প্রতিষ্ঠাতা: মুজাহিদে আযম হযরত মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.

জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ, ঢাকা-এর মুখপত্র

প্রতিষ্ঠাকালঃ ১৯৩৭ ঈসায়ী

একটি আদর্শ বিবাহ

একটি আদর্শ বিবাহ

মাওলানা খালেদ সাইফুল্লাহ রাহমানী


আল্লাহ তাআলা দুনিয়াতে বস্তু জোগানের যে ব্যবস্থা রেখেছেন তা আল্লাহ তাআলার প্রতিপালনকারী হওয়ার অনন্য নিদর্শন এবং সৃষ্টির ওপর তাঁর সীমাহীন দয়া ও করুণার আলামত। এ রহমত ও দয়ার একটা নিদর্শন হলো, যে জিনিস যত প্রয়োজনীয় তা ততধিক সহজলভ্য এবং তার জোগানও তত বেশি।

অক্সিজেন ব্যতীত কোনো প্রাণী বেশিক্ষণ বাঁচতে পারে না। অক্সিজেন শুধু ফুসফুসের জন্য জরুরি এমনটা নয়, একটা মানুষের অস্তিত্বের জন্য অক্সিজেন আবশ্যক, যা তার রক্তের মধ্য দিয়ে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এ অতি প্রয়োজনীয় অক্সিজেন পৃথিবীর বুকে সব প্রাণী বিনামূল্যে পেয়ে থাকে। পৃথিবী ব্যতীত এ অক্সিজেন কোথাও পাওয়া যায় না। কারণ এ গ্রহের বাহিরে অক্সিজেন—নির্ভর প্রাণের অস্তিত্ব নেই।

মানুষের আরেকটি অনিবার্য প্রয়োজন পানি। শরীর পানিশূন্য হলে সুস্থ—সবল মানুষও ধীরে ধীরে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। আল্লাহ তাআলা পৃথিবীতে পর্যাপ্ত পরিমাণে পানির জোগান রেখেছেন। ঝরনা—খাল—নদী—সাগরের মাধ্যমে অফুরন্ত পানির জোগান দিয়ে চলেছেন। বিশেষত ভূগর্ভ পানির এক বিশাল ভান্ডার। সামান্য খরচ ও শ্রম দিয়ে মানুষ যা উত্তোলন করতে পারে সহজেই। পানির অন্যতম ভান্ডার হলো বরফের পাহাড়, যা আল্লাহ তাআলা পৃথিবীর বিভিন্ন কোণে মানব সভ্যতার কল্যাণার্থে সংরক্ষণ করে রেখেছেন। আমাদের দেশের পাশেই মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে হিমালয় পর্বতমালা, যা কিছুটা উচ্চতার পর পুরো বরফে ঢাকা। সাধারণ মানুষের জন্য তা দুর্গম।  সারা বছর এ বরফের পাহাড়, আমাদেরকে স্বচ্ছ, পরিষ্কার, সুমিষ্ট ও সুপেয় পানি প্রদান করে থাকে।

অন্যদিকে পান করার সুপেয় পানির সরবরাহ অব্যাহত রাখতে, পৃথিবীতে গভীর ও কূলহীন সমুদ্র বহমান রেখেছেন। সমুদ্রের পানি সূর্যের তাপে বাষ্প হয়ে বায়ূমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে। বাতাস এ বাষ্পকে কোলে নিয়ে বায়ুমণ্ডলের ওপরের অংশে পৌঁছে দেয়। যেখানে তা ঘন মেঘে রূপান্তরিত হয়। পরে প্রয়োজন মোতাবেক তা জমিনে বর্ষিত হয়।

