প্রতিষ্ঠাতা: মুজাহিদে আযম হযরত মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.

জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ, ঢাকা-এর মুখপত্র

প্রতিষ্ঠাকালঃ ১৯৩৭ ঈসায়ী

তালিবে ইলম ও ওলামায়ে কেরামের সফলতার তিন শর্ত

তালিবে ইলম ও ওলামায়ে কেরামের সফলতার তিন শর্ত

সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.


[১২ জুলাই, ১৯৭৮ ঈসায়ি জামিয়া দারুল উলুম করাচীতে ওলামায়ে কেরাম, দারুল উলূমের ছাত্র-শিক্ষকগণের সামনে হযরত মাওলানা সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. এই বক্তব্য পেশ করেছেন। দারুল উলূম করাচীর প্রতিষ্ঠাতা হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহ.-এর সুযোগ্য সন্তান, ইসলামী নযরিয়াতী কাউন্সিলের সদস্য, মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ তকী উসমানী দা. বা. বক্তব্যের পূর্বে হযরত নদভী রহ.-এর পরিচয় তুলে ধরেন।]

 

মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহ. এবং পাকিস্তানের বড় বড় ওলামায়ে কেরামের স্মৃতিচারণ

উপস্থিত দারুল উলূমের শিক্ষক ও প্রিয় ছাত্রবৃন্দ,

এ যুগে যে সকল ওলামায়ে কেরাম বিস্তৃত ও গভীর ইলমের অধিকারী হওয়ার বিষয়টি আমি বিশ্বাস করি ও স্বীকার করি, তন্মধ্যে দারুল উলূমের প্রতিষ্ঠাতা হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহ. অন্যতম। জ্ঞানের গভীরতা, ফিকহ ও ফাতাওয়ার ময়দানে বিস্তৃত ও সূ²দৃষ্টি, অধ্যাপনায় দক্ষতা ইত্যাদি একজন মানুষের মহামূল্যবান ও মর্যাদাশীল বৈশিষ্ট্য। তবে আরেকটি বিশেষ গুণ রয়েছে, যার ভিত্তিতে কোনো ফকীহ বা মুফতীকে ‘ফকীহুন নফস’ বলা হয়। সমকালীন ওলামায়ে কেরামের মধ্যে মুফতী সাহেব রহ. এই গুণের অধিকারী ছিলেন। তিনি আমার ওস্তাদগণের সমবয়সি এবং তাঁদের সারির বুযুর্গ ছিলেন। আমার দুর্ভাগ্য যে, আমি সরাসরি হযরত মুফতী সাহেব রহ.-এর দরস থেকে উপকৃত হওয়ার সুযোগ পাইনি। আমি যখন দেওবন্দ গিয়েছি, মুফতী সাহেব রহ. তখন দেওবন্দে শিক্ষকতা করতেন। আমি যেহেতু শুধু দাওরার সবকে শরিক হতাম, তাই তাঁর ছাত্র হওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি।

দীর্ঘ বাইশ বছর পর আমি এই ভূমিতে পা রেখেছি। ১৯৫৬ সালে এক সফর থেকে ফেরার সময় দুই-তিনদিনের জন্য করাচীতে অবস্থান করেছিলাম। আল্লাহ তাআলার শোকর আদায় করছি, আজ তিনি আকাবিরের পুণ্যভূমি, দারুল উলূম করাচী পৌঁছে দিয়েছেন।

পাকিস্তানে হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মাদ শফী রহ., মাওলানা যফর আহমদ উসমানী রহ., মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ বিন্নূরী রহ.-এর মতো জ্ঞানী ও দ্বীনের ওপর অবিচল ওলামায়ে কেরামের আজ অনেক প্রয়োজন ছিল। বাস্তব সত্য হলো, বর্তমান পরিস্থিতি ও সমস্যাগুলো এমন জটিল যে, এ দেশে এখন হুজ্জাতুল ইসলাম ইমাম গাযালী রহ., শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. ও হাকীমুল ইসলাম শাহ ওয়ালীউল্লাহ রহ. এর প্রয়োজন ছিল। তাঁদের মতো না হোক, অন্তত এই সকল মনীষীগণের মতো মানুষ থাকত, যাদের নাম আমি উল্লেখ করেছি। আফসোস, এই মুহূর্তে তাঁরাও আমাদের মাঝে নেই।

 

