প্রতিষ্ঠাতা: মুজাহিদে আযম হযরত মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.

জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ, ঢাকা-এর মুখপত্র

প্রতিষ্ঠাকালঃ ১৯৩৭ ঈসায়ী

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও অনিয়ন্ত্রিত বাজার : কিছু কথা

দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও অনিয়ন্ত্রিত বাজার : কিছু কথা

আব্দুল মুমিন


‘বাজার’ আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রাণী হিসাবে জীবন যাপনের প্রয়োজনে নিত্যদিন আমরা বাজারের মুখাপেক্ষী হই। খাবার বলি, কাপড় বলি আর ঘরের অন্যান্য প্রয়োজনীয় বস্তু বলি, সব কিছুর ব্যবস্থা করতেই আমাদের বাজারমুখী হতে হয়। (বাজার বলতে ব্যাপকভাবে দোকান, কাঁচা বাজার, মার্কেট, সুপার শপ সবই বোঝানো হয়েছে।) বাজার করা খুবই কষ্টকর, কারও কাছে বিরক্তকর বা অনেক ক্ষেত্রে প্রচুর সময়ের অপচয় মনে হলেও বাজারে না গিয়ে উপায় থাকে না। পৃথিবীতে একজন মানুষ জীবিত থাকবে আর সে বাজারের প্রয়োজন অনুভব করবে না, এটা একপ্রকার অসম্ভব বিষয়। কোরআনে কারীমে এসেছে,

وَقَالُوْا مَالِ هٰذَا الرَّسُوْلِ یَاْكُلُ الطَّعَامَ وَ یَمْشِیْ  فِی الْاَسْوَاقِ

কাফেররা বলে, এ রাসূলের কী হলো যে, তিনি খাবার খান ও বাজারে গমন করেন।—সূরা ফুরকান (২৫) : ০৭

মক্কার কাফেরদের ধারণা ছিল, আল্লাহ তার পক্ষ থেকে কোনো রাসূল পাঠালে অবশ্যই ফেরেশতাদের রাসূল হিসাবে পাঠাবেন। মানুষকে কেন রাসূল বানানো হলো। যিনি খাবার খান ও বাজারে গমন করেন। বোঝা যায়, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন স্বাভাবিক মানুষ ছিলেন। তাই তাঁর খাবারের যেমন প্রয়োজন ছিল তেমনি বাজারে গমনেরও প্রয়োজন ছিল। এ স্বাভাবিক মানুষকেই তারা রাসূল হিসাবে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না। বোঝা গেল, স্বাভাবিক মানুষ বাজারের প্রয়োজন অস্বীকার করতে পারে না। আর এ কারণেই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদ ও ঘরে প্রবেশের মতো বাজারের দুআও শিক্ষা দিয়েছেন।

কিন্তু যে বাজার ব্যতীত আমাদের চলা দায়, যে বাজার থেকে আমরা আমাদের প্রয়োজনীয় সবকিছুর ব্যবস্থা করে থাকি, সে বাজার থেকে বর্তমানে স্বস্তি নিয়ে ফেরা দায়। নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বেড়েই চলছে দিন—দিন। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পরিবহন ভাড়া, বাসা ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, গ্যাস বিল, টিউশন ফি, ডাক্তার ফি—সহ সকল ধরনের প্রয়োজনীয় সেবার মূল্য। যে হারে মূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে সে হারে পণ্য ও সেবার মান বৃদ্ধি পাচ্ছে না। সে হারে বাড়ছে না সাধারণ মানুষের উপার্জন। ফলে বিশেষ করে নিম্ন, নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ পড়ছে চরম ভোগান্তিতে। এর কারণ ও প্রতিকার অনুসন্ধানের আগে সংবাদপত্রের পাতায় বর্তমান সময়ের কিছু চিত্র দেখে আসি।

 

চিত্র ০১. জনজীবনে নাভিঃশ্বাস

গত ২৬ জুলাই ২০২২ প্রথম আলোর একটি সরেজমিন প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল, ‘সব জিনিসের দাম বাড়তি, কষ্টে আছে মানুষ’। প্রতিবেদক লিখেন, দিলু রোডের এক মুদিদোকানে গতকাল সোমবার সকালে চাল, ডাল, লবণ, সয়াবিন তেল, মসলা, তরল দুধ ইত্যাদি কিনছিলেন মোশাররফ হোসেন। প্রথম আলোর প্রতিবেদক পরিচয় দিয়ে জিনিসপত্রের দাম কেমন জানতে চাইলে বলেন, ‘এমন কোনো জিনিস নেই, যার দাম বাড়েনি।’ বাসা থেকে অফিসের দূরত্ব আধা কিলোমিটার। জানালেন, এ পথটুকু একসময় রিকশায় আসতেন। এখন আর সেই বিলাসিতা করেন না। কীভাবে সামলাচ্ছেন সব—এমন প্রশ্ন করতেই একটা হিসাব দেন মোশাররফ। জানান, ‘যাতায়াতের ভাড়া বাঁচাতে বাসাটা নিই অফিসের কাছে। বাসাভাড়া ১৮ হাজার, বিদুৎ বিল ও গ্যাস বিল আড়াই হাজার, চাল, ডালসহ মাসিক শুকনা বাজার ১০ হাজার, কাঁচাবাজার চার হাজার, মায়ের ওষুধ তিন হাজার, মেয়ের স্কুলের বেতন ও বই—খাতা মিলিয়ে ছয় হাজার টাকা খরচ হয়। সব মিলিয়ে খরচ ৪৩ হাজার ৫০০ টাকা। সামাজিকতা করার জন্য আর কিছু থাকে না। বিয়ের অনুষ্ঠানে কেউ দাওয়াত দিলে এড়িয়ে যাই।’ সীমিত আয়ের মানুষ ও চাকরিজীবীরা সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন। চিকিৎসা কিংবা অন্য কোনো বিপদ এলে তাঁরা খরচ করতে পারছেন না।