এ তো গেল বাতাস ও পানির বিষয়। আমরা সৃষ্টি—জগতের গোটা ব্যবস্থাপনার প্রতি লক্ষ করলে দেখতে পাব, যে জিনিস যত প্রয়োজনীয় তার জোগান তত বেশি এবং তা ততধিক সহজলভ্য। চোখ—কান খোলা রেখে, গভীরভাবে চারপাশ পর্যবেক্ষণ করলে আমাদের ঈমান তাজা হবে এবং স্রষ্টা ও পালনকর্তার সঙ্গে সম্পর্ক ও ভালোবাসা গভীর হবে। যেহেতু এ বিশ্ব জাহানের স্রষ্টা আল্লাহ তাআলা, আর ইসলামী শরীয়তের হুকুম—আহকামও তাঁরই তরফ থেকে নাযিলকৃত। তাই শরীয়তের হুকুম—আহকামেও এ বিষয়টি পরিলক্ষিত হয়। তথা যে বিষয়টি মানুষের জন্য যত জরুরি তা পালন করা (শরীয়ত মতে) ততই সহজ।

মানুষের জীবনের একটি অনিবার্য প্রয়োজন হলো বিবাহ। মানুষ স্বভাবজাতভাবেই জীবনে সুখে—দুঃখে একজন সঙ্গী ও সহমর্মী কামনা করে। শৈশব—কৈশোরে বাবা—মা—ই হয় তার সম্পর্ক ও ভালোবাসার কেন্দ্রবিন্দু। জীবনের একটি পর্যায়ে পৌঁছে একজন পুরুষ স্ত্রীর এবং একজন নারী স্বামীর প্রয়োজন অনুভব করে। পরস্পরের এ আকর্ষণ ও মুখাপেক্ষিতা মানবজাতির স্বভাবজাত বিষয়, কৃত্রিম কিছু নয়। এজন্য আল্লাহ তাআলা সৃষ্টির সময় ঊর্ধ্ব জগতে আদম আ. এর সঙ্গে হাওয়া আ. কে সৃষ্টি করেছেন। মানব সভ্যতার শ্রেষ্ঠ মানুষগণ বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন এবং সাংসারিক জীবনযাপন করেছেন।

বিবাহের তিনটি উদ্দেশ্য। একটি হলো মনের স্থিরতা ও মানসিক প্রশান্তি। কোরআনে কারীমে সূরা রূম, আয়াত নং ২১—এ,  لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا (যেন তোমরা প্রশান্তি লাভ করো) বলে এ কথাই বোঝানো হয়েছে।

দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হলো, নিজেকে গোনাহ থেকে রক্ষা করা। এ কারণেই কোরআনে কারীমে বিবাহিত পুরুষদের مُحْصِنِيْنَ (সূরা মায়েদা : ০৫) আর বিবাহিত নারীদের مُحْصَنَات (সূরা নিসা : ২৪) আখ্যায়িত করা হয়েছে। যার অর্থ হলো, দুর্গবেষ্টিত ও সুসংরক্ষিত। অর্থাৎ বিবাহিত নর—নারী যেন পাক—পবিত্রতার দুর্গে নিজেদের আবদ্ধ করে নিয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াাসাল্লাম বিষয়টি আরও সুস্পষ্ট ভাষায় বলেছেন,

فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ

বিবাহ চোখ ঠিক রাখে তথা চোখের গোনাহ থেকে বাঁচায় এবং লজ্জাস্থান হেফাজতে রাখে।—সহীহ বুখারী, হাদীস নং : ১৯০৫

বিবাহের তৃতীয় উদ্দেশ্য হলো, বংশবিস্তার করা। কিছু দিক বিবেচনায় এটাই বিবাহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্য। আল্লাহ তাআলা উদ্ভিদের ক্ষেত্রে এ নিয়ম রেখেছেন যে, বীজ বপন করলে আপনা আপনিই চারা বেরিয়ে আসে। কখনো তো নিয়মতান্ত্রিক চাষাবাদ করা ছাড়াই বীজ পড়ে গাছ জন্ম নেয়। আল্লাহ তাআলার এ ব্যবস্থাপনা থেকে মানুষ সহজেই চাষ করে নিজের খাদ্যের সংস্থান করতে পারে। কিন্তু প্রাণীদের বিষয়টা ভিন্ন। এখানে নর—নারীর মিলনে বংশ বিস্তার হয়ে থাকে। তাই বিবাহ ব্যতীত পবিত্র উপায়ে মানব বংশ বিস্তার লাভ করতে পারে না। কোরআনে কারীমে সূরা নিসায় (আয়াত নং ০১) এ দিকেই ইঙ্গিত করা হয়েছে।

