প্রতিষ্ঠাতা: মুজাহিদে আযম হযরত মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.

জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ, ঢাকা-এর মুখপত্র

প্রতিষ্ঠাকালঃ ১৯৩৭ ঈসায়ী

নূরের মজলিস

নূরের মজলিস

মাওলানা আবুল হাসান


শুক্রবার এশা বাদ মজলিসের পর হযরত মুফতী আবদুস সালাম সাহেবের কামরায় গেলাম—বলে রাখি, হুযুরের মসজিদটি হলো, ফরিদাবাদ গ্লাসফ্যাক্টরি বাইতুন নূর জামে মসজিদ—সঙ্গে ছিলেন রায় সাহেব বাজার মসজিদের ইমাম মাওলানা শরীফ সাহেব। এশা বাদ মজলিস শেষ হওয়ার পর প্রায়ই হুযুরের কামরায় যাওয়া হয়। মাসআলা-মাসায়েলের আলোচনার পাশাপাশি মনীষীদের স্মৃতিচারণায় কামরার খুসূসী মজলিসটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। আমরা হুযুরের ছাত্র হওয়া সত্ত্বে হুযুর আমাদের আপনি বলে সম্বোধন করেন এবং খুব ইকরাম করেন। তো আজকের মজলিসে উস্তাদ-শাগরিদের ইকরাম প্রসঙ্গে আলোচনা উঠল। প্রায় এক ঘণ্টা হুযুর আলোচনা করলেন। বড়দের বিভিন্ন ঘটনা শোনালেন। সে মজলিসের কিছু বিবরণ এখানে তুলে ধরছি।

 

মুফতী মাহমূদ হাসান গাঙ্গুহী রহ.

প্রথমে আলোচনা এল মুফতী মাহমূদ হাসান গাঙ্গুহী রহ.-এর। তিনি তাঁর দুই শাগরিদ হারদুঈ হযরত রহ. ও ক্বারি সিদ্দীক আহমদ বান্দবি রহ.-কে খুব ইকরাম করতেন। তাঁদের ব্যাপারে বলতেন, এরা তালেবে ইলমের জমানা থেকেই সাহেবে নিসবত। হযরত প্রায়ই বলতেন, আল্লাহ পাক যদি কেয়ামতের দিন প্রশ্ন করেন,

مياں محمود کيا لائے ہو؟  تو ميں صديق و ابرار کو پيش کر دونگا۔

‘মিয়া মাহমূদ, কী নিয়ে এসেছ? তখন আমি সিদ্দীক ও আবরারকে পেশ করে দেব।’

একবার রমযান মাসে হারদুঈ হযরত মুফতী সাহেবের খেদমতে হাযির হন। মুফতী সাহেবের সঙ্গে ছাত্তা মসজিদের তারাবীতে শরিক হন। জামাত বড় হওয়ায় তারাবী মাইকে হচ্ছিল। মুসল্লী বেশি হওয়ায় রাস্তায়ও কাতার করে নামায পড়তে হচ্ছিল। তারাবী চলা অবস্থাতেই হারদুঈ হযরত মাইক হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে আরজ করলেন,

مجھے حضرت کی طرف سے اجازت ہے کہ اگر کوئی منکر ديکھو تو اس پر نکير کرو،نماز ميں مائيک استعمال کرنا منکر ہے، اس لئے ميں اس پر نکیرکرتا ہوں۔

‘হযরতের পক্ষ থেকে আমার অনুমতি আছে কোনো অছন্দনীয় কাজ দেখলে আমি তাতে আপত্তি করতে পারব। নামাযে মাইক ব্যবহার অপছন্দনীয়, তাই আমি এর ওপর আপত্তি করছি।’

হযরত মুফতী সাহেবের উপস্থিতিতে তিনি এ কথা বললেন; হযরত নীরব রইলেন। মাইক বন্ধ হয়ে গেল। জামাত বড় হওয়ায় পেছনে তেলাওয়াত শোনা যাচ্ছিল না। রাস্তায় যারা দাঁড়িয়ে ছিলেন তাদের অনেকের নামায গড়বড় হয়ে গেল। হযরত মুফতী সাহেবকে বিষয়টি জানানো হলো। হযরত জবাব দিলেন—

