প্রতিষ্ঠাতা: মুজাহিদে আযম হযরত মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.

জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ, ঢাকা-এর মুখপত্র

প্রতিষ্ঠাকালঃ ১৯৩৭ ঈসায়ী

পরচর্চা আমাদেরকে নিজের ব্যাপারে  চরম উদাসীন করে রেখেছে

পরচর্চা আমাদেরকে নিজের ব্যাপারে চরম উদাসীন করে রেখেছে

হাকীমুল উম্মত মুজাদ্দিদে মিল্লাত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ.

ভাষান্তর : মাওলানা আতাউল্লাহ আব্দুল জলীল


হামদ ও সালাতের পর।

আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন,

اَتَاْمُرُوْنَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنْسَوْنَ اَنْفُسَكُمْ وَاَنْتُمْ تَتْلُوْنَ الْکِتٰبَ      ؕ اَفَلَا تَعْقِلُوْنَ ﴿۴۴﴾

তোমরা কি অন্য লোকদেরকে পুণ্যের আদেশ করো আর নিজেদেরকে ভুলে যাও; অথচ তোমরা কিতাব তিলাওয়াত করো। তোমরা এতটুকুও বুঝ না।—সূরা বাকারা, ০২ : ৪৪

এ আয়াতে বাহ্যত শুধু আলেমদের নসীহত করা হয়েছে। আয়াতটি এই মর্মে অতি প্রসিদ্ধ। অধিকাংশ মানুষ এটাই ভেবে থাকে যে, এই আয়াত শুধু আলেমদের সাথে সংশ্লিষ্ট। আর এর প্রভাব হলো এই—ইলমবিহীন লোকজন আলেম না হওয়ায় নিজেদেরকে এই অসন্তোষ—বহিভূর্ত মনে করে।

কিন্তু একটু গভীরভাবে ভাবলে বোঝা যায়, যে কাজের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে এবং যে কাজ এই অসন্তোষের কারণ, তাতে সাধারণ মানুষ আলেমদের চেয়ে আরও বেশি আক্রান্ত। আয়াত আদ্যোপান্ত গভীরভাবে চিন্তাভাবনা করলে এর বিধান আলেম—গায়রে আলেম সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হওয়ার বিষয়টি দিবালোকের মতো সুস্পষ্ট হয়ে যাবে।

তদ্রূপ কোরআন শরীফের অন্যান্য আয়াত যার কোনোটা বাহ্যত আলেমদের লক্ষ করে বলা মনে হয়, সাধারণ মানুষজন নিজেদেরকে সেসবের বিধান থেকে দায়মুক্ত মনে করে, ফলে সাধারণ মানুষ নিজেদেরকে সেসবের বিধান থেকে দায়মুক্ত মনে করে। এমনকি অনেক সময় কোনো আয়াতে আলেমদের কর্মকাণ্ড সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু হতে দেখে নিজেদের আলেম না হওয়াটাকে বড় গনিমত মনে করে এবং নিজেদের অজ্ঞতা নিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তোলে। আবার কোনো আয়াতে আলেমরা সাধারণ লোকদের কর্মকাণ্ডকে সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু হওয়া দেখে তা থেকে নিজেদের দায়মুক্ত মনে করে।

কিন্তু আলেম—জাহেলের এই বিভাজন ততক্ষণই ঠিক মনে হয় যতক্ষণ আয়াতের বিষয়বস্তুতে নজর বুলানো হয় ভাসাভাসা দৃষ্টিতে। নতুবা গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যায়, শরীয়তের সকল বিধান ব্যাপক। এতে আলেম—জাহেল, শিক্ষিত—অশিক্ষিত সবাই সমান। সুতরাং এতে না গৌরববোধের সুযোগ আছে আর না নিজেকে কোনো বিধান থেকে দায়মুক্ত মনে করার অবকাশ আছে। তো এ আয়াতও যেহেতু শরীয়তের বিধানাবলির মধ্য থেকে একটি বিধান তাই এর বিধানও (আলেম—জাহেল) সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এ হলো এই আয়াতের সংক্ষিপ্ত তাহকীক।

এই আয়াতের আলোকে যা বয়ান করা উদ্দেশ্য এখন আমি তা সংক্ষিপ্ত আকারে উপস্থাপন করছি। বিশদ ও পূর্ণাঙ্গ আলোচনা ইনশাআল্লাহ সামনে হবে।

 

আয়াতের সারকথা

তাই প্রথমে আয়াতের মর্মার্থ উল্লেখ করছি যাতে আয়াতের জাহেরি অর্থ পরিষ্কার হয়ে যায়। আল্লাহ পাক বলেন, তোমরা অন্যদের নেক কাজ ও ভালো বিষয়ের তাগাদা দাও আর নিজের কথা ভুলে যাও (অর্থাৎ এটা কত খারাপ কথা) অথচ তোমরা আল্লাহ পাকের কিতাব পড় (আর তাতে লেখা আছে, কথায়—কাজে গরমিল হওয়া অত্যন্ত গর্হিত আর একেবারে আল্লাহ তাআলার হুকুম—বিরুদ্ধ) তোমরা কি বুঝো না যে এটা গর্হিত এবং আল্লাহ পাকের নারাজির কারণ। এই হলো এ আয়াতের জাহেরি অর্থের সারকথা।

আমজনতা اَتَاْمُرُوْنَ আয়াতের বিধান শুধু আলেমদের ব্যাপারে প্রযোজ্য মনে করে

এই আয়াতের ব্যাপারে একটি সংশয় হয়ে থাকে আলেমদের। তা আমি ইনশাআল্লাহ আলোচনার মধ্যভাগে তুলে ধরব। আরেকটি সংশয় হয় আমজনতার। তাদের সংশয়টা হলো—তারা এই আয়াতকে কেবল আলেমদের সাথে সংশ্লিষ্ট মনে করে নিজেদের দায়মুক্ত মনে করে। তারা মনে করে, এই তিরস্কার করা হয়েছে আলেমদের লক্ষ্য করে। আর এর পক্ষে সহায়ক হয়েছে আয়াতের বর্ণনাভঙ্গি। যার দ্বারা মনে হয়, এর বক্তব্য ওই ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে যে অন্যকে সদুপদেশ দেয়, ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করে। আর এ পদ ও দায়িত্ব আলেমদের। তাই এ আয়াতের হুকুম কেবল আলেমদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। এই হলো আমজনতার সংশয়।

