আজ ৩০শে নভেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ২৫শে রবিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি
মাসিক নেয়ামত

জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ, ঢাকা-এর মুখপত্র

প্রতিষ্ঠাতা: মুজাহিদে আযম আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ.

গোনাহের ক্ষতি

গোনাহের ক্ষতি

হাকীমুল উম্মত মুজাদ্দিদে মিল্লাত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ.

ভাষান্তর : মাওলানা আতাউল্লাহ আব্দুল জলীল

 

[পূর্বপ্রকাশের পর]

নিছক নামায—রোযার নাম শরীয়ত নয়; সামাজিকতা ও লেনদেনও তার অন্তভুর্ক্ত

লোকমুখে শোনা যায়, শরীয়তে নামায—রোযা ছাড়া আর কী আছে। আল্লাহর কসম, তারা আজ পর্যন্ত শরীয়তের আসল রূপটাই দেখেনি। বিষয়টি এমনই যেমন কেউ খুব সুন্দর ও সুদর্শন মানুষের একটা নখ দেখেছে, চেহারা—সূরত কিছুমাত্রও দেখতে পায়নি। তাহলে তার শোভা—সৌন্দর্য কীভাবে আন্দাজ করবে? এ প্রসঙ্গে খুব যুৎসই একটি দৃষ্টান্ত মনে পড়ল। এর দ্বারা আমাদের বাস্তবতা—জ্ঞান ও আসল তত্ত্ব সম্পর্কের অবগতির স্বরূপ পুরোপুরি প্রকাশিত হয়ে যাবে। জনশ্রম্নতি আছে, অন্ধদের এলাকায় এক হাতি এসে উপস্থিত হয়। হাতির কথা শুনে সকলেরই তা দেখার আগ্রহ হলো। কিন্তু চক্ষু তো নেই দেখবে কী করে? তারপরও তারা সবাই একজোট হয়ে হস্তি দর্শনে গেল। নিকটে গিয়ে সকলে হাত দিয়ে স্পর্শ করে দেখতে লাগল। তখন কারও হাত পড়ল সঁুড়ের ওপর, কারও পায়ের ওপর, কারও কানের ওপর আর কেউ ধরল লেজ। দেখা শেষে পরস্পরে হাতির আকার— আকৃতি নিয়ে আলোচনা শুরু হলো―একজন মন্তব্য করল, হাতি হলো খাম্বার মতো। অপর জন বলল, না বরং হাতি হলো কূলার মতো। তৃতীয় আরেক জন বলল, না হাতি বরং মূলার মতো। চতুর্থ জন বলল, না বরং হাতি হলো সাপের মতো।

মাওলানা রুমী রহ. এই ঘটনা বর্ণনা করে লেখেন, যদি সেখানে কোনো চক্ষুষ্মান থাকত তাহলে তাদের লক্ষ্য করে বলত, তোমরা সত্যবাদী আবার মিথ্যাবাদীও। সত্যবাদী এ হিসাবে যে প্রত্যেকে যা দেখেছে তা—ই বলেছে। আর মিথ্যাবাদী এজন্য যে, প্রকৃত বাস্তবতা সম্পর্কে কারোই সঠিক জ্ঞান নেই। পূর্ণ হাতি তো কেউই দেখতে পায়নি। একটি একটি অঙ্গ ধরে দেখে একেই পূর্ণ হাতি মনে করে বসেছে। এ কালের মুসলমানদের অবস্থাও ঠিক এমনই। ব্যাপকভাবে তারা পূর্ণাঙ্গ ইসলামকে দেখেনি তাই ভাবে, শুধু নামায—রোযার নামই ইসলাম।

আমি এক জায়গায় গিয়েছিলাম। সেখানে একটি স্কুল ছিল। যাতে দ্বীনি শিক্ষাও দেওয়া হতো। এ উদ্দেশ্যে শুধু রাহে নাজাত কিতাবখানি পাঠদান করত। আরও গজবের বিষয় হলো, একেই যথেষ্ট মনে করত। অথচ রাহে নাজাত কিতাবে দ্বীনের অনেক বিষয় আসেনি। আমি আরজ করলাম, সুধীবৃন্দ, রাহে নাজাত কিতাব যদি দ্বীনের সকল জরুরি বিষয়ের জন্য যথেষ্ট হয় তাহলে বলুন দেখি, একজনের কাছে যদি সরিষা থাকে আর আরেক জনের কাছে তেল থাকে আর তারা যদি পরস্পর পণ্য বিনিময় করতে চায় তাহলে তা কীভাবে করবে? রাহে নাজাতে কি এ ব্যাপারে সমাধান পাওয়া যাবে?

আমার প্রশ্ন শুনে তারা মন্তব্য করল, এটা কি কোনো মাসআলা হলো?

আফসোস, মুআমালাত ও মুয়াশারাতকে (পারস্পরিক লেনদেন ও ক্রয়—বিক্রয়কে মুআমালাত বলে আর সামাজিক আচরণকে মুয়াশারাত বলে) ব্যাপকভাবে মানুষজন দ্বীনের গণ্ডিবহিভূর্ত মনে করে বসে আছে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, লেনদেন ও সামাজিকতাকে আল্লাহর আইন—বহিভূর্ত মনে করলেও সরকারি আইন—বহিভূর্ত মনে করে না।

কেউ কখনো সরকারকে এ কথা বলেনি, ব্যবসা—বাণিজ্যে আপনি নাক গলাতে আসেন কেন এবং এর জন্য আইনই—বা প্রণয়ন করেন কেন? আপনি আপনার রাজ্য—ব্যবস্থাপনার আইন প্রণয়ন করুন। এর বিপরীত কিছু ঘটলে আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও ধর—পাকড় করবেন। বাকি সব আমাদের ব্যক্তিগত বিষয়। পারস্পরিক লেনদেনে আমাদের ওপর লাইসেন্স ইত্যাদির বাধ্যবাধকতা কেন আরোপ করতে যান। (এক্ষেত্রে আমাদেরকে আমাদের অবস্থার ওপর ছেড়ে দিন।)

বলুন, কেউ কি সরকারকে এ ধরনের কথা বলতে পারবে? আর যদি বলার সাহস করে তাহলে তারপর দেখুন তার মুণ্ডু ঠিক থাকে কি না? নিঃসন্দেহে তার মুণ্ডুপাত করা হবে আর বলা হবে, আমরা যেহেতু শাসক তাই প্রতিটি বিষয়ে আইন প্রণয়নের অধিকার আমাদের আছে।

অত্যন্ত আফসোসের বিষয় হলো, সরকারকে তো এ ধরনের কাজের অধিকারপ্রাপ্ত মনে করা হয়, অপরপক্ষে আল্লাহ পাকের আইনকে শুধু ওযু—নামাযের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে রাখা হয়। আল্লাহ পাক প্রতিটি বিষয়ের জন্য একটি বিধান নির্ধারণ করে দিয়েছেন। প্রতিটি ক্ষেত্রে নীতিমালা বাতলে দিয়েছেন। কিন্তু লোকজন দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গভাবে অবলোকন করে না। তাই শুধু নামায—রোযা কিংবা বড়জোড় লেনদেনকে শরীয়তের অন্তভুর্ক্ত মনে করে কিন্তু বেশভূষা, পোশাক—পরিচ্ছদ, সামাজিকতা ও আচার—অভ্যাসকে শরীয়ত—বহিভূর্ত মনে করে।

