প্রতিষ্ঠাতা: মুজাহিদে আযম হযরত মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.

জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ, ঢাকা-এর মুখপত্র

প্রতিষ্ঠাকালঃ ১৯৩৭ ঈসায়ী

এক তালিবুল ইলমের গল্প

এক তালিবুল ইলমের গল্প

তালিবুল ইলমের পাতা

শায়েখ আলী তানতাভী

 

মুহাম্মদ ইবনে সাঈদ বললেন, আল্লাহকে ভয় করো। তুমি এই ভালো মানুষটিকে হত্যা করতে যাচ্ছ। আল্লাহর কসম, তুমি তাঁর হত্যার দায় বহন করবে। সতর্ক হও। আল্লাহকে ভয় করো। তোমার হোটেল থেকে তাঁকে তাড়িয়ে দিয়ো না। সে দূরদেশের একজন মুসাফির। বহু মরুভূমি ও সাগর অতিক্রম করে পূর্ব—পশ্চিম সফর করেছে।

হোটেল মালিক বলল, বাকী ইবনে মাখলাদ পূর্ব—পশ্চিম সফর করেছে?

তিনি বললেন, হ্যাঁ। তুমি কি মনে করেছ আমি অন্য কারও কথা বলছি? তার প্রয়োজনেই আমি তোমার কাছে এসেছি। এর আগে কোনো প্রয়োজনে তোমার কাছে আসিনি। তুমি কি তা পূরণ করবে না? তিনি একজন মর্যাদাবান শায়েখ। তিনি অনেক হাদীস জানেন ও বর্ণনা করেন। আমরা কি তাকে রাস্তায় মরে যেতে দেব?

হোটেল মালিক বলল, তাকে দিয়ে আমি কী করব? দু—বছর ধরে আমার হোটেলে তাঁকে থাকতে দিয়েছি। তাঁর কাছ থেকে কোনো বিনিময় নিইনি। তাঁর প্রতি কোনো অন্যায়—অবিচার করিনি। তাঁর কোনো কথা ফেলে দিইনি। বিনিময়ে কি আমি শুধু তার পেছনে আমরণ খেটেই যাব? শেষ পর্যন্ত সে এখানেই মারা যাবে। এখান থেকে নিয়ে তাকে দাফন করা হবে। মানুষ আমার হোটেলকে অলক্ষুনে মনে করবে। তারা এড়িয়ে চলবে। ফলে আমি নিঃস্ব হয়ে যাব। বেদনা তাঁকে জীর্ণ করেছে। জ্বর তাঁকে মারাত্মক রোগা বানিয়েছে। বিশেষজ্ঞ ডাক্তাররা জবাব দিয়ে দিয়েছেন। মনে হয় সন্ধ্যায় বা আগামীকালই মারা যাবে। আমাকে রহম করুন। তাঁর থেকে আমাকে মুক্তি দিন। তাঁর কোনো প্রয়োজন আমার নেই। সে সময়টা হয়তো খারাপ ছিল যখন তাঁকে আমি এ ঘর ভাড়া দিই। সে সময় হয়তো কোনো রহমতের ফেরেশতা ছিল না।

মুহাম্মদ ইবনে সাঈদ : এখন তোমার চারটি বিষয় করণীয়। তুমি বিশাল এক নেয়ামত লাভ করেছ। যার মূল্য বুঝতে পারলে রাতভর আল্লাহর প্রশংসা করে কাটিয়ে দিতে। তুমি জানো না, কত বড় কল্যাণ আল্লাহ তোমার পর্যন্ত পেঁৗছে দিয়েছেন। আর কত বড় প্রতিদান তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। তাঁর খেদমতে নিজেকে নিয়োজিত করো। আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রত্যাশা করো। তোমার জন্য জান্নাত লাভের আশা করি।

হোটেল মালিক : আমি যে কত বড় বিপদে আছি তুমি তা বুঝলে আমার অস্থিরতার কারণে তিরস্কার করতে না। তুমি জানো না, এ শায়েখ কে? আমি কি তোমাকে তাঁর ব্যাপারে বলব? সে আমার এখানে একটি রাত অবস্থান করেই পুরাতন ও ছিঁড়া কাপড় পরে সঙ্গে একটি পাত্র ও লাঠি নিয়ে ভিক্ষা করতে বেরিয়ে পড়ে।

তোমার কী হলো, আমার কথায় হাসছ? তুমি কি আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করছ হে ইবনে সাঈদ?

তিনি বললেন, না। কিন্তু তুমি এই ব্যক্তি সম্পর্কে জানো না।

হোটেল মালিক বলল, তিনি কি সম্মানিত কেউ?