এই সংশয়ের কুপ্রভাব এই পড়ছে যে, তারা নিজেদেরকে একেবারে এই বিধানের আওতামুক্ত মনে করে বসে আছে। এটা বড় মারাত্মক ক্ষতি। এটা ঠিক এমন, যেমন কোনো ব্যক্তি বিকলাঙ্গ করে দেওয়া রোগে আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও নিজেকে এ ধরনের রোগ থেকে একেবারে মুক্ত মনে করছে। বলা বাহুল্য এমন রোগী অত্যন্ত হতভাগ্য। তার পরিণাম অতি ভয়াবহ। কেননা এ যদি নিজেকে অসুস্থ মনে করত তাহলে চিকিৎসার ফিকিরও করত। কোনো চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতো। তার ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী ওষুধ সেবন করত। ক্ষতিকর জিনিস পরিহার করে চলত। পক্ষান্তরে সে যখন নিজেকে অসুস্থই মনে করছে না তখন না কোনো চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়ার প্রয়োজন মনে করবে আর না ক্ষতিকর জিনিস পরিহার করবে। পরিণাম এই হবে, দিন দিন রোগ বাড়তে থাকবে। এরপর এই রোগ থেকে আরেক রোগ সৃষ্টি হবে। এক ক্ষতি হলো এই। দ্বিতীয় ক্ষতি হলো আমজনতার মাথায় যখন এ কথা ঢুকে গেছে যে, অন্যদের ভালো ভালো কথা বলে নিজে আমল না করায় আলেমদের তিরস্কার করা হয়েছে, তখন তারা নিজেদের আলেম না হওয়াকে গনিমত মনে করবে। এমনকি অধিকাংশ সময় নিজের জাহেল থেকে যাওয়াটাকেই গৌরবের বিষয় মনে করে থাকে। আর বলে বেড়ায়, এর থেকে তো জাহেল তথা মূর্খই শ্রেয়। অথচ এটা একেবারে নিরর্থক গৌরব। এর স্বরূপ ইনশাআল্লাহ সামনে পরিষ্কার হয়ে যাবে। আজকাল আমাদের এমন আজব এক অবস্থা—না কমদামি জিনিস চিনি আর না দামি জিনিসের খবর রাখি। যা তা নিয়ে গর্ব করি, আর দামি জিনিসেরও খুঁত বের করতে ছাড়ি না।

 

কতক মানুষ নিজের দারিদ্র্য নিয়ে গর্ব করে

যেমন কতক লোকের বাতিক হলো তারা নিজের অভাব ও দারিদ্র্য নিয়ে ফখর করে। ধনী যদি ফখর করে তাহলে এর একটা যৌক্তিকতা থাকে। কেননা তার নিকট গর্ব ও ফখর করার উপকরণ বিদ্যমান। গরিব মানুষ—তার না আছে ক্ষুধার অন্ন আর না পরনের ল্যাংটি, সে কী নিয়ে গর্ব করে। আরও চমকপ্রদ বিষয় হলো, এ বড়াই কেবল কথার কথা না কর্মে ও আচরণেও প্রকাশ পায়। যেমন, যখন কোনো অনুষ্ঠান ইত্যাদি হয় তখন আমি এই গরিবদেরকেই বেশি ইতরামি করতে দেখেছি। তারাই সর্বাধিক মান—অভিমান করতে থাকে। আর এর কারণ এটাও যে, তারা মনে করে আমি এমনটা না করলে মানুষজন আমাকে নীচ ও হীন মনে করবে। এ কথা খেয়াল করবে, এই লোক আমাদের দাওয়াতের অপেক্ষাতেই ছিল। তদ্রূপ এই গরিব শ্রেণির মাঝে আরেকটি জনশ্রম্নতি আছে, তারা বলে থাকে, কেউ মালের মস্ত—পাগল, কেউ খালের মস্ত—পাগল। খাল—চামড়া নিয়ে মস্ত হওয়ার কী অর্থ তা আমার বোধগম্য নয়, তবে যাই হোক তারা এতটুকু তো স্বীকার করে নিয়েছে যে আমাদের বিচার—বিবেচনা লোপ পেয়েছে, কেননা নিজেকে মস্ত তথা পাগল আখ্যায়িত করেছে, আর মস্তি বা পাগলামি সুস্থ মস্তিষ্ক—বিরুদ্ধ, যদি বোধ—বুদ্ধি ঠিকই থাকত তাহলে এহেন আচরণই—বা কেন করত।

হাদীস শরীফে আছে, আল্লাহ তাআলা তিন শ্রেণির মানুষকে ভীষণ ঘৃণা করেন :

এক. ওই ব্যক্তি যে বাদশাহ হয়েও মিথ্যা কথা বলে। কেননা মিথ্যা এই কারণে বলতে হয় যে, সত্য বললে উদ্দেশ্য হাসেল হয় না। তাই মিথ্যার আশ্রয় নিতে হচ্ছে। এটা ওই ব্যক্তির প্রয়োজন হয় যার প্রতিদ্বন্দ্বী এমন শক্তি বিদ্যমান যা উদ্দেশ্য হাসিলে বিঘ্ন ঘটায়। বলা বাহুল্য, বাদশার এমন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী থাকে না। তাই তার মিথ্যা বলাটা খেয়ানতের একেবারে খোলামেলা দলিল।

দুই. ওই ব্যক্তি যে বয়োবৃদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও যিনা করে। কেননা যিনা একে তো হারাম, দ্বিতীয়ত বৃদ্ধ মানুষের মাঝে ততটা কামোত্তেজনা থাকে না, যার ভিত্তিতে তাকে ছাড় দেওয়া যায়। তাই তার এ কাজ তার স্বভাব—নীচতার প্রমাণ।

তিন. ওই ব্যক্তি যে গরিব হয়ে অহংকার করে। যেন রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে লক্ষ্য করে বলেছেন, ওই বেটা, তোর কাছে এমন কী আছে যা নিয়ে তুই অহংকার করিস। তদ্রূপ জাহেলের ফখরটাও অত্যন্ত গর্হিত। বিশেষত যখন মূর্খতা নিয়ে ফখর করা হয়। অর্থাৎ মূর্খের জন্য অন্যান্য বস্তু নিয়েই ফখর করা মানায় না, তদুপরি মূর্খতা নিয়ে ফখর করা তো আরও বেমানান। কেননা ইলম হলো মানুষের জীবনতুল্য আর মূর্খতা হলো মৃত্যুতুল্য। তো এ আলোচনায় এ বিষয়টিও পরিষ্কার হয়ে গেল।

 

টাকা—পয়সা নিয়ে ধনীদের ফখর করাটা মূর্খতা

অধিকাংশ ধনী যারা টাকা—পয়সা নিয়ে ফখর করে, তা—ও এর স্বরূপ না জানার কারণে। কেননা যখন তারা ইলমের গুণ থেকে বঞ্চিত তখন তাদের মধ্যে যেন গর্ব করার কোনো বিষয়ই নেই। হযরত আলী রাযি. দুনিয়া নিয়ে গর্বকারীদের মূর্খতা আলোচনা করতে গিয়ে বলেন, বংশ কোনো গর্ব করার বিষয় না। কেননা সকলেই বাবা আদম আ. ও মা হাওয়া আ.—এর সন্তান। এরপর বলেন, অবশ্য যদি ফখর করে তাহলে কেবল আলেম করতে পারে। কেননা সে নিজে সরল পথের ওপর আছে এবং অন্যদের সরল পথের আদেশ দেয়।