পায়ে হেঁটে এবার যাই মগবাজার কাঁচাবাজারে। কথা হয় সবজি কিনতে আসা গৃহিণী হালিমা খাতুনের (৪৩) সঙ্গে। ৫০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই বলে হতাশ তিনি। কী করবেন এখন—জানতে চাইলে বলেন, ‘এখানে আসাটাই ভুল হয়েছে। রাতের বেলায় কারওয়ান বাজারে নাকি সস্তায় সবজি বিক্রি হয়। ওখানেই যাব।’

সরকারি হিসাব বলছে, দেশের মূল্যস্ফীতির হার এখন ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ, যা ৯ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এ মূল্যস্ফীতির চেয়ে মজুরি বৃদ্ধির হার কম, যা বেশি থাকাটাই যৌক্তিক।

শুধু খাদ্যপণ্য নয়, যাতায়াতভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। বাসে উঠলেই আধা কিলোমিটারের রাস্তা হলেও ভাড়া ১০ টাকা।… এদিকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা মিটারে চলা বন্ধ হয়ে গেছে অনেক আগে। নিম্নবিত্ত মানুষ নিরুপায় হয়ে মাঝে মাঝে চুক্তিতে অটোরিকশায় চড়েন। সেই ভাড়া এখন প্রায় দ্বিগুণ। আর সম্পন্ন মানুষ যাঁরা উবারের গাড়িতে চড়েন, গত দুই তিন মাসে ভাড়া বেড়েছে গড়ে ১০ থেকে ২০ শতাংশ।

গতকাল এই প্রতিবেদক মোটরসাইকেলে বিমানবন্দর থেকে কারওয়ান বাজার আসতে ভাড়া গুনেছেন ২০০ টাকা, দুই মাস আগেও যা ছিল ১৭০ টাকা। ফাঁকে গত সপ্তাহে বেড়েছে ৫৩ ব্র্যান্ডের ওষুধের দাম। আবার বছর ঘুরলেই বাড়ছে বাড়িভাড়া।

সাবান, শ্যাম্পু, টুথপেস্ট, ব্রাশ, রেজার, ফোম, খাতা, কলম—পেনসিল, রাবার, শার্পনার, ডিটারজেন্ট—এসব পণ্য কিনতেই বেশি দিতে হচ্ছে। বাজেট বাড়াতে হচ্ছে। বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বড় আকারে লাক্স, মেরিল, লাইফবয় সাবানের দাম ছয় মাসের ব্যবধানে ১০ টাকা বেড়েছে। বড় আকারের লাক্স সাবানের দাম এখন ৭৫ টাকা। ৩৫০ গ্রামের সানসিল্ক শ্যাম্পুর দাম ৩০ টাকা বেড়ে ৩৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ১৫০ গ্রামের ক্লোজআপ ব্র্যান্ডের টুথপেস্ট বিক্রি হচ্ছে ১২৫ টাকায়। দাম বেড়েছে ৫ টাকা। আর সব ধরনের টুথব্রাশের দাম ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে।

সন্তানের পড়াশোনায় খরচ বাড়ছে। ১২০ পৃষ্ঠার খাতার দাম ৫ টাকা বেড়েছে। ৩০ টাকার নিচে আর কোনো খাতা মিলছে না। ১০ টাকার পেনসিল এখন ১৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আবার কলমের দাম ৫ টাকা থেকে শুরু। রাবার ও শার্পনারের দাম ২ থেকে ৫ টাকা বেড়েছে। ১০ টাকার নিচে মোটামুটি মানের রাবার মিলবে না।—প্রথম আলো, ২৬ জুলাই ২০২২ (অনলাইন সংস্করণ)

 

চিত্র ০২. তেলের তেলেসমাতি

তেলের তেলেসমাতির কথা সবারই মনে থাকার কথা। গত মার্চের (২০২২) শুরুর দিকেই পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে সয়াবিন তেল পাওয়া যাচ্ছে না এমন অভিযোগ উঠেছিল। এ প্রসঙ্গে বিবিসির একটি রিপোর্ট পড়ে নেওয়া যাক, খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, মার্চ মাসের প্রথম দিন থেকেই ডিলারদের কাছ থেকে তারা তেল পাচ্ছেন না। ঢাকার বনানীর একজন খুচরা বিক্রেতা বলছিলেন, আবার কখনো পেলেও ডিলাররা বাড়তি দাম চাইছে তাদের কাছে।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বলছে, সয়াবিন মিলার, আমদানিকারক কোম্পানি এবং পাইকারি ও খুচরা বিক্রেতা মিলে তেল মজুদ করে রাখার কারণেই মূলত খুচরা পর্যায়ে তেলের কৃত্রিম সংকট দেখা দিয়েছে।

অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান বিবিসিকে বলেছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেড়েছে, ফলে দেশেও বাড়বে এই আশায় অনেক ব্যবসায়ী তেল বাজারে ছাড়ছেন না। সে কারণেই এই কৃত্রিম সংকট, আর সেটি ঠেকাতে তারা অভিযান শুরু করেছেন। তিনি বলেন, আমরা বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানিয়েছি যে, আন্তর্জাতিক বাজারে যে দাম বেড়েছে বা রাশিয়া—ইউক্রেন যুদ্ধ এসবের জন্য দাম বাড়লে তার প্রভাব দেশের বাজারে আরো দুইমাস পরে পড়বে। কিন্তু এখন তেল নিয়ে বাড়াবাড়ি হচ্ছে। তেল নিয়ে তেলেসমাতি হচ্ছে। এজন্য এটা (অভিযান) আমরা কন্টিনিউ করবো।