মুহাম্মদ ইবনে সাঈদ বললেন, কী সম্মান? তিনি সেই ব্যক্তি, যে বাগদাদে পাড়ি জমানোর জন্য ছেড়েছে আন্দালুসের সব বাগ—বাগিচা, ঝরনাধারা ও নদ—নদী। বিসর্জন দিয়েছে নিজের সুউচ্চ পদমর্যাদা, সম্মান ও খ্যাতি। বিসর্জন দিয়েছেন নিজের পরিবার—পরিজন, বন্ধু—বান্ধব, আপনজন ও অঢেল সম্পদ। অনেক সমুদ্র—সৈকত, নির্জন মরুভূমি ও জনশূন্য প্রান্তর অতিক্রম করে বাগদাদে পাড়ি জমিয়েছেন। সম্পদের লোভ কিংবা মর্যাদা লাভের আশায় নয়। কোনো বন্ধুর সাক্ষাতের জন্যও নয়। কোনো নারীকে প্রস্তাব দেওয়ার জন্যও নয়। কোনো সুখ উপভোগের জন্যও নয়। তিনি এ কষ্ট স্বীকার করেছেন শুধুই ইলমের আগ্রহে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—এর হাদীসের ভালোবাসায়। আর আবু আব্দুল্লাহর সাক্ষাতের আশায়।

আবু আব্দুল্লাহর নাম শোনামাত্রই হোটেল মালিক সতর্ক হয়ে উঠল। তার অবস্থা পাল্টে গেল। এই ইমামের জন্য তার হৃদয়ে যে গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা ছিল, তা তার চেহারায় প্রকাশ পেল। তার সুর নরম হয়ে এল। কণ্ঠ মধুর হলো। বাকী ইবনে মাখলাদের প্রতি যে বিরক্তি ছিল, আবু আব্দুল্লাহর মহব্বতে তা উবে গেল।

সে বলল, লোকটি আহমদ ইবনে হাম্বলের সাক্ষাৎ লাভের জন্য আন্দালুস থেকে এসেছে?

—হ্যাঁ। হায়, দুনিয়া ও আখেরাতে তাঁর কতই—না মর্যাদা। তাঁর সঙ্গে কি সাক্ষাৎ হয়েছে? আমাকে কি একটু বলবে, কীভাবে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন?

—তিনি তোমাদের এই মুসাফিরখানায় এসে উঠেছেন। এখানে আসবাবপত্র রেখে আবু আব্দুল্লাহর সন্ধানে বেরিয়ে পড়লেন। এটা সে সময়কার কথা, যখন খলীফার পক্ষ থেকে ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। তাই মানুষ ভয়ে তার নাম নিত না। আবু আব্দুল্লাহ তো তখন নিঃসঙ্গ ছিলেন। তাঁর সঙ্গে কেউ সাক্ষাৎ করলেই বাদশার গুপ্তচর তাকে পাকড়াও করত। কঠোর শাস্তি দিত। ফলে তাঁর আর কষ্টের অন্ত নেই। লোকটি এ কথা জানতে পেরে যে কী পরিমাণ ব্যথিত হলেন তা আল্লাহই ভালো জানেন। অতঃপর পশ্চিম বাগদাদে অবস্থিত জামে মসজিদের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়লেন। মুহাদ্দিসগণ থেকে হাদীস শুনছিলেন। একের পর এক হাদীসের আসরের পাশ দিয়ে অতিক্রম করছিলেন। অবশেষে জ্ঞানগর্ভ একটি মজলিসে গিয়ে বসে পড়লেন।

মুহাম্মদ ইবনে সাঈদ বলেন, ভিনদেশি বেশভূষা আমার নজরে পড়ে। তার একাকিত্ব দূর করতে তাকে সালাম করলাম। (যিনি হাদীস পড়াচ্ছিলেন তার দিকে ইশারা করে) আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, এই শায়েখ কে?

বললাম, ইয়াহইয়া ইবনে মাইন।

তিনি ইবনে মাইনকে আগে থেকেই চিনতেন। ইবনে মাইনকে আবার কে না চেনে? অতঃপর তিনি কিছু সময় অপেক্ষা করলেন। মজলিসে খালি জায়গা পেয়েই বসে পড়লেন। শায়েখ তখন হাদীসের রাবীদের অবস্থা বর্ণনা করছিলেন। হাদীস বর্ণনায় কাউকে পূর্ণ নির্ভরযোগ্য আর কাউকে দুর্বল আখ্যা দিচ্ছিলেন। কারও ভালো দিকগুলো তুলে ধরছিলেন। আর কারও সমস্যার দিকগুলো।

মুসাফির শায়খকে সম্বোধন করে বললেন, হে আবু যাকারিয়া, (ইবনে মাইনের উপনাম) আল্লাহ আপনার প্রতি রহম করুন। আমি ভিনদেশি একজন মুসাফির। কিছু প্রশ্ন করতে চাচ্ছি। দয়া করে আমাকে হেয় জ্ঞান করবেন না।

শায়েখ বললেন, তোমার প্রশ্ন কী?