এর দ্বারা বোঝা যায়, ইলম ছাড়া সম্পদও ফখর করার কোনো বস্তু নয়। সম্পদের ব্যাপারটি নিয়ে যদি গভীরভাবে চিন্তা করা যায় তাহলে দেখা যাবে, তা না থাকাই ভালো। কেননা সম্পদের অবস্থা সাপের মতো। বাহ্যরূপটা অত্যন্ত চকচকে ও আকর্ষণীয় কিন্তু ভেতরটা বিষে ভরা। তদ্রূপ সম্পদ বাহ্যত যদিও আরাম—আয়েশ ও স্বাচ্ছন্দ্যের কারণ কিন্তু তা ভেতরগতভাবে সকল অনিষ্ট ও অনাচারের মূল। তো সম্পদ নিয়ে ফখর করার অর্থ হলো কারও সারা শরীরে সাপ লেপ্টে আছে আর সে তা নিয়ে গর্ব করছে। এহেন অবস্থা নিয়ে কেউ যদি গর্ব করে তাহলে বলার অপেক্ষা রাখে না, পৃথিবীর সকল বিবেকবান একবাক্যে তাকে আহাম্মক সাব্যস্ত করবে, তদ্রূপ সম্পদ নিয়ে গর্বকারীকেও আহম্মক মনে করা উচিত।

হযরত আলী রাযি. ইলম ও সম্পদ প্রসঙ্গে অন্যত্র মন্তব্য করেছেন, এই বণ্টনে আমরা তো বড়ই আনন্দিত যে, আমাদের ইলম এবং আমাদের শত্রুদের সম্পদ দান করা হয়েছে। কেননা সম্পদ ধ্বংস হয়ে যায় আর ইলম থাকে চিরকাল।

সুধীবৃন্দ, সম্পদ এমন জিনিস যা অনেক সময় সুস্থ সবল থাকা অবস্থাতেই হাতছাড়া হয়ে যায় নতুবা মৃত্যুরোগে তা হাতছাড়া হয়ে যাওয়াটা তো সুনিশ্চিত, যাতে কোনো সন্দেহ নেই। কেননা শরীয়তের আইন হলো মৃত্যুরোগে আক্রান্ত ব্যক্তির দুই—তৃতীয়াংশ সম্পদে তার আর মালিকানা থাকে না। তার সঙ্গে ওয়ারিশদের হক সংশ্লিষ্ট হয়ে যায়। কেউ যদি মৃত্যুরোগে ভোগা অবস্থায় ওসিয়ত করে কিংবা নিজের সম্পদ ভোগ করতে চায়, তাহলে এক—তৃতীয়াংশে তা কার্যকর হবে। যেমন, কারও কাছে তিন হাজার টাকা আছে। সে যদি পুরো তিন হাজার কিংবা দুই হাজার টাকার ব্যাপারে ওসিয়ত করে তাহলে তা শুধু এক হাজারে কার্যকর হবে। বাকি দুই হাজারে তথা অবশিষ্ট সম্পত্তিতে ওয়ারিশদের হক সংশ্লিষ্ট হয়ে যায়। যেমন, ওসিয়ত যদি না করে থাকে তাহলে এই এক—তৃতীয়াংশও ওয়ারিশরাই পেয়ে যেত। সুতরাং পরিষ্কার হয়ে গেল, সম্পদ—যাকে আমরা নিজের মনে করি, প্রকৃতপক্ষে তা আমাদের নিজের নয়। এমনকি অধিকাংশ সময় তা এমন লোকদের হাতে চলে যায় যাদের সহ্য করতেও মনে চায় না। আর এই এক—তৃতীয়াংশের ওপরও মালিকানাটি থাকে মৃত্যু পর্যন্ত। মৃত্যুর পর তো এটুকুও থাকে না। অর্থাৎ কেউ যদি তাকে কাফনও না দেয় তবুও তার কিছু করার থাকে না। এর দ্বারা পরিষ্কার হয়ে যায়, অর্থ—সম্পদ এমন জিনিস যা খুব দ্রুতই মানুষের নিকট থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এমনকি কবরে শুধু তার সঙ্গী হয় এক টুকরো কাফন। কিন্তু কাফন দিয়ে মৃতের কী লাভ। মোটকথা না কবরে সঙ্গী হয়, না হাশরে সঙ্গী হয়। কেননা কেয়ামতের দিন সেখানে এই অবস্থা হবে আল—কোরআনের ভাষায় :

وَ لَقَدْ جِئْتُمُوْنَا فُرَادٰی کَمَا خَلَقْنٰكُمْ  اَوَّلَ مَرَّۃٍ

অর্থাৎ কেয়ামত দিবসে আল্লাহ তাআলা বলবেন, তোমরা আমার কাছে একেবারে নিঃসঙ্গ একাকী এসে হাজির হয়েছ তথা কোনো কিছুই তোমাদের সঙ্গে নেই। বিলকুল এমন যেমন আমি তোমাদেরকে প্রথম সৃষ্টি করেছিলাম, অর্থাৎ একেবারে একা।

হ্যা,ঁ জীবদ্দশায় আল্লাহর রাস্তায় কিছু দিয়ে থাকলে তা সঙ্গে যাবে। তবে তা নিজের সম্পদ হওয়া শর্ত নয়, কেননা আল্লাহর রাস্তায় খরচ করলে স্বয়ং সম্পদ তো যায় না; বরং তার সওয়াব যায়। যা কেয়ামত দিবসে কাজে আসবে। আর সওয়াবের জন্য সম্পদ শর্ত নয়; বরং এর ভিত্তি হলো নিয়তের ওপর। এমনকি কেউ যদি লক্ষ লক্ষ টাকা ভালো কাজে খরচ করে আর নিয়ত ঠিক না থাকে, তাহলে সে কিছুমাত্র নেকী পাবে না। পক্ষান্তরে কারও কাছে যদি এক পয়সাও না থাকে অথচ মনে মনে এই নিয়ত পোষণ করে, যদি আল্লাহ পাক সম্পদ দেন তাহলে আমি নেক কাজ করব, তাহলে পুরোপুরি সওয়াব পেয়ে যাবে।

 

ইলমের ফযীলত ও মর্যাদা

পক্ষান্তরে যে ইলমে দীনের অধিকারী হবে সে সারা পৃথিবী থেকে নির্মুখাপেক্ষী। তার না কোনো বন্ধু প্রয়োজন, না কোনো সাহায্যকারী প্রয়োজন। সে সদা আনন্দিত ও নিশ্চিন্ত। এমনকি তার আনন্দ ও নিশ্চিন্ততার অবস্থা এমন, যা কোনো রাজা—বাদশাহর ভাগ্যেও জুটে না। বাদশাহ তো সর্বপ্রথম নিজের মুসাহেবদের ব্যাপারে আতঙ্কে থাকে যে, এরা আবার বিষ পান করিয়ে মেরে না ফেলে। এমন কত ঘটনা ঘটেছে যে, স্বয়ং বাদশাহর বেগমই তাকে বিষ পান করিয়ে দিয়েছে। আর আলেমদের শান হলো একাকী জঙ্গলে থাকলেও ওই বাদশাহর চেয়েও বেশি নিশ্চিন্ত, যে চতুর্দিকে পাহারাদার—বেষ্টিত। এটা কোনো আশ্চর্যের বিষয় নয়। কেননা ইলমের ফায়দা আরও অনেক বেশি। হ্যাঁ, যাদের ইলম—কালাম নেই তারা এ নিয়ে তাজ্জববোধ করলে তাতে তাজ্জবের কিছু নেই।

 

কোন ইলম ফখর ও গৌরবের বিষয় এবং তার আলামতসমূহ কী?