যুগের পরিবর্তনের অভিযোগ

প্রিয় তালিবুল ইলম, যেহেতু আমি দারুল উলূমে বয়ান করছি, তাই এখানে ইলম সম্পর্কে কিছু কথা বলব। ছাত্র-শিক্ষকদের ভবিষ্যৎ, তাদের দায়িত্ব-কর্তব্য, সময়ের সংবেদনশীলতা এবং সমকালীন ফিতনা সম্পর্কে কিছু কথা বলব। ‘জমানা পরিবর্তন হয়ে গেছে’, ‘দুনিয়া বদলে গেছে’, ‘আসমান-জমিন বদলে গেছে’, ‘চিন্তার ধরন পাল্টে গেছে’, ‘এই যুগে দ্বীনি ইলম অর্জনে জীবন ব্যয় করা, তাতে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখা, তার সূ² বিষয়গুলো ও শাখা-প্রশাখাতে যাওয়া, মূলত অসময়ে সানাই বাজানো আর নিস্ফল কাজে সময় নষ্ট করা ছাড়া আর কী’—ইত্যাদি স্লোগান আপনারাও হয়তো বারবার শোনেছেন।

জমানা পরিবর্তনের অভিযোগ কেবল এই যুগে নয়, সব যুগেই ছিল। যেকোনো যুগের সাহিত্য বা কাব্যশাস্ত্র অথবা ইতিহাস আপনি অধ্যয়ন করুন। সবখানে দেখবেন, সবাই একই বিলাপ করে গেছে। সবাই বলেছে, এই যুগ খুব খারাপ যুগ। এই যুগে ইলমের কোনো মূল্য নেই। যোগ্য লোকদের কোনো মূল্যায়ন নেই। অযোগ্যতা আর অযোগ্যদের দাপট চলছে। আরবী কাব্যশাস্ত্র ও সাহিত্য দেখুন, আবুল আ’লা মাআ’ররীকে দেখবেন, তিনি বলছেন,

تطاولتِ الأرض السَّماء سفاهةً        وفاخرت الشُّهب الحصى والجنادل

وقال السُّهى للشمس أنت ضئيلةٌ       وقال الدُّجى للصُّبح لونك حائل

إذا وصف الطّائي بالبخل مادرٌ                  وعيّر قساً بالفهاهة باقلُ

ভ‚পৃষ্ঠের নির্বুদ্ধিতা দেখো, সে আকাশের নাগাল পেতে চায়।

পাথর, কংকর নক্ষত্রের সঙ্গে গর্ব করে।

সূর্যকে সুহা (সপ্তর্ষিমণ্ডলের অনুজ্জ্বল তারকা) বলে, তুমি ম্লান হয়ে গেছ।

প্রভাতকে অন্ধকার বলে, তোমার উজ্জ্বলতা শেষ হয়ে গেছে।

কোনো মাদের (কার্পণ্যে উপমাতুল্য ব্যক্তি) যখন (হাতেম) তাঈকে বলে কৃপণ,

আর কোনো বাকেল (নির্বুদ্ধিতায় উপমাতুল্য ব্যক্তি) যখন কুছকে (কুছ ইবনে সায়িদা, আরবের শ্রেষ্ঠ খতীব) নির্বোধ বলে খোঁটা দেয় (তখন এই দুঃখ রাখি কোথায়)।

কবিতার শেষে বলেছেন,

فياموت زُر أن الحياة ذميمةٌ

  ويا نفس جدّي أن دهرك هازل

হে মৃত্যু, তোমার আগমনই ভালো। কেননা, জীবনের কোনো স্বাদ আর বাকি নেই।

হে নফস, তুমি গাম্ভীর্যের পথে চলো। তোমার যুগ তোমার সঙ্গে কৌতুক করছে।

অপরদিকে হাফেয শিরাযী এভাবে অভিযোগ করেছেন,

ایں چہ شورمیت کہ درد ور قمری بینم

  ہمہ آفاق پر از فتنہ و شرمی بینم

এ কেমন হাঙ্গামা, চাঁদের যুগেও আমি গোটা বিশ্বজগৎ ফিতনা-ফ্যাসাদে নিমজ্জিত দেখতে পাচ্ছি।