মোটকথা বিবাহের অনেক উপকারিতা রয়েছে। মানব সমাজের জন্য বিবাহ একটি অনিবার্য প্রয়োজন। তাই ইসলামে বিবাহের পদ্ধতি ও নিয়মাবলি অত্যন্ত সহজ করা হয়েছে। ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মের বিবাহের নিয়ম—কানুন তুলনামূলক পর্যালোচনা করলে ইসলামে যে বিবাহ খুবই সহজ তা সুস্পষ্ট বুঝে আসে। যেমন : ইসলামে বিধবাদের কেবল বিবাহের অনুমতিই প্রদান করা হয়নি; বরং উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে। ইসলামের দৃষ্টিতে বিধবা বিবাহ একটি উত্তম কাজ। কোরআনে কারীমে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন,

وَأَنْكِحُوا الْأَيَامَى مِنْكُمْ.

অর্থাৎ, তোমাদের মাঝে যারা বিধবা আছে তাদের বিবাহ দাও।—সূরা নূর : ৩২

স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—এর স্ত্রীগণের মাঝে আয়েশা রাযি. ব্যতীত সবাই বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা ছিলেন। এর মাধ্যমে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিধবা বিবাহের সুন্নত কার্য নিজের জীবনে বাস্তবায়িত করে দেখিয়েছেন। পক্ষান্তরে পৃথিবীর দুটি বড় ধর্ম, খ্রিষ্টান ও হিন্দু ধর্মে বিধবা বিবাহের কোনো ধারণাই নেই। বরং হিন্দু ধর্মে বিধবাদের অশুভ মনে করা হতো। অনেক চেষ্টা—প্রচেষ্টার পরও হিন্দুরা এ কুসংস্কার থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। আর এখন তাদের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মুসলমানদের মাঝেও এ কুসংস্কারের বিস্তার ঘটেছে।

হযরত মাওলানা শাহ ইসমাইল শহীদ রহ. ও আল্লামা কাসিম নানূতুবী রহ. এর যুগশ্রেষ্ঠ সংস্কার কার্যের মধ্যে অন্যতম ছিল, তারা উভয়ে বিধবা বিবাহের সুন্নত পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, এত কিছুর পরও মুসলিম সমাজের অবস্থা হলো, কেবল বাবা—মা ও অভিভাবকরা বিধবাদের বিবাহের চিন্তা করেন না এমন নয়; বরং স্বয়ং যুবতী বিধবারা নিজেরাও দ্বিতীয় বিয়ে করতে লজ্জাবোধ করে। এর চেয়েও গযবের কথা হলো কোনো কোনো ঘরে বিধবাদের অশুভ মনে করা হয় এবং স্বামীর মৃত্যুর জন্য তাদের দায়ী করা হয়। এমনিভাবে ইসলামে প্রয়োজনে সমতা ও ইনসাফ রক্ষার শর্তে একাধিক বিবাহের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

ইসলামে বিবাহ সহজ হওয়ার আরেকটি দিক হলো, বিবাহকে আর্থিক দিক থেকে সহজ ও নির্ভার রাখা হয়েছে। বিবাহ যাতে ব্যয়বহুল না হয় সেজন্য মসজিদে বিবাহ পড়ানোর প্রতি উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

اجعلوه في المساجد.