ভিনদেশি লোকটি অনেক মুহাদ্দিস ও হাদীস বর্ণনাকারীগণের সম্পর্কে প্রশ্ন করতে লাগলেন। (তিনি তাদের অনেকের সঙ্গেই সাক্ষাৎ করেছেন।) শায়েখ কারও ব্যাপারে বলছেন, সে নির্ভরযোগ্য আর কারও ব্যাপারে বলছেন, সে নির্ভরযোগ্য নয়।

এরপর তিনি হিশাম ইবনে আম্মার সম্পর্কে প্রশ্ন করলেন। তিনি হিশাম থেকে অনেক ইলম আহরণ করেছিলেন।

শায়েখ বললেন, আবুল ওয়ালিদ হিশাম ইবনে আম্মার দিমাশকে মানুষ নামায ঠিকমতো আদায় করছে কি না তা দেখভাল করার যিম্মাদার ছিলেন। তিনি নির্ভরযোগ্য। শুধু তা—ই নয়; নির্ভরযোগ্যের উপরে কিছু থাকলে তা। তাঁর ভেতরে অহংকার থাকলেও তাঁর গুণ, যোগ্যতার কারণে তাকে কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।

এ পর্যায়ে মজলিসের অন্যরা বলে উঠল, থামো। আল্লাহ তোমাকে রহম করুন। তুমি ছাড়া অন্যদেরও তো প্রশ্ন আছে।

তিনি আবার প্রশ্ন করলেন, আপনাকে আহমদ ইবনে হাম্বল সম্পর্কে একটি প্রশ্ন করব।

ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল সম্পর্কে প্রশ্ন করামাত্রই উপস্থিত সবাই স্তব্ধ হয়ে গেল। শায়েখের চেহারা মলিন হয়ে গেল। তিনি বাকী ইবনে মাখলাদের দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকালেন। যেন তিনি বলতে চান, আহমদ সম্পর্কে কি কেউ প্রশ্ন করে? তুমি তাঁর আলোচনা তোলার সাহস পেলে কীভাবে?

মনে হলো শায়েখের মনে কিছুটা ভীতি কাজ করছিল। পরক্ষণেই তাঁর ঈমানী চেতনা প্রবল হয়ে উঠল। তিনি বাদশা ও বাদশার ক্রোধের কোনো পরোয়া করলেন না। প্রশ্নকারীকে বললেন, তুমি কোথাকার কে যে আমরা আহমদ ইবনে হাম্বল সম্পর্কে তোমাকে বলব?

শায়েখ কিছুক্ষণ চুপ রইলেন। এরপর সাহসের সঙ্গে বললেন। মানুষ অবাক হয়ে গেল। সবাই অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল শায়েখের দিকে। তাদের ভয় হচ্ছিল, বাদশার গুপ্তচর না আবার শায়েখকে তুলে নিয়ে যায়।

শায়েখ বললেন, তিনি মুসলমানদের ইমাম। তাদের মধ্যে সর্বোত্তম ও গুণী।

এরপর সে মুসাফির আবু আব্দুল্লাহর বাড়ির ঠিকানা মানুষকে জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন। বাদশার গুপ্তচর ভেবে কেউ তাকে উপেক্ষা করল। কেউ—বা সাহস করে তার সাথে কয়েক কদম চলল। একপর্যায়ে তাঁর বাড়ি পেঁৗছলেন।

এ কথা শুনে হোটেল মালিকের বিস্ময়ের আর অন্ত রইল না। হোটেল মালিক তাকে জিজ্ঞাসা করল, তুমি কি বলছ সেই লোকটি বাদশার জুলুমকালে আবু আব্দুল্লাহর সঙ্গে বাড়িতে গিয়ে সাক্ষাৎ করেছে?

মুহাম্মদ ইবনে সাঈদ বললেন, হ্যাঁ, তিনি দরজায় কড়া নাড়লেন। দরজা খোলার পর বললেন, আমি একজন ভিনদেশি মুসাফির। অনেক দূর দেশ থেকে আপনার কাছে এসেছি।

আবু আব্দুল্লাহ বললেন, স্বাগতম। তোমার বাড়ি কোথায়?