কিন্তু ইলমওয়ালা হওয়ার অর্থ এই নয়, শব্দ পাঠ বিশুদ্ধ করে নিল আর তার অর্থ শিখে নিল; বরং ইলম একটি নূর, যার ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন,

وَ جَعَلْنَا لَهٗ نُوْرًا یَّمْشِیْ بِهٖ فِی النَّاسِ

অর্থ : তার জন্য এক আলোর ব্যবস্থা করেছি, যার সাহায্যে সে মানুষের মাঝে চলাফেরা করে।—সূরা আনআম : ১২২

ওই নূরের উপস্থিতিতে অন্তরাত্মার অবস্থা এমন হয় যে, তার কদমে যদি সোনা—চাঁদিও রেখে দেওয়া হয় তবুও সেসবের প্রতি কোনো ভ্রম্নক্ষেপই করে না। পক্ষান্তরে চারদিক থেকে যদি শত্রু তরবারি নিয়ে ঘিরে ফেলে তবুও তার মনে ভয়—ভীতি বিন্দুমাত্র কাজ করে না।

 

জনাবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—এর ঘটনা

একবারের ঘটনা। তিনি কোনো সফরে ছিলেন। দ্বিপ্রহরে বিশ্রামের জন্য একটি গাছের ছায়ায় অবতরণ করলেন। ঘটনাক্রমে সাহাবায়ে কেরাম কেউ তখন ধারে—কাছে ছিলেন না। তিনি আপন তরবারি গাছে ঝুলিয়ে গাছের ছায়ায় শুয়ে পড়লেন। এক শত্রু বিষয়টি আঁচ করতে পেরে তৎক্ষণাৎ সেখানে এসে হাজির। এসে দেখতে পেল বাস্তবেই নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে একাকী ঘুমিয়ে আছেন আর তরবারি গাছে ঝুলন্ত। সে প্রথমে সন্তর্পণে এগিয়ে গিয়ে তরবারি কব্জা করে নিল। তারপর নিঃশব্দে তা কোষমুক্ত করল এবং নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—এর নিকট এসে দাঁড়ালো। এভাবে সে তার সমস্ত প্রস্তুতি পূর্ণ করে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে ঘুম থেকে জাগ্রত করে প্রশ্ন ছুড়ে দিল,

من يمنعك مني

কে তোমাকে আমার হাত থেকে রক্ষা করবে?

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার রণমূর্তি দেখার পরও বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। উল্টো তার প্রশ্নের জবাবে পূর্ণ আস্থার সঙ্গে বললেন, ‘আল্লাহ!’ অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা আমাকে রক্ষা করবেন! পারলে কেউ এমনটা করে দেখাক। আল্লাহ তাআলার সঙ্গে গভীর ও নিবিড় সম্পর্ক ছাড়া কেউ কি কখনো এমনটা করতে পারবে? (কিছুতেই না)

রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—এর জবাবে শত্রুর হাতে কম্পন শুরু হয়ে গেল। কম্পনের চোটে তরবারিও পড়ে গেল। তারপর নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তরবারি হাতে নিয়ে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন, এবার তোমাকে আমার হাত থেকে কে রক্ষা করবে?

সে উত্তর দিল, আপনিই।

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তৎক্ষণাৎ তরবারি কোষবদ্ধ করে নিলেন এবং তাকে ছেড়ে দিলেন, পরবর্তীতে সে মুসলমান হয়ে যায়।

মোটকথা এর নাম হলো ইলমের নূর, নতুবা নিছক শব্দমালা তো শয়তানেরও জানা। এই হলো ইলম, আর এর প্রতিক্রিয়া হলো, বুযুর্গদের ভাষায়, তার মধ্যে না কারও প্রতি আশা থাকে আর না কারও ভয় কাজ করে।

 

কামেল আলেম বিপদাপদে ঘাবড়ায় না

কামেল আলেম বিপদে ঘাবড়ায় না। এর অন্তর্নিহিত রহস্য হলো, কামেল ইলমের দ্বারা আল্লাহ পাকের মারেফাতও কামেল হয়। তিনি জানেন,

وَعَسٰۤی اَنْ تَكْرَهُوْا شَیْئًا وَّهُوَ خَیْرٌ لَّكُمْ

অর্থাৎ এটাও তো খুবই সম্ভব যে, তোমরা একটা জিনিসকে মন্দ মনে করো, অথচ তোমাদের পক্ষে তা মঙ্গলজনক।—সূরা বাকারা, ০২ : ২১৬

তাই সে ঘাবড়ায় না। বিচলিত হয় না। সে মনে করে, এই বিপদ আমার গোনাহের চিকিৎসা ও কাফফারা। তারপর তার এ কথাও মনে পড়ে, আমরা আল্লাহর, নিজের নই। আমাদের যে অবস্থায় রাখা উপযোগী সে অবস্থায় রাখার পূর্ণ অধিকার তাঁর রয়েছে, যেমন এই কোরআন মাজীদেই শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে,

وَبَشِّرِ الصّٰبِرِیْنَ ﴿۱۵۵﴾ۙ   الَّذِیْنَ اِذَاۤ اَصَابَتْهُمْ مُّصِیْبَۃٌ        ۙ قَالُوْۤا اِنَّا لِلهِ وَ اِنَّاۤ اِلَیْهِ رٰجِعُوْنَ ﴿۱۵۶﴾ؕ

সুসংবাদ দিন ওই সবরকারীদের, যারা মুসিবতে আক্রান্ত হলে বলে, ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন অর্থাৎ আমরা আল্লাহর, তাঁর কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে।—সূরা বাকারা, ০২ : ১৫৫—৫৬

 

সূরা ইয়াসীন এবং ইন্না লিল্লাহকে আমরা মৃত্যুর সঙ্গে বিশিষ্ট করে ফেলেছি

কিন্তু আফসোসের বিষয় হলো আমরা এই আয়াতকে মৃত্যুর সঙ্গে বিশিষ্ট করে ফেলেছি। এক বৃদ্ধার ঘটনা। তার ছেলে যে—কোনো বিপদ—আপদে ‘ইন্নালিল্লাহ’ পড়ত। একদিন বৃদ্ধা বলতে লাগল, বেটা, কাকে মারতে চাচ্ছ! ভালো চাও ভালো আশা করো।

তদ্রূপ সূরা ইয়াসীন যে—কোনো বিপদের সহজতার জন্য পড়া হয়। কিন্তু এখন সাধারণত মনে করা হয় সূরা ইয়াসীন কেবল মুমূর্ষু রোগীর প্রাণ বের হওয়ার সময় পড়া উচিত।

 

সূরা ইয়াসীন তেলাওয়াতের স্থান—কাল—পাত্র

যেমন, কেউ যদি কোনো রোগী দেখতে যায় আর তার কষ্ট দেখে সূরা ইয়াসীন পড়তে শুরু করে তাহলে দেখবেন, তার ওপর কেমন সমালোচনার বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। অথচ মুমূর্ষু রোগীর নিকট এ জন্যই সূরা ইয়াসীন পড়া হচ্ছে যাতে এর বরকতে কষ্ট—যাতনা কিছুটা হালকা হয়। আর হায়াত থেকে থাকলে যেন সুস্থ হয়ে যায়। আর যদি মৃত্যু এসে গিয়ে থাকে তাহলে সহজে জীবন অবসান ঘটে।