তারপর যুগ ও যুগের অধিবাসীদের দীনতা ও অবমূল্যায়নের চিত্র এভাবে এঁকেছেন,

اسپ تازی شدہ مجروح بزیر پالاں

طوق زریں ہمہ در گردن خرمی بینم

গাধার জিনের আঘাতে আরবের উন্নত ঘোড়া ক্ষতবিক্ষত।

আর গাধার গলায় আজ সোনার হার দেখতে পাচ্ছি।

উর্দু কবিতায় দেখুন, আবে হায়াত ও অন্যান্য তাযকিরাতে (জীবন-চরিত) বিশৃঙ্খল শহরের আলোচনা পাবেন। সেসব কবিতাসমগ্রে কবিরা তাদের সময়, নিজের দেশের দুরবস্থা তুলে ধরেছেন। উপার্জন কমে যাওয়ায় তারা অশ্রু প্রবাহিত করেছেন। এ ক্ষেত্রে উস্তাদ ‘যওক’ এর একটি কবিতাই যথেষ্ট। তিনি বলেছেন,

پھرتے ہیں اہل کمال آشفتہ حال افسوس ہے

اے کمال افسوس ہے تجھ پر افسوس ہے

আফসোস, যোগ্য ব্যক্তিগণ আজ পথে পথে ঘুরে বেড়ায়।

হে যোগ্যতা, আফসোস, তোমার জন্য আফসোস।

এ মুহূর্তে এ কবিতাগুলোই মনে পড়েছে। অন্যথায় এমন কবিতা, যুগের প্রতি অভিযোগে কাব্যসমগ্র ভরে আছে। যেকোনো গ্রন্থ দেখবেন, যুগের জন্য মাতম ও বিলাপ করতে দেখবেন। গ্রন্থগুলো অভিযোগে ভরপুর। ‘নিজের কাব্যযোগ্যতা কার সামনে পেশ করবে? চেনার মতো লোক কোথায়? আহলে নযর কোথায়? এই যুগ অযোগ্যতার যুগ। এটি অকর্মণ্যতার যুগ। যোগ্য ব্যক্তিগণ কার জন্য পরিশ্রম করবে? কার জন্য নিজের রক্ত পানি করবে? কার জন্য কলিজার রক্ত ঝরাবে?’ এই কথাগুলো বিশ্বাস করলে মাদরাসায় আপনার মন টিকবে না। পড়তে মন চাইবে না। পরিশ্রম করতে ভালো লাগবে না।

 

আল্লাহ তাআলার নীতি অপরিবর্তনীয়

আমি আপনাদের বলতে চাচ্ছি, যুগের পরিবর্তন একটি অনস্বীকার্য বাস্তবতা। কেউ তা অস্বীকার করতে পারবে না। একশ বছর পূর্বের সময়টি দেখুন, কেমন কল্যাণ ও বরকতের সময় ছিল। সে যুগের বিশিষ্টজনের কথা বাদ দিন, সাধারণ মানুষও এই যুগের বিশিষ্টজন থেকে উত্তম ছিল। কত দৃঢ় ঈমানের অধিকারী ছিল। কেমন দ্বীনি আত্মমর্যাদাবোধ ছিল। দ্বীনি জ্ঞানচর্চা, কোরআন মাজীদ হিফয ইত্যাদি, পুরুষদের মধ্যে তো ছিলই, নারীদের মধ্যেও ব্যাপক ছিল।

বর্তমানে উদাসীনতা ও বস্তুবাদের যুগ। দ্বীন ও দ্বীনি ইলমের প্রতি উদ্বুদ্ধকারী বিষয়গুলো অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছে। এ সবকিছু মেনে নিয়েও আমি আপনাদেরকে বলতে চাই, পূর্বের এসব পরিবর্তন, বর্তমানের সকল বিবর্তন এবং ভবিষ্যতে যত বিপ্লব আসবে,  তা আল্লাহ তাআলা ছাড়া কেউ জানে না, তা সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলার নীতি অলঙ্ঘনীয়। এসব বিপ্লব, পরিবর্তন এই নীতিতে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। কোরআন মাজীদে এই অলঙ্ঘনীয় নীতি ঘোষণা করা হয়েছে। বিষয়টি জোরালো করতে কোরআনের সাধারণ নীতির বিপরীতে একই আয়াতে বিষয়টি পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

فَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّتِ اللهِ تَبْدِیْلًا  ۬ۚ وَلَنْ تَجِدَ لِسُنَّتِ اللهِ تَحْوِیْلًا.