এই মুহূর্তে সরকারের নির্ধারিত দাম অনুযায়ী, বোতলজাত সয়াবিন তেল প্রতি লিটারে সর্বোচ্চ মূল্য ১৬৮ টাকা, পাঁচ লিটারের বোতলের দাম ৭৯৫ টাকা। আর খোলা সয়াবিন লিটার প্রতি ১৪৩ টাকা। এই দাম ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুতে নির্ধারণ করা হয়েছে।

—বিবিসি বাংলা : ৬ মার্চ ২০২২

এরপর ৫ মে বৃহস্পতিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকের পর সয়াবিন তেলের নতুন দাম নির্ধারণ করে বাংলাদেশ ভেজিটেবল অয়েল রিফাইনার্স অ্যান্ড বনস্পতি ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন। নতুন নির্ধারিত দর অনুযায়ী, বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে ৩৮ টাকা বেড়ে হয়েছে ১৯৮ টাকা।—প্রথম আলো : ৬ মে ২০২২

এর দুদিন পর প্রথম আলোর একটি শিরোনাম ছিল, ‘মজুত করা তেল বেরিয়ে আসছে, দামও বেশি’। এতে বলা হয়, নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরের বিভিন্ন বাজার ও অলিগলির দোকানে বোতলজাত সয়াবিন তেল বিক্রি শুরু হয়েছে। তবে এই তেল মূল্যবৃদ্ধির আগে কিনে রাখা। তেলের বোতলের মোড়কে উল্লেখ করা দরও আগের। কিন্তু বিক্রি হচ্ছে নতুন দামে, যা আগের চেয়ে প্রতি লিটারে ৩৮ টাকা বেশি। এরপরও কোথাও কোথাও সরকার নির্ধারিত দরের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হতে দেখা গেছে।—প্রথম আলো, ৮ মে ২০২২

এরপর আরও বিস্ময়কর তথ্য পড়–ন বাংলাদেশ প্রতিদিনের রিপোর্টে : সারা দেশে অভিযান চালিয়ে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৭২৫ লিটার ভোজ্য তেল জব্দ করেছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর। এর মধ্যে খুলনায় ১ লাখ ৬৭ হাজার ৪৮৪, চট্টগ্রামে ১ হাজার ১৫, সিরাজগঞ্জে ৩৭ হাজার, পিরোজপুরে ১০ হাজার ৪০০, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪ হাজার ৫০০, কুমিল্লায় ৮ হাজার ৩৬৪, মাদারীপুরে ৯৭২, নেত্রকোনায় ৩০, টাঙ্গাইলে ২০ হাজার, ফেনীতে ১৬০, গাজীপুরে ৪ হাজার ৮০০ লিটার ভোজ্য তেল উদ্ধার করে সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করা হয়। জরিমানা করা হয় মজুদদারদের।—বাংলাদেশ প্রতিদিন : ১৩ মে ২০২২

 

হালাল উপায়ে উপার্জন করা ইসলামের নির্দেশ

শ্রম ও মেধা ব্যয় করে উপার্জন করে নিজের ও পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করতে ইসলাম আমাদের নির্দেশ দিয়েছে। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

طلب كسب الحلال فريضة بعد الفريضة.

হালাল উপার্জন করা প্রথম পর্যায়ের ফরয বিধানের পর দ্বিতীয় পর্যায়ের ফরয কাজ।—শুআবুল ঈমান, বাইহাকী : ৮৭৪২

অন্যের কাছে হাত পাতা বা ভিক্ষাবৃত্তি ইসলামে খুবই নিন্দনীয়। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

الْيَدُ الْعُلْيَا خَيْرٌ مِنَ الْيَدِ السُّفْلى.

নিচের হাতের চেয়ে ওপরের হাত উত্তম।—সহীহ বুখারী : ১৪২৭; সহীহ মুসলিম : ২৩৪৯

তো হাত ওপরে রেখে কাউকে দান করার জন্য যেমন সদিচ্ছা থাকা চাই তেমনি পকেটে অর্থও থাকা চাই। তাই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে বিভিন্ন সময়ে উপার্জনের মৌলিক তিনটি উপায়ের সবগুলোই অবলম্বন করেছেন। কিশোর বয়সে অর্থের বিনিময়ে ছাগল চড়িয়েছেন। অর্থাৎ চাকুরি করেছেন। যৌবনে মুদারাবার ভিত্তিতে ব্যবসাও করেছেন। আবার কৃষিকাজ করেছেন। তবে তিনি ব্যবসাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন এবং ব্যবসায়ীদের উদ্বুদ্ধ করেছেন। বলেছেন,

التَّاجِرُ الصَّدُوقُ الأَمِينُ مَعَ النَّبِيّينَ، وَالصِّدِّيقِينَ، وَالشُّهَدَاءِ.