 

প্রতিটি অসুবিধা ও অনভিপ্রেত অবস্থার ক্ষেত্রে ইন্না লিল্লাহ বলা সুন্নত

হাদীস শরীফে আছে, একবার রাতে ঘরের বাতি নিভে গেলে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ বললেন। হযরত আয়শা রাযি. প্রশ্ন করলেন, হযরত এটাও কি কোনো মুসিবত? অর্থাৎ হযরত আয়শা রাযি.—এর এ কথা জানা ছিল যে, ‘ইন্না লিল্লাহ’ মুসিবতের সময় পড়তে হয়। কিন্তু বাতি নেভার ঘটনা হবার ব্যাপারে তিনি দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন। কেননা বাহ্যত এ ঘটনা একটি মামুলি বিষয় ছিল। হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, অনভিপ্রেত যে—কোনো বিষয়ই মুসলমানদের জন্য মুসিবত। বাতি নিভে যাওয়া যদি অনভিপ্রেত না হয়, তাহলে তাও মুসিবত।

 

আপন বান্দাদের প্রতি আল্লাহ তাআলার দয়া—মায়া অপরিসীম

আর হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—এর ইরশাদের আলোকে পরিষ্কার হয়ে গিয়ে থাকবে, আল্লাহ পাক বান্দাদের নেকী প্রদানের কত সাধারণ সাধারণ বিষয়কে মাধ্যম বানিয়েছেন। এতে পরিষ্কার হয়ে গেল, আল্লাহ পাকের রহমত বাহানা তালাশ করে। এর চেয়েও চমকপ্রদ বিষয় হলো, হাদীস শরীফে আছে, কেউ যদি নিজের পকেটে কোনো কিছু রেখে ভুলে যায় আর এদিক—সেদিক তালাশ করে, তাহলে এই তালাশ করতে গিয়ে যে পেরেশানি হবে, আল্লাহ তাআলা এর বিনিময়ও তাকে নেকী প্রদান করবেন এবং গোনাহ ক্ষমা করবেন। একই অবস্থা পড়ে গেলে হোঁচট খেলে। এ ক্ষেত্রেও আল্লাহ পাকের খুব মায়া হয়। তাই প্রতিটি কাজেই নেকী দান করেন। তবে শর্ত হলো, কাজটি গোনাহের কাজ না হতে হবে।

 

ইন্না লিল্লাহ পড়ার দ্বারা মুসিবত হালকা হওয়ার কয়েকটি কারণ

তো ইন্নালিল্লাহ যে শেখানো হয়েছে তার কারণ হলো, এর দ্বারা দুঃখ—দুশ্চিন্তা লাঘব হয়। কেননা একে তো যখন তা পড়া হবে তখন তার বিষয়বস্তুটি অন্তরে তাজা ও জাগ্রত হবে যে, আমরা আল্লাহ পাকের মালিকানায় আর তিনি আমাদের মালিক। নিজ মালিকানায় যা ইচ্ছা তা করার পূর্ণ এখতিয়ার থাকে মালিকের। আর এতে যে দুঃখ লাঘব হবে তা বলা বাহুল্য। দ্বিতীয়ত এই ভাবনা তাজা হওয়ার দ্বারা আল্লাহ তাআলার মহব্বত বৃদ্ধি পায়। মহব্বতের বৈশিষ্ট্য হলো এর দ্বারা কঠিন থেকে কঠিন মুসিবতও হালকা হয়ে যায়।

দেখুন, যাদের কোনো বালক বা বাজারি নারীর সঙ্গে সম্পর্ক হয়ে যায়, তারা তাদের জন্য কত্ত সব বিপদাপদ বরদাশত করে। এমনকি তারা যদি তাদেরকে জুতাপেটাও করে তবুও তাতে তারা মজা পায় এবং গর্ব করে। জনশ্রম্নতি আছে, এক ব্যক্তির স্ত্রীর প্রতি তেমন আকর্ষণ ছিল না। ঘটনাক্রমে এক পতিতার সঙ্গে তার সম্পর্ক হয়ে গেল। স্ত্রী ভাবল, ওই পতিতা হয়তো আমার চেয়ে বেশি সুন্দরী। কিন্তু অনুসন্ধানে জানা গেল একেবারে কালো কুৎসিত। (এতে তার) স্ত্রীর বড়ই তাজ্জব বোধ হলো। এখন সে ভাবতে লাগল, তার এই আকর্ষণের কারণ কী? অনেক অনুসন্ধান ও চিন্তা—ভাবনার পর জানা গেল, এই লোক যখন তার কাছে যায় তখন সে দূর থেকেই তাকে গালমন্দ শুরু করে আর কাছে গেলে খুব জুতাপেটা করে।

(এই রহস্য উদ্ধারের পর স্ত্রী বলতে লাগল) এটা আর কী কঠিন কাজ। আজ থেকে আমিও এই কৌশল প্রয়োগ করব। যেই ভাবনা সেই কাজ। স্বামী যখন ঘরে এলো তখন সে দরজা থেকেই তাকে গালমন্দ শুরু করল এবং ঘরে প্রবেশের পর খুব জুতাপেটা করল। জুতাপেটা খাওয়ার পর সে বলতে লাগল, ব্যস, এখন থেকে আর কোথাও যাব না। আজ পর্যন্ত তোর মধ্যে এটুকুই কমতি ছিল, তো এখন সেটাও পূর্ণ হয়ে গেছে।

