ও মুসলিম (তারপর দেখা হলেই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে এই প্রশ্ন করতেন।)

ফায়েদা : খেলার জন্য শিশুদের পাখি দেওয়া জায়েয, যদি শিশুরা তাকে কষ্ট না দেয়। কষ্ট না দেওয়ার শর্ত আরোপের দলীল সামনের হাদীসে আসছে। এ ছাড়া আরও বহু হাদীস আছে যেখানে জানদারদের কষ্ট দিতে নিষেধ করা হয়েছে।

 

হাদীস নং : ১৭

وَعَنْ عَامِرٍ الرَّامِ قَالَ: بَيْنَا نَحْنُ عِنْدَهُ يَعْنِي عِنْدَ النَّبِيِّ – صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ – إِذْ أَقْبَلَ رَجُلٌ عَلَيْهِ كِسَاءٌ وَفِي يَدِهِ شَيْءٌ قَدِ الْتَفَّ عَلَيْهِ، فَقَالَ: يَا رَسُولَ الله مَرَرْتُ بِغِيضَةِ شَجَرٍة فَسَمِعْتُ فِيهَا أَصْوَاتَ فِرَاخِ طَائِرٍ، فَأَخَذْتُهُنَّ فَوَضَعْتُهُنَّ فِي كِسَائِي، فَجَاءَتْ أُمُّهُنَّ فَاسْتَدَارَتْ عَلَى رَأْسِي، فَكَشَفْتُ لَهَا عَنْهُنَّ فَوَقَعَتْ عَلَيْهِنَّ فَلَفَفْتُهُنَّ بِكِسَائِي فَهُنَّ أُولَاءِ مَعِي، قَالَ: ضَعْهُنَّ، فَوَضَعْتُهُنَّ، وَأَبَتْ أُمُّهُنَّ إِلَّا لُزُومَهُنَّ، فَقَالَ رَسُولُ الله – صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ -: أَتَعْجَبُونَ لِرَحْمِ أُمِّ الْأَفْرَاخِ فِرَاخَهَا، فَوَالَّذِي بَعَثَنِي بِالْحَقِّ لَلَّهُ أَرْحَمُ بِعِبَادِهِ مِنْ أُمِّ الْأَفْرَاخِ بِفِرَاخِهَا، ارْجِعْ بِهِنَّ حَتَّى تَضَعَهُنَّ مِنْ حَيْثُ أَخَذْتَهُنَّ وَأُمُّهُنَّ مَعَهُنَّ، فَرَجَعَ بِهِنَّ.

হযরত আমের আর-রামী রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, একবার আমি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। গায়ে চাদর জড়ানো এক লোকের হঠাৎ আগমন ঘটল। তার কাছে কিছু একটা ছিল, যা সে ঢেকে রেখেছিল। সে বলল, ইয়া রাসূলুল্লাহ, আমি ঘন বৃক্ষরাজিপূর্ণ একটি স্থান অতিক্রম করছিলাম। তখন পাখির ছানাদের কিচির-মিচির শুনতে পেয়ে তাদের বাসার দিকে এগিয়ে গেলাম। সেখান থেকে এগুলোকে বের করে আমার চাদরে পেঁচিয়ে নিলাম। বাচ্চাদের জন্য মা-পাখিটি আমার মাথার ওপর চক্কর দিতে লাগল। আমি চাদরটি তার সামনে খুলে দিতেই সে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। ফলে আমি এদের সকলকে এই চাদরে পেঁচিয়ে নিয়েছি। এই তো আমার হাতেই আছে এরা।

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এগুলো (নিচে) রাখো।

(কথামতো) লোকটি তাদের রেখে দিল; কিন্তু পাখিটি কিছুতেই বাচ্চাদের ছেড়ে গেল না।

(এ দৃশ্য দেখে) নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রশ্ন করলেন, তোমরা কি বাচ্চাগুলোর প্রতি মা-পাখিটির ভালোবাসা দেখে আশ্চর্যবোধ করছ? ওই সত্তার কসম, যিনি আমাকে সত্যের বার্তাবাহকরূপে পাঠিয়েছেন, মা-পাখিটি তার বাচ্চাদের প্রতি যতটা মমতাবান, সত্যি সত্যি আল্লাহ পাক আপন বান্দাদের প্রতি এর চেয়ে (বহু বহু গুণ) বেশি মমতাবান।

তারপর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে আদেশ দিলেন পাখিগুলো যেখান থেকে এনেছ সেখানে মা-পাখিটিসহ রেখে আসো। আদেশমতো লোকটি সেগুলোকে সেখানে রেখে আসার জন্য ফিরে গেল।-আবূ দাঊদ

ফায়েদা ১ : আরেক বর্ণনায় আছে, এ ধরনেরই এক প্রসঙ্গে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধমকের স্বরে বলেছিলেন,

من فجَّعَ هذه بولدها؟

কে এই মা-পাখিটিকে দুঃখ দিল?

ردوا ولدها إليها.

তার বাচ্চাগুলো তাকে ফিরিয়ে দাও। (এই বর্ণনা ২৮ নম্বর হাদীসে আসছে।)

ফায়েদা ২ : এর দ্বারা বোঝা গেল, কোনো প্রাণীকে বিনা প্রয়োজনে কষ্ট দেওয়া শাসনযোগ্য অপরাধ এবং নিষিদ্ধ।

অন্য হাদীসেও আদেশসূচক শব্দ এসেছে যে, এদেরকে স্বস্থানে রেখে আসো। আর পূর্বাপর করিনা-অনুষঙ্গমুক্ত আমর সাধারণত আবশ্যকতা বোঝায়। এখানে এর বিপরীত কোনো অনুষঙ্গ নেই। অনেককেই খাঁচায় পাখি পালতে দেখা যায়। সৃষ্টিগতভাবেই যেহেতু এগুলো পোষ মানে না আর প্রতিপালনের পর অপোষ্যই থেকে যায়, আর এই অপোষ্য স্বভাবের কারণে পিঞ্জিরাবদ্ধ রাখার কারণে অবশ্যই এদের কষ্ট হয়। তদ্রূপ যখন তাদের বাচ্চা থাকা অবস্থায় ধরে আনা হয়, যেমনটা তোতা পাখির ছানার ক্ষেত্রে বেশিরভাগ ঘটে থাকে—এতে বাচ্চা এবং মা-পাখি উভয়েরই কষ্ট হয়। তাই এহেন কাজ অবশ্যই নিষিদ্ধ। যেমন দুররে মুখতারে এই বক্তব্যের অন্তর্গত আলোচনায় আছে, আনন্দের জন্য কবুতর পালার অনুমোদনের কথা এসেছে, কিন্তু উড়িয়ে দিতে নিষেধ করা হয়েছে। আল্লামা শামী রহ. উদ্ধৃত করেছেন, ‘মুজতাবা’তে আছে, ঠিকমতো পানাহার প্রদান করলে ঘরে পাখি ও মুরগি পালনে কোনো অসুবিধা নেই। আর গুনিয়াতে আছে, খানাপিনা ঠিকমতো দিলেও বুলবুলিকে পিঞ্জিরাবদ্ধ রাখা জায়েয নয়। আর বিশেষত পিঞ্জিরাবদ্ধ রাখা মাকরূহ হওয়ার বড় কারণ হলো বন্দিত্ব ও এক ধরনের কষ্ট প্রদান।