بھائی مہمان کا بھی تو اکرام ہے۔

‘ভাই, মেহমানেরও সম্মান আছে।’

হযরত মাওলানা মাসীহুল্লাহ খান সাহেবের সঙ্গে হযরত মুফতী সাহেবের একেবারে বেতাকাল্লুফ ও অকৃত্রিম সম্পর্ক ছিল। অথচ মাওলানা মাসীহুল্লাহ খান সাহেব বয়সে তাঁর চেয়ে অনেক ছোট ছিলেন। তা সত্ত্বেও তাঁদের সম্পর্ক একেবারে অকৃত্রিম ছিল। কিন্তু যখন হযরত মাসীহুল্লাহ খান সাহেব হযরত থানভী রহ.-এর খেলাফত লাভ করলেন আর এ কথা হযরত মুফতী সাহেব জানতে পারলেন, তখন থেকে অকৃত্রিম আচরণ বাদ দিয়ে তাঁর সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করতে শুরু করলেন।

হযরত মুফতী সাহেব রহ. উস্তাদযাদা (উস্তাদের সন্তান) হওয়ায় হযরত আসআদ মাদানী রহ.-কে খুব ইকরাম করতেন। অথচ হযরত আসআদ মাদানী রহ. হযরত মুফতী সাহেব রহ. থেকে বয়সে অনেক ছোট ছিলেন। মুফতী সাহেবের ছাত্তা মসজিদের কামরায় সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি হযরত আসআদ মাদানী রহ.-কে নিজ গদিতে বসার জন্য খুব পীড়াপীড়ি করতেন। হযরতের পীড়াপীড়ি সত্ত্বেও আসআদ মাদানী রহ. গদিতে বসতে চাইতেন না। তবে অত্যধিক পীড়াপীড়ির ফলে দু-একবার গদিতে বসতেও দেখেছি।

মুফতী নিজামুদ্দীন সাহেব বার্ধক্যের কারণে দু-তলায় দারুল ইফতার কামরায় আসতে পারতেন না। তাই নিচে তাঁকে বড় একটি কামরা দেওয়া হয়েছিল। ছাত্ররা সেখানে গিয়ে তাঁর কাছে সবক পড়ত। একদিনের ঘটনা, মুফতী নিজামুদ্দীন সাহেবকে ফত্ওয়া দেখানোর জন্য তাঁর তেপায়ার সামনে বসে আছি। হুযুর নিজের গদিতে বসে ফত্ওয়া দেখছিলেন। একজনের বসার গদি, একজনের আকারেই বানানো। দুজন বসা যায় না। ইতিমধ্যে হযরত মুফতী মাহমূদ হাসান সাহেব কামরায় প্রবেশ করে মেঝেতে বসে পড়লেন। হযরত নিজামুদ্দীন সাহেব তাঁকে গদিতে বসার জন্য কত যে পীড়াপীড়ি করলেন, কিন্তু হযরত মেঝেতেই বসে রইলেন। আলাপ-আলোচনা সেরে বিদায় নিয়ে গেলেন।

ছাত্রদের মধ্যে হযরত মুফতী সাহেবের খুব ভীতি ও সমীহ কাজ করত। তো মাত্রাতিরিক্ত এই ভীতি ও সমীহ কাটানোর জন্য হযরত ছাত্রদের সঙ্গেও মাঝেমধ্যে অকৃত্রিম আচরণ করতেন। একবার তাখাসসুসের ছাত্রদের আম খাওয়ালেন। খাওয়ার পর আটিগুলো এক টুকরিতে জমা করা হলো। হযরত সেখান থেকে একটি আটি নিয়ে এক ছাত্রের পেছন দিয়ে জামার কলারের ভেতর ঢুকিয়ে দিলেন!