আপনি আল্লাহর নীতিতে কোনো পরিবর্তন পাবেন না। আল্লাহর নীতিতে কোনো বিচ্যুতি পাবেন না।-সূরা ফাতির (৩৫) : ৪৩

আল্লাহ তাআলা স্বীয় কুদরতে কামেলা ও পূর্ণ প্রজ্ঞার ভিত্তিতে সৃষ্টিজগতে মানবসভ্যতার জন্য যে নীতিমালা প্রণয়ন করেছেন, কিয়ামত পর্যন্ত তাতে কোনো পরিবর্তন আসবে না। কোরআন-সুন্নাহ অধ্যয়ন করলে জানা যাবে সে নীতিমালা। এই নীতিমালার ফিরিস্তি অনেক দীর্ঘ। আমার মতো তালিবে ইলমের জন্য তা সংকলন করা সম্ভব নয়। এত দীর্ঘ সময়ও এখন নেই। কিন্তু আমি আমার জ্ঞানের স্বল্পতা সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলার এই সুনানে কাওনিয়্যাহ বা জাগতিক বিধান ও রীতিগুলোর তিনটি রীতি আলোচনা করব, যেগুলোর সঙ্গে আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য এবং আমাদের মাদরাসার ও উদ্দেশ্যের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে।

 

উপকারী ও কল্যাণকর বিষয়ের মূল্যায়ন ও স্বীকৃতি

আল্লাহ তাআলার একটি নীতি হলো, উপকারী ও কল্যাণকর যেকোনো কিছুর সামনে মানুষ নত হয়। যেকোনো কল্যাণকর বস্তুকে মানুষ মূল্যায়ন করে এবং স্বীকার করে। কল্যাণকর বস্তু, তার অবস্থান ও কেন্দ্রের সঙ্গে মানুষের ভালোবাসা তৈরি হয়। মানুষ উপকারী বস্তু খোঁজে বের করে। উপকারী বস্তু পেয়ে গেলে মূল্যায়ন করে। এটি মানবপ্রকৃতির অন্তর্ভুক্ত। উপকারী বস্তুকে টিকিয়ে রাখা, তাকে জীবন্ত ও সজীব রাখার দায়িত্ব আল্লাহ তাআলা নিয়েছেন। যার মধ্যে কোনো কল্যাণ নেই তার স্থায়িত্বের গ্যারান্টি ও নিশ্চয়তা নেই। সূরা রা’দে আল্লাহ তাআলা স্পষ্টভাবে বলেছেন,

فَاَمَّا الزَّبَدُ فَیَذْهَبُ جُفَآءً  ۚ وَاَمَّا مَا یَنْفَعُ النَّاسَ فَیَمْكُثُ فِی الْاَرْضِ کَذٰلِکَ یَضْرِبُ اللهُ  الْاَمْثَالَ.

ফেনা তো শুকিয়ে নিঃশেষ হয়ে যায়। যা মানুষের উপকারে আসে (পানি) তা জমিনে অবশিষ্ট থাকে। এভাবে আল্লাহ (ভালো-মন্দের) উপমা পেশ করেন (যেন তোমরা বুঝতে পারো)।-সুরা রা’দ, ১৩ : ১৭

‘যোগ্যতম’ নয়, বরং কোরআনের ভাষায় ‘উপকারী বস্তু ও বিষয়ের’ ক্ষেত্রে এই নীতি হাজার-লক্ষ বছর থেকে চলছে। হাজারো পরিবর্তন, অসংখ্য বিপ্লব সত্ত্বেও তা চলমান থাকবে। যা উপকারে আসে তা-ই স্থায়িত্ব লাভ করে। প্রতিটি কল্যাণকর বস্তু বহাল থাকে। যার মধ্যে কল্যাণ আছে সে নিজের মূল্য ও গুরুত্ব ফুটিয়ে তুলতে পারে। এটাই ভাগ্যলিপি। কল্যাণকর হওয়া হাজারও বিরোধ থেকে নিরাপদ থাকার উপায়। তার জন্য প্রচার-প্রচারণার প্রয়োজন নেই। কল্যাণকর বস্তু সহজাতভাবে সবার প্রিয় হয়ে ওঠে। ধর্ম-বর্ণ-দেশ-জাতি নির্বিশেষে সবার মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। যোগ্য ব্যক্তি যদি পাহাড়-চূড়ায় গিয়ে অবস্থান করেন, বিশ্ববাসী তাঁর খোঁজে সেখানেও পৌঁছে যাবে। তাকে মাথায় তুলে, হাতে হাতে, বরং চোখের মণিকোঠায় জায়গা দিয়ে নিয়ে আসবে। মানবসভ্যতার জন্য এটাই আল্লাহ তাআলার নীতি। হাজারও-লাখো বছর ধরে এই নীতি চলমান।