—আন্দালুসে।

—আফ্রিকা?

—না। আফ্রিকা থেকেও অনেক দূরে। আফ্রিকা থেকে সমুদ্রপথে আমার দেশে যাই।

—তাহলে তো অনেক দূর! আচ্ছা, এবার বলো তোমার কী প্রয়োজন?

—উদ্দেশ্য আপনার থেকে রাসূলের হাদীস শুনে বর্ণনা করব।

—কিন্তু তুমি তো দেখতেই পাচ্ছ, আমি কারও সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারছি না। আর আমার সঙ্গেও কাউকে সাক্ষাৎ করতে দেওয়া হচ্ছে না। আমার কাছে আসলে তুমিও জুলুমের শিকার হতে পার।

বাকী ইবনে মাখলাদ বললেন, আপনার কাছ থেকে ইলম আহরণের পথে কোনো জুলুম ও শাস্তির পরোয়া আমি করি না।

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল বললেন, তারা যদি তোমাকে বাধা দেয়?

বাকী ইবনে মাখলাদ : একটা কৌশল অবলম্বন করব। আপনার কাছে ভিক্ষুক বেশে আসব। ভান করে চিৎকার করে বলব, আল্লাহর ওয়াস্তে কিছু দিন, আপনার উপর আল্লাহ রহম করুন। আপনি আমার জন্য দরজা খুলে দেবেন এবং হাদীস বর্ণনা করবেন।

ইমাম আহমদ : তবে মজলিসে কারও কাছে বলতে পারবে না। তাহলে তারা তোমাকে চিনে ফেলবে।

—আমি কারও কাছে প্রকাশ করব না।

মুহাম্মদ ইবনে সাঈদ বলেন, বাকী ইবনে মাখলাদ এমনই করতেন। আর তুমি তাকে ভিক্ষুক মনে করতে।

হোটেল মালিক নিশ্চিত হতে আবার প্রশ্ন করতে লাগল। তার চোখে এখন সে মুসাফির অনেক বড় কিছু। যেন তার মুসাফিরখানায় কোনো বাদশা বা মন্ত্রী বসবাস করছে। নিশ্চিন্ত হতে আবার প্রশ্ন করল, তাহলে কি তিনি ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বলের শাগরেদ?

মুহাম্মদ ইবনে সাঈদ বললেন, হ্যাঁ । এভাবেই তিনি দীর্ঘ সময় কাটিয়ে দিলেন। আল্লাহ তাআলা জুলুম—নির্যাতনের অবসান ঘটালেন। খলীফা হলেন মুতাওয়াক্কিল। তিনি হক মতবাদ ও আহলুস সুন্নাহর বিশ্বাস ও চেতনা প্রতিষ্ঠা করলেন। বিদআত দূর করলেন। আল্লাহ তাআলা ইমাম আহমদকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। যেমন তুমি জানো আমিও জানি, তিনি উম্মতের ইমাম। আল্লাহ তাঁর দ্বারা দ্বীনকে শক্তিশালী করেছেন যেমন শক্তিশালী করেছেন আবু বকর রাযি. এর দ্বারা যখন মানুষের মাঝে মুরতাদ হওয়ার প্রবণতা দেখা দিয়েছিল।

এবার হোটেল মালিক এ লোকের মর্যাদা বুঝতে লাগল। সে তার সঙ্গীদের বলল, এদেরই বলা হয় তালিবুল ইলম।

হোটেল মালিক বলল, আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন হে ইবনে সাঈদ। তুমি আমাকে তাঁর পরিচয় জানিয়েছ। আমাদের একটু তার কাছে নিয়ে যাও।

বাকী ইবনে মাখলাদ নিজ কামরায় নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছিলেন। যন্ত্রণায় এপাশ—ওপাশ করছিলেন। জ্বরে জড়সড় হয়ে গেছেন। অসুস্থতায় তিনি শক্তি হারিয়ে ফেলেছেন। ব্যথা তাকে দুর্বল করে ফেলেছে। ফলে অন্তঃসারশূন্য নালার মতো কঙ্কালসার দেহই বাকি আছে, যে নালা দিয়ে বাতাস আসা—যাওয়া করে।

কামরায় পিঠ রাখার একটি চাটাই আর মাথা রাখার মতো একটি বালিশ ছাড়া কিছুই নেই। কিতাব তাঁর চারপাশে ছড়িয়ে—ছিটিয়ে আছে। একটু হুঁশ ফিরে এলেই কিতাব দেখেন। প্রচণ্ড ব্যথায় জ্ঞান হারাতে লাগলে কিতাব রেখে দেন।