 

সভ্যতা ও সংস্কৃতিতে আমরা বিজাতির মুখাপেক্ষী—এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল

এর চেয়ে জঘন্য বিষয় হলো, কিছুসংখ্যক মানুষের চিন্তাধারা এত নিচে নেমে গেছে যে, তারা মনে করে, সভ্যতা—সংস্কৃতির ক্ষেত্রে আমরা বিজাতীর দুয়ারের ভিখারি। আর দ্বীন ও শরীয়তকে তারা সভ্যতা—বিবর্জিত মনে করে। তাদের দৃষ্টান্ত ঠিক তেমন যেমন এক কানা লোকের ব্যাপারে খ্যাত আছে যে, সে দিল্লি ভ্রমণে গিয়ে চাঁদনি চক দেখতে বের হলো। ঘটনাক্রমে সে ঘাড় বাঁকিয়ে অপর দিক দেখতে পেত না। তাই প্রবেশের সময় কেবল এক পাশের দোকান তার নজরে পড়ল। অপর পাশের দোকানপাট নজরে পড়ল না। ফেরার পথে যখন অপর পাশের দোকানপাট নজরে পড়ল তখন সে মন্তব্য করল, দিল্লির মানুষ তো বড় সাংঘাতিক, মাত্র দেখে গেলাম দোকানগুলো ডান দিকে, আমি ফিরতে ফিরতেই সেসব তোলে বাঁ দিকে বসিয়ে দিয়েছে।

আমাদের স্বজাতির ভাইয়েরাও শরীয়তকে শুধু এক দিক থেকে দেখেছে, তাই তারা নিজেদেরকে বিজাতীয় সভ্যতা—সংস্কৃতির ভিখারি মনে করে। নতুবা যদি শরীয়তকে পূর্ণাঙ্গরূপে দেখত, তাহলে দেখতে পেত যে শরীয়তের মধ্যে এমন উন্নত সভ্যতা—সংস্কৃতি বিদ্যমান যা পৃথিবীর কোনো জাতির কাছে নেই। এ ব্যাপারে যদি বিন্দু পরিমাণ দ্বিধা থাকে তাহলে আমাদের সঙ্গে থেকে দেখুন, ওই শরীয়ত যাকে রক্তপিপাসু আখ্যায়িত করা হচ্ছে তা কতটা চিত্তাকর্ষক। যখন তার স্বরূপ জানতে পারবেন তখন তার প্রেমে মজে যাবেন। তার প্রতিটি আচরণ ও ভাব—ভঙ্গি মধুময় মনে হবে, অথচ আজ তা থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। তখন আপনি শরীয়তকে বুকে জড়িয়ে নিয়ে মন্ত্রমুগ্ধের মতো বলবেন,

یہی دل کی حسرت یہی آرزو ہے

نکل جائے دم تيرے قدموں کے نچے

অর্থ : সর্বান্তকরণে মোর একটাই মিনতি একটাই চাওয়া। প্রাণ উৎসর্গ হোক মোর তোমার পদতলে।

শরীয়তের সভ্যতার এটাও একটা অংশ যে,

یٰۤاَیُّهَا  الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا لَا تَرْفَعُوْۤا اَصْوَاتَكُمْ  فَوْقَ صَوْتِ النَّبِیِّ

অর্থ : হে ঈমানদাররা! নবীজির আওয়াজের চেয়ে তোমাদের আওয়াজ উঁচু করো না।

 

বুযুর্গদের সঙ্গে সাক্ষাতের আদব—কায়দা

এর দ্বারা জানা গেল বড়দের সামনে সতর্কতার সঙ্গে মুখ সামলে কথা বলা উচিত। অবশ্য যেটা বলা দরকার তা পরিষ্কারভাবে বলা, অস্পষ্ট না বলা। এখন আমাদের দুর্ভাগ্যজনক অবস্থা হলো আমরা এ দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য করি না। এখন হয় কৃত্রিমতা হয় তথা নিজের অবস্থাও পরিষ্কার বর্ণনা করে না। যেমন আজকাল কিছু লোকের অবস্থা হলো, যদি পীর সাহেবের আদব করে তা করে এভাবে, চার—পাঁচ দিন পীর সাহেবের কাছে থাকবে কিন্তু কী প্রয়োজনে এসেছে তা মুখ ফুটে বলবে না। ঠিক বিদায়ের সময় গিয়ে বলে, আমার প্রতি হযরতের কী নির্দেশ। তখন পীর সাহেব যদি বলে, ভাই তুমি আগে যদি নিজ অবস্থা অবহিত করতে তারপর জানতে চাইতে। তো এর জবাব আসে, হযরতকে কি আর বলতে হবে, হযরতের কাছে তো সবই পরিষ্কার।

আরে হযরতের তো নিজের খবরই নেই সেখানে তোমার হালত কী করে তার কাছে পরিষ্কার হয়ে গিয়ে থাকবে। এতে করে কেউ যেন এ কথা মনে না করে যে আমি কাশ্ফ অস্বীকার করছি। আমি কাশ্ফ অস্বীকার করি না। বুযুর্গদের কাশ্ফ হয় কিন্তু তা তাদের এখতিয়ারী বিষয় নয়। এটা পুরোপুরি তাদের এখতিয়ার—বহিভূর্ত বিষয়। আর বুযুর্গ তো পরের বিষয় এমনকি তা নবীদের এখতিয়ারেও নয়।

দেখুন, হযরত ইয়াকুব আ. দীর্ঘদিন পর্যন্ত হযরত ইউসুফ আ. এর কোনো সন্ধান পাননি। মিশরে তো তিনি পরে গিয়েছেন। প্রথমে তিনি বাড়ির কাছেই কূপের ভেতর পড়ে ছিলেন। অথচ হযরত ইয়াকুব আ. এর কোনো খবর হয়নি। এই নিখোঁজের ফলে তিনি যে চরম দুঃখ—যাতনার শিকার হয়েছেন তা সবার জানা। তিনি কাঁদতে কাঁদতে অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। কাশ্ফ যদি এখতিয়ারী হয়েই থাকে তাহলে হযরত ইয়াকুব আ. কেন পুত্রের খোঁজ পাননি? যখন খোঁজ পাওয়ার সময় ঘনিয়ে এসেছে তখন বহু মাইল দূর থেকে হযরত ইউসুফ আ. এর জামার সুঘ্রাণ পেতে থাকেন। সুতরাং কাশ্ফ যখন এখতিয়ারী জিনিস নয় তখন সদা—সর্বদা বুযুর্গদের কাশ্ফ হতেই হবে আর তিনি তোমার অবস্থা নিজেই জেনে যাবেন এর কী বাধ্যবাধকতা আছে? তাই নিজের অবস্থা নিজে থেকেই বলা উচিত। পীর সাহেবের কাছ থেকে কোনো কিছু লুকানো উচিত নয়।

 