পক্ষান্তরে অন্যান্য প্রতিপালন-পদ্ধতিতে এমন কিছু নেই। আর এর দ্বারা বন্দিত্ব বৈধ ও অবৈধ এ দুই মতের মধ্যে সমন্বয় হয়ে গেল। এই হাদীসে পরিষ্কার বিবৃত হয়েছে, যেভাবে পাললে প্রাণী কষ্ট পায় ও আহত বোধ করে, সেভাবে পালা জায়েয নয়। তো পাখিদের মধ্যে কিছু আছে পোষ মানে, যেমন : কবুতর, তিতির, মোরগ ইত্যাদি। এসব পালনে কোনো অসুবিধা নেই। আর কিছু আছে পোষ মানে না। এদের স্বাধীন রাখা হয়। যেমন : চিড়িয়াখানায় বড় জায়গা নিয়ে লোহার খাঁচা তৈরি করে রাখা হয় এবং খাবার-দাবারের সুন্দর ব্যবস্থাপনা থাকে, এভাবে পালতেও কোনো অসুবিধা নেই।

আর যদি খাঁচা-পিঞ্জিরায় আবদ্ধ রাখা হয় যেমনটা সাধারণত করা হয়, তা বৈধ নয়। আর বুলবুলি পাখি পালার বিষয়টি যা ওপরে আলোচিত হয়েছে, হয় পালার সময় বিষয়টি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানতে পারেননি কিংবা তা পিঞ্জিরাবদ্ধ ছিল না। খানাপিনার যথাযথ ব্যবস্থা করা সত্ত্বেও এ ধরনের পাখি পিঞ্জিরাবদ্ধ রেখে পালা যখন জায়েয নয়, তখন খানাপিনার সুব্যবস্থা যদি না থাকে তাহলে দ্বিগুণ গোনাহ। আর যদি রোদ-বৃষ্টিতে অযত্ন অবহেলায় থাকে, তাহলে গোনাহ হবে তিন গুণ। বাঘ, সিংহ ইত্যাদি ‘কাট-ঘরে’—চিড়িয়াখানায় রাখাও এই হুকুমভুক্ত।

 

হাদীস নং : ১৮

وَعَن يعلى بن مرَّةَ الثَّقفي قَالَ ثَلَاثَةُ أَشْيَاءَ رَأَيْتُهَا مِنْ رَسُولِ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَيْنَا نَحْنُ نَسِيرُ مَعَه إِذ مَرَرْنَا بِبَعِير يُسْنَى عَلَيْهِ فَلَمَّا رَآهُ الْبَعِيرُ جَرْجَرَ فَوَضَعَ جِرَانَهُ فَوَقَفَ عَلَيْهِ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ أَيْنَ صَاحِبُ هَذَا الْبَعِيرِ فَجَاءَهُ فَقَالَ بِعْنِيهِ فَقَالَ بَلْ نَهَبُهُ لَكَ يَا رَسُولَ الله  وَإِنَّهُ لِأَهْلِ بَيْتٍ مَا لَهُمْ مَعِيشَةٌ غَيْرُهُ قَالَ أَمَا إِذْ ذَكَرْتَ هَذَا مِنْ أَمْرِهِ فَإِنَّهُ شَكَا كَثْرَةَ الْعَمَلِ وَقِلَّةَ العلفِ فَأحْسنُوا إِلَيْهِ.

হযরত য়ালা বিন মুররা সাকাফী থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর তিনটি আশ্চর্য ঘটনা দেখেছি, (তন্মধ্যে একটি হলো) আমরা একবার তাঁর সঙ্গে পথে চলছিলাম, পথিমধ্যে পানি টানার একটি উট পড়ল। উটটি তাঁকে দেখে করুণ স্বরে আওয়াজ করতে লাগল এবং গর্দানের অগ্রভাগ তাঁর পায়ে বিছিয়ে দিল (এমনটা করে সাধারণ আনুগত্য প্রকাশের জন্য)। তিনি তার কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে গেলেন। আর বললেন, এর মালিককে খবর দাও। মালিক হাজির হলে তাকে বলেন, এটাকে আমার কাছে বিক্রি করে দাও।

মালিক : ইয়া রাসূলুল্লাহ! বিক্রি নয়, এমনিতেই আপনাকে দিয়ে দিচ্ছি। আর তা এমন পরিবারের মানুষের, যাদের এ ছাড়া উপার্জনের কোনো উপকরণ নেই।

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম : ঘটনা যদি তা-ই হয় যা তুমি বলছ, তাহলে (তা আর আমি গ্রহণ করছি না)। শোনো এটি আমার নিকট অধিক খাটুনি ও খোরাক কম দেওয়ার অভিযোগ করেছে। সুতরাং তার সঙ্গে ভালো আচরণ করো।-শরহুস সুন্নাহ

ফায়েদা : পশু-প্রাণী খাটিয়ে যারা কাজ নেয় তারা এতে খুব বেশি আক্রান্ত। হাল চাষকারী ও এক্কা গাড়ির গাড়োয়ানরা এ হাদীস খুব মনোযোগের সঙ্গে পড়বেন, শুনবেন। দুররে মুখতারে গরু, মহিষ ও গাধাকে কাজে খাটানোর ক্ষেত্রে শর্ত যোগ করা হয়েছে। কষ্ট না দিয়ে প্রহার না করে কাজে খাটাতে বলেছে আর কারণ লিখেছে পশু-প্রাণীর ওপর জুলুম করাটা যিম্মির (মুসলিম দেশে নিরাপত্তা নিয়ে বাস করা অমুসলিম) ওপর জুলুম করার চেয়ে মারাত্মক ও ভয়াবহ আর যিম্মির ওপর জুলুম করা মুসলমানদের ওপর জুলুম করার চেয়ে ঘোরতর অন্যায়।