তোমরা মসজিদে বিবাহ পড়াও।—জামে তিরমিযী, হাদীস নং : ১১১২

এর ফলে ব্যয়বহুল অনুষ্ঠান—হল ও কমিউনিটি সেন্টারের কোনো প্রয়োজনীয়তা অবশিষ্ট থাকে না। সাধারণ কমিউনিটি সেন্টার ও অনুষ্ঠান হলের ব্যয়ভারই তো কম ছিল না, তথাপি বর্তমানে  থ্রি স্টার—ফাইভ স্টার কমিউনিটি সেন্টার, গার্ডেন ও অনুষ্ঠান হল তৈরি হচ্ছে। যেগুলোতে কখনো এক রাতের ভাড়ার জন্য লাখ টাকা গুণতে হয়।

ইসলাম মেয়েপক্ষের ওপর খাবার আয়োজনের কোনো দায়িত্ব দেয়নি। ফলে মেয়ের অভিভাবকরা জামাই—র আত্মীয়—স¦জনদের মেহমাদারির জন্যে যে বিরাট অঙ্কের ব্যয়ের ফাঁদে পড়েন এবং এর জন্য ঋণ নিয়ে থাকেন, এমনকি কখনো সুদের ভিত্তিতে ঋণ নিয়ে থাকেন—ইসলামের এ রীতি মেনে চললে তার কোনো প্রয়োজনই পড়বে না। মেয়ের বাড়ির তরফ থেকে অনুষ্ঠানের আয়োজন মূলত হিন্দুসমাজের রেওয়াজ। কালের প্রবাহে মুসলিম সমাজে তা ছড়িয়ে পড়েছে।

এমনিভাবে যৌতুকের প্রথা সেই সমাজ থেকে এসেছে, যাদের মাঝে মেয়েদের মীরাস দেওয়ার প্রচলন ছিল না। যেহেতু সম্পত্তি সব ছেলেরা পাবে, তাই কিছু টাকা দিয়ে মেয়েদের বিদায় করে দেওয়া হত। বিবাহের পর মেয়েদের বাবার বাড়ির সঙ্গে সম্পর্ক একপ্রকার ছিন্ন হয়ে যেত। ইসলামে বিষয়টা এমন নয়। ইসলামের দৃষ্টিতে বিবাহের পরও বাবার বাড়ির সঙ্গে মেয়েদের সম্পর্ক পূর্বের মতো অটুট থাকে। মেয়েরা বাবা—মার মীরাসের সম্পত্তি পায়। কখনো অন্যান্য আত্মীয়—স্বজনদের সম্পত্তিও পায়। তাই ইসলামে বিয়ের সঙ্গে যৌতুকের কোনো দূরতম সম্পর্কও নেই।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—এর কোনো স্ত্রী যৌতুক নিয়ে আসেননি। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্বীয় কন্যা হযরত যয়নব রাযি, হযরত উম্মে কুলসুম রাযি. ও হযরত রুকাইয়্যা রাযি. এর বিবাহে কোনো যৌতুক প্রদান করেননি। হযরত ফাতেমা রাযি. কে শ্বশুর বাড়ি যাওয়ার সময় রাসূল কিছু দিয়েছিলেন বলে যা লোকমুখে শোনা যায়, তা সঠিক নয়। সেখানে প্রকৃত ঘটনা ছিল এমন, বিবাহের সময় হযরত আলী রাযি. এর একটি বর্ম বিক্রয় করা হয়েছিল। মূল্য বাবদ প্রাপ্ত অর্থের কিছু অংশ দিয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি ঘরের অতীব প্রয়োজনীয় কিছু সামগ্রী ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ থেকে হযরত ফাতেমা রাযি. এর শ্বশুর বাড়িতে কিছু দিয়ে থাকলে সব মেয়েকেই দিতেন। কেননা তিনি সন্তানদের মাঝে সমতা—বিধানের নির্দেশ দিয়েছেন।—সহীহ বুখারী, হাদীস নং : ২৫৮৬; সহীহ মুসলিম, হাদীস নং : ৪২৬২