পীর—মুর্শিদের কাছে নিজের রোগ ও ত্রুটি পরিষ্কার বলা উচিত

বুযুর্গরা তো এতদূর বলেছেন, নিজের মধ্যে যদি কোনো দোষও থাকে তাহলে তা—ও পীর সাহেবকে পরিষ্কার জানানো উচিত, আমার মধ্যে এই দোষ আছে। একালে কিছু লোক আছে, যারা সুশ্রী বালকদের আকর্ষণে ফেঁসে আছে অথচ নিজের এই রোগকে গুই সাপের মতো লোকায়। এখানে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেন, নিজের খারাপ দিকগুলো প্রকাশ করা নাজায়েয তাই প্রকাশ করব কীভাবে? এর উত্তর হলো, লোকানোর হুকুম সেখানে যেখানে প্রকাশ করায় কোনো ফায়দা নেই।

এর নিষিদ্ধতা এমন ক্ষেত্রে যেমন এক ব্যক্তির ব্যাপারে শুনেছি, যখন সে হজে গিয়েছে তখন কংকর মারার সময় একটা লম্বা জুতা নিয়ে প্রতীকি তিন শয়তানের একটাকে খুব প্রহার করছিল আর বলছিল, কমবখত তুই আমাকে দিয়ে অমুক দিন অমুক গোনাহ করিয়েছিলি, অমুক রাতে আমাকে যিনায় লিপ্ত করেছিলি, অমুক রাতে চুরি করিয়েছিলি, তো এ ধরনের ক্ষেত্রে বিনা প্রয়োজনে দোষ প্রকাশ করা বোকামি ছাড়া কিছুই নয়। কিন্তু পীরের কাছ থেকে কিছুতেই লুকোবে না। তার কাছে দোষ প্রকাশ করে এর চিকিৎসা জেনে নিতে হবে। যেমন ডাক্তারকে সতরের ফোঁড়া—পাঁচড়া দেখিয়ে চিকিৎসা করানো হয়।

কেউ বলতে পারে, তাহলে তো আমরা তার দৃষ্টিতে হেয় ও ছোট হয়ে যাব।

এর উত্তর হলো, যার ব্যাপারে মনে হয় যে, তোমাকে ছোট ও হীন মনে করবে কিংবা হেয় মনে করবে এ ধরনের লোককে পীর হিসেবে গ্রহণ করতে যেয়ো না। এহেন কাজ ভণ্ড পীরদের কাজ। যিনি খাঁটি পীর তিনি কাউকে ছোট ও হীন মনে করেন না। কেননা তিনি জানেন, যে আল্লাহ পাকের নিকট মর্যাদাবান, সে—ই প্রকৃত মর্যাদাবান। আর কারই—বা এ কথা জানা আছে ওখানে কে মাকবুল আর কে বিতাড়িত। তাঁরা তো কুকুরকে পর্যন্ত তুচ্ছ মনে করেন না। কারও ব্যাপারে তারা এহেন খেয়াল পোষণ করেন না যে, আল্লাহ পাক তাকে অগ্রাহ্য করে তাড়িয়ে দেবেন।

তাদের নীতি তো হলো—হতে পারে বড় থেকে বড় মুত্তাকী—আল্লাহভীরু পরহেযগার মানুষ সারা জীবনেও ওই মর্যাদায় উপনীত না—ও হতে পারে যা একজন বদকার ও ফাসেক লোক এক নারায়ে তাকবীর লাগিয়ে মুহূর্তের মধ্যে হাসেল করে নিতে পারে। তো যাদের নীতি এই তারা কীভাবে কাউকে তুচ্ছ মনে করতে পারে? কিছুতেই পারে না।

এখন হয়তো কেউ বলতে পারে, তুচ্ছ মনে না করুক, আমাদের অবস্থা তো কাউকে বলে দিতে পারে। তখন সে আমাকে হীন ও তুচ্ছ ভাবতে পারে। মনে রাখবেন, তাঁরা কাউকে বলবেন না। কারণ তাঁরা আল্লাহ পাকের গোপন ভেদই যেখানে কাউকে প্রকাশ করেন না—যা প্রকাশ করাতে আল্লাহ পাকের কোনো ক্ষতি নেই̶  সেখানে আপনার গোপন ভেদ কীভাবে প্রকাশ করবেন, যা প্রকাশ করাতে আপনার ক্ষতি আছে? তো যখন এই আশঙ্কাও নেই তখন সকলের নজরেই আপনার মর্যাদা এখনকার মতোই বহাল থাকবে আর তাঁদের নজরেও বহাল থাকবে।

এ কারণেই হাদীস শরীফে এসেছে, বিশেষ কোনো প্রয়োজনে যদি চাইতেই হয় তাহলে আল্লাহওয়ালা বুযুর্গদের কাছে চেয়ো। কেননা ভিক্ষাবৃত্তি হারাম হওয়ার কারণ হলো—প্রথমত এতে নিজেকে ছোট করা হয়, দ্বিতীয়ত অন্যকে চাপে ফেলা হয়। বুযুর্গদের কাছে চাওয়াতে এ দুইয়ের কোনোটাই ঘটে না; ছোট হতে হয় না, কারণ তারা কাউকে ছোট মনে করেন না। আর চাপে না পড়ার কারণ হলো তাঁরা একেবারে নিঃসংকোচ হয়ে থাকেন, কোনোরূপ কৃত্রিমতা করেন না। সামর্থ্য থাকলে দিয়ে দেন আর না থাকলেও দিতেই হবে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা অনুভব করে না, নির্দ্বিধায় অপারগতা প্রকাশ করে দেন। অসতর্কতাবশত যদি কাউকে ছোট মনে করে বসেনও তাহলে তৎক্ষণাৎ তাঁকে সতর্ক করে দেওয়া হয়; তাই ভবিষ্যতে এর আর কোনো সম্ভাবনা থাকে না।

হযরত জুনাইদ বাগদাদী রহ. এর ঘটনা, তিনি সুস্থ—সামর্থ্য এক লোককে মসজিদের দুয়ারে দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করতে দেখলেন। মনে মনে লোকটির কাজে আপত্তি জাগলো, মনে মনে তার সমালোচনাও করলেন। রাতে স্বপ্নে দেখলেন, কেউ তাঁকে মৃতের গোশত খেতে বলছে। তিনি ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করলেন। তখন তাকে বলা হলো, তুমি কি ওই ফকীরের গীবত করে মৃতের গোশত খাওনি?

তিনি উত্তর দিলেন, আমি তো তাকে কিছু বলিনি।

পাল্টা প্রশ্ন এলো, মনে মনে কি গীবত হয় না? বরং তা তো প্রথমে মনেই সৃষ্টি হয়, তারপর মুখে উচ্চারিত হয়।

ঘুম থেকে জেগে তিনি ক্ষমা চাওয়ার জন্য ভিক্ষুকের খোঁজে বের হলেন। ওই লোক তাঁকে আসতে দেখে এ আয়াত পড়লেন,

وَ هُوَ الَّذِيْ يَقْبَلُ  التَّوْبَةَ  عَنْ عِبَادِهٖ.