সত্যবাদি ও আমানতদার ব্যবসায়ীর হাশর হবে নবী, সিদ্দীক ও শহীদগণের সঙ্গে।—জামে তিরমিযী : ১২০৯

হাদীসটি ব্যবসায়ীদের জন্য খুবই উৎসাহব্যঞ্জক। একজন মানুষ ব্যবসা—বাণিজ্য করেও নবী, সিদ্দীক ও শহীদগণের সঙ্গে হাশরের ময়দানে অবস্থানের সম্মান লাভ করতে পারেন। তবে সে ব্যবসা অবশ্য সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততার সঙ্গে আঞ্জাম দিতে হবে। মনে রাখতে হবে, ইসলাম এসে ব্যবসা প্রথার নতুন প্রচলন ঘটায়নি; বরং প্রচলিত ব্যবসা পদ্ধতিতেই কিছু বিধি—নিষেধ আরোপ করেছে। অনেকে বলে, আমি কষ্ট করে অর্জন করেছি। কষ্টের পয়সা হালাল। তারা হয়তো বোঝাতে চান, আমার অর্থ কারও কাছ থেকে চুরি করা কিংবা ছিনিয়ে আনা নয়। পরিশ্রম করে অর্জন করা। মনে রাখতে হবে, কেবল শ্রম ও মেধা ব্যয় করলেই উপার্জন হালাল হয় না। হালাল হওয়ার জন্য পদ্ধতিও ইসলামসমর্থিত হতে হবে। ইসলামে ব্যবসা ও উপার্জন হালাল হওয়ার জন্য কিছু বিধি—নিষেধ রয়েছে। এর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলো মূল ব্যবসা হালাল ও জায়েয পণ্যের হতে হবে। হারাম বস্তুর ব্যবসাও হারাম। যে ব্যবসার কারণে মানুষের চারিত্রিক অবক্ষয় ঘটে সে ব্যবসা করাও ইসলামে জায়েয নেই। এমনিভাবে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় কিংবা বাজারের জোগান—চাহিদার স্বাভাবিক গতি প্রভাবিত হয় এমন কোনো পদ্ধতি অবলম্বন করলেও সে ব্যবসা ইসলামে নিষিদ্ধ, যদিও তাতে ব্যবসা জায়েয হওয়ার অন্যান্য শর্ত পাওয়া যায়। এ কারণেই অপর হাদীসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

إِنَّ التُّجَّارَ يُبْعَثُونَ يَوْمَ القِيَامَةِ فُجَّارًا، إِلاَّ مَنْ اتَّقَى اللهَ، وَبَرَّ، وَصَدَقَ.

ব্যবসায়ীদেরকে কেয়ামতের দিন পাপী ও নাফরমান অবস্থায় উপস্থিত করা হবে। তবে যে তাকওয়া অবলম্বন করেছে, নেক কাজ করেছে ও সত্য বলেছে তাকে এমন করা হবে না।—জামে তিরমিযী : ১২১০

বোঝা গেল, ব্যবসা আমার জান্নাত লাভের উপায় হতে পারে আবার জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হতে পারে। আল্লাহর ভয়, সততা ও আমনতদারি রক্ষা করে ব্যবসা করলে সওয়াবের অধিকারী হবে। অন্যথায় জাহান্নামের আগুনে দগ্ধ হতে হবে।

 

বাজার থাকবে স্বাধীন

ইসলামের দৃষ্টিতে বাজার থাকবে স্বাধীন। এখানে জোগান ও চাহিদার ভিত্তিতে দ্রব্যমূল্য উঠানামা করবে। কৃত্রিমভাবে কেউ দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে না। এমনকি বিশেষ পরিস্থিতি ব্যতীত সাধারণভাবে সরকারও কোনো দ্রব্যের মূল্য নির্ধারণ করে দিবে না। এ প্রসঙ্গে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

لاَ يَبِعْ حَاضِرٌ لِبَادٍ دَعُوا النَّاسَ يَرْزُق اللهُ بَعْضَهُمْ مِنْ بَعْضٍ.

গ্রাম্য কোনো লোকের পক্ষ থেকে যেন শহুরে কেউ বিক্রয় না করে। মানুষকে স্বাধীন ছেড়ে দাও। আল্লাহ তাআলা একজনকে অপরজনের মাধ্যমে রিযিক প্রদান করবেন।—সহীহ মুসলিম : ৩৮১৮

অপর এক হাদীসে এসেছে, হযরত আনাস রাযি. বর্ণনা করেন,

غَلاَ السِّعْرُ عَلَى عَهْدِ رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالُوا: يَا رَسُولَ اللهِ، سَعِّرْ لَنَا، فَقَالَ إِنَّ اللهَ هُوَ الْمُسَعِّرُ، القَابِضُ، البَاسِطُ، الرَّزَّاقُ.

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—এর সময়ে একবার দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেল। লোকজন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—এর কাছে নিবেদন করল, হে আল্লাহর রাসূল, পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে দিন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, পণ্যের মূল্য নির্ধারণকারী হলেন আল্লাহ। তিনিই স্বচ্ছলতা দেন। তিনিই অভাব দেন। তিনিই রিযিকদাতা।—জামে তিরমিযী : ১৩১৪

অতএব ইসলামে সাধারণ পরিস্থিতিতে সরকারের জন্যও মূল্য নির্ধারণ করে দেওয়ার সুযোগ নেই। বাজার চলবে, স্বাধীন গতিতে। পণ্যের জোগান বেশি হলে মূল্য হ্রাস পাবে, কম হলে বৃদ্ধি পাবে।

—সূত্র : ফিকহুল বুয়ূ : ১০০০—১০০১

 

মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এমন পদ্ধতি অবলম্বন করা নিষেধ

