প্রতিষ্ঠাতা: মুজাহিদে আযম হযরত মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.

জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ, ঢাকা-এর মুখপত্র

প্রতিষ্ঠাকালঃ ১৯৩৭ ঈসায়ী

ইসলামে পশু—পাখির অধিকার

ইসলামে পশু—পাখির অধিকার

হাকীমুল উম্মত মুজাদ্দিদে মিল্লাত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ.

[পূর্বপ্রকাশের পর]

হাদীস নং : ১০

عن أبي واقد الليثي قال : قدم النبي صلى الله عليه و سلم المدينة وهم يجبون أسنمة الإبل ويقطعون أليات الغنم فقال : ما يقطع من البهيمة وهي حية فهي ميتة لا تؤكل.

অর্থ : হযরত আবু ওয়াকেদ লাইসী রাযি. বলেন, প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মদীনায় শুভাগমন করেন তখন সেখানকার লোকেদের মধ্যে জীবন্ত উটের কুঁজ এবং দুম্বার চাকতি কেটে নেওয়ার পর তা জবাই করার প্রচলন ছিল। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, জীবন্ত পশু—প্রাণীর যে অংশ কেটে নেওয়া হয় তা মৃত হিসেবে গণ্য হয়, তাই তা খাওয়া যাবে না।—তিরমিযী, আবু দাউদ

ফায়দা : এটা নিষিদ্ধ হওয়ার কারণ এটাই যে, এতে অহেতুক পশুকে কষ্ট দেওয়া হয়। কুঁজ ও চাকতি জবাইয়ের পরও সংগ্রহ করা যায়, তাই জবাইয়ের পূর্বে কাটা মানে খামাখা পশুকে কষ্ট দেওয়া। জীবন্ত প্রাণীর কর্তিত কুঁজ ও চাকতির স্বাদ সম্ভবত একটু বেশি, কিন্তু সামান্য স্বাদের জন্য (আর তা—ও এমন যা পুরোপুরি নিশ্চিত নয়) পশুকে কষ্ট দেওয়া বৈধ নয়।

এই অবৈধতার গণ্ডিতে কসাইদের এ কাজও অন্তভুর্ক্ত হবে যে, চামড়া সামান্য বড় করার জন্য ওপর থেকে জবাই শুরু করে রগ পর্যন্ত নিয়ে আসে। রগ কাটার পূর্বে যতদূর থেকে চামড়া কাটা হয়েছে তাতে বিনা প্রয়োজনে পশুকে কষ্ট দেওয়া হয়। এহেন কাজের দরুন গোশত যদিও হারাম হবে না (কিন্তু কাজটা খুব খারাপ হয়েছে)। কেননা জবাইয়ের পূর্বে চামড়া কিংবা কোনো অঙ্গ বিচ্ছিন্ন হয়নি।

স্মর্তব্য এই হাদীসে জীবন্ত পশু থেকে কেটে নেওয়া অংশকে যে হারাম বলা হয়েছে তা দ্বারা ওই পশু উদ্দেশ্য যা জবাই করা হয়নি। সুতরাং পশু জবাইয়ের পর পুরোপুরি ঠান্ডা হওয়ার পূর্বে যদি কোনো অঙ্গ কেটে নেওয়া হয় তাহলে তা খাওয়া যাবে; যদিও এমনটা করা গোনাহের কাজ। তবে জবাইকৃত পশুকে শরীয়ত যেহেতু জীবিত আখ্যায়িত করেনি তাই ওই অঙ্গ খাওয়া হালাল হবে যা জবাইয়ের পর প্রাণ পুরোপুরি বের হওয়ার পূর্বে কেটে নেওয়া হয়েছে। (দুররে মুখতার ও রদ্দুল মুহতারে এ ব্যাপারে পরিষ্কার বক্তব্য বিদ্যমান) ৯ নং হাদীসের অধীনে যে মাসআলা আলোচিত হয়েছিল এখানে তার তাহকিক—দলিলসহ আলোচনা হয়ে গেল।

 

হাদীস নং : ১১

عن ابن عباس قال : نهى رسول الله صلى الله عليه و سلم عن التحريش بين البهائم.

অর্থ : হযরত ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পশু—প্রাণীদের মাঝে লড়াই বাধাতে নিষেধ করেছেন।—তিরমিযী, আবু দাউদ

ফায়দা : মোরগ লড়াই অনুরূপ অন্য কোনো প্রাণীর লড়াই এই নিষেধাজ্ঞার আওতাভুক্ত আর এসবই হারাম। কেননা এতে পশু—প্রাণীকে খামাখা কষ্ট দেওয়া হয়। গাড়োয়ানদের দ্রুত গরু হাঁকানোও এই হুকুমভুক্ত বলেই গণ্য হবে, কেননা এতে তারা হাঁপিয়ে ওঠে। কখনো কখনো আরোহীরাও আঘাতপ্রাপ্ত হয়। গর্ব ও ফখর ছাড়া এখানে অন্য কোনো কল্যাণ নেই। জুয়ামুক্ত ঘোড়দৌড় এই হুকুমের ব্যতিক্রম। এর প্রশিক্ষণে কল্যাণ রয়েছে।

 

হাদীস নং : ১২

عَن زيدِ بن خالدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: لَا تَسُبُّوا الدِّيكَ فَإِنَّهُ يُوقِظُ للصلاةِ.