বর্তমানে ছেলের বাড়ি থেকে বিভিন্ন ধরনের দাবি—দাওয়া করা হয়। মেয়ের জন্য শ্বশুর বাড়ির জরুরি আসবাব—পত্র, জামাইর জন্য গাড়ি, বিদেশের ভিসা, নগদ টাকা, বিয়ের দিন মেয়ে পক্ষের খাবারের আয়োজন ইত্যাদি। এমন কি কোথাও তো লজ্জা—শরমের মাথা খেয়ে খাবারের মেন্যু পর্যন্ত ঠিক করে দেওয়া হয়। ক্ষুধার্ত ব্যক্তি যেমন দস্তরখানের সবটুকু খাবার গলাধঃকরণ করে ফেলতে চায়, তেমনি ছেলে—পক্ষ পারলে মেয়ের বাবার শেষ রক্তবিন্দুটুকুও শুষে নেওয়ার প্রয়াস চালায়। ছেলেপক্ষের জন্য এগুলো গ্রহণ করা যেমন হারাম তেমনি একেবারে অনন্যোপায় না হলে মেয়েপক্ষের জন্য দেওয়াও হারাম। পরবর্তী সময়ে সুস্থ বিবেকসম্পন্ন কারও এ কাজ যে ভুল তার অনুভূতি জাগ্রত হলে তা মেয়েপক্ষকে ফিরিয়ে দেওয়া ওয়াজিব। অন্যদিকে মেয়ে—পক্ষের কর্মকাণ্ডও দুঃখজনক। কেবল রসম—রেওয়াজ ও ঠুনকো সামাজিকতার দায়ে পড়ে তারা অনর্থক লোক দেখানো বহু আচার—অনুষ্ঠান করে থাকে। শেষে এক ধরনের ভিক্ষুকের হাতে নিজের আদরের কন্যাকে তুলে দেয়। কারণ ভিক্ষা করে পাঁচ টাকা উপাজর্নকারী যদি পাঁচ টাকার ভিখারী হয়, তাহলে এভাবে পাঁচ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া ব্যক্তিও অবশ্যই তার চেয়ে বড় ভিখারী।

ইসলামী বিবাহে সর্বসাকুল্যে দুটি আর্থিক বিষয় রয়েছে। তন্মধ্যে একটি ওয়াজিব। আর তা হলো মোহর। কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো, বর্তমানে মোহরকে নিছক একটি রসম বা ফর্মালিটি মনে করা হয়। যা আদায় করার নিয়ত থাকে না। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে বিবাহ করল এবং বিবাহে মোহরও নির্ধারণ করল কিন্তু মোহর আদায়ের কোনো নিয়তই তার নেই, সে ব্যাভিচারী, যিনাকারী।

যতক্ষণ স্ত্রীর পূর্ণ মোহর আদায় করা না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত স্বামী ঋণী থাকে। বিনা ওজরে ঋণ আদায়ে বিলম্ব করা গোনাহ। বিবাহে অপচয় ও অনর্থক খরচ করার পরিবর্তে বিবাহের সময়ই মোহর প্রদান করলে অবশ্যই তা শরীয়তের দাবির পূর্ণ অনুসরণ হবে এবং এতে একটি অতীব জরুরি সামাজিক রীতির প্রচলন ঘটবে।

বিবাহে দ্বিতীয় আর্থিক বিষয় হলো, ওয়ালিমা। ওয়ালিমা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—এর সুন্নত, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে আজকাল ওয়ালিমাতে যে লোকদেখানো খরচ করা হয় তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অপচয় ও অপব্যয়ের মধ্যে পড়ে। আর অপচয় করা গোনাহ। কোরআন শরীফে অপচয়কে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সবচেয়ে বড় আয়োজন করে যে ওয়ালিমার আয়োজন করেছিলেন তাতে একটা বকরি জবাই করেছিলেন। অথচ আমরা এ সুন্নতটিকে অপচয়ের প্রলেপ দিয়ে আল্লাহ পাকের নাফরমানির আয়োজনে পরিণত করেছি। এসব অনুষ্ঠানে ব্যয়বহুল আলোকসজ্জা, আতশবাজি, কৃত্রিম ফোয়ারা স্থাপন করা হয়ে থাকে। তাছাড়া অনুষ্ঠানে নারী—পুরুষের ভিডিও ধারণ করা হয় এবং নারীদের খাবার পরিবেশন করা হয় পুরুষ ওয়েটারের মাধ্যমে। কোনো কোনো বেপরোয়া মানুষ তো নাচ—গান ও আনন্দ—ফূর্তির আয়োজন করে সুন্নত এ অনুষ্ঠানকে পুঁতিগন্ধময় করে তোলে। এসব কর্মকাণ্ড আল্লাহর ক্রোধ ও গযবকে তড়ান্বিত করে। বিবাহের বরকতকে নষ্ট করে দেয়। এভাবে শরীয়ত পরিপন্থী উপায়ে বিবাহ অনুষ্ঠানের আয়োজন করার পর যদি ভবিষ্যতে স্বামী—স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া—বিবাদ হয়, শ্বশুর—শাশুড়ি ও জামাই—পুত্রবধুর মাঝে মনোমালিন্য হয়, বৈবাহিক জীবন শান্তি ও প্রশান্তি লাভের উপায় হওয়ার পরিবর্তে পূর্বের সুখ—শান্তিও শেষ হয়ে যায় তাহলে এর জন্য মানুষ কেন অভিযোগ করবে?