সবাই তো হাসতে হাসতে কাহিল। (এটাকে ওই ঘটনার সঙ্গে তুলনা করা যায় যাতে বর্ণিত হয়েছে, একবার নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাজারে গিয়ে সাহাবী আযহারের পেছন থেকে দুই হাত দিয়ে তার চোখ বন্ধ করে দেন।)

এরপর হুযুর মন্তব্য করলেন, আহা! কত দ্রুত এই সুন্দর সময়গুলো হারিয়ে গেল।

 

ক্বারী সিদ্দীক আহমদ বান্দবী রহ.

হযরত ক্বারী সিদ্দিক আহমদ বান্দবী সাহেব রেলের সফরে কোরআন শরীফ তেলাওয়াত করে কাটাতেন। এক সফরে তিনি নিজ আসনে বসে তেলাওয়াত করছিলেন। খাদেমকে দেখলেন এদিক-সেদিক দেখছে। তখন তাকে লক্ষ্য করে বললেন, এত কী দেখো? কয়টা জিনিসের কথা মনে থাকবে? এর আগে রেলে তো কত সফর করেছ, কত কিছু দেখেছ, বলো দেখি কয়টা জিনিসের কথা মনে আছে।

এ ঘটনা আলোচনা করে হুযুর মন্তব্য করলেন, কত সুন্দর কথা, কত কিছু দেখো, কয়টা জিনিসের কথা মনে থাকে, দুয়েকটা জিনিস যা স্মৃতিতে গেঁথে যায় তা ছাড়া সবই তো মানুষ ভুলে যায়। মনেই যদি না থাকে তাহলে অহেতুক এদিক-সেদিক দেখে কী লাভ।

ছাত্র জমানায় ক্বারী সাহেবের آداب متعلمين পড়েছি, খুব সুন্দর বই। অনেক ফায়দা হয়েছে। শিক্ষকতাকালে তাঁরই লেখা آداب معلمين বইটি পড়েছি, এটিও খুব সুন্দর বই। পড়ে অনেক উপকার হয়েছে। ক্বারী সাহেবের  জীবনীও আছে আমার সংগ্রহে, তিন খণ্ডে।

 

আমাদের হযরতওয়ালা

আমাদের হযরতওয়ালা হযরত হাকীম মুহাম্মদ আখতার সাহেব রহ. যখন গাড়িতে করে কোথাও যেতেন, তখন সামনের সিটে বসতেন। সামনের সিটে বসলে তো সামনে ডানে-বামে সবই দেখা যায়। হযরত এদিক-সেদিক আর কী দেখবেন? বেশিরভাগ সময় সিটে বসে দুআ-মোনাজাতে মশগুল হয়ে যেতেন। মাঝেমধ্যে পেছনে যারা থাকত তাদেরকে লক্ষ্য করে নসীহতও করতেন।

 

হযরত মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী রহ.

মাওলানা আব্দুর রাজ্জাক নদভী সাহেব আমাকে শুনিয়েছেন, একবার হযরত মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী রহ. খাটে শুয়েছিলেন। আমরা কিছু তালেবে ইলম খাটের আশেপাশে বসা। ইতিমধ্যে একজন এসে জানাল গাঙ্গুহের এক আগন্তুক আপনার সাক্ষাৎপ্রার্থী। গাঙ্গুহ নাম শুনতেই হযরত শোয়া থেকে উঠে দাঁড়ালেন এবং সাক্ষাৎপ্রার্থী আসতেই জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি হযরতের খান্দানের?