সারকথা এই দাঁড়াল, মুসলমানের ওপর জুলুম করা (যে ব্যাপারে হাদীসে কঠিন থেকে কঠিনতর হুঁশিয়ারি উচ্চারিত হয়েছে) যতটা ঘোরতর, তার চেয়ে দ্বিগুণ ঘোরতর হলো কোনো পশু-প্রাণীর ওপর জুলুম করা। রদ্দুল মুহতারে বলা হয়েছে, তার সামর্থ্যরে চেয়ে বেশি বোঝা তার ওপর চাপানো যাবে না। তার মাথা-চেহারায় মারা যাবে না। এ ব্যাপারে সবাই একমত। আর ইমাম আবু হানিফা রহ. প্রহারকে মোটেই অনুমোদন করেন না, যদিও নিজের মালিকানাধীন হয়। অবাধ্যতার দরুন প্রহার করতে হলে ততটুকুই মারতে পারবে যতটুকু প্রয়োজন হবে, এর বেশি নয়। এর দ্বারা এ কথাও পরিষ্কার হয়ে গেল যে, শুধুমাত্র দ্রুতগতিতে চলার জন্য কিছুতেই মারা যাবে না।

হাদীস নং : ১৯

وَعَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ الله  صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: غُفِرَ لِامْرَأَةٍ مُومِسَةٍ مَرَّتْ بِكَلْبٍ عَلَى رَأْسِ رَكِيٍّ يَلْهَثُ كَادَ يَقْتُلُهُ الْعَطَشُ فَنَزَعَتْ خُفَّهَا فَأَوْثَقَتْهُ بِخِمَارِهَا فَنَزَعَتْ لَهُ مِنَ الْمَاءِ فَغُفِرَ لَهَا بِذَلِكَ.

قِيلَ: إِنَّ لَنَا فِي الْبَهَائِمِ أَجْرًا؟ قَالَ: فِي كُلِّ ذَاتِ كبد رطبَة أجر.

হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এক বদকার মহিলাকে ক্ষমা করে দেওয়া হয় শুধু এই কারণে যে, তার চলার পথে পিপাসার্ত একটি কুকুর কূপের পাশে জিহ্বা বের করে মরণাপন্ন হয়ে পড়েছিল। (এই করুণ দৃশ্য দেখে তার মনে দয়া হলো) সে নিজের পায়ের চামড়ার মোজা খুলে ওড়নায় পেঁচিয়ে কূপ থেকে পানি তুলল এবং কুকুরকে পান করাল। তো এই সুবাদে সে ক্ষমা পেয়ে যায়। প্রশ্ন করা হলো, পশু-প্রাণীকে পানাহার করানোতেও কি আমাদের সাওয়াব হয়?

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উত্তর দিলেন, প্রত্যেক প্রাণীর সেবা-যত্নেই সওয়াব হয়।-বুখারী, মুসলিম

ফায়েদা : যেসব প্রাণী হত্যা করা অপরিহার্য, যেমন সাপ ইত্যাদি এই হুকুমভুক্ত নয়। তবে কষ্ট দেওয়া এদেরকেও বৈধ নয়। এই হাদীস দ্বারা কেউ যেন কুকুর পালার পক্ষে দলিল পেশ না করে। কেননা পালা এক জিনিস আর প্রয়োজনের সময় সাহায্য আরেক জিনিস। লক্ষ করুন, এই কুকুরকে সে কোনো কাজে খাটায়নি (আর কাজে না খাটানো সত্ত্বেও তাকে সাহায্য করাতে এত বড় পুরস্কার পেয়েছে) তো যেসব পশু-প্রাণীকে কাজে খাটানো হয় তাদের হক ও অধিকার কত বেশি হবে। (আর তা আদায় করলে কী পরিমাণ সওয়াব হবে কল্পনা করা যায়?)

 

হাদীস নং : ২০

وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ وَأَبِي هُرَيْرَةَ قَالَا: قَالَ رَسُولُ الله  صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: عُذِّبَتِ امْرَأَةٌ فِي هِرَّةٍ أَمْسَكَتْهَا حَتَّى مَاتَتْ مِنَ الْجُوعِ فَلَمْ تَكُنْ تُطْعِمُهَا وَلَا تُرْسِلُهَا فَتَأْكُلَ مِنْ خَشَاشِ الْأَرْضِ

হযরত আবু হুরায়রা ও হযরত ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত, তাঁরা বলেন, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এক মহিলাকে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, কারণ সে একটি বিড়ালকে বেঁধে রেখেছিল। খাবারও দেয়নি এবং ছেড়েও দেয়নি, যাতে যমিনের কীটপতঙ্গ খেতে পারে। এমনকি সেটি ক্ষুধায় মারা যায়।

ফায়েদা : রদ্দুল মুহতারে আছে, বিড়াল কষ্টদায়ক হলে তাকেও মাত্রাতিরিক্ত প্রহার করা যাবে না; বরং ধারালো ছুড়ি দিয়ে জবাই করে দেবে। মানুষজন পশু-প্রাণীকে কষ্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো পরোয়া করে না। নাসাঈ শরীফে এক বর্ণনায় আছে, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, বিড়াল-সংক্রান্ত অপরাধের কারণে এক মহিলাকে দোযখে এমনভাবে শাস্তি ভোগ করতে দেখেছি যে, ওই বিড়ালটি মহিলার সম্মুখভাগে কামড়াচ্ছিল যখন সে মুখোমুখি হতো, আর যখন পেছন ফিরত তখন পশ্চাদ্দেশে কামড়াচ্ছিল।-সালাতুল কুসূফ অধ্যায়

আল্লাহ পাক সকল মুসলমানকে পশু-প্রাণীদের কষ্ট প্রদান থেকে হেফাজত করুন। আমীন।

 

হাদীস নং : ২১

وَعَنْ أَبِي جُرَيٍّ جَابِرِ بْنِ سُلَيْمٍ رضي الله عنه في حديث طويل قَالَ: قُلْتُ: اعْهَدْ إِلَيَّ. قَالَ : لَا تَسُبَّنَّ أَحَدًا, قَالَ فَمَا سَبَبْتُ بَعْدَهُ حُرًّا وَلَا عَبْدًا وَلَا بَعِيرًا وَلَا شَاةً.