 

উপকারীর অনুসন্ধান

প্রিয় তালিবুল ইলম, আপনারা নিজের মধ্যে উপকারী হওয়ার গুণ সৃষ্টি করতে সচেষ্ট হোন। অন্ধকারের পথিক যেন আপনার কাছ থেকে আলো পায়। আপনার সাহায্যে যেন জ্ঞানের কঠিন বিষয়গুলোর সমাধান হয়। আপনার সান্নিধ্যে বসে যেন ঈমান শক্তিশালী হয়। আপনার কাছে গিয়ে মানুষ যেন কিছু নিয়ে আসতে পারে।

এই গুণ সৃষ্টি হওয়ার পর আপনি যদি আপনার ও অন্যদের মধ্যে দেয়াল তুলে দেন কিংবা ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে থাকেন, আর মানুষ জানতে পারে যে, এখানে একজন উপকারী ব্যক্তিত্ব আছেন, তার থেকে এই ধরনের উপকার গ্রহণ করা যায় (আত্মার ফায়েদা ও ঈমানের ফায়েদা তো অনেক বড় বিষয়), তাহলে মানুষ আপনার দেয়াল টপকে, দরজা ভেঙে, আপনার কাছে ছুটে আসবে।

এই মুহূর্তে হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ ইয়াকুব মুজাদ্দেদী ভ‚পালী রহ.-এর একটি ঘটনা আমার মনে পড়েছে। জটিল জটিল বিষয়ও সহজ ও সাধারণ উপমা দিয়ে বোঝানোর যোগ্যতা ও প্রজ্ঞা আল্লাহ তাআলা তাঁকে দান করেছিলেন।

একবার নবাব কোরওয়ায়ী তাঁর কাছে অভিযোগ করলেন, হযরত, আমি অনেক আগ্রহ নিয়ে একটি মসজিদ নির্মাণ করেছি। তাতে অনেক টাকা খরচ করেছি। কিন্তু সেখানে কেউ নামায পড়তে আসে না।

হযরতের বোঝানোর ধরন বড় চমৎকার ছিল। কখনো কখনো তা শ্রোতাদের জন্য পরীক্ষা হয়ে যেত। তিনি বললেন, নবাব সাহেব, আপনি এর দরজা বন্ধ করে দিন। একেবারে সিলগালা করে দিন।

নবাব সাহেব খুবই অবাক হলেন। কী ব্যাপার, হযরত তো উল্টা চিকিৎসা দিচ্ছেন। হযরত, আমি তো এই জন্য মসজিদ নির্মাণ করেছি যে, তাতে মানুষ আসবে, নামায পড়বে। এতে মসজিদ আবাদ থাকবে। আপনি বলছেন মসজিদের দরজা বন্ধ করে দিতে।

হযরত বললেন, আমার কথা এখনো শেষ হয়নি। আপনি মসজিদের দরজা বন্ধ করে দিয়ে ভেতরে একজন লোক বসিয়ে দিন। তার হাতে পঞ্চাশ টাকা বা পাঁচ-দশ টাকার কতগুলো নোট দিয়ে দিন। তারপর বাইরে ঘোষণা দিন, এই মসজিদে টাকা দেওয়া হচ্ছে।

আপনি মসজিদ নির্মাণ করেছেন। কিন্তু নামাযের সওয়াব ও ফায়েদা তো মানুষ জানে না। তাহলে তারা মসজিদে কেন আসবে? অন্যদিকে তারা টাকার মূল্য বোঝে। তারা জানে, পাঁচ টাকার নোট দিয়ে কী কেনা যায়? এ দিয়ে কী কী কাজ করা যায়? তারা জানে না, নামাযের দ্বারা কী কী কেনা যায়? এর দ্বারা কী কী ফায়েদা অর্জন করা যায়? অথচ আপনি আশা করছেন, তারা যেন গরমে ও শীতে কষ্ট করে এখানে আসে। নিজেকে কষ্ট দিয়ে তারা যেন দূর-দূরান্ত থেকে এখানে আসে। কাউকে টাকা বণ্টনের জন্য বসিয়ে দেওয়ার পর ঘোষণা করারও প্রয়োজন নেই। কিছুক্ষণের মধ্যে এমনিতেই এ কথা ছড়িয়ে পড়বে যে, আল্লাহ জানেন, নবাব সাহেব, কেন জানি এমন কাজ করলেন, মসজিদ বন্ধ করে দিয়েছেন, আর ভেতরে এক লোক বসে হাজার টাকার নোট বিতরণ করছে। ফলে দরজা ভেঙে তারা মসজিদে প্রবেশ করবে। হাজার বললেও কেউ বাধা মানবে না।