আল্লাহ পাকের হুকুম ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—এর সুন্নতকে ক্ষত—বিক্ষত করার মতো বিয়ে অনুষ্ঠান তো দিন—রাত চোখে পড়ছেই। এখন চোখ এসব দেখে দেখে এবং কান এসব শুনে শুনে এতটাই অভ্যস্ত হয়ে গেছে যে, এখন আর এ বিষয়ে কিছু বলারও প্রয়োজন অনুভূত হয় না। এর বিপরীতে সুন্নত মোতাবেক অনাড়ম্বর ও সাদাসিধে বিয়ের অনুষ্ঠান আজ সমাজে দুর্লভ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। তাই কোথাও এ ধরনের বিয়ের আয়োজন হলে গুরুত্ব সহকারে তার আলোচনা করা জরুরি। যেন তা অন্যদের সুন্নতী বিবাহ আয়োজনে উদ্বুদ্ধ করতে পারে।

আল্লাহর শোকর, কিছু দিন পূর্বে হায়দারাবাদ শহরে একটি বিবাহের অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণের সুযোগ হয়েছিল। প্রিয় মাওলানা খাজা নাজির উদ্দিনের ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠান ছিল সেটি। ১০ মুহাররম জুমার নামাযের পর একটা বড় মসজিদে এ বিবাহ অনুষ্ঠিত হয়। সে মজলিসে অনেক বড় বড় আলেম—ওলামা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন। ১০ মুহাররম বিবাহের তারিখ নির্ধারণ করাটাও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। এর কারণ ছিল এই, যেন এ দিনে বিবাহ করা নিষেধ বা এ দিনে বিয়ে করা ভালো নয়, এ কুসংস্কার দূর হয়ে যায়। বিবাহে মেয়েপক্ষের তরফ থেকে কোনো কিছুর আয়োজন ছিল না। না খাবার—দাবারের আর না চা—নাশতার। ছেলেপক্ষের কয়েক জন মহিলা গিয়ে মেয়েকে শ্বশুর বাড়ি নিয়ে আসে। পরদিন ওয়ালিমার আয়োজনে ও এ অনাড়ম্বর ও সাদাসিধা ধারা অক্ষুণ্ণ ছিল। সাধারণ এক পদের খাবার দিয়েই ওয়ালিমার আয়োজন করা হয়।

হায়! যদি মুসলমানরা এ দৃষ্টান্তকে ব্যাপক হারে প্রসার ঘটাত। উন্নত ও দূরদর্শী জাতি, অনুসরণীয় পন্থা—পদ্ধতিগুলো আপন করে নেয়। নিজেদের দৈনন্দিন জীবনে সেগুলো প্রয়োগ করে। দুর্ভাগা ও পশ্চাৎপদ জাতি অবাঞ্ছিত ও অনুসরণ অযোগ্য কর্মপদ্ধতিকেই নিজেদের পথের দিশা মনে করে।

(উর্দু থেকে অনুবাদ করেছেন, মাওলানা ফয়জুল্লাহ খান)

Avatar

zobayer

একটি কমেন্ট করুন