হযরত আবু জুরাই বিন সুলাইম রাযি. থেকে একটি দীর্ঘ হাদীসে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নিকট আবেদন করলাম ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে কিছু অসিয়ত করুন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, কাউকে গালমন্দ করো না। তিনি বলেন, এরপর আমি আর কাউকে গালমন্দ করিনি, না কোনো স্বাধীন ব্যক্তিকে, আর না কোনো গোলামকে, না কোনো উটকে আর না বকরিকে।-আবু দাউদ

ফায়েদা : কাউকে গালি দেওয়া ও অলুক্ষণে বলা সবই গালমন্দের অন্তর্ভুক্ত। ১২ ও ১৫ নং হাদীসে এ প্রসঙ্গে বিশদ আলোচনা দেখা যেতে পারে।

 

হাদীস নং : ২২

وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ رَجُلًا لَعَنَ الرِّيحَ عِنْدَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: لَا تَلْعَنُوا الرِّيحَ فَإِنَّهَا مَأْمُورَةٌ وَأَنَّهُ مَنْ لَعَنَ شَيْئًا لَيْسَ لَهُ بِأَهْلٍ رَجَعَتِ اللَّعْنَةُ عَلَيْهِ  رَوَاهُ التِّرْمِذِيُّ وَقَالَ: هَذَا حَدِيثٌ غَرِيبٌ

হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, এক লোক নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সামনে হাওয়াকে লা’নত দিল। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, হাওয়াকে লা’নত দিয়ো না, কেননা সে তো আদিষ্ট অর্থাৎ আল্লাহ পাকের হুকুমে প্রবাহিত হয়। লা’নতের উপযুক্ত নয় এমন বস্তুকে যে লা’নত করে তখন ওই লা’নত উল্টো লা’নতকারীর ওপর পতিত হয়।-তিরমিযী

ফায়েদা : ‘বস্তু’ শব্দের ব্যাপকতায় পশু-প্রাণীও অন্তর্ভুক্ত; তাই পশু-প্রাণীর ওপর লা’নত করাও নাজায়েয।

 

হাদীস নং : ২৩

وَعَنْهُ قَالَ: كَانَ رَسُولُ الله  صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسلم يكرَهُ الشِّكالَ فِي الْخَيْلِ وَالشِّكَالُ: أَنْ يَكُونَ الْفَرَسُ فِي رِجْلِهِ الْيُمْنَى بَيَاضٌ وَفِي يَدِهِ الْيُسْرَى أَوْ فِي يدِه اليُمنى ورِجلِه اليُسرى.

হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোড়ার মাঝে শিকাল পছন্দ করতেন না। আর শিকাল হলো—ঘোড়ার পেছনের ডান পায়ে বা সামনের বাম পায়ে কিংবা সামনের ডান পায়ে অথবা পেছনের বাম পায়ে শুভ্রতা থাকা।-মুসলিম

লুমআ’তে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, সম্ভবত এ জাতীয় ঘোড়ায় উৎকৃষ্ট গুণাবলির ঘাটতি থাকে।

 

হাদীস নং : ২৪

وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: يُمْنُ الْخَيْلِ فِي الشُّقْرِ.

হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, বরকতপূর্ণ ঘোড়া হলো লাল বর্ণের ঘোড়া।-তিরমিযী

হাদীসের شُقْرِ শব্দের অর্থ—নিরেট লাল।

ফায়েদা : বিভিন্ন জিনিস বরকতপূর্ণ হওয়ার বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত ও প্রমাণিত বাস্তবতা, তবে অশুভ হওয়া নয়।

 

হাদীস নং : ২৫

وَعَن عُتبةَ بن عبدٍ السُّلميِّ أَنَّهُ سَمِعَ رَسُولَ الله  صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ:  لَا تَقُصُّوا نَوَاصِيَ الْخَيْلِ وَلَا مَعَارِفَهَا وَلَا أَذْنَابَهَا فَإِنَّ أَذْنَابَهَا مَذَابُّهَا وَمَعَارِفَهَا دِفاءُها وَنَوَاصِيهَا مَعْقُودٌ فِيهَا الْخَيْرُ.

হযরত উতবা ইবনে আবদ আসসুলামী রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি নবীজিকে বলতে শুনেছেন, ঘোড়ার কপাল ও লেজের পশম কেটো না। কেননা লেজ হলো তাদের পাখা, গর্দানের পশম হলো উষ্ণতার উপকরণ, কপালের পশম হলো কল্যাণের আধার।-আবু দাউদ

 

হাদীস নং : ২৬

وَعَنْ أَبِي وَهَبٍ الْجُشَمِيِّ قَالَ: قَالَ رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ:  ارْتَبِطُوا الْخَيْلَ وامسحُوا بنواصيها وأعجازِها أَو قَالَ: كفالِها وَقَلِّدُوهَا وَلَا تُقَلِّدُوهَا الْأَوْتَارَ.

আবু ওয়াহাব আলজুশামী রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, নিজেদের এখানে ঘোড়া বেঁধে রেখো, তাদের কপাল ও পশ্চাদ্দেশে হাত বুলিয়ে দিয়ো (এর দ্বারা তাদের প্রতি আদর-যতœ প্রকাশ পায়। আর এতে তাদের মাঝে আনন্দ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়) ধনুকের তাঁত (রশি) দিয়ে তাদের গলা বেঁধো না।-আবু দাউদ, নাসাঈ

ফায়েদা : উল্লেখিত হাদীসদ্বয় থেকে পরিষ্কার জানা গেল, পশু-পাখিদের আরাম ও সুবিধার প্রতি খেয়াল রাখা উচিত। তাদের আরামে ব্যাঘাত ঘটে এমন কাজ পরিহার করা উচিত। সুতরাং যেখানে আরামে ব্যাঘাত ঘটাতে নিষেধ করা হয়েছে, সেখানে কষ্ট দেওয়া কতটা জঘন্য কাজ হবে। তাঁত বাঁধতে নিষেধ করার কারণ সামনে আসবে।

 

হাদীস নং : ২৭

عَنْ جَابِرٍ قَالَ: ذَبَحَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ الذَّبْحِ كَبْشَيْنِ أَقْرَنَيْنِ أَمْلَحَيْنِ موجوئين.

হযরত জাবের রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শিংওয়ালা সাদা-কালো দুটি খাসি দুম্বা কোরবানী করেছিলেন।-মুসনাদে আহমাদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ, দারেমী

ফায়েদা : এই হাদীস থেকে জানা গেল বিশেষ কোনো সুবিধা ও কল্যাণ বিবেচনায় পশুকে খাসি করা জায়েয। দুররে মুখতার ও রদ্দে মুহতার উভয়টাতেই এ ব্যাপারে পরিষ্কার বক্তব্য রয়েছে।

 

হাদীস নং : ২৮

وَعَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَبْدِ الله عَنْ أَبِيهِ قَالَ: كُنَّا مَعَ رَسُولِ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي سَفَرٍ فَانْطَلَقَ لِحَاجَتِهِ فَرَأَيْنَا حُمْرَةً مَعَهَا فَرْخَانِ فَأَخَذْنَا فَرْخَيْهَا فَجَاءَتِ الْحُمْرَةُ فَجَعَلَتْ تَفْرُشُ فَجَاءَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: مَنْ فَجَعَ هَذِهِ بِوَلَدِهَا؟ رُدُّوا وَلَدَهَا إِلَيْهَا . وَرَأَى قَرْيَةَ نَمْلٍ قَدْ حَرَّقْنَاهَا قَالَ: مَنْ حَرَّقَ هَذِهِ؟ فَقُلْنَا: نَحْنُ قَالَ: إِنَّهُ لَا يَنْبَغِي أَنْ يُعَذِّبَ بِالنَّارِ إِلاَّ ربُّ النَّار.

হযরত আব্দুর রহমান বিন আব্দুল্লাহ তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেন, আমরা রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে এক সফরে ছিলাম। তিনি প্রকৃতির প্রয়োজন সমাধা করতে গেলেন। আমরা একটি ঘুঘু দেখতে পেলাম, যার সঙ্গে দুটি ছানা ছিল। আমরা তার ছানা দুটিকে ধরে ফেললাম। ফলে ঘুঘুটিও উড়ে এসে ছানাদের ওপর পাখা ছড়িয়ে দিতে লাগল। ইতিমধ্যে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফিরে এলেন এবং প্রশ্ন করলেন এর ছানাদের ধরে কে একে কষ্ট দিল? তাকে তার ছানাগুলো ফিরিয়ে দাও।

এরপর তিনি পিপীলিকাদের বড় একটি বাসা দেখতে পেলেন যা আমরা জ¦ালিয়ে দিয়েছিলাম। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কে এদের বাসা জ্বালিয়ে দিয়েছে?

আমরা নিবেদন করলাম, আমরা জ্বালিয়েছি।

তিনি বললেন, আগুনের মালিক যিনি তিনি ছাড়া কারও জন্য আগুন দিয়ে শাস্তি দেওয়া বৈধ নয়।

ফায়েদা : এই হাদীস থেকে কয়েকটি বিষয় জানা গেল,

এক. পশু-পাখির বাচ্চা ধরা জায়েয নয়। এতে বাচ্চারাও কষ্ট পায় (যেমনটা ১৭ নং হাদীসের আলোচনায় বিস্তারিত গত হয়েছে) এবং মা-বাবাও কষ্ট পায়। যার ফলে এই হাদীসে বাচ্চাগুলোকে স্বস্থানে রেখে আসার নির্দেশ জারি করা হয়েছে। তাই এর থেকে পরিষ্কার জানা গেল, এর অনুমোদন নেই।

দুই. কোনো প্রাণীকে আগুন দিয়ে পোড়ানো জায়েয নয়, যদিও তা কষ্টদায়ক প্রাণী হয়। এতে সেই দাগানোর বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত, যা অসহনীয় আর অন্যান্য পদ্ধতিও এতে শামিল হয়ে গেছে যেমন, ছাড়পোকাদের ওপর গরম পানি ঢেলে দেওয়া, তেল বের করার জন্য তপ্ত পানিতে কোনো জ্যান্ত প্রাণীকে ফেলে দেওয়া যেমনটা চিকিৎসকরা বাতলে থাকে, এ সবই নিষিদ্ধ। মৌলভী মুস্তফা সাহেব রচিত তিব্বি জাওহর নামক গ্রন্থে এ প্রসঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা রয়েছে। আর হারাম জিনিস দিয়ে চিকিৎসা প্রসঙ্গেও তিনি দারুন আলোচনা করেছেন।

ফিকহ্বিদগণ চিকিৎসার স্বার্থে যে দাগানোর অনুমোদন দিয়েছেন (যেমনটা রদ্দুল মুহতারে আছে) তাতে সহনীয়তার শর্ত প্রযোজ্য। এর অনুমোদনের দলিল হলো—স্বয়ং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত সাদ ইবনে মুয়াজের যখমে দাগাতে নির্দেশ দিয়েছেন। তদ্রূপ কষ্টদায়ক পশু-পাখিকে প্রতিরোধের অন্য কোনো ব্যবস্থা না থাকলে আগুন প্রয়োগের ব্যবস্থা গ্রহণের অনুমোদন রয়েছে, যেমন غنيم শত্রুকে প্রতিরোধের জন্য বন্দুক ব্যবহার যা প্রকৃতপক্ষে জ্বালানো। দুররে মুখতার ও রদ্দে মুহতার উভয়টিতেই এর পরিষ্কার অনুমোদন রয়েছে। মুসলমান ভাইয়েরা কান পেতে মন দিয়ে এসব হাদীস শুনুন এবং আমল করার চেষ্টা করুন, কোনো কষ্টদায়ক প্রাণীকে আগুনে পোড়াবেন না।

 

হাদীস নং : ২৯

وَعَنِ ابْنِ عُمَرَ مرفوعا: لَعَنَ اللهُ الْخَمْرَ وَشَارِبَهَا وَسَاقَيَهَا وَبَائِعَهَا وَمُبْتَاعَهَا وَعَاصِرَهَا وَمُعْتَصِرَهَا وَحَامِلَهَا وَالْمَحْمُولَةَ إِلَيْهِ . رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ

হযরত ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, শরাব ও শরাব পানকারীর প্রতি, পরিবেশকের প্রতি, বিক্রেতার প্রতি, ক্রেতার প্রতি, প্রস্তুতকারীর প্রতি, অর্ডারকারীর প্রতি, বহনকারীর প্রতি, যার নিকট বহন করে নিয়ে যাওয়া হয় তার প্রতি আল্লাহ পাকের অভিশাপ হোক।-আবু দাউদ

ফায়েদা : ‘পরিবেশন ও পান করানো’ ব্যাপকতাজ্ঞাপক শব্দ। প্রাণীকে পান করানোও এর মধ্যে অন্তর্ভুক্ত। এর দ্বারা জানা গেল, প্রাণীকেও কোনো হারাম জিনিস খাওয়ানো নাজায়েয। যেমন, কিছু মানুষ শক্তি বর্ধনের জন্য হাঁস-মুরগিকে ড্রাগ সেবন করায় এবং তা জবাই করে নিজেরা খায়। দুররে মুখতারে পরিষ্কার বলা হয়েছে,

و حرم الانتفاع بها يعنى بالخمر و لو لسقي دواب أو لطين او نظر للتلهى او فى دواء.

তো মতন-মূল পাঠের বর্ণনা নিঃশর্ত। শুধু কোনো কোনো মাশায়েখের বক্তব্য আল্লামা শামী উদ্ধৃত করেছেন,

لو قاد الدابَّة إلى الخمر لا بأس به و لو نقل الى الدابَّة يكره.

তবে মতন তথা মূল পাঠের বক্তব্যই অগ্রগণ্য হয়ে থাকে। হ্যাঁ, নাপাক জিনিস যদি কোথাও রাখা থাকে আর পশু-প্রাণী নিজ থেকেই খেতে শুরু করে, তাহলে তাকে বারণ করা ওয়াজিব ও আবশ্যক নয়। তবে ইচ্ছা করে তাকে খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা যাবে না।

 

হাদীস নং : ৩০

وَعَن سهلِ بنِ الحَنظلِيَّةِ قَالَ: مَرَّ رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِبَعِيرٍ قَدْ لَحِقَ ظَهْرُهُ بِبَطْنِهِ فَقَالَ:  اتَّقُوا اللهَ فِي هَذِهِ الْبَهَائِمِ الْمُعْجَمَةِ فَارْكَبُوهَا صَالِحَة واترُكوها صَالِحَة.

হযরত সাহল বিন হানযালিয়া থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, (একবার) রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি উটের পাশ দিয়ে রাস্তা অতিক্রম করছিলেন। তখন দেখতে পেলেন (ক্ষুধায়) উটটির পেট পিঠের সঙ্গে লেগে আছে। তিনি এই দুরবস্থা দেখে বললেন, এসব নির্বাক প্রাণীর ব্যাপারে তোমরা আল্লাহ পাককে ভয় করো। যথানিয়মে তাতে আরোহণ করো, (তাদের ক্ষুধা ও পিপাসার খেয়াল রেখো) যথার্থ অবস্থায় তাদের ছেড়ে দিয়ো (অর্থাৎ ক্লান্ত-শ্রান্ত হওয়ার আগেই নেমে পড়)।-আবু দাউদ

ফায়েদা : পশু-পাখিরা নির্বাক, তারা তাদের ক্লান্তি ও ক্ষুৎ-পিপাসা প্রকাশ করতে অক্ষম। তাই তোমরা নিজ থেকেই এদের হকের প্রতি খেয়াল রেখো। তাদের পানাহারের খেয়াল রেখো। চলার শক্তি থাকলে তাদের ব্যবহার করো। ব্যবহার করতে করতে তাদের ঘিলু শেষ করে ফেলো না; বরং ক্লান্ত হওয়ার আগে আগেই তাদের ছেড়ে দিয়ো।

 

হাদীস নং : ৩১

وَعَن ابنِ عبَّاسٍ أَنَّهُ دَفَعَ مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ عَرَفَةَ فَسَمِعَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَرَاءَهُ زَجْرًا شَدِيدًا وَضَرْبًا لِلْإِبِلِ فَأَشَارَ بِسَوْطِهِ إِلَيْهِمْ وَقَالَ: يَا أَيُّهَا النَّاسُ عَلَيْكُمْ بِالسَّكِينَةِ فَإِنَّ الْبِرَّ لَيْسَ بِالْإِيضَاعِ.

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (হজের সময়) আরাফার দিন আমি রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে চলছিলাম। তিনি পেছন থেকে উটদের প্রহার ও কঠোরভাবে হাঁকানোর আওয়াজ শুনতে পেলেন। তাই তিনি (পেছন ফিরে) নিজের চাবুকটি দিয়ে ইশারা করে বললেন, হে লোকসকল! ধীরস্থিরে কার্য সম্পাদন করো। কেননা (সওয়ারিকে) দ্রুত হাঁকানো কোনো নেক কাজ নয়।-বুখারী

ফায়েদা : বোঝা গেল বিনা প্রয়োজনে দ্রুত হাঁকানো, বিনা প্রয়োজনে একে অপরকে ছাড়িয়ে যাওয়ার জন্য বাহন-জন্তুকে কষ্ট দেওয়া যেমনটা টাঙ্গাওয়ালারা করে থাকে, সম্পূর্ণ নিষেধ।

 

হাদীস নং : ৩২

وَعَن أبي بشيرٍ الأنصاريِّ: أَنَّهُ كَانَ مَعَ رَسُولِ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي بَعْضِ أَسْفَارِهِ فَأَرْسَلَ رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَسُولًا:  لَا تبقين فِي رَقَبَة بَعِيْر قِلَادَةٌ مِنْ وَتَرٍ أَوْ قِلَادَةٌ إِلَّا قُطِعَتْ

আবু বশির আনসারী থেকে বর্ণিত, তিনি প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সঙ্গে কোনো এক সফরে ছিলেন। ওই সফরে এই ঘটনা ঘটে, (রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কাফেলার লোকদের মাঝে ঘোষণা করার জন্য) একজন ঘোষক পাঠালেন যিনি এই মর্মে ঘোষণা করবেন, কোনো উটের গলায় তাঁত-ধনুকের ফিতা বাঁধা থাকলে তা যেন কেটে ফেলা হয়।-বুখারী, মুসলিম

তাঁত-ধনুকের ফিতা যেহেতু খুব শক্ত হয়ে থাকে আর তাতে অনেক সময় ফিতা দ্বারা চামড়া কেটে গোশতের মধ্যে গিয়ে লাগার সম্ভাবনা থাকে, তাই তা বাঁধতে নিষেধ করেছেন। কোনো কোনো বর্ণনায় আছে—প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে দাড়িতে গিঁট লাগায়, (কিংবা পশুর গলায়) তাঁত-ধনুকের ফিতা বাঁধে অথবা চতুষ্পদ প্রাণীর বিষ্ঠা বা হাড্ডি দিয়ে ইস্তিঞ্জা করবে তার ব্যাপারে (রাসুলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) দায়মুক্ত।

এর দ্বারা এ বিষয়টিও পরিষ্কার হয়ে গেল, কোনো পশু-প্রাণীকে এত কষে বাঁধা যাবে না, যার ফলে উঠতে বসতে গেলে তার দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়।

 

হাদীস নং : ৩৩

وَعَن أَنَسٍ قَالَ: أَتَى النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِتَمْرٍ عَتِيقٍ فَجَعَلَ يُفَتِّشُهُ وَيُخْرِجُ السُّوسَ مِنْهُ.

হযরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, (একবার) রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে পুরোনো খেজুর আনা হয়, তখন তিনি তা থেকে খুঁজে খুঁজে কিড়া বের করতে লাগলেন।-আবু দাউদ

ফায়েদা : বোঝা গেল, কোনো ফলে যদি কিড়া লেগে যায় তাহলে তা পরিষ্কার করে খাওয়া উচিত। কিড়া খাওয়া উচিত নয়। পোকাসহ পুরোনো লাড্ডু খেয়ে ফেলার প্রচলন ভারতবর্ষে রয়েছে। এ ব্যাপারে এই বলে যুক্তি দেখানো হয় যে, পোকাসহ লাড্ডু খেলে চোখের ক্ষতি হয় না। এটা ভুল বিশ্বাস, শরীয়তবিরুদ্ধ ও নাজায়েয কাজ।

 

হাদীস নং : ৩৪

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ عَنْ رَسُولِ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ:  بَينا رجل يَسُوق بقرة إِذْ أعيي فَرَكِبَهَا فَقَالَتْ: إِنَّا لَمْ نُخْلَقْ لِهَذَا إِنَّمَا خُلِقْنَا لِحِرَاثَةِ الْأَرْضِ. فَقَالَ النَّاسُ: سُبْحَانَ اللّূهِ بَقَرَةٌ تَكَلَّمُ. فَقَالَ رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ:  فَإِنِّي أومن بِهَذَا أَنَا وَأَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ.

হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক লোক গরু হাঁকিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল। চলতে চলতে সে ক্লান্ত হয়ে পড়লে গরুর পিঠে চড়ে বসল। তখন গরুটি তাকে লক্ষ করে বলল, আমাদের এ জন্য সৃষ্টি করা হয়নি (যে আমাদের সওয়ারি হিসেবে ব্যবহার করা হবে)। আমাদের তো শুধু চাষাবাদের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে।

এই ঘটনা দেখে লোকজন (আশ্চর্য হয়ে) বলল, সুবহানাল্লাহ! গরুও মানুষের মতো কথা বলে।

এ ঘটনা শুনে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমি এ ঘটনা বিশ্বাস করি আর আবু বকর ও উমরও বিশ্বাস করে। (অর্থাৎ আল্লাহ পাক সর্ববিষয়ে ক্ষমতাবান, তিনি পশু-প্রাণীকেও বাকশক্তি দিতে পারেন) আর যখন তিনি এ কথা বলছিলেন তখন আবু বকর ও উমর রাযি. সেখানে উপস্থিত ছিলেন না।-বুখারী ও মুসলিম

ফায়েদা : এর দ্বারা বোঝা গেল, হযরত আবু বকর ও উমর রাযি.-এর সঙ্গে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সম্পর্ক খুব গভীর ও নিবিড় ছিল। তাঁদের উভয়ের ঈমানকে খুব উল্লেখযোগ্য মনে করতেন।

ফায়েদা : এই হাদীসের আলোকে জানা গেল, আল্লাহ পাক যে প্রাণীকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন, তাকে সেই কাজের জন্যই ব্যবহার করতে হবে। সুতরাং কেউ যদি বকরিকে সওয়ারির কাজে ব্যবহার করতে চায়, তাহলে তা অগ্রহণযোগ্য কাজ বলে বিবেচিত হবে।

 

হাদীস নং : ৩৫

عَن أُمِّ كُرْزٍ قَالَتْ: سَمِعْتُ رَسُولَ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ:  أَقِرُّوا الطَّيْرَ عَلَى مَكِنَاتِهَا.

উম্মে কুরয রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি—পাখিদের নিজ নিজ বাসস্থানে থাকতে দাও।-আবু দাউদ

ফায়েদা : বোঝা গেল পাখিদেরকে তাদের বাসা থেকে কিংবা অবস্থানের জায়গা থেকে সরানো ও উড়ানো বৈধ নয়। এর দ্বারা (ইসলামপূর্ব) আরব জাহেলিয়াত ও যাত্রার শুভ-অশুভ লক্ষণ নির্ণয়ে বাসা থেকে পাখি উড়িয়ে দেওয়ার প্রথার ভিত্তিহীনতা প্রমাণিত হয়। তারা বাসা থেকে পাখি উড়িয়ে দেওয়ার পর পাখিটি ডানে গেলে যাত্রা শুভ হবে বলে মনে করত আর বাঁ দিকে উড়ে গেলে যাত্রা অশুভ মনে করত হতো এবং নিজ অভিপ্রায় বর্জন করত। রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই শিরকী প্রথা নিষিদ্ধ করেন।

 

হাদীস নং : ৩৬

وَعَن عبد الله بن عَمْرو رضي الله عنه قال: قال رَسُول اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ:  كَفَى بِالرَّجُلِ إِثْمًا أَنْ يَحْبِسَ عَمَّنْ يَمْلِكُ قُوتَهُ . وَفِي رِوَايَةٍ: كَفَى بِالْمَرْءِ إِثْمًا أَنْ يُضَيِّعَ مَنْ يَقُوتُ.

হযরত আব্দুল্লাহ বিন আমর রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, কারও গোনাহগার হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, সে যার খোরাকের দায়িত্বশীল তাকে সে আটকে রাখে। অর্থাৎ তার খোরাক বন্ধ করে দেয়, যার ফলে তার শক্তি-সামর্থ্য কমে যায় কিংবা প্রাণহানি ঘটে।-মুসলিম

অন্য বর্ণনায় আছে, কারও গোনাহগার সাব্যস্ত হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট, যে জিনিস তার মালিকানায় আছে সে তাকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়।

ফায়েদা : অর্থাৎ যদি কারও মধ্যে সকল ভালো দিক থাকে কিন্তু তার মধ্যে এই সামান্য খারাবিটুকু থাকে তথা তার অধীনস্থ, যাদের ভরণপোষণের দায়িত্ব তার, যেমন দাস-দাসী, স্ত্রী-সন্তান, পশু-প্রাণী; তো তার গোনাহগার হওয়ার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে, সে তাদের খোরাক বন্ধ করে দেয়। যেমন বিড়ালকে বেঁধে রাখা মহিলাকে শুধু এ কারণে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়। কেননা, সে তাকে বেঁধে রেখেছে কিন্তু কোনো খানা-পিনা দেয়নি। যার ফলে বাকশক্তিহীন এই প্রাণীটির প্রাণহানি ঘটে।

 

হাদীস নং : ৩৭

وَعَنْ أَنَسٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ:  مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَغْرِسُ غَرْسًا أَوْ يَزْرَعُ زَرْعًا فَيَأْكُلُ مِنْهُ إِنْسَانٌ أَوْ طَيْرٌ أَوْ بَهِيمَةٌ إِلَّا كَانَت لَهُ صَدَقَة.

হযরত আনাস রাযি. বর্ণনা করেন, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যে-কোনো মুসলমান কোনো চারা রোপণ করে কিংবা কোনো ফসল ফলায়, আর কোনো মানুষ বা পাখি কিংবা চতুষ্পদ জন্তু তা থেকে খায়, তাহলে তা তার জন্য সদকা বলে গণ্য হবে।-বুখারী, মুসলিম

ফায়েদা : এ হাদীসের আলোকে প্রাণীকে পানাহার করানোর সওয়াব জানা গেল। আর নিঃশর্ত যে-কোনো প্রাণীকে যখন পানাহার করানো সদকা (বরং হাদীস দ্বারা জানা যাচ্ছে নিজের অজান্তে যে পশু-প্রাণীরা ক্ষেত থেকে খেয়ে ফেলে তা-ও সদকা বলে গণ্য হয়) তো যে প্রাণীকে সে প্রতিপালন করছে তার খোরপোষও নিজ জিম্মায় বহন করছে তাকে পানাহার করানোর দ্বারা কী পরিমাণ সওয়াব হবে। (একটু চিন্তা করে দেখুন)

 

হাদীস নং : ৩৮

وَعنهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: الْخَلْقُ عِيَالُ الله فَأَحَبُّ الْخَلْقِ إِلَى اللهِ مَنْ أَحْسَنَ إِلَى عِيَالِهِ.

হযরত আনাস রাযি. থেকে এ হাদীসও বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, গোটা সৃষ্টি আল্লাহ পাকের পরিবার। তাই আল্লাহ পাকের নিকট সর্বাধিক প্রিয় সে, যে তাঁর পরিবারের সঙ্গে সদাচরণ করে।-বায়হাকী, শুআবুল ঈমান

ফায়েদা : সৃষ্টিজীবের মধ্যে পশু-প্রাণীরাও অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং পশু-প্রাণীদের খোঁজ-খবর রাখা। তাদের পানাহার করানোও আল্লাহ পাকের প্রিয়পাত্র হওয়ার আমল বলে সাব্যস্ত হলো।

 

হাদীস নং : ৩৯

وَعَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُولُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: قَرَصَتْ نَمْلة نَبِيًّا من الأنبياءِ فأمرَ بقريةِ النَّمْلِ فَأُحْرِقَتْ فَأَوْحَى اللهُ تَعَالَى إِلَيْهِ: أَنْ قَرَصَتْكَ نَمْلَةٌ أَحْرَقْتَ أُمَّةً مِنَ الْأُمَمِ تُسَبِّحُ؟

হযরত আবু হুরায়রা রাযি. বর্ণনা করেন, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, নবীদের মধ্য থেকে একজন নবীকে পিপীলিকা দংশন করেছিল, তখন তিনি পিপীলিকাদের পুরো বাসাটিকে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন, ফলে (সকল পিপীলিকাসহ) বাসা জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। তখন আল্লাহ পাক তার প্রতি ওহি নাযিল করেন যে, একটা পিপীলিকার দংশনের কারণে তুমি তাসবীহ পাঠকারী একটি জামাতকে জ্বালিয়ে দিয়েছ।-বুখারী, মুসলিম

ফায়েদা : কোরআন শরীফে বর্ণিত হয়েছে, প্রতিটি বস্তু আল্লাহ পাকের তাসবীহ পড়ে। তো কোনো প্রাণীকে মেরে ফেলায় এটিও একটি ক্ষতি হয় যে, এতে পৃথিবীতে যিকিরের কমতি-ঘাটতি সৃষ্টি হয়, যেমন আল্লাহ পাক এ জন্য নবীকে পর্যন্ত ছাড় দেননি, যা এই হাদীসে আলোচিত হয়েছে। সুতরাং যে প্রাণী কষ্টদায়ক কিংবা হালাল গোশত খাওয়ার উদ্দেশ্য ছাড়া (নিছক বিনোদনের জন্য) কোনো পশু-প্রাণীর প্রাণহানি ঘটানো আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টিবিরুদ্ধ। আর যেসব প্রাণীর গোশত আহার করা হয় সেগুলোও আল্লাহ পাকের তাসবীহ পড়ে থাকে। কিন্তু মানুষের স্বার্থ, সুবিধা ও প্রয়োজন বিবেচনায় হালাল পশু-প্রাণী খাওয়ার এবং কষ্টদায়ক প্রাণীকে হত্যার অনুমোদন দিয়ে দিয়েছেন।

 

হাদীস নং : ৪০

 عن أبي هريرة رضي الله عنه أن رسول الله صلى الله عليه وسلم قال: يقضي الله بين خلقه الجن والإنس والبهائم، وإنه ليقيد يومئذ الجماء من القرناء، حتى إذا لم يبق تبعة عند واحدة لأخرى قال الله : كونوا تراباً، فعند ذلك يقول الكافر : يا ليتني كنت تراباً “ .

আল্লাহ পাক (কিয়ামতের দিন) আপন সৃষ্টি তথা মানুষ, জিন এবং চতুষ্পদ প্রাণীদের মধ্যে ফয়সালা করবেন। আর সেদিন শিংবিহীন প্রাণীকে আঘাতকারী প্রাণী থেকে—যে তাকে দুনিয়াতে অহেতুক আঘাত করেছে—বদলা গ্রহণের সুযোগ করে দেবেন। এমনকি যখন কোনো প্রাণীর অন্য প্রাণীর নিকট কোনো দাবি ও প্রাপ্য না থাকবে, তখন আল্লাহ পাক তাদেরকে হুকুম দেবেন সকলে মাটি হয়ে যাও (ফলে মানুষ আর জিন ছাড়া সকলে মাটি হয়ে যাবে); এই দৃশ্য দেখে কাফের চরম আক্ষেপের সাথে বলবে, হায়! আমি যদি মাটি হয়ে যেতাম (তাহলে পশু-প্রাণীদের মতো অনন্তকালের শাস্তি থেকে বেঁচে যেতাম)।-তাফসীরে ইবনে জারীর

সহীহ মুসলিমের এক হাদীসে আছে, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, কিয়ামত দিবসে পাওনাদারদের ন্যায্য পাওনা অতি অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে। এমনকি শিংবিহীন বকরির পক্ষে শিংওয়ালা বকরি থেকে বদলা গ্রহণ করা হবে। (শিংওয়ালা বকরি যদি শিংবিহীন বকরিকে আঘাত করে থাকে) মানুষ তো মানুষ, পশু-প্রাণীরাও যদি একে অপরের ওপর জুলুম করে থাকে তাহলে তাদেরও বদলা গ্রহণের ব্যবস্থা করা হবে। অথচ পশু-প্রাণীর ওপর আল্লাহ পাকের বিধি-বিধান প্রযোজ্য নয়। এ থেকেই বোঝা যায়, যদি কোনো মানুষ পশু-প্রাণীর ওপর কিংবা কোনো মানুষের ওপর জুলুম করে তাহলে তার থেকে অবশ্যই বদলা গ্রহণের ব্যবস্থা করা হবে।

و هذا آخر الكلام فى هذا المرام والعلم عند الله العلام و الصلاة و السلام على البدر التمام و على آله و صحبه البررة الكرام.

Avatar

zobayer

একটি কমেন্ট করুন