বলছিলাম, উপকারী হওয়াটাই মূল বিষয়। উপকারীর পাশে মানুষ পতঙ্গের মতো ভিড় করবে। পতঙ্গকে বলতে হয় না, ওখানে মোমবাতি জ্বলছে। কে এই ঘোষণা করে, হে পতঙ্গ, এখানে বাতি জ্বলছে, এখানে ভিড় করো। পতঙ্গ ও বাতির মধ্যে কী সম্পর্ক? যেখানে পানি থাকে, সেখানেই কীট-পতঙ্গ, মানুষ, চতুষ্পদ জন্তু ভিড় করে। যুগ পরিবর্তনের অভিযোগ মূলত অজ্ঞতা, অদূরদর্শিতা ও কম হিম্মতের প্রমাণ।

 

কল্যাণকর হওয়ার মধ্যে আছে বশীভূত করার অপার ক্ষমতা

আপনাদেরকে একটা মজার ঘটনা শোনাব। আমাদের লখনৌ শহরে একজন বিজ্ঞ মুসলিম ডাক্তার ছিলেন। তার নাম ছিল আব্দুল হামীদ রহ.। তাঁর দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও নিপুণতা হিন্দু-মুসলিম সবার মাঝে স্বীকৃত ছিল। তিনি আমাকে ঘটনাটি শুনিয়েছেন। তিনি বলেন, বারাবাংকী এলাকার একজন অমুসলিম ধনী ব্যবসায়ী দেশভাগের পর আমাকে খোঁচা মেরে বলল, ডাক্তার সাহেব, আপনি পাকিস্তান গেলেন না?

তিনি বললেন, জি না, আমি হিন্দুস্তানে থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

আল্লাহ তাআলার ইচ্ছায়, একদিন ওই ব্যবসায়ী কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ল। সব ধরনের চিকিৎসা সে করালো। বড় বড় ডাক্তারদের ডেকেও কোনো লাভ হলো না। সবখানে নিরাশ হয়ে অবশেষে এই ডাক্তার সাহেবকে ডাকল। ডাক্তার সাহেব তার চিকিৎসা শুরু করলেন। একপর্যায়ে বললেন, দেখুন, আমি যদি পাকিস্তান চলে যেতাম তাহলে আপনি আমাকে কীভাবে পেতেন? আমি আপনার চিকিৎসা কীভাবে করতাম? আল্লাহর ইচ্ছায় এই ডাক্তারের চিকিৎসায় সে সুস্থ হলো এবং পূর্বের কথার জন্য লজ্জিত হলো।

প্রিয় তালিবুল, আমার দৃষ্টিতে আপনাদের হাজার সমস্যার সমাধান হলো, আপনারা যুগের কাছে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করুন। যুগের কাছ থেকে স্বীকৃতি আদায় করে নিন যে, আপনার কাছে যে জ্ঞান আছে, দুনিয়াবাসীর এর প্রয়োজন রয়েছে। দুনিয়াতে নিয়ম হলো, যেখানে পণ্য পওয়া যায় মানুষ সেখানে কিনতে যায়। একজন জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তিও অপর জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তির কাছে যান, যাঁর কাছে তিনি নিজের কাক্সিক্ষত বস্তু, নিজের রোগের চিকিৎসা পান।

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. তাঁর যুগের ইমাম ছিলেন। বাগদাদে তিনি সকলের মধ্যমণি ছিলেন। কিন্তু নিজের অন্তরের খোরাক ও আত্মিক শক্তির জন্য শহরের এক আধ্যাত্মিক বুযুর্গের কাছে যেতেন, জ্ঞানের বিবেচনায় যিনি অতি সাধারণ ছিলেন। একবার ইমাম আহমাদ রহ.-এর ছেলে তাঁকে বললেন, আব্বাজান, আপনি ওখানে যাওয়ায় দরুন আমাদের লজ্জিত হতে হয়। মানুষ কী বলবে?