অর্থ : আল্লাহ পাক এমন সত্তা যিনি আপন বান্দাদের তওবা কবুল করেন।

অর্থাৎ আমি ক্ষমা করে দিয়েছি, আপনার তওবা কবুল হয়ে গেছে, এখন আর ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজন নেই। তারপর ওই লোক এ কথাও বলে দিলেন, ভবিষ্যতে যেন আর এমনটা না হয়। তো এই লোক বহুত বড় কামেল মানুষ ছিলেন। বিশেষ কোনো কারণে তখন হাত পেতে থাকবেন।

মোটকথা, এভাবে বুযুর্গদের ইসলাহ ও সংশোধন চলতে থাকে। তাই তারা কাউকে হীন ও ছোট ভাবতে পারেন না। বরং পৃথিবীতে নিজেকেই সবচে’ নিকৃষ্ট থেকে নিকৃষ্টতম মনে করে থাকেন। বুযুর্গরা তো এতদূর লিখেছেন, কেউ ততক্ষণ পর্যন্ত কামেল ঈমানদার হতে পারে না যতক্ষণ পর্যন্ত নিজেকে কাফেরের চেয়ে নিকৃষ্ট মনে না করে। তো এই মহামানবরা যখন নিজেকে নিতান্তই তুচ্ছ মনে করেন তখন তাদের কাছে নিজেদের দোষ প্রকাশ করাতে কোনো ক্ষতি নেই।

মোটকথা, পীর সাহেবের কাছে নিজের অবস্থা অবশ্যই প্রকাশ করুন। তাঁর কাশ্ফের ওপর ভরসা করে বসে থাকবেন না। কেননা একে তো কতক বুযুর্গের কাশ্ফ হয়ই না, আর হলেও সর্বদা হয় না। দ্বিতীয়ত যদি কখনো হয়ও আপনি কী করে জানবেন? তাঁর কাশ্ফের ব্যাপারে কি আপনার কাশ্ফ হয়েছে? তো বুযুর্গদের কাছে গিয়ে কিছু না বলে চুপ করে বসে থাকা অহেতুক কৃত্রিমতা। আবার সেখানে গিয়ে বগর বগর করতে থাকাও বেয়াদবি। এরই সংশোধন করা হচ্ছে এই আয়াতে,

يٰۤاَيُّهَا  الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا لَا تَرْفَعُوْۤا اَصْوَاتَكُمْ  فَوْقَ صَوْتِ النَّبِيِّ وَلَا تَجْهَرُوْا  لَهٗ  بِالْقَوْلِ کَجَهْرِ بَعْضِكُمْ لِبَعْضٍ.

অর্থ : হে ঈমানদারগণ, নবীর আওয়াজের চেয়ে তোমাদের আওয়াজ উঁচু করো না এবং তোমরা একে অপরের সঙ্গে কথাবার্তা বলার মতো করে তার সঙ্গে জোর আওয়াজে কথাবার্তা বলো না।

 

আদব শিক্ষা

আরবদের মধ্যে অকৃত্রিমতা খুব বেশি ছিল। বড় বড় মানুষদেরও তারা নাম ধরে ডাকত। কেউ কেউ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নাম ধরে ডাকতে শুরু করল। আল্লাহ পাক এই আয়াতে তা করতে নিষেধ করেছেন। তারপর বলেছেন,

أَن تَحْبَطَ أَعْمَالُكُمْ وَأَنتُمْ لَا تَشْعُرُونَ.

অর্থ : এ নির্দেশ এজন্য যাতে তোমাদের অজান্তে তোমাদের আমল নষ্ট না হয়ে যায়।

রইল এ কথা যে এই নষ্টের কারণ কী? এর কারণ আমার যেটা বুঝে আসে তা হলো, নিজেদের নবীর আদবের প্রতি খেয়াল রাখা ঈমানদারদের অবশ্যকর্তব্য। এর বিপরীত হলে নবীজির কষ্ট হবে। কেননা, যার কাছ থেকে আদবের আশা করা হয় তার কাছ থেকে যদি তা না পাওয়া যায় তাহলে তো কষ্ট পাওয়া স্বাভাবিক। পক্ষান্তরে যার কাছ থেকে আদবপূর্ণ আচরণের আশাই থাকে না সে যদি আদবপূর্ণ আচরণ না করে তাহলে মনে কোনো কষ্ট লাগে না। দুনিয়ার শাসক—প্রশাসকদের কথাই ধরুন, তারা গ্রামীণ লোকদের অনেক অভদ্র আচরণ সহ্য করে নেয় অথচ একই আচরণ শহুরে লোকদের কাছ থেকে প্রকাশ পেলে সহ্য করেন না।

 

এক গেঁয়োর গল্প

এক গেঁয়ো এক প্রশাসকের কাছে দরখাস্ত নিয়ে গেল। দরখাস্তে সরকারি টিকেট লাগানো না থাকায় প্রশাসক তাকে বলল, টিকেট লাগাও।

গেঁয়ো পকেট থেকে পয়সা বের করে বলল, এই লও টাকা। এই বুঝি তোমার সাহেবি। টিকেট লাগিয়ে নিয়ো। কিছু বাঁচলে নিজের কাছে রেখে দিয়ো।

প্রশাসক হেসে নীরব হয়ে গেল এবং মুফতে দরখাস্ত নিয়ে নিল। অথচ কোনো শহুরে লোক এমনটা করলে তার বারোটা বাজিয়ে ছাড়ত। তো ঈমানদাররা যদি নবীর সঙ্গে আদবপূর্ণ আচরণ না করে তাহলে তাঁর কষ্ট হবে। আর তিনি কষ্ট পেলে আমল বরবাদ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কেউ হয়তো এই প্রশ্ন করতে পারেন, কোনো কোনো বুযুর্গের মুখ থেকে তো এমনও শব্দ শোনা যায় যা আল্লাহ পাকের শানে আদবের খেলাফ। অথচ এ নিয়ে কোনো ধর—পাকড় হয় না। যেমন হযরত মূসা আ. এর জমানার রাখালের প্রসিদ্ধ ঘটনা।

এর উত্তর হলো, এ ধরনের কথায় ধর—পাকড় না হওয়ার কারণ হলো, ওই সকল বুযুর্গদের ওপর কোনো হালত প্রবল হয়ে যায় ফলে তাদের হুশ—বুদ্ধি ঠিক থাকে না, তাই তাদের মাযুর গণ্য করে ছেড়ে দেওয়া হয়। নতুবা যেসকল বুযুর্গ এমন নয় তাঁদের ছোট—খাটো অনুচিত কথাও বরদাশত করা হয় না।

জনৈক বুযুর্গের ঘটনা, তিনি একবার বৃষ্টিপ্রসঙ্গে বললেন, বাহ! আজ কি দারুণ সময়োপযোগী বৃষ্টি। তৎক্ষণাৎ গায়েব থেকে ধমক এলো, এই বেয়াদব কোন দিন বৃষ্টি অনুপযোগী হয়েছিল? ধমক খেয়ে তো তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। এ ধমকও পুরোপুরি যথার্থ। অসময়ে বা অপাত্রে কখনো বৃষ্টি হয় না।

তো আদব জানা ব্যক্তি যখন বেয়াদবি করে তখন খুবই অপ্রিয় ঠেকে, এই আয়াতে এরই সংশোধন করেছেন। আরও কয়েক জায়গায় এ বিষয়টি সংশোধন করেছেন। এক জায়গায় ইরশাদ করেন,

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا لَا تَدْخُلُوْا بُيُوْتَ النَّبِيِّ  اِلَّاۤ اَنْ يُّؤْذَنَ لَكُمْ  اِلٰي طَعَامٍ غَيْرَ نٰظِرِيْنَ  اِنٰىهُ  وَلٰکِنْ  اِذَا دُعِيْتُمْ فَادْخُلُوْا فَاِذَا طَعِمْتُمْ فَانْتَشِرُوْا وَلَا مُسْتَاْنِسِيْنَ لِحَدِيْثٍ ؕ اِنَّ ذٰلِكُمْ کَانَ يُؤْذِي النَّبِيَّ فَيَسْتَحْيٖ مِنْكُمْ ۫ وَاللهُ  لَا يَسْتَحْيٖ مِنَ الْحَقِّ.