এ নিবন্ধে ব্যবসার কোন কোন পদ্ধতি জায়েয আর কোন কোন পদ্ধতি জায়েয নয় তা নিয়ে আলোচনা করা হবে না। কেবল চলমান সংকট ও পরিস্থিতি সৃষ্টির পেছনে যে মৌলিক কারণগুলো বিশেষজ্ঞগণ চিহ্নিত করেছেন, কেবল সেগুলো নিয়ে ইসলামের নির্দেশনা তুলে ধরা হবে। আমরা আগেই বলে এসেছি, নিজের শ্রম, মেধা ও অর্থ ব্যয় হলেই ব্যবসা জায়েয হয়ে যায় না। বরং পদ্ধতিও ইসলাম—সমর্থিত হতে হয়। ইসলাম ব্যবসায় মৌলিক যে বিষয়গুলো নিষিদ্ধ করেছে তার একটি হলো এমন কোনো পদ্ধতি অবলম্বন করা যাবে না যার ফলে বাজারের সাধারণ জোগান—চাহিদার গতি ব্যহত হয়। যে সকল কারণে তা হতে পারে তার একটি হলো অবৈধ মজুদদারী। পণ্য মজুদ করে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা বা মূল্য বৃদ্ধির আশায় এমন করা জায়েয নয়। এ প্রসঙ্গে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াাসাল্লাম বলেছেন,

من احتكر فهو خاطئ.

যে পণ্য মজুদ করে সে পাপী।—সহীহ মুসলিম : ৪০৯২

এক হাদীসে এসেছে,

من احتكر على المسلمين طعاما ضربه الله بالجذام والإفلاس.

যে ব্যক্তি মুসলমানদের পণ্য মজুদ করে রাখল, আল্লাহ পাক তাকে কুষ্ঠ রোগ ও দারিদে্র্য আক্রান্ত করবেন।—সুনানে ইবনে মাজাহ : ২১৫৫

কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির জন্য কিংবা মূল্য বৃদ্ধির আশায় কেউ পণ্য মজুদ করে রাখলে ইসলামের আইন হলো, সংশ্লিষ্ট কতৃর্পক্ষ তাকে পণ্য বাজারজাত করতে বাধ্য করবে। এ প্রসঙ্গে ফিকহে হানাফীর বিখ্যাত গ্রন্থ আদ্দুররুল মুখতার—এ বলা হয়েছে, বিচারকের জন্য জরুরি হলো, তাকে নিজের ও পরিবারের প্রয়োজনের অতিরিক্ত খাবার বিক্রয় করার নির্দেশ দিবেন। বিচারকের নির্দেশ অমান্য করলে তাকে নিবৃত করার জন্য উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করবেন এবং তিনি নিজে সে খাদ্যদ্রব্য বাজারে বিক্রয় করে দিবেন।—সূত্র : ফিকহুল বুয়ূ : ৯৯৬, ৯৯৮

দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে অবৈধ মজুদদারির পাশাপাশি আরেকটি বড় কারণ হলো মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম, সিন্ডিকেট ও বহু হাত বদলের অনর্থক ধারা। এক হাদীসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাাম বলেছেন,

لاَ يَبِعْ حَاضِرٌ لِبَادٍ.

গ্রাম থেকে কিছু বিক্রি করতে আসা ব্যক্তির পক্ষ থেকে যেন শহরের কেউ বিক্রয় না করে।

অর্থাৎ এক ব্যক্তি গ্রাম থেকে তার শাক, সবজি বা মাছ নিয়ে এলো শহরের বাজারে বিক্রয় করার জন্য। ইসলাম বলে সে বাজারে গিয়ে নিজের সুবিধামতো মূল্যে পণ্য বিক্রয় করবে। এতে দু পক্ষেরই সুবিধা হবে। বিক্রেতা বাজারে গেলে বাজারের অবস্থা বুঝে মূল্য নির্ণয় করতে পারবে। এতে সে ন্যায্য মূল্য পাবে। অপর দিকে সে যেহেতু নিজে বিক্রি করছে এবং তাকে আবার বিক্রয় করে গ্রামে ফিরে যেতে হবে তাই সে অযথা মূল্য বৃদ্ধি করবে না। মোটামুটি তার পুষিয়ে গেলে পণ্য ছেড়ে দেবে। এতে ক্রেতার লাভ হবে। পক্ষান্তরে এখানে শহরের কেউ মধ্যস্থ হলে ঝামেলা শুরু হবে। সে বেশির থেকে বেশি দামে বিক্রি করতে চাইবে। বেশি মূল্যের আশায় পণ্য আটকেও রাখতে পারে। এতে পণ্যের সংকট সৃষ্টি হতে পারে। মূল্য বৃদ্ধি পেতে পারে। তাই ইসলাম এ পথ বন্ধ করে দিয়েছে।

 

মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌড়াত্ব

আমাদের দেশে মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়াদের দৌরাত্ম এক দুঃখজনক ব্যাপার। অপর দিকে বহু হাত বদলের অনর্থক ধারায় পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়। এক দিকে মূল কৃষক যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয় তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয় আসল ভোক্তা বা ক্রেতা। এবারের তরমুজের ব্যাপারটিই দেখুন। গরমের সুস্বাদু এ ফলের এত ফলন হওয়া সত্ত্বেও তা অনেকের হাতের নাগালের বাইরে রয়ে গেছে। এর কারণ কী? এ প্রসঙ্গে প্রথম আলোর একটি অনুসন্ধানী রিপোর্ট পড়–ন :

‘বরগুনার আমতলী উপজেলার পশ্চিম সোনাখালী গ্রামের চাষি মাহবুব মাতুব্বর এবার ১২ একর জমিতে তরমুজ আবাদ করেন। এতে তাঁর তিন লাখ টাকা খরচ হয়। এবার প্রতি একর ১ লাখ টাকা করে ১২ একর জমির তরমুজ বিক্রি করেছেন ১২ লাখ টাকায়। মাহবুবের মতে, প্রতি হেক্টরে (আড়াই একরে এক হেক্টর) এবার গড়ে ৪৫ টন তরমুজ উৎপাদিত হয়েছে তাঁর। সেই হিসাবে তিনি ৪৫ টন তরমুজ বিক্রি করেছেন আড়াই লাখ টাকায়। কেজি দরে হিসাব করলে তাতে প্রতি কেজি তরমুজ তিনি পাইকারের কাছে বিক্রি করেছেন ৫ টাকা ৫৫ পয়সায়। মাহবুবের খেতের সাড়ে পাঁচ টাকা কেজির তরমুজ হয়তো ঢাকায় কেউ ৫০ টাকা কেজি দরে কিনে খাচ্ছেন।