তিনি বললেন, শোনো, মানুষ যেখানে নিজের উপকার পায় সেখানে ছুটে যায়। আমি সেখানে আমার অন্তরের ফায়দা পেয়েছি।

এই দরসে নেযামী, যা আজ পৃথিবীতে সচল নোটের মতো চলছে, মোল্লা নিযামুদ্দীন ফিরিঙ্গীমহল্লী রহ.-এর সাজানো শিক্ষা সিলেবাস। তিনি হিন্দুস্তানের উস্তাযুল ওলামা ছিলেন। তিনি এত অধিক জ্ঞান-গরিমার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও ‘উধে’র একটি গ্রাম বাঁসার একজন বুযুর্গ, হযরত সায়্যিদ আব্দুর রাযযাক বাঁসুবী কাদেরী রহ.-এর মুরিদ ছিলেন। তিনি ‘উধে’র পূরবী ভাষা বলতেন। প্রাথমিক কিছু কিতাব পড়েছিলেন। মোল্লা সাহেব রহ. তাঁর হযরতের মালফুযাতও লিখেছিলেন। অনেক ভক্তি-শ্রদ্ধার সাথে তাঁর নাম স্মরণ করতেন। কারণ, নিজের জ্ঞান-গরিমা সত্ত্বেও তিনি একটা শূন্যতা অনুভব করতেন, যা সেখানে গিয়ে পূরণ হতো। তিনি নিজে সবার উস্তাদ ছিলেন। কিন্তু তিনিই এমন ব্যক্তির সন্ধানে ছিলেন, যেখানে গিয়ে বুঝতে পারবেন যে, আমি কিছুই না। এখনো আমার শেখার ও পড়ার প্রয়োজন আছে।

হযরত মাওলানা আব্দুল হাই বুরহানুভী রহ. ও হযরত মাওলানা শাহ ইসমাইল শহীদ রহ. কত মহান ব্যক্তি ছিলেন। শাহ আব্দুল আযীয রহ. প্রথমজনকে শায়খুল ইসলাম এবং দ্বিতীয়জনকে হুজ্জাতুল ইসলাম উপাধিতে স্মরণ করতেন। তাঁরা হযরত সায়্যেদ আহমাদ শহীদ রহ.-এর হাতে বাইয়াত ছিলেন। অথচ তখনো তাঁর পড়াশোনা শেষ হয়নি। দেওবন্দের বুযুর্গগণ বলেছেন, সায়্যেদ সাহেব যখন এখানে এসেছেন, সায়্যেদ সাহেব আরাম করলে তাঁরা খাটের ডানে-বামে বসে থাকতেন। তিনি জাগ্রত হলে এবং কিছু বললে, দীর্ঘ সময় উভয়ে তা নিয়ে আলোচনা করতেন এবং কথার গভীরতা উপলব্ধি করতেন।

 

অমুখাপেক্ষিতা ও নির্লোভ স্বভাবের প্রভাব ও সম্মোহনী শক্তি

দ্বিতীয় গুণ হলো, অমুখাপেক্ষিতা ও নির্মোহ স্বভাব। এটাও আল্লাহ তাআলার নীতি যে, যারা মানুষের কাছে চায়, মানুষ তাদেরকে ভয় পায়। যারা হাত পাতে মানুষ তাদের থেকে দূরে সরে যায়। যে মুষ্টি বন্ধ করে রাখে, আঁচল গুটিয়ে নেয়, মানুষ তাঁদের পায়ে এসে পড়ে। তাঁদেরকে তোষামোদ করে যে, কিছু গ্রহণ করুন। আদিকাল থেকে অমুখাপেক্ষিতার মধ্যে সমাদর ও গ্রহণযোগ্যতার বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আর চাওয়ার মধ্যে রয়েছে অপমান। অর্থাৎ অমুখাপেক্ষী মানুষের প্রতি সবাই মুখাপেক্ষী। যে চায় তার থেকে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নেয়। এটিও আল্লাহ তাআলার সৃষ্টিগত এমন একটি নীতি যে, যুগ পরিবর্তনেও এতে কোনো পরিবর্তন হয়নি ।