ভাবার্থ : হে ঈমানদারগণ, তোমরা দাওয়াত ব্যতিরেকে এমনিতেই নবীজির ঘরে যেয়ো না। এক্ষেত্রেও (দাওয়াতের ক্ষেত্রেও) আগে থেকেই খাবার প্রস্তুতের অপেক্ষায় গিয়ে বসে থেকো না; বরং যখন ডাকা হয় তখন যাও এবং খাওয়া সারামাত্রই সরে যাও, গল্প—গুজবে মেতে উঠো না। এতে নবীজির কষ্ট হয় তবুও তিনি তোমাদের লেহাজ করেন। আল্লাহ পাক হক কথায় কেন শরমিন্দাবোধ করবেন। তিনি তো মহান আল্লাহ।

দেখুন, কেমন দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলে দিয়েছেন যে, আল্লাহ পাক হক কথার ব্যাপারে শরম করেন না। অন্যত্র বলেন,

لَا تَكُوْنُوْا کَالَّذِيْنَ اٰذَوْا مُوْسٰي فَبَرَّاَهُ  اللهُ مِمَّا قَالُوْا.

তোমরা তাদের মতো হয়ো না যারা মূসাকে কষ্ট দিয়েছিল। তো তিনি তাকে তা থেকে নির্দোষ সাব্যস্ত করে দেন।

মোটকথা, শরীয়ত এদিকে খুব সতর্ক দৃষ্টি রেখেছে যে, কারও দ্বারা কেউ যেন অহেতুক কোনো কষ্ট না পায়। তাই নবীকে কষ্ট দেওয়া আরও অগ্রাধিকার—ভিত্তিতে হারাম বিবেচিত হবে।

এর প্রতিক্রিয়াও তা—ই যা কুফরের অর্থাৎ কুফর দ্বারা যেমন আমল বিনষ্ট হয়ে যায় তদ্রƒপ এর দ্বারাও আমল বিনষ্ট হয়ে যায়, আর কখনো এমন হয় যে টেরও পাওয়া যায় না—আমার দ্বারা কষ্ট পেল কি না? অথচ আমল বরবাদ হয়ে যায়।

তাই ইরশাদ হয়েছে, ওই কাজই করো না যা দ্বারা কষ্ট পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এই আয়াত দ্বারা জানা গেল রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কষ্ট দেওয়ার দ্বারা সমস্ত আমল বিনষ্ট হয়ে যায়। তো গোনাহসমূহের মধ্যে কেবল এই গোনাহ এমন যার কারণে কোনো নেক আমল বাকি থাকে না। অবশ্য কিছু গোনাহ এমন যার ফলে কোনো বিশেষ আমল নষ্ট হয়ে যায়। যেমন কোরআন শরীফে আছে,

يٰۤاَيُّهَا الَّذِيْنَ اٰمَنُوْا لَا تُبْطِلُوْا صَدَقٰتِكُمْ بِالْمَنِّ وَالْاَذٰي.

অর্থ : হে ঈমানদারগণ, খেঁাটা দিয়ে এবং কষ্ট দিয়ে নিজেদের সদকা নষ্ট করে ফেলো না।

অর্থাৎ সদকা—খয়রাত করে যে সওয়াব পেয়ে গেছ, খোঁটা দিয়ে তা নষ্ট করে ফেলো না। তো কিছু আমল এমন যার প্রতিক্রিয়া এরূপ। সুতরাং ‘গোনাহ দ্বারা সওয়াব নষ্ট হয়ে যায় না’ বলে যে দাবি করা হয়েছে তাতে এমন গোনাহ উদ্দেশ্য নয় যার কারণে সমস্ত আমল কিংবা কিছু আমল নষ্ট হয়ে যায় এবং তার সওয়াব আর পাওয়া যায় না; বরং ওই সকল গোনাহ উদ্দেশ্য যার উপস্থিতিতে নেক আমলও সহীহ হয়ে যায় আর তা বহালও থাকে। আর বেশির ভাগ গোনাহ তো এমন যার ব্যাপারে আমি দাবি করছি যে, এসবের দ্বারা নেক কাজের সওয়াব বিনষ্ট হয়ে যায় না, যদিও বরকত কমে যায়। আর এর প্রথম দলীল ওই হাদীস যা ওপরে বর্ণিত হয়েছে। আরেকটি দলীল হলো, আল্লাহ পাক বলেন,

اِنَّ الْحَسَنٰتِ يُذْهِبْنَ السَّيِّاٰتِ.

অর্থ : নিঃসন্দেহে নেক আমল গোনাহসমূহ মিটিয়ে দেয়।

দেখুন, কী পরিষ্কার দলীল। গোনাহ করার দ্বারা যদি নেক কাজের সওয়াব লাভ না হতো তাহলে নেক আমলের মধ্যে গোনাহ মিটিয়ে দেওয়ার প্রভাব কোত্থেকে আসত।

এ আয়াত থেকে এ—ও পরিষ্কার হয়ে গেল, গোনাহের দ্বারা নেকী নষ্ট হয় না, কিন্তু নেক আমলের দ্বারা গোনাহ মিটে যায়। তো এ আয়াত দ্বারা প্রমাণ হয়ে গেল, গোনাহগারের নেক আমলেও সওয়াব হয় যদিও তার বরকত কমে যায়। যেমন এ হাদীস দ্বারাই প্রমাণিত হয়েছে, যা আমি আলোচনার শুরুতে রোযা প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছি। এখন আমি এই হাদীস দ্বারা তা প্রমাণ করছি।

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, রোযাদার যদি গোনাহ থেকে আত্মরক্ষা না করে তাহলে পানাহার বর্জন করে কী লাভ। দেখুন হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এখানে লাভ ও ফায়দা নাকচ করেছেন। আর এ কথা আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছি এ ব্যাপারে সবাই একমত, গোনাহ সত্ত্বেও রোযা হয়ে যায়। তো হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে ফায়দা নাকচ করেছেন তা হলো রোযার বরকত। সুতরাং প্রমাণিত হয়ে গেল, গোনাহের ফলে নেক কাজের বরকত চলে যায়। আর আমার উদ্দেশ্যও প্রমাণিত হয়ে গেল যা বর্ণনা করার জন্য এই হাদীস পড়েছি, অর্থাৎ গোনাহ বর্জনের চেষ্টা বিশেষত রোযা অবস্থায় একান্ত জরুরি। কেননা, মেনে নিলাম গোনাহ অবস্থায় রোযা সহীহ হয়ে যায় কিন্তু যখন তার বরকত হাসিল হলো না তখন তা কীসের রোযা হলো?