এই গল্প থেকে জানা গেল পার্থিব মহব্বতের ক্ষেত্রে যদি প্রিয়জনের পক্ষ থেকে কোনো বিপদও আসে, তাও খুশি ও আনন্দের উপকরণ হয়ে থাকে। অথচ এই পার্থিব মহব্বতের মূল্যই—বা কতটুকু। এই মহব্বতের স্বরূপ হলো পরিণামে লজ্জা ও অনুতাপ। কেননা এর ভিত্তি হলো রং—রূপ। এক সময় তা ফিকে হয়ে যায়। তাই মানুষকে অনুতপ্ত হতে হয়। অবশ্য আল্লাহ তাআলার সঙ্গে যে মহব্বত হয় তা বিবেচনাযোগ্য হয়ে থাকে। কেননা আল্লাহ তাআলা আমাদের আপনজন বানিয়েছেন। আর বলা বাহুল্য আপনজনদের সঙ্গে মহব্বত হয়ে থাকে। প্রেমিক কখনো প্রিয়জনকে কষ্ট দেয় না। সুতরাং বাহ্যত আমরা যে কষ্টের স্বীকার হই তা এমনই যেমন বাবা—মা শিশুর ফোড়ায়—যা তাকে ভীষণ যন্ত্রণাকাতর করে রাখে কিংবা ভবিষ্যতে যন্ত্রণাগ্রস্ত করতে পারে—ছুড়ি চালায়, যাতে বাহ্যত কষ্টও হয় কিন্তু প্রকৃতপক্ষে পূর্ণ আরাম ও শান্তির ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে। এই কষ্টের ক্ষেত্রে এমন অবস্থা হয়ে থাকে যে, বাচ্চা ভয় পায় অথচ বাবা—মা খুশি। এমনকি যে অস্ত্র চালায় তাকে পুরস্কার দেয়। তবে যদি কোনো অজ্ঞ লোক তাজ্জববোধ করে প্রশ্ন করে, এই পুরস্কার কীসের? এই লোক তো বাচ্চাকে কষ্ট দিয়েছে, এর তো সাজা হওয়া উচিত। তাহলে বাবা—মা বলবে, নির্বোধ, এটা তো কষ্ট নয়; বরং এটা প্রকৃত সুখ। কেননা এটা এমন কষ্ট যার সুবাদে সন্তানের জীবনের আশা জেগে উঠেছে। নতুবা এই ফোড়া বড় হলে তার বিষ সারা দেহে ছড়িয়ে পড়ত, ছেলের জীবন নাশ হতো। তো বাবা—মার অস্ত্র ব্যবহার ও কষ্টদানটা যখন অপ্রিয় নয়—কেননা তা সুস্থতার জন্য—আল্লাহ পাকের তো বান্দার প্রতি হাজারো গুণ বেশি মহব্বত, তখন তিনি যদি বান্দাকে অভাব—অনটনে ফেলেন কিংবা কোনো মুসিবতে ফেলেন, তাহলে কেন তাকে অস্ত্রপচারের মতো মনে করা হয় না। তো ইলমের ফায়দা হলো এই। যা সম্পদ দ্বারা হয় না, হতে পারে না। এই ফায়দা তো দুনিয়াতে হয় আর সবচেয়ে বড় ফায়দা হলো এই যে, ঈমানের সঙ্গে মৃত্যু নসীব হয় আর এটা ইলমে দীনের সুবাদে হয়।

 

জাহেলের শেষ অবস্থা অধিকাংশ সময় খারাপ হয়ে থাকে আর জাহেল দ্বারা আমাদের উদ্দেশ্য

জাহেল ব্যক্তির শেষ অবস্থা বেশিরভাগ খারাপ হয়ে থাকে। তবে জাহেল দ্বারা আমাদের উদ্দেশ্য হলো—না নিজে পড়াশোনা করে আর না আলেমদের সোহবতে যায় আর না জিজ্ঞেস করে। তো এমন ব্যক্তির ঈমানের ভরসা নেই। কেননা এই ব্যক্তির মৃত্যুকালে শয়তান তাকে এভাবে বোঝায় যে, এখন তোমাকে নিজের সব প্রিয় প্রিয় জিনিস ছেড়ে যেতে হচ্ছে। আল্লাহ তাআলা তোমাকে এসব ছাড়তে বাধ্য করছে। ফলাফল এই দাঁড়ায় যে, আল্লাহ পাকের প্রতি তার ঘৃণা সৃষ্টি হয়ে যায়। ফলে কুফর অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। পক্ষান্তরে যদি তার ইলম থাকত তাহলে এ ধরনের আশঙ্কা থাকত না। তবে আলেম দ্বারা বিশেষ অর্থে আরবী পড়–য়া আলেম উদ্দেশ্য নয়; বরং হয় স্বশিক্ষিত কিংবা আলেমদের সোহবতে থেকে ইলম হাসেল করে নিয়েছে কিংবা আলেমদের প্রশ্ন করে করে দীনের জরুরি বিষয়াবলির ইলম হাসিল করে নিয়েছে। মোটকথা ইলম এক অসাধারণ নেয়ামত। কিন্তু এ কালে দুনিয়াকে এতটাই মুখ্য উদ্দেশ্য বানিয়ে রাখা হয়েছে যে, বহু লোক আলেমদেরকে উন্নয়নের পথে অন্তরায় বিবেচনা করে থাকে এবং তাদের নির্বোধ মনে করে থাকে।

 

দীনের মহব্বত হৃদয়ে বদ্ধমূল না হলে জাহেরি নামায—রোযা তেমন কোনো কাজের নয়

আর তাদের নামায—রোযাও সাধারণত কোনো চাপের কারণে না হলেও যেহেতু তা অন্তরের অন্তস্তল থেকে হয় না, তাই তা ততটা উপকারীও হয় না। তাদের অবস্থা ঠিক তেমন যেমন এক তোতা পাখিকে কেউ اَلَمْ  تَرَ کَیْفَ শিখিয়ে দিয়েছিল। সে সারাক্ষণ নির্দ্বিধায় তা—ই রটতে থাকত। কিন্তু বিড়ালের হামলার কবলে পড়লে কি তার এই সূরা মনে থাকবে? কখনই নয়। কেননা তার দিলে কিছুই নেই।

রসপ্রিয় এক লোক তোতার উচ্চারিত শব্দমান দিয়ে তার মৃত্যুতারিখ নির্ধারণ করেছে। যদিও সে তা নিছক ঠাট্টাচ্ছলে লিখেছে কিন্তু বিষয়টা খুব তাৎপর্যপূর্ণ ও বড় কাজের। এক তোতার আকস্মিক মৃত্যু ঘটেছিল। মৃত্যুকালে তার উচ্চারিত ٹے ٹے টে টে শব্দগুলোর মান যোগ করে দাঁড়িয়েছে ১২৩০। রসিক :

مياں مٹھو جو ذاکر حق تھے رات

دن ذکر حق رٹا کرتے

মিষ্টিভাষী যিকিরকারী, রাত—দিন তার মুখে যিকির

گربہ موت نے جو آدابا

مضطرب ہو کے اور گبھراکے

বিড়াল যখন দিল হানা ভয়ে তটস্থ হয়ে গিয়ে

چونچ ميں لے کے پانی کی کلھيا

 کچھ نہ بولے سوائے  ٹے  ٹے  ٹے

ঠোঁটে পান—পাত্র নিয়ে টেঁ টেঁ ছাড়া আর কিছুই মুখ দিয়ে বের হলো না।

ٹ এর বর্ণমান ت এর বর্ণমানের সমান। ت এর বর্ণমান ৪০০, তিন ٹ এর বর্ণমান ১২০০ আর ی এর বর্ণমান ১০। সুতরাং তিন ی এর বর্ণমান ৩০—সর্বমোট ১২৩০।

সারকথা হলো—তোতা পাখির যিকির নিছক মুখের ছিল, অন্তরে বদ্ধমূল ছিল না। তাই বিপদের সময় তার কোনো কিছু স্মরণ রয়নি আর ট্যাঁ ট্যাঁ করতে করতেই তার জীবনযাপন ঘটেছে। মনে রাখবেন, দীনের মহব্বত যদি হৃদয়ে বদ্ধমূল না হয় তাহলে বাহ্যত যা দেখা যায় তার সবই খোলসমাত্র। যা ওপর থেকে খুব আকর্ষণীয় ও চাকচিক্যপূর্ণ মনে হয়, কিন্তু ভেতরে একেবারে সাদা।

প্রসিদ্ধ আছে, এক মৌরুসী ফারায়েয লেখানোর জন্য কারও নিকট খাম নিয়ে এলো। যার কাছে নিয়ে এলেন তিনি দেখলেন খামের উপরিভাগ নাম—ঠিকানাবিহীন একেবারে সাদা। কারণ জানতে চাইলে সে উত্তর দিল, হুযুর, খুব তাড়াহুড়া করে চিঠিটি দিয়েছেন তো তাই নাম—ঠিকানা লেখার ফুরসত হয়নি।

হুযুর ভাবলেন, ভেতরে হয়তো ওয়ারিশদের বিবরণ থাকবে। তাই তিনি খাম খুলে দেখতে পেলেন তা—ও একেবারে সাদা―কালির অঁাচড়টুকু পর্যন্ত নেই। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ব্যাপার কি ভাই?