চতুর্থ শতাব্দীর অবস্থা আপনি পড়–ন, তাহলে এমনটিই দেখতে পাবেন। অষ্টম শতাব্দীর ইতিহাস পড়–ন, এমন ঘটনাই পাবেন। আজ চৌদ্দতম শতাব্দীতেও এমনই হচ্ছে। এ সংক্রান্ত ঘটনা এখন শোনাব না। এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনাও এখন করতে চাই না। বুযুর্গদের জীবনী এবং তাসাউফের ইতিহাস এমন ঘটনায় ভরপুর। আপনি নিজেও হয়তো তা যাচাই করেছেন, অথবা নিজের উস্তাদ-মাশায়েখদের থেকে তাঁদের উস্তাদ ও মাশায়েখের ঘটনা শুনেছেন।

 

কীর্তি ও কৃতিত্বের অধিকারী হোন, পৃথিবীতে প্রিয়পাত্র হয়ে যাবেন

তৃতীয় এবং শেষ বৈশিষ্ট্য হলো কৃতিত্বের অধিকারী হওয়া। কোনো বিষয়ে পূর্ণ দক্ষতা অর্জন করা। উলূমে আ’লিয়া তথা মূল বিষয়ের জ্ঞান তো অনেক বড় বিষয়, উলূমে আলিয়া তথা মূল বিষয় অর্জনের মাধ্যম কোনো একটি শাস্ত্রেও যদি কেউ শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারে, বরং আরও নিচে নেমে বলব, কেউ যদি সুন্দর হস্তলিপির মধ্যেও কৃতিত্বের অধিকারী হয়, বড় বড় জ্ঞানী বিদ্যান ব্যক্তিরা তার পেছনে ঘুরতে থাকবে। অনেক বড় বড় লেখককে প্রকাশক ও লিপিকারের তোয়াজ করতে হয়, তাদের অহংকার সহ্য করতে হয়। তাদেরকে তোষামোদ করেন, যেন তাঁরা সময়মতো লিখে দেন। কমপক্ষে বইয়ের নামটাই লিখে দেন, যেন ব্লক বানানো যায়।

যদি কোনো শ্রেষ্ঠত্বের অধিকারী, কোনো বিশেষ জ্ঞানে পারদর্শী ব্যক্তিকে দেখেন বা তাঁর ব্যাপারে শোনেন যে, তিনি কষ্টে আছেন বা বেকার দিন কাটাচ্ছেন, তাহলে আপনি নিশ্চিত থাকুন, তাঁর এমন কোনো দুর্বলতা আছে বা স্বভাবগত কোনো সমস্যা আছে, যাতে তাঁর সকল শ্রেষ্ঠত্ব ঢাকা পড়েছে। যেমন, কারও বেশি রাগ। কেউবা এক অবস্থার ওপর অটল থাকতে পারে না। কেউ আছে অলস প্রকৃতির, পরিশ্রম করে না। মনোযোগ দিয়ে কাজ করে না। অন্যদিকে কারও বিশৃঙ্খলা অভ্যাসে পরিণত হয়। অন্যের কথা সহ্য করতে পারে না। কেউবা অস্থির, স্বভাবে কিছুটা পাগলামো আছে। এক জায়গায় স্থির থাকতে পারে না। অল্পতেই আশপাশের মানুষদের সাথে মনোমালিন্য দেখা দেয়। এমন কোনো না কোনো ত্রুটি তার মধ্যে অবশ্যই পাবেন। এ কারণেই তাঁর জ্ঞান-বিদ্যা দ্বারা উপকৃত হওয়া সম্ভব হয় না। তাই তিনি অপরিচিত বা বিচ্ছিন্ন হয়ে নিঃসঙ্গ দিন কাটান।

এই হলো তিনটি বিশেষ গুণ। এ ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার সৃষ্টিগত রীতি হলো, যুগ যত পরিবর্তনই হোক না কেন, যুগের মানুষ যত বিগড়ে গিয়ে থাকুক না কেন, এগুলোর মধ্যে বশীভূত করার উপাদান রয়েছে। তাতে প্রিয় হওয়ার গুণাগুণ আছে। আমাদের মাদরাসার শিক্ষার্থী ও ফারেগীনদের এই শর্তগুলো পূরণ করতে হবে। এই সকল গুণে গুণান্বিত হতে হবে। আল্লাহ তাআলা আপনাদের হেফাজতকারী ও সাহায্যকারী হোন। এই বলে আমি আজ বিদায় চাচ্ছি।

وما علينا إلا البلاغ المبين

و السلام عليكم ورحمة الله وبركاته

Avatar

zobayer

একটি কমেন্ট করুন