 

রোযা অবস্থায় গোনাহ বর্জন অত্যধিক জরুরি

আমি এখন আর এ আলোচনা দীর্ঘ করতে চাচ্ছি না। তো কোনো মুসলমান এমন নেই যে জানে না যে গোনাহ খারাপ ও গর্হিত। সবাই জানে গোনাহ খারাপ। অন্তত এক মাসের জন্য গোনাহ ছেড়ে দিন। তবে এর অর্থ এই নয়, এরপর গোনাহ করার অবকাশ আছে; বরং এতে একটি হেকমত আছে। হেকমত এই—শুরুতেই নফসের কাছ থেকে এত দীর্ঘ ওয়াদা গ্রহণ করা যে, সারা জীবনের জন্য গোনাহ ছেড়ে দিতে হবে, খুব কঠিন কাজ। হঁ্যা, অল্প সময়ের জন্য তার কাছ থেকে ওয়াদা নেওয়া যেতে পারে। তাই আমি বলেছি, অন্তত এক মাসের জন্য গোনাহ না করার অঙ্গীকার করে নাও। তারপর পুনরায় এক মাসের ওয়াদা নিয়ে নেবে। এরপর পুনরায় এমনটাই করে নেবে। এতে বিষয়টা সহজ হয়ে যায় এবং সব সময় একে নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়ে যায়। কোনো কোনো বুযুর্গ নিজ নফসকে এভাবে এক ঘণ্টার, দুই ঘণ্টার ওয়াদা নিয়ে নিয়ে ভুলিয়ে রেখে যিকিরে লিপ্ত করে রেখেছেন।

 

নফসের স্বভাব এবং তাকে বশীভূত করে রাখার কৌশল

এতে এই রহস্য নিহিত—নফস যতটা দুষ্ট ততটাই ভুলাভালা। একে শয়তান দুষ্ট বানিয়ে রেখেছে। কিন্তু বুযুর্গদের কাছে শয়তানও একেবারে বোকা ও নিরুপায় হয়ে যায়। তার কুবুদ্ধিও প্রমাদ গুণতে থাকে।

হযরত ইমাম আবু হানিফা রহ. এর কাছে এক লোক এলো। চেহারায় ভীষণ অস্থিরতা ও পেরেশানীর ছাপ। সে আরজ করল, হযরত আমার ধনভান্ডার এক জায়গায় দাফন করে রেখেছিলাম, কিন্তু এখন মনে পড়ছে না কোথায় দাফন করেছিলাম।

হযরত ইমাম সাহেব পরামর্শ দিলেন, ঘরে গিয়ে লাগাতার নফল পড়তে থাকো। আর পাকা সংকল্প করে নাও, যতক্ষণ পর্যন্ত ধনভান্ডার গচ্ছিত রাখার জায়গা মনে না পড়বে ততক্ষণ নফল পড়তেই থাকব। ইনশাআল্লাহ তোমার সম্পদ পেয়ে যাবে।

ইমাম সাহেব চিন্তা করে দেখলেন শয়তান তাকে বিষয়টি ভুলিয়ে রেখেছে। এ যখন নফল পড়তে শুরু করবে তখন তার নামায দেখে শয়তান ভীষণ বিচলিত হয়ে পড়বে, বেশিক্ষণ তাকে নামাযরত থাকতে দিবে না। ফলে তৎক্ষণাৎ তাকে স্মরণ করিয়ে দেবে। অবশেষে দেখা গেল এমনটাই ঘটেছে।

তো বুযুর্গদের কাছে তার বুদ্ধিও প্রমাদ গুণতে শুরু করে। অবশ্য আমাদের মতো সাধারণদের ওপর তার খুব দাপট চলে কিন্তু তারপরও কখনো কখনো সে—ও ধেঁাকায় পড়ে যায়। তবে নফস খুব বেশি ধেঁাকার শিকার হয়ে যায়। কেননা, প্রত্যেকের নফস পৃথক ও স্বতন্ত্র এবং অল্পবয়সি—যেন তা বাচ্চা। তাই দুষ্টুও, ভুলাভালাও। কেননা বাচ্চাদের মধ্যেও এ দুটি অভ্যাস থাকে।

এ প্রসঙ্গে দুষ্ট ছেলেদের একটি ঘটনা মনে পড়ল। একবার মক্তবের উস্তাদজীর কাছে বাতাশা হাদিয়া এলো। তিনি চিন্তা করলেন, খোলা রাখলে ছেলেরা সাবার করে ফেলবে। তাই সেগুলো বদনায় ঢুকিয়ে তার মুখ আটার খামিরা দিয়ে বন্ধ করে দিলেন। উস্তাদজী যখন কোনো কাজে বাইরে গেলেন তখন ছেলেরা পরামর্শ করে বদনার নালীতে পানি ভরে দিল, ফলে বাতাশা শরবত হয়ে গেল। আর তারা খুব মজা করে পান করে নিল।

মোটকথা, নফস ভুলাভালাও—ভুলিয়ে ফুসলিয়ে যে—কোনো কাজ তার কাছ থেকে নিতে পারেন। তাই জনৈক বুযুর্গ নফসের সঙ্গে এই চুক্তি করে নিয়েছিলেন, এক ঘণ্টা যিকির করে নাও, এক ঘণ্টা শেষ হওয়ার পর আরও এক ঘণ্টার চুক্তি করতেন। এভাবে দীর্ঘ সময় যিকিরে মগ্ন থাকতেন। আরেক বুযুর্গের ঘটনা, মিষ্টি তার খুব প্রিয় ছিল, তো তিনি নফসকে বলতেন, দশ রাকাত নামায পড় তাহলে মিষ্টি খাওয়াব। দশ রাকাত পড়ার পর মিষ্টিমুখ করিয়ে দিতেন।

আমাদের হযরত হাজী সাহেব রহ. বলতেন, নফসকে খুব পানাহার করাও, তারপর তার থেকে ভালো করে কাজ নাও—কেননা

کہ مزدور خوش دل کند کا ربيش

খোশ দিল শ্রমিক হয় কর্মমুখর।

আল্লাহর কসম, হযরতের বাতানো এই হেকমত স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার মতো। হযরতের এসব হেকমতপূর্ণ কথা নজরে পড়লে বোঝা যায় তিনি বড় কামেল শায়েখ ছিলেন। কেননা, বাস্তবেই আমাদের অবস্থা এমন, যদি নফসকে কিছু দিতে থাকি তাহলে খুশি খুশি কাজ করতে থাকবে, অন্যথায় নয়। হঁ্যা, এত বেশিও দেওয়া যাবে না যাতে দুষ্ট হয়ে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। মোটকথা, এত কমিয়ে দিয়ো না যাতে দুর্বল হয়ে কর্মে অক্ষম হয়ে পড়ে আর এত বেশিও দিয়ো না যে একেবারে দুষ্টের একশেষে পরিণত হয়।

আমাদের সকল হযরতের এই তরীকাই ছিল, যেন সহজে কাজ হয়ে যায়। বিনা প্রয়োজনে কষ্ট করা পছন্দ করতেন না। হযরত মাওলানা গাঙ্গুহী রহ.—কে একজন প্রশ্ন করল, হযরত যিকিরে বসলে খুব ঘুম আসে, কী করা যায়?