মৌরুসী উত্তর দিল, হুযুর, আগেই বলেছি, খুব তাড়াহুড়া করে পত্রটি দিয়েছেন তো তাই কিছু লেখার সুযোগ হয়নি।

 

লৌকিকতার কদর্যতা ও এখলাসের শিক্ষা

আমাদের বেশিরভাগের অবস্থা তো হুবহু এমনই—ভেতর—বাহির উভয়টাই একেবারে আঠকোরা। যাদের কিছু আছে তাদের অবস্থাও নিছক বাহ্যিক চাকচিক্য ও আড়ম্বর। কিন্তু ভেতরটা একেবারে অন্তঃসারশূন্য। অথচ প্রয়োজন ছিল বাইরের খোলসটা চাকচিক্যপূর্ণ না হোক কিন্তু ভেতরটা সার ও নির্যাসপূর্ণ হোক। তদ্রূপ আমাদের যদি অনেক নফল আদায় ও অনেক যিকির—শোগলের সুযোগ না হয়, দরবেশদের বেশ—ভূষা ধারণ করার তাওফীক না হোক, অন্তত ভেতরটা তো আল্লাহ পাকের মহব্বতে পূর্ণ থাকার দরকার ছিল। প্রকৃত ইলম তা—ই যা দ্বারা অন্তরে মহব্বত ও মারেফতের মহা দৌলত নসীব হয়। এই ইলমের কথাকেই হযরত আলী রাযি. নিম্নে বর্ণিত শব্দমালায় ব্যক্ত করেছেন―

رضينا قسمة الجبار فينا

لنا علم و للجهال مال

আল্লাহ পাকের এই বণ্টনে আমরা খুবই খুশি যে, তিনি আমাদের দিয়েছেন ইলম আর মূর্খদের দিয়েছেন সম্পদ।

 

এ কালে মূর্খতা নিয়ে গর্ব করা হয়

কিন্তু এ কালের অবস্থা এতটাই নিদারুণ যে, মূর্খতা নিয়েই বড়াই করা হয়। এ নিয়ে তাদের প্রশ্ন করা উচিত যে তোমাদের আবার কীসের বড়াই। কেননা আলেম যদি আমলবিহীনও হয় তাহলে তবুও তিনি তোমাদের থেকে হাজার গুণে ভালো। কেননা তিনি রোগী, কিন্তু রোগী হলেও তার ব্যবস্থাপত্র জানা আছে। যখন একটু সতর্ক হবে তখন চিকিৎসা করিয়ে নেবে। পক্ষান্তরে তোমরা আপাদমস্তক রোগী, অথচ তোমাদের না রোগের খবর আছে আর না ব্যবস্থাপত্রের। মোটকথা মূর্খতা কোনো অবস্থাতেই বড়াই করার কিছু নয়।

 

কতক মূর্খের বড়াইয়ের কারণ

কিন্তু কতক মূর্খ এই কারণে বড়াই করে যে আমরা ওই সকল হুঁশিয়ারি ও অসন্তোষ থেকে মুক্ত, যা কোরআনে কারীমে আলেমদের প্রসঙ্গে প্রকাশ করা হয়েছে। একে তো সেসব ইলম দ্বারা বিশেষ করে হুযুর—মাওলানারা উদ্দেশ্য নয়; বরং নিছক জানা উদ্দেশ্য। তো এমন অল্পবিস্তর ইলম সবারই থাকে। দ্বিতীয়ত ইলম না থাকলেও দায়মুক্ত হওয়ার সুযোগ নেই। কেননা ইলম না থাকার দায়টা আরও মারাত্মক। কেননা ইলম আমলের ভিত্তি, তাই প্রতিটি জিনিসের ভিত্তি আরও বেশি জরুরি হয়ে থাকে, আরও বেশি চেষ্টা—পরিশ্রম দাবি করে থাকে। اَتَاْمُرُوْنَ النَّاسَ بِالْبِرِّ আয়াতের অভিযোগ থেকে অশিক্ষিত ব্যক্তিও মুক্ত নয়।

এখন আমি আলোচনা করছি যে, এ আয়াতের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া থেকে অশিক্ষিত লোকও কেন মুক্ত নয়। এ বিষয়টি বোঝার জন্য অভিযোগটির স্বরূপ নিয়ে চিন্তা করা প্রয়োজন―যা আমি এ আয়াত থেকে প্রমাণ করছি। কান পেতে মন দিয়ে শুনুন এই অভিযোগের স্বরূপ (যা আয়াতের আসল উদ্দেশ্য আর যা আলেম—জাহেল সবার মধ্যেই বিদ্যমান আর যা অতি বিষাক্ত উপাদান।)। তা এই―আমরা নিজেদের দোষ—ত্রুটি দেখি না; বরং অন্যদের দোষ—ত্রুটি দেখি। আমরা দিন—রাত অন্যদের আলোচনা—সমালোচনায় ব্যস্ত থাকি। তাদের দোষ—ত্রুটি খুঁজে বের করি। কিন্তু এদিকে লক্ষ করি না, আমার মধ্যে কী দোষ—ত্রুটি আছে। আমার দোষ—ত্রুটি অন্যের তুলনায় বেশি ও গুরুতর কি না? অন্যকে উপদেশ দেওয়াটা নির্ভর করে তার দোষ—ত্রুটির প্রতি নজর রাখার ওপর। তদুপরি এর সঙ্গে যদি ‘নিজেকে ভুলে থাকা’র বিষয়টি মিলিয়ে দেখা হয় তাহলে এর সারকথা এই দাঁড়াবে, তোমরা অন্যদের দোষ—ত্রুটি দেখো কিন্তু নিজেদের দোষ—ত্রুটি দেখো না। এ রোগের এতটা বিস্তার ঘটেছে যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা মুখেও প্রকাশ করা হয়।

 

মহামারি শ্রেণির রোগ—ব্যাধির মূল কারণ গোনাহ

যেমন, যখন কোনো মহামারি ছড়িয়ে পড়ে তখন অধিকাংশ মানুষের এই অনুভূতিই থাকে না যে এসব বিপদাপদে পাপাচারের কোনো ভূমিকা আছে। বরং জলবায়ূর দূষণকে দায়ী করে থাকে। তাদের চিন্তা—চেতনা এতদূর যেতেই পারে না যে, পাপেরও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রয়েছে। অথচ এটা তাদের মারাত্মক ভ্রান্তি। তাদের নিকট আমার প্রশ্ন, জলবায়ূর দূষণ কেন ঘটল?