হযরত যায়েদ ইবনে খালিদ রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমরা মোরগকে গালমন্দ করো না। কেননা এটা নামাযের জন্য জাগায়।—আবূ দাঊদ

সামনে একুশ ও বাইশ নাম্বার হাদীস থেকে জানা যাবে যে, ক্ষতিকর নয় এমন সকল পশুর ক্ষেত্রে সর্বাবস্থায় এ বিধান প্রযোজ্য। সুতরাং সমষ্টিগত কয়েকটি হাদীসের আলোকে প্রমাণিত হলো, পশু—পাখির  অধিকারসমূহের মধ্যে এটিও অন্যতম হক যে, পশু—পাখিকে গালমন্দ করা যাবে না। এখনকার কথা আর কী বলব, গজবের বিষয় হলো—বর্তমানে পশুদের ছাড়িয়ে পশুর মালিকদের গালমন্দ করা শুরু হয়ে গেছে। যেমন : গরুর ক্ষেত্রে বলা হয় তোর মালিকের গোষ্ঠী….। এ কাজ আরও জঘন্য, আরও মারাত্মক হারাম। ‘ক্ষতিকর নয়’ এ শর্ত যোগের কারণ হলো—لعن الله العقرب (অর্থাৎ বিচ্ছু নিপাত যাক) হাদীস।

 

হাদীস নং : ১৩

وَعَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: نَهَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ قَتْلِ أَرْبَعٍ مِنَ الدَّوَابِّ: النَّمْلَةِ وَالنَّحْلَةِ وَالْهُدْهُدُ وَالصُّرَدُ.

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চার প্রাণী হত্যা করতে নিষেধ করেছেন। পিপীলিকা, মৌমাছি, হুদহুদ, ছুরাদ—(এক ধরনের পাখি)।—আবু দাউদ ও দারেমী

ফায়েদা : চার প্রজাতির উল্লেখ করা হয়েছে উদাহরণস্বরূপ। উদ্দেশ্য হলো যেসব প্রাণী খাওয়া যায় না আর তা ক্ষতিকর ও কষ্টকর নয় সেসব প্রাণী হত্যা করা মানে খামাখা প্রাণনাশ করা। ৯ নং হাদীসের আলোচনায় এ বিষয়টি গত হয়েছে। কতক পাষাণ হৃদয় মানুষ আছে, যারা বন্দুক নিয়ে ঘুরে। বন্দুক খালি করার জন্য তারা সামনে যে প্রাণীই পায় অহেতুক তাকেই নিশানা বানায়। এহেন কাজও এই হাদীসের অন্তভুর্ক্ত। আর ওই বেচারার অবস্থার ভাষা এই বলে আর্তনাদ করে—

لکھ کر ہمارا نام زمين پر مٹا ديا

ان کا تو کھيل خاک ميں ہم کو ملا ديا

অস্তিত্বের খাতায় নাম থাকা সত্ত্বেও মিটিয়ে দাও মোদের ভূমিতে

তাদের তরে যা খেলা আমাদের তরে সর্বনাশ।

কিংবা হাতে বেত নিয়ে চলার পথেও কোনো কুকুর বিড়াল চোখে পড়লে বিনা কারণে তাকে একটা লাথি মেরে দিল আর ওই বেচারার মেউ মেউ বা ঘেউ ঘেউ করতে করতে প্রাণ ওষ্ঠাগত হলো।

بترس آہ مظلوماں کہ  ہنگام دعا کر دن

اجابت ازدر حق بہر استقبال آيد

মজলুম—নিপীড়িতদের আহ!—কে ভয় করো, কেননা যখন সে দুআ করে আল্লাহ পাকের তরফ থেকে ইস্তেকবালের সাথে গ্রহণ করে নেওয়া হয়।

 

হাদীস নং : ১৪

وَعَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عُثْمَانَ: إِنَّ طَبِيبًا سَأَلَ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ ضِفْدَعٍ يَجْعَلُهَا فِي دَوَاءٍ فَنَهَاهُ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَنْ قَتْلِهَا.

হযরত আবদুর রহমান ইবনে উসমান রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক চিকিৎসক রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে প্রশ্ন করল, ব্যাঙ মেরে ওষুধে ব্যবহার করা যাবে কি না?

তখন রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যাঙ মারতে নিষেধ করেছেন।—আবু দাউদ

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. থেকে নাসাঈ শরীফের এক রেওয়ায়েতে বর্ণিত আছে, তোমরা ব্যাঙ হত্যা করো না, কেননা তাদের ডাক হলো তাসবীহ।—মেশকাত, পৃ. ৩৮৯

ফায়েদা : এ নিষেধের কারণও তা—ই যা ৯ নম্বর হাদীসে গত হয়েছে। নাসাঈ শরীফের বর্ণনায় যে হেকমতের কথা বলা হয়েছে তা স্বতন্ত্র কোনো কারণ নয়; বরং পূর্বে বর্ণিত কারণের পরিপূরক।

উদ্দেশ্য হলো এই কথা বোঝানো, এ প্রাণীটিও অন্যান্য প্রাণীর মতো যিকির করে থাকে। তাকে হত্যা করা মানে যিকির বন্ধ করে দেওয়া। তেমন কোনো বিশেষ কল্যাণও নেই, যার কারণে একে হত্যার বিষয়টি অনুমোদন করা যেতে পারে। আর চিকিৎসা ও ওষুধের বিষয়টি প্রয়োজন বিবেচনায় না নেওয়ার কারণ হলো—হারাম জিনিস দিয়ে চিকিৎসা বৈধ নয়, যেমনটা সংখ্যাগরিষ্ঠ ওলামায়ে কেরামের অভিমত। কিংবা যদি অনুমোদন থাকে তাহলে তাতে কঠিন প্রয়োজনের শর্ত প্রযোজ্য, যেমন অন্য ওষুধ কার্যকর না হওয়া। আর ব্যাঙ ব্যবহারের ক্ষেত্রে এমন কঠিন প্রয়োজন অনুপস্থিত, যেমনটা পরবর্তী ওলামায়ে কেরামের ফত্ওয়া। তাই ব্যাঙ হত্যা আর প্রয়োজনীয় রয়নি, অতএব তা নিষিদ্ধ।

 

হাদীস নং : ১৫

وَعَن سعدِ بْنِ مَالِكٍ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لَا هَامَةَ وَلَا عَدْوَى وَلَا طِيَرَةَ وَإِنْ تَكُنِ الطِّيَرَةُ فِي شَيْءٍ فَفِي الدَّارِ وَالْفرس وَالْمَرْأَة.

قال في المرقاة : وَالْمَعْنَى أَنَّ فَرْضَ وَجُودِهَا تَكُونُ فِي هَذِهِ الثَّلَاثَةِ، وَيُؤَيِّدُهُ مَا وَرَدَ فِي الصَّحِيحِ بِلَفْظِ: إِنْ كَانَ الشُّؤْمُ فِي شَيْءٍ فَفِي الدَّارِ وَالْمَرْأَةِ وَالْفَرَسِ، وَالْمَقْصُودُ مِنْهُ نَفْيُ صِحَّةِ الطِّيَرَةِ عَلَى وَجْهِ الْمُبَالَغَةِ.

হযরত সাদ বিন মালেক রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, খুপড়ি থেকে কোনো প্রাণী বের হওয়ার ধারণা ভিত্তিহীন। জাহেলি যুগের ধারণা ছিল—যে নিহত ব্যক্তির হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ না করা হবে তার খুপড়ি থেকে একটি প্রাণী বের হয়ে (পানি দাও, পানি দাও বলে) চিৎকার করতে থাকে। সংক্রমণ রোগ বলে কিছু নেই। অশুভ লক্ষণ নামে কিছু নেই। অশুভ লক্ষণ বলে যদি কিছু থাকতই তাহলে তা বাড়ি, ঘোড়া কিংবা স্ত্রীলোকের মধ্যে থাকত।—আবু দাউদ

ফায়েদা : তরজমায় ‘যদি’ যোগ করার কারণ মেশকাত শরীফের টীকায় তদীয় ব্যাখ্যাগ্রন্থ মেরকাতের উদ্ধৃতিতে বর্ণনা করা হয়েছে, যার সারকথা এটাই। আর টীকার শেষাংশে বলা হয়েছে এর দ্বারা অশুভ লক্ষণের বিষয়টি আরও জোরালোভাবে রদ করা উদ্দেশ্য।

ফায়েদা : এই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হলো কিছু প্রাণীর ব্যাপারে ব্যাপকভাবে সমাজে যে ‘অশুভ’ হওয়ার ধারণা প্রচলিত আছে—যেমন পেঁচার ব্যাপারে কিংবা ঘোড়ার ব্যাপারে অশুভ হওয়ার ধারণা প্রচলিত আছে—তা একেবারে ভিত্তিহীন ধারণা। পশু—পাখির অধিকারসমূহের মধ্যে এটিও একটি অধিকার যে তাকে অশুভ মনে না করা। আর এ অধিকার হরণের ফলে অন্যান্য অধিকার হরণের পথও খুলে যায়। ফলে তার প্রতি অবহেলার কারণে তার পানাহার ও সেবা—যত্নে ঘাটতি দেখা দেয়।

[ইরশাদুল হায়েম থেকে অনুবাদ করেছেন, মাওলানা আতাউল্লাহ আব্দুল জলীল]

[চলবে, ইনশাআল্লাহ]

Avatar

zobayer

একটি কমেন্ট করুন