তিনি উত্তর দিলেন, মাথার নিচে বালিশ দিয়ে ঘুমিয়ে পড়বে। যখন ঘুম পূর্ণ হয়ে যাবে তখন উঠে পুনরায় নতুন উদ্যমে কাজে লেগে যাবে।

আল্লাহু আকবার, আমাদের হযরতদের তরীকা কত সহজ। আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো, সহজতা সত্ত্বেও উদ্দেশ্য সাধনেও খুবই কার্যকর। এটা শুধু এই সুবাদে যে, তাঁদের সিলসিলা পুরোপুরি সুন্নত মুতাবেক। তাঁরা সুন্নত মুতাবেক চলতে সর্বোচ্চ পর্যায়ের চেষ্টা করতেন। এজন্যই এই সিলসিলায় সামান্য মনোযোগ ও মেহনতেই প্রভূত সাফল্য লাভ হয়ে থাকে। এর রহস্য হলো এই, হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ পাকের বিশেষ প্রিয়ভাজন। আর বলাবাহুল্য, প্রিয়জনের প্রতিটি আদা ও আন্দাজ প্রিয় হয়ে থাকে। তো যে এসব আদা ও আন্দাজ অবলম্বন করবে সে—ও প্রিয় পাত্রে পরিণত হয়ে যাবে। যদিও তা ওই পর্যায়ের এবং ওই স্তরের না হোক। কিন্তু নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর খাস গোলামদের অন্তভুর্ক্ত হয়ে অবশ্যই আল্লাহ পাকের প্রিয়তমে পরিণত হয়ে যাবে। তো আমাদের হযরতগণও যেহেতু প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তরীকার ওপর চলেন আর তাদের সিলসিলা পুরোপুরি সুন্নত মুতাবেক তাই সহজ হওয়া সত্ত্বেও (এ তরীকায়) সাফল্য খুব দ্রুত অর্জিত হয়। তো এ সকল মহান বুযুর্গ, যাদের উদ্ধৃতিতে বিভিন্ন ঘটনা আলোচনা করা হলো, তাঁদের অভ্যাস দ্বারাও এ কথাই প্রতীয়মান হয় যে, তারা নফসকে মাত্রাতিরিক্ত চাপে রাখতেন না। হ্যাঁ, গোনাহ থেকে কঠোরভাবে ফিরিয়ে রাখতেন।

 

নফসের সাথে মাত্রাতিরিক্ত নম্রতা ও কঠোরতা উভয়ই ক্ষতিকর

বর্তমানে কিছু মানুষ নফসের সঙ্গে এতটা ন¤্রতা প্রদর্শন করে যে, তাকে গোনাহ থেকেও বিরত রাখে না। কিছু মানুষ এতটাই কঠোরতা করে যে, জায়েয কাজও করতে দেয় না। অথচ পরিণাম উভয়টারই মারাত্মক।

 

রমযান মাসে তাকওয়া অবলম্বনের বরকত

তো নফসকে এ কথা বলে দিন, অন্তত রমযান মাসে কোনো গোনাহ করো না। আর তার কাছ থেকে অন্তত এক মাসের প্রতিশ্রম্নতি নিন। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, যদি রমযান মাস তাকওয়ার ওপর অতিবাহিত হয়ে যায় তারপর এই তাকওয়া ইনশাআল্লাহ আর সহজে ছুটবে না।

জনৈক বুযুর্গ বলেন, রমযান যে অবস্থায় কাটে বাকি এগারো মাসও সহজেই ওই অবস্থাতেই কেটে যায়। সহজে কেটে যাওয়ার কথা এজন্য বললাম যাতে আপনারা এ কথা বলতে না পারেন, বাকি এগারো মাস গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা আমাদের ইচ্ছা ও চেষ্টাধীন কাজ। যদি আমরা ইচ্ছা ও চেষ্টা করি তাহলে গোনাহমুক্ত থাকতে পারি, এতে রমযান মাসের কৃতিত্ব কীসের?

সুধীবৃন্দ, পার্থক্য এই—এমনিতে গোনাহ থেকে আত্মরক্ষা করতে কষ্ট করতে হতো, রমযান মাসের বরকতে সহজে আত্মরক্ষা করতে পারবেন। আর আত্মরক্ষার ইচ্ছা ও চেষ্টা তো সর্বাবস্থায়ই করতে হবে।

মোটকথা, এর খাতিরে সব ধরনের গোনাহ ছেড়ে দিন। যবানের গোনাহ যেমন গালি—গালাজ ও গীবত—শেকায়েত করা, কোনো অবৈধ বিষয় পড়া, মিথ্যা বলা। কানের গোনাহ যেমন গীবত শোনা, গান শোনা। চোখের গোনাহ যেমন পরনারীর প্রতি কুদৃষ্টি দেওয়া, সুশ্রী বালকদের দেখা। হাতের গোনাহ যেমন অন্যায়ভাবে কাউকে মারধর করা, সুদী লেনদেন লেখা কিংবা কোনো অবৈধ বিষয় লেখা ইত্যাদি। তদ্রƒপ পায়ের গোনাহ যেমন নাচ—গানের আসরে যাওয়া, মিথ্যা মামলার পেছনে ছোটাছুটি করা ইত্যাদি সব গোনাহ বর্জন করুন।

 

বিশেষত রমযান মাসে পেটকে হারাম খাদ্য থেকে রক্ষা করা অবশ্যকর্তব্য

আর সবচেয়ে বড় একটি গোনাহ হলো এই এবং এটা অতি অবশ্যই বর্জন করা উচিত, পেটের গোনাহ অর্থাৎ হারাম খাদ্য দিয়ে পেটপূর্তি করা। এটা বর্জন না করা হলে অন্যান্য গোনাহ বর্জন করা অত্যন্ত কঠিন হবে। কেননা পেট পুরো দেহের হাউজ। সুতরাং তাতে যদি গান্দা পানি থাকে তাহলে সকল নালিতে গান্দা পানিই প্রবাহিত হবে। এ কথা মানুষের দেহ ও আত্মা উভয় ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। অর্থাৎ অধিকাংশ শারীরিক রোগের উৎস পেট, তদ্রƒপ সকল আত্মিক রোগের উৎসও পেট। শারীরিক রোগের চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে যেমন পেটের চিকিৎসা করিয়ে থাকেন তদ্রƒপ আত্মার রোগের চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে হারাম খাদ্য ছেড়ে দিন।

এক হলো আত্মিক সুস্থতা আরেক হলো শারীরিক সুস্থতা। শারীরিক সুস্থতা লাভের তরীকা হলো, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খাওয়া আর তা—ই সারা দেহে পুষ্টি জোগাবে। আত্মিক সুস্থতা হলো হালাল খাদ্য। হালাল খাদ্য খেলে সকল অঙ্গের নেক কাজের তাওফীক হয়। হারাম খাদ্য গ্রহণ করলে সকল অঙ্গে গোনাহের প্রবণতা দেখা দেয়।

তো রমযান মাসে অবশ্যই অন্তত এটুকু করুন, এ মাসে সুদ, ঘুস, লুটপাট, জবর—দখল এবং হারাম পয়সার খাবার পরিহার করুন। তবে এর অর্থ এই নয় যে, রমযানের পর এসব ভোগ করা বৈধ হয়ে যাবে। বরং রমযানব্যাপী এসব থেকে আত্মরক্ষা করতে পারলে আশা করা যায়, বাকি জীবন এসব থেকে আত্মরক্ষার তাওফীক হয়ে যাবে। আর যাদের অবস্থা এমন যে, তাদের কাছে জবর—দখলের সম্পত্তি ছাড়া অন্য কোনো সম্পত্তি নেই, তাহলে তারা অন্তত এটুকু করুক, কারও কাছ থেকে সুদবিহীন করজ গ্রহণ করে রমযান মাস অতিবাহিত করুক। তারপর ওই করজ পরদিনই আদায় করে দিক এবং যে সম্পত্তি দিয়েই করুক। তো ধার—করজ করে নেওয়া জিনিস হালাল হয়ে থাকে তা খেতে কোনো অসুবিধা নেই।