উত্তরে যদি বলা হয়, অতি গরম কিংবা অতি শীতের কারণে এমনটা হয়েছে। তাহলে আমি প্রশ্ন করব, গরম কিংবা শীতে অতিমাত্রাটা যোগ হলো কেন?

এই প্রশ্নোত্তর যার সমাপ্তি ঘটবে আল্লাহ পাকের ইচ্ছা ও এরাদা পর্যন্ত গিয়ে। মুসলমানকে লক্ষ্য করেই, কোনো অমুসলমানকে লক্ষ্য করে নয়। যদিও এসব প্রশ্নের উত্তর আমাদের কাছে বিদ্যমান। আল্লাহ পাকের শোকর, আমরা সেসব প্রশ্নের উত্তর প্রদানে অপারগও নই, তবে এখনকার প্রসঙ্গ তা নয়।

মোটকথা মুসলমান আমজনতা যে জিনিসকে কারণ আখ্যায়িত করবে আমরা সে ব্যাপারেই প্রশ্ন করব, এটা কেন ঘটল, এর কারণ কী? একপর্যায়ে গিয়ে অবশ্যই তাদের স্বীকার করতে হবে, আল্লাহ তাআলার হুকুমে ঘটেছে। তখন আমরা প্রশ্ন করব, এই সময়ে এমন হুকুম জারি করার কারণ কী, যা দ্বারা এ বিপদ দেখা দিয়েছে? তারপর আমরাই কোরআন শরীফ থেকে এর উত্তর দেব। কারণ হলো পাপাচারের ফলে আল্লাহ তাআলা তোমাদের প্রতি অসন্তুষ্ট হয়ে বিপদাপদে আক্রান্ত করেছেন। যেমন তিনি বলেছেন,

وَ مَاۤ  اَصَابَكُمْ مِّنْ مُّصِیْبَۃٍ  فَبِمَا کَسَبَتْ اَیْدِیْكُمْ وَ یَعْفُوْا عَنْ کَثِیْرٍ ﴿ؕ۳۰﴾

অর্থাৎ তোমরা যেসব বিপদাপদে আক্রান্ত হও তা তোমাদের কৃতকর্মের কারণেই আক্রান্ত হও। আর অনেক বিষয়ই আল্লাহ পাক এড়িয়ে যান।—সূরা শূরা, ৪২ : ৩০

এ উদাহরণ এমন যে, কাউকে ফাঁসি দেওয়া হলো। এখন এর মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে বাহ্যিক অবস্থা অবলোকনকারী এ কথাই বলবে, ফাঁসিতে ঝুলে মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু একজন বুদ্ধিমান মানুষ এটুকুতেই থেমে থাকবে না; বরং প্রশ্ন করবে, ফাঁসিতে কেন ঝুলানো হলো? উত্তরে যদি বলা হয়, একজন ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিয়েছে। তাহলে প্রশ্ন হবে, সে কেন ঝুলিয়ে দিল? এর উত্তর আসবে বিচারপতি নির্দেশ দিয়েছিল। তো সর্বশেষ কারণ বিচারকের নির্দেশে এসে ঠেকল। কিন্তু এখনো এই প্রশ্ন বাকি রয়ে গেছে যে, বিচারক এ নির্দেশ কেন দিলেন? উত্তর আসবে, এ লোক একজনকে হত্যা করেছিল কিংবা ডাকাতি করেছিল। এ উত্তরের পর ফাঁসির আসল কারণ পরিষ্কার হয়ে যায়। তদ্রূপ মহামারিও আল্লাহ তাআলার হুকুমে আসে। কিন্তু আল্লাহ তাআলার হুকুম আমাদের অপরাধের কারণে। একে কোরআন শরীফ এভাবে উল্লেখ করেছে,

فَلَمَّاۤ  اٰسَفُوْنَا انْتَقَمْنَا مِنْهُمْ

যখন তারা আমাকে ক্রুদ্ধ করল তখন আমি তাদের থেকে প্রতিশোধ নিলাম।—সূরা যুখরুফ, ৪৩ : ৫৫

জায়াউল আমাল নামে আমার একটি পুস্তিকা আছে, তাতে এ বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। আল্লাহ পাকের শোকর, তাতে এ বিষয়টি প্রমাণিত করা হয়েছে যে আমরা যে—কোনো পেরেশানি কিংবা কষ্টের শিকার হই, আমাদের বদ আমলের কারণেই হই। তো মানুষের বুদ্ধির দৌড় শুধু জাহেরি কারণ পর্যন্ত।

 

সমাজে দীনদার বলে গণ্য মানুষজনও অন্যদের গোনাহকে বিপদাপদের কারণ মনে করে

তবে যারা কিছুটা দীনদার ও সমঝদার তারা যদিও এসব মহামারিকে আল্লাহ পাকের হুকুম বলে স্বীকার করে আর এ কথাও বলে যে, গোনাহের কারণেই আল্লাহ পাকের হুকুমে এমনটা ঘটেছে। কিন্তু এ জন্য তারা সদা অন্যদের গোনাহকেই দায়ী করে থাকে। ওপরে এ কথাই আমরা আলোচনা করে এসেছি যে, আমাদের নজর থাকে সর্বদা অন্যদের দোষত্রুটির ওপর। যেমন, বেশিরভাগ লোককেই দেখে থাকবেন অন্যদের যিনা—জুয়ায় লিপ্ত দেখে মন্তব্য করে, এ জন্যই তো দুর্ভিক্ষ দেখা দিচ্ছে। কিন্তু কখনো কাউকে এমনটা দেখা যাবে না যে, তিনি নিজের বদ আমলকে এর কারণ আখ্যায়িত করেছেন। অথচ বেশি দরকার ছিল এ জিনিসটির।

হযরত যুননূন মিসরী রহ.—এর কাছে লোকেরা দুর্ভিক্ষের অভিযোগ করে দুআ চাইল। তিনি আরজ করলেন, এলাকা থেকে আমার বহিষ্কার ছাড়া দুর্ভিক্ষ দূর হওয়ার আর কোনো পথ আমি দেখি না। কেননা আমার পাপের কারণেই লোকজন এই মুসিবতের শিকার। আর শুধু বলেই ক্ষান্ত থাকেননি; বরং এলাকা ছেড়ে চলেও গিয়েছেন।

জনৈক বুযুর্গ বলতেন, রেলগাড়িতে চড়লে আমি আল্লাহ পাকের কাছে দুআ করি, হে আল্লাহ, আমার গোনাহের কারণে এসব মানুষ যেন ধ্বংস না হয়ে যায়।

এসব সেই অনাচারই যার চিকিৎসা ও সংশোধন করেছেন আল্লাহওয়ালারা। তাই তারা সর্বদা বলে থাকেন, অন্যের দোষ আর নিজের ভালো দেখতে নেই। কিন্তু আমাদের এখানকার রাত—দিনের সবক হলো এটাই যে, আমরা এমন আমরা তেমন, ওরা এহেন তারা এহেন। ইমাম গাযালী রহ. বলেন, হে প্রিয়