আগন্তুক : না আমি হযরতের খান্দানের নই।

এ ঘটনা শুনিয়ে হুযুর মন্তব্য করেন, আলী নদভী রহ.-এর মতো বিশ্ববরেণ্য আলেম, খান্দানী মানুষ গাঙ্গুহ নাম শুনতেই দাঁড়িয়ে যাওয়া কতটা আশ্চর্যের ব্যাপার। তারপর খান্দানের হলে একরকম আদব ও ইকরাম আর এলাকার হলে একরকম আদব ও ইকরাম।

তৃতীয় হযরতজী হযরত মাওলানা ইনআমুল হাসান সাহেব এবং হযরত আলী নদভী রহ. প্রায় কাছাকাছি বয়সের ছিলেন; অথচ তাদের পারস্পরিক আচরণ এতটা শ্রদ্ধাপূর্ণ ছিল, দেখলে অভিভূত হয়ে যেতে হত। নিজামুদ্দীনে অনেকবার এই দৃশ্য দেখার তাওফীক হয়েছে।

প্রসঙ্গক্রমে হযরত ইমাম মালেক রহ.-এর আলোচনা উঠল। খলীফা হারুনুর রশীদ ইমাম মালেক রহ.-কে শাহজাদাদের আলাদা পড়ানোর আবদার করল। কিন্তু ইমাম মালেক রহ. বললেন, আলেম ও ইলমে দ্বীনের আদব আমরা আপনার খান্দানের কাছ থেকেই শিখেছি। তা হলো, ইলমের বিষয়ে ধনী-গরিব ও আমীর-ফকিরের ব্যবধান না করা।

ইমাম সাহেবের কথা শুনে খলীফা নতশিরে তাঁর কথা মেনে নেন। শাহজাদাদের সবার সঙ্গে বসে ইলম হাসিলের ব্যবস্থা করেন।

 

মোল্লা বিহারী রহ.

মোল্লা বিহারী রহ. হযরত মাদানী রহ.-এর দেওবন্দের প্রথম বছরের শাগরিদ। আর আল্লামা কমরুদ্দিন সাহেব শেষ বছরের শাগরিদ। এই দুজনের মাঝে বিয়াল্লিশ বছরের ব্যবধান। তিনি আবু দাউদ শরীফ পড়াতেন। সবচেয়ে প্রবীণ উস্তাদ ছিলেন। কমরুদ্দিন সাহেব ও আরশাদ মাদানী সাহেব তাঁর ছাত্র ছিলেন। তাঁরা শিক্ষক হয়ে যাওয়ার পরও তাকে দেখলেই হযরত হযরত বলে খুব ইকরাম করতেন। হযরতের হাতে লাঠি থাকত, লাঠি খুব ঘোরাতেন। এক কনকনে শীতের দিনে হযরত বিহারী রহ. তালীমাতের সামনে দিয়ে যাচ্ছিলেন। সেখানে হযরত আরশাদ মাদানী, হযরত কমরুদ্দিন সাহেব আরও অন্যান্য শিক্ষকবৃন্দ ছিলেন। তাঁরা হযরত বিহারীকে দেখে তটস্থ হয়ে উঠলেন এবং হযরত হযরত বলে এগিয়ে এলেন। আরশাদ মাদানী সাহেবের গায়ে কম্বলের কাপড়ের মোটা জুব্বা ছিল। তিনি সেটাই খুলে হযরতের বসার জন্য বিছিয়ে দিলেন।

হযরত বিহারী সাহেব সফফে আওয়াল এবং তাকবীরে উলার খুব পাবন্দি করতেন। বছরের পর বছরও হযরতের তাকবীরে উলা ও সফফে আওয়াল ছুটত না। খুব গুরুত্বের সঙ্গে আগে আগে ওযু করে আগে আগে মসজিদে আসতেন। একবার আসরের সময় পরিবর্তন হলো, যথারীতি মসজিদে এলানও হলো। কিন্তু হযরত বিষয়টি খেয়াল করতে পারলেন না। পরদিন আসরে মাসবুক হয়ে গেলেন। মাসবুক হওয়ায় খুব পেরেশান হলেন। শুরু হলো ধমকাধমকি, মুয়াজ্জিন কোথায়? ডাকো মুয়াজ্জিনকে।

মুয়াজ্জিনকে ডেকে আনা হলো। মুয়াজ্জিন তো ভয়ে কাঠ। হযরত তাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কেমন এলান করেছ যে আমি শুনতে পাইনি।

Avatar

zobayer

একটি কমেন্ট করুন