মাথার ঘাম পায়ে ফেলে তরমুজ ফলান কৃষক আর লাভের সিংহভাগ চলে যাচ্ছে মধ্যস্বত্বভোগীদের পকেটে। আর এ কারণেই বাড়তি দামে কিনে খেতে হচ্ছে ভোক্তাদের। স্থানীয় চাষিদের সঙ্গে কথা বলে এবং বাজারে ঘুরে জানা যায়,      কৃষকদের কাছ থেকে ফড়িয়ারা ‘খেত মূলে’ তরমুজ কিনে পাইকারি মোকামে এনে এক ধাপ লাভে বিক্রি করেন। আবার পাইকারি মোকাম থেকে আরেক ধাপ লাভে ‘শ মূলে’ খুচরা ব্যবসায়ীরা কেনেন। এরপর খুচরা ব্যবসায়ীরা আবার ভোক্তা পর্যায়ে তা কেজি দরে আরেক দফা লাভে বিক্রি করেন। ফলে তিন হাত ঘুরে এই তরমুজের দাম এলাকাভেদে ১০ গুণও বেড়ে যায়।

আমতলীর কুকুয়া ইউনিয়নের চুনাখালী গ্রামের ওহাব মৃধা, বাহাউদ্দিন হাওলাদার ও রাজ্জাক মৃধা যৌথভাবে ৩৬ একর জমিতে তরমুজ চাষ করেছিলেন। খেত থেকে ৩১ লাখ টাকায় সব তরমুজ বিক্রি করেছেন। কেজি দরে হিসাব করলে তাতে প্রতি কেজি তরমুজ বিক্রি করেছেন ৪ টাকা ৭৮ পয়সায়।

—প্রথম আলো : ২৯ এপ্রিল

এ অবস্থা কেবল তরমুজের ক্ষেত্রে নয়। কৃষকের সকল খাদ্যদ্রব্যেরই একই অবস্থা। ২০১৯ সালের যুগান্তরের একটি রিপোর্ট দেখে নেওয়া যাক :

‘কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য থামানো যাচ্ছে না কোনোভাবেই। কৃষক পর্যায় থেকে খুচরা বাজারে আসতে কৃষিপণ্য চার—পাঁচ হাত বদল হয়। এতে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের মূল্য তিন—চার গুণ দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে লাভের সব টাকা চলে যায় মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে। কৃষি বিপণন অধিদফতরের নানা পদক্ষেপেও ঠেকানো যাচ্ছে না মধ্যস্বত্বভোগীদের।

কৃষি বিপণন অধিদফতরের সর্বশেষ জরিপে দেখা যায়, কৃষক পর্যায়ে এক কেজি আলু উৎপাদনে খরচ হয় ৭ টাকা ৬০ পয়সা। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছে এ আলু কৃষক কেজিতে বিক্রি করছেন ৮ টাকা ৮৫ পয়সা। স্থানীয় ব্যবসায়ী তা পাইকারি বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছেন ১২ টাকা ২০ পয়সা কেজি। পাইকারি বিক্রেতা এক কেজি আলু খুচরা বিক্রেতার কাছে বিক্রি করছে ১৭ টাকায়। খুচরা বিক্রেতা সাধারণ ভোক্তার কাছে বিক্রি করছে ২২ টাকা। ফলে দেখা যায়, কৃষকের ৭ টাকা ৬০ পয়সার এক কেজি আলু ভোক্তা পর্যায়ে আসতে তিন হাত ঘুরে বিক্রি হচ্ছে ২২ টাকায়।

একইভাবে কৃষক পর্যায়ে এক কেজি পেঁয়াজের উৎপাদনে খরচ ১৫ টাকা। কিন্তু ফড়িয়া ও বেপারি চক্রের কাছে লোকসান দিয়ে তা কৃষককে বিক্রি করতে হচ্ছে গড়ে ১০ টাকা ৯ পয়সায়। অথচ ভোক্তা পর্যায়ে পেঁয়াজ কিনতে হয় প্রতি কেজি ৩০ টাকায়। বেগুন প্রতি কেজি উৎপাদন করতে কৃষকের খরচ হয় ৮ টাকা ৩৬ পয়সা। কিন্তু বিভিন্ন ধাপ পেরিয়ে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি কেজি বেগুন বিক্রি হয় ৩০ টাকায়।

এছাড়া মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াও মৌসুমের সময় স্থানীয় ব্যবসায়ীরা কম মূল্যে কৃষকের কাছ থেকে কৃষিপণ্য কিনে নিজেদের কাছে ধরে রাখছে। পরে তারা সেগুলো ধীরে ধীরে দাম বাড়িয়ে বাজারে ছাড়ে।

অধিদফতর সূত্র জানায়, উৎপাদনকারী থেকে পণ্য ভোক্তা পর্যায়ে আসতে বেশ কয়েকটি ধাপ পেরোতে হয়। এর মধ্যে রয়েছে— স্থানীয় ব্যবসায়ী, স্থানীয় মজুদদার, স্থানীয় খুচরা বাজার, বেপারি, পাইকারি ব্যবসায়ী, কেন্দ্রীয় বাজার বা টার্মিনাল, আড়তদার, প্রক্রিয়াজাতকারী, খুচরা বাজার, খুচরা ব্যবসায়ী ইত্যাদি। এছাড়া বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজিও পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম একটি কারণ।

এ বিষয়ে কৃষি বিপণন অধিদফতরের উপ—পরিচালক দেওয়ান আশরাফুল হোসেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশের উদাহরণ টেনে বলেন, দেশের বড় বড় কোম্পানিগুলোকে বড় পরিসরে বিনিয়োগ করতে হবে। সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে পণ্য কিনে খুচরা বাজারে বিক্রি করতে হবে। তাহলে স্থানীয় ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের একচেটিয়া প্রাধান্য ভেঙে নতুন বাজার ব্যবস্থাপনা সৃষ্টি হবে। এতে কৃষক থেকে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্যের দাম কমবে।

তবে ভিন্ন মত প্রকাশ করেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান। তিনি যুগান্তরকে বলেন, দেশের বড় কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ করে কৃষক থেকে পণ্য সরাসরি বাজারে নিয়ে আসলে মধ্যস্বত্বভোগী কমলেও একটি আশঙ্কা থাকে। সেটি হল— কোম্পানিগুলো বাজার দর ধরে রেখে বেশি দামে পণ্য বিক্রি করবে। এতে পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। তাই কৃষকদের একজোট করে তাদের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি খুচরা বাজারে আনার ব্যবস্থা করতে হবে সরকারকে। এছাড়া অনলাইনের মাধ্যমে রাজধানীতে পণ্যের মূল্য সম্পর্কে কৃষকদের অবহিত করার ব্যবস্থা চলমান রেখে পণ্য বিক্রির নতুন নতুন মাধ্যম বের করতে হবে।—যুগান্তর : ১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯

আমরা কল্পনা করে দেখি, ইসলামের নির্দেশনামতো গ্রামের কৃষক যদি সরাসির এ পণ্যগুলো খুচরা ক্রেতার হাতে বিক্রি করতেন তাহলে কৃষক নিজে যেমন আরও বেশি মূল্য পেত তেমনি খুচরা ক্রেতাও আরও কম মূল্যে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য পেয়ে যেত।

 

সিন্ডিকেট

বাজারের স্বাভাবিক গতি ব্যহত হওয়ার আরেকটি কারণ হলো, ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট। ব্যবসায়ীরা একজোট হয়ে কোনো পণ্য মজুদ করে রাখে কিংবা পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করে। উল্লিখিত রিপোর্টেই আমরা দেখেছি, কৃষকের যেখানে খরচ পড়েছে ১৫ টাকা সেখানে ফড়িয়া ও বেপারি চক্রের কাছে লোকসান দিয়ে তা কৃষককে বিক্রি করতে হচ্ছে গড়ে ১০ টাকা ৯ পয়সায়। ব্যবসায়ীদের এ বাজার নিয়ন্ত্রণপদ্ধতি ইসলামের স্বাধীন বাজার নীতির পরিপন্থী। শাইখুল ইসলাম মুফতী তাকী উসমানী দা. বা. লিখেন, অবৈধ মজুদদারী যেমন নিষিদ্ধ তেমনি বর্তমান সময়ের প্রচলিত একই শিল্প বা একই পণ্যের ব্যবসায়ীদের সমিতি করাও নিষিদ্ধ হবে। যারা দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। ফলে বাজারে মূল্য নিয়ে কোনো স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা থাকে না। মানুষের তখন তাদের নির্ধারিত চড়া মূল্যে পণ্য ক্রয় করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। ফলে এর দ্বারাও সে ক্ষতিই হয়, যে ক্ষতি হয় মজুদদারির দ্বারা। অতএব সংশ্লিষ্ট কতৃর্পক্ষের কর্তব্য হলো এ ধরনের সমিতি করার সুযোগ না দেওয়া।—ফিকহুল বুয়ূ : ৯৯৯

ইসলামের মৌলিক এ নীতিগুলো অবলম্বন করলে বাজারের অস্বাভাবিক গতি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। তবে এক্ষেত্রে আরও কিছু বিষয় সামনে রাখতে হবে, যা ইসলাম আমাদের শিক্ষা দিয়েছে।

 

সম্পদ উপার্জন জীবনের লক্ষ্য নয়

সম্পদের প্রতি আকর্ষণ একটি স্বাভাবিক বিষয়। প্রয়োজন পরিমাণ সম্পদ থাকা কাম্যও বটে। তবে সম্পদ উপার্জনের নেশায় মত্ত হওয়া নিন্দনীয়। সম্পদের এহেন নেশা মানুষকে অবৈধ পন্থা অবলম্বনে উদ্বুদ্ধ করে। নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে সম্পদ গড়ার নেশা একটি বড় কারণ। এক রসিক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, ‘আমাদের যে অবস্থা তাতে মনে হয়, যদি এমন কোনো ঘোষণা আসে যে, অমুক দিন কেয়ামত হবে। পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। তখন দেখা যাবে, বাজারে জায়নামায, তসবীহ ও টুপির দাম বেড়ে গেছে।’ এ প্রসঙ্গে আরেকটি গল্প আছে আরও চমকপ্রদ। এক ব্যবসায়ীর মৃত্যুর পর ফেরেশতা তাকে বলল, তোমার আমল ওজন করে দেখা গেছে, তোমার নেক আমল ও বদ আমল সমান সমান। এখন তোমার ইচ্ছা। তুমি যেখানে যেতে চাও সেখানেই যেতে পারবে। জান্নাতে চাইলে জান্নাতে, জাহান্নামে চাইলে জাহান্নামে।

ব্যবসায়ী বলল, ভাই, আমি জান্নাত জাহান্নাম বুঝি না। যেখানে গেলে আমার পাঁচ পয়সা লাভ হবে, আমি সেখানেই যাব।

নিছক কৌতুক হলেও ঘটনা দুটিতে আমাদের বর্তমান সমাজের খাই খাই অবস্থা চিত্রায়িত হয়েছে খুবই সুন্দরভাবে।

সম্পদের মোহ ও সম্পদের প্রতি আকর্ষণ একটি বাস্তবতা। যা মানুষকে অন্ধ ও বধিরে পরিণত করে। সম্পদের মোহে পড়ে মানুষ নীতি—নৈতিকতা এমনকি সাধারণ মানবিক বোধ পর্যন্ত হারিয়ে ফেলতে পারে। তাই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে সতর্ক করেছেন। নিজে কখনো সম্পদ সঞ্চয় করেননি। যা কিছুই হাতে এসেছে সবই অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছেন।

একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াাসাল্লাম হযরত আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাযি. কে বাহরাইন পাঠালেন। তিনি সেখান থেকে প্রচুর পরিমাণ জিযিয়া নিয়ে ফিরে এলেন। রাতে আনসাররা হযরত আবু উবাইদা রাযি. এর আগমনের সংবাদ জানতে পারলেন। সাহাবায়ে কেরাম খুশি হলেন। কারণ তখন মুসলমানরা খুবই দারিদে্র্যর মাঝে দিনাতিপাত করছিলেন। ফজরের নামাযের পর আনসাররা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—এর কাছে গেলেন। নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের দেখে মুচকি হাসলেন। বললেন, মনে হয় তোমরা আবু উবায়দার আগমনের সংবাদ শুনেছ?

সাহাবায়ে কেরাম জবাব দিলেন, জী, ইয়া রাসূলুল্লাহ।

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন তাদের লক্ষ করে বললেন,

أَبشِروا وأمِّلوا ما يسُرُّكم، فو الله ما الفقرَ أخشى عليكم، ولكنى أخشى أن تُبسَط الدنيا عليكم كما بُسطتْ على من كان قبلكم، فتَنافَسوها كما تَنافسوها، فتُهلِكَكم كما أهلَكتْهم.

সুসংবাদ গ্রহণ করো এবং ইচ্ছামতো আশা করো। আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের ব্যাপারে দারিদে্র্যর আশঙ্কা করি না। বরং আমার ভয় ও আশঙ্কা হলো তোমাদের প্রাচুর্যপ্রাপ্তি হবে যেমন প্রাপ্ত হয়েছিল তোমাদের পূর্ববতীর্রা। এরপর তোমরা এ দুনিয়া নিয়ে পরস্পরে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে যেমনটা তারা করেছিল। এমন হলে এ দুনিয়া তোমাদের ধ্বংস করবে যেমন তাদের ধ্বংস করেছিল।—সহীহ বুখারী : ৪০১৫; সহীহ মুসলিম : ২৯৬১

সম্পদের চাহিদা এমন এক পিপাসা, দুনিয়া ভর্তি সম্পদেও যা মেটে না। তৃপ্তি লাভ হয় না। তাই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

لَوْ كَانَ لِابْنِ آدَمَ وَادِيَانِ مِنْ مَالٍ لَابْتَغَى ثَالِثًا وَلَا يَمْلَأُ جَوْفَ ابْنِ آدَمَ إِلَّا التُّرَابُ

কারও যদি দুই উপত্যকা ভর্তি সম্পদ থাকে তাহলে সে তৃতীয় আরেকটি উপত্যকার মালিক হতে চাইবে। কবরের মাটি ব্যতীত আর কিছুই তার উদর পূর্ণ করতে পারবে না—সহীহ বুখারী, হাদীস নং : ৬৪৩৬

হযরত ইবরাহীম ইবনে আদহাম রহ. কে কেউ বলল, আমি আপনাকে একটি জুব্বা হাদিয়া দিতে চাই, আপনি যদি তা গ্রহণ করতেন।

হযরত ইবরাহীম আদহাম রহ. বললেন, তুমি ধনী হলে গ্রহণ করব, গরিব হলে নয়।

লোকটি বলল, আমি ধনী।

তিনি জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কী পরিমাণ সম্পত্তি আছে?

লোকটি বলল, দুই হাজার দিনার।

তিনি বললেন, তুমি কি চাও না তোমার সম্পদ দুই হাজার দিনারের পরিবর্তে চার হাজার হয়ে যাক?

লোকটি বলল, অবশ্যই।

তিনি বললেন, তাহলে তুমি গরিব। তোমার হাদিয়া আমি গ্রহণ করব না।—টীকা, রিসালাতুল মুসতারশিদীন : ৯৩—৯৪

ইসলাম মানুষকে অন্যের কাছে হাত পাততে নিষেধ করেছে। পরিশ্রম করে হালাল পথে উপার্জন করার নির্দেশ দিয়েছে। পাশাপাশি সম্পদের মোহের ব্যাপারেও সতর্ক করেছে। সম্পদের ব্যাপারে যে আল্লাহ পাককে হিসাব দিতে হবে তাও স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। এ চেতনা জাগ্রত রেখে শরীয়ত নির্দেশিত পন্থায় ব্যবসা—বাণিজ্য পরিচালিত হলে বাজার অস্থিতিশীল হবে না। চলমান সংকট নিরসনে মুত্তকী ও পরহেজগার ব্যবসায়ী শ্রেণির বড় প্রয়োজন।

Avatar

zobayer

একটি কমেন্ট করুন