মুহাম্মদ ইবনে সাঈদ ও হোটেল মালিক গিয়ে দেখতে পেলেন, একটি পুস্তিকা হাতে নিয়ে পড়ছেন। তাঁকে সঙ্গ দেওয়ার জন্য তারা কিছুক্ষণ বসলেন। এর মধ্যে তারা কোলাহল শুনতে পেলেন, যা ক্রমেই এগিয়ে আসছে। মনে হলো তা হোটেলে এসে থেমে গেছে।

তারা উভয়ে জানালা দিয়ে উঁকি দিল। দেখল হোটেল চত্বর ও রাস্তায় কোথাও পা ফেলার জায়গা নেই।

হোটেল মালিক দ্বিধান্বিত হয়ে পড়ল। নামতে নামতে জিজ্ঞেস করল কী হয়েছে?

সবার মুখে শোনা যাচ্ছিল, তিনি এসেছেন।… তিনি এখন রাস্তায়।…

সে বুঝতে পারল, খলীফাতুল মুসলিমীন এসেছেন। কিন্তু সে খলীফার শোভাযাত্রা একাধিকবার দেখেছে। কিন্তু আজকের মতো দেখেনি।

সে মানুষের ভিড়ের একপাশে দাঁড়ানো এক বৃদ্ধের কাছে জিজ্ঞেস করলেন, আগন্তুক কে? কোথায় যাচ্ছেন?

বৃদ্ধ বলল, আবু আব্দুল্লাহ আহমদ ইবনে হাম্বল! যিনি খলীফার দরবারে যান না। এই মুসাফিরখানায় এক অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে এসেছেন।

এ কথা শুনে হোটেল মালিক চিৎকার করে উঠল, আবু আব্দুল্লাহ আমার মুসাফিরখানায় আগমন করেছেন!!

এবার সে চিৎকার ও ছুটাছুটি করতে লাগলেন। বুঝতে পারছেন না কী করবে আর কীইবা বলবে? কেউ তার দিকে ভ্রম্নক্ষেপ করছেন না। সকলের দৃষ্টি রাস্তার দিকে। সবাই রাস্তায় ভিড় জমিয়েছে। দোকানে নেই কোনো কাপড়—বিক্রেতা। বাজারে নেই কোনো ব্যবসায়ী। মজলিসে নেই কোনো তালিবুল ইলম। তাদের সবার মুখে ছিল একটি ধ্বনি ও গুঞ্জন। সরাইখানা উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

আল্লাহর কুদরতে এই জনসমুদ্র বিদীর্ণ হতে লাগল। উপস্থিত সকলেই নিশ্চুপ, যেন তাদের মাথায় পাখি বসে আছে। ইমাম জনসম্মুখে এলেন। দুই মিলিয়ন অধিবাসীর বিশাল বাগদাদের সকল দিক থেকে তালিবুল ইলম জড়ো হয়েছে তাঁর চারপাশে। তাদের হাতে কাগজ আর কলম। তিনি যা বলছেন তা লিখছে।

ইমাম আহমদ বাকী ইবনে মাখলাদের কামরায় গেলেন। রোগীর কাছে দাঁড়িয়ে বললেন, হে আবু আব্দুর রহমান, আল্লাহর প্রতিদানের সুসংবাদ গ্রহণ করো। আল্লাহ তোমাকে ভালোভাবে সুস্থ করুন। তোমার উপর তাঁর নিরাময়কারী হাত বুলিয়ে দিন।

লোকেরা একজন আরেকজনকে ইমামের মুখ—নিঃসৃত দুআ শুনিয়ে দিল। তারা তা লিপিবব্ধ করে নিল।

এরপর অনেক বছর কেটে গেল। লোকজন এই স্মরণীয় দিনটির আলোচনা করতে লাগল। সেই দিনের পর থেকে এই মুসাফিরখানায় উলামায়ে কেরাম ও বড় বড় ব্যক্তিবর্গ এসে উঠতেন। মুসাফিরখানার মালিকের রিযিকে অনেক প্রাচুর্য এল। আর বাকী ইবনে মাখলাদকে আল্লাহ সুস্থতা দান করলেন। তাকে আবার আন্দালুসে ফিরিয়ে নিলেন। তিনি আন্দালুসকে ইলম দিয়ে সমৃদ্ধ করে তুললেন।

 

Avatar

editor

একটি কমেন্ট করুন