সুধীবৃন্দ, এ ধরনের মাসআলা জনসম্মুখে আলোচনাযোগ্য নয়। কারণ, এতে লোকদের অবৈধ আমদানির প্রতি দুঃসাহসী হয়ে উঠার আশঙ্কা থাকে। কিন্তু দরদ ও কল্যাণচিন্তায় কাবু হয়ে বলে ফেললাম। যাই হোক পূর্বপ্রসঙ্গে আসি। উদাহরণত কোনো অমুসলিমের কাছ থেকে পাঁচ হাজার টাকা ধার গ্রহণ করে এক মাসের খাবারসামগ্রী ক্রয় করে নিন। অথবা কোনো অমুসলিম দোকানির কাছ থেকে বাকিতে এক মাসের খাদ্যসামগ্রী নিয়ে নিন। এখানে আরেকটি মাসআলাও বুঝে নিন। খাদ্যসামগ্রী ধার নেওয়ার দুটি পদ্ধতি রয়েছে :

এক. আমি তোমাকে এই খাদ্যসামগ্রীর পরিবর্তে অন্য খাদ্যসামগ্রী দেব, যেমন এই এক মণ গমের বিনিময়ে তোমাকে দুই মণ ছোলা দেব, ধার গ্রহণের এই পদ্ধতি নাজায়েয।

দুই. যেমনটা সাধারণত বাড়ি ঘরে ধার নেওয়া হয়ে থাকে, আমাকে এক সের আটা দাও, আমার ঘরে যখন আটা আসবে তখন আমি তোমাকে দিয়ে দেব, এই পদ্ধতি জায়েয।

তো আপনি অমুসলিম মহাজনের কাছ থেকে খাদ্যসামগ্রী করজ হিসেবে নিয়ে নিন। তারপর এই করজ আপনি জবরদখল করা সম্পত্তি থেকেও আদায় করতে পারেন আর অমুসলিম মহাজনের জন্য জবরদখলে থাকা মৌরসি সম্পত্তির খাদ্যসামগ্রী নেওয়া হারাম নয়; বরং এ ধরনের আরও অনেক বিষয়ই তার জন্য হারাম নয়, কেননা কুফরের কারণে সে খোদাদ্রোহী। আর বিদ্রোহ এমন গুরুতর অপরাধ যে, তার উপস্থিতিতে এ ধরনের ছোট ছোট মামলার বিচার হয় না।

মোটকথা, অমুসলিম মহাজনকে বলুন, আমাকে ধারে কিছু খাদ্যসামগ্রী দিয়ে দাও পরে আমি আদায় করে দেব। এরপর চাই তা এক ঘণ্টার মধ্যেই আদায় করে দেওয়া হোক তাতে কোনো অসুবিধা নেই। বিনা সুদে ধার না পেলে কিছুতেই নিতে যাবেন না। তবে আল্লাহ পাকের ওপর আস্থা রাখুন, ইনশাআল্লাহ বিনা সুদে ধার পেয়ে যাবেন। তবে এক্ষেত্রে এ কথা মনে করার কোনো সুযোগ নেই, এত বড় ভালো কৌশল হাতে পেয়ে গেলাম। এখন থেকে কোনো হারাম জিনিস হাতে এসে গেলে তার বিনিময়ে এভাবে হালাল জিনিস নিয়ে নেওয়া যাবে। তো মনে রাখবেন, আমি যে তরীকা বাতলে দিলাম তার অর্থ এই নয় যে, এতে অন্য কোনো প্রকার গোনাহ নেই; বরং এতেও কয়েকটি গোনাহের সমাবেশ ঘটেছে :

এক. হারাম খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ করা।

দুই. অন্যকে হারাম জিনিস প্রদান করা।

তো কারও হাতে হারামকে হালাল বানানোর অস্ত্র তুলে দেওয়া আমার উদ্দেশ্য নয়; বরং আমার উদ্দেশ্য হলো এই পদ্ধতিতে সে অন্তত হারাম খাওয়া থেকে বেঁচে যেতে পারবে, যদিও অন্যান্য গোনাহ ঠিকই থাকবে, যা থেকে আত্মরক্ষা করা অপরিহার্য। হারাম জিনিস কাউকে দেওয়া বা খাওয়া এতটাই সঙ্গীন গোনাহ যে, তা কুকুরকে পর্যন্ত খাওয়ানো নাজায়েয।

হারাম ও অপবিত্র জিনিস পশু—পাখিকে পর্যন্ত খাওয়ানো নিষেধ

এর দ্বারা এ কথাও পরিষ্কার হয়ে গেল, অনেক মানুষ গরু—মহিষকে যে নাজায়েয জিনিস খাইয়ে দেয় কিংবা মেথরকে দিয়ে দেয় এটা নাজায়েয। অবশ্য এমন করা যায়, কোথাও রেখে দেওয়া হলো আর আপনার বলা—কওয়া ছাড়া লোভের বশবর্তী হয়ে সে নিজেই তুলো নিয়ে গেল কিংবা নিজেই খেয়ে নিল। তবে আপনাকে যদি কেউ জিজ্ঞেস করে, তুলে নেব কি না? তাহলে আপনি পরিষ্কার বলে দিন আমাকে জিজ্ঞেস করছ কেন?

ওয়াজের সারকথা, রমযানে সব ধরনের গোনাহ একেবারে ছেড়ে দিন। এরপর ইনশাআল্লাহ ওই রোযা বরকতপূর্ণ রোযা হবে। ওই রোযা আপনার জন্য সুপারিশ করবে। তা ওই রোযা হবে যার ব্যাপারে হাদীস শরীফে আল্লাহ পাক বলেছেন,

أنا أجزي به.

আমি নিজে তার বদলা দেব।

আর গোনাহ বর্জন না করলে রোযা তো হয়ে যাবে তবে এমন রোযা হবে যেমন আপনি আপনার কোনো প্রিয় বন্ধুকে বললেন, আমার একজন লোক দরকার। কথামতো সে আপনার জন্য এক লোক নিয়ে এলো, যে কানেও শোনে না, চোখেও দেখে না, ল্যাংড়া—লোলা এবং বোবাও। এই লোক লোক তো বটে কিন্তু একেবারে বেকার লোক। শুধু নিশ্বাসটুকু আছে বলেই তাকে মানুষ বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। এই লোক যেমন লোকও আর লোক না—ও, ঠিক এমন রোযা রোযাও, আবার রোযা না—ও। এই রোযা কবরস্থানে দাফন করে দেওয়ার উপযুক্ত। তাই রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই হাদীসে উৎসাহ দিচ্ছেন, রোযা অবস্থায় সব ধরনের গোনাহ পুরোপুরি বর্জন করো।

গুরুত্বপূর্ণ যেসকল বিষয় আলোচনার দরকার ছিল সেসবের আলোচনা হয়ে গেছে। তাই এখানেই আমি আমার আলোচনার ইতি টানছি। দুআ করুন আল্লাহ পাক যেন আমল করার তাওফীক দান করেন। আমীন।

[সমাপ্ত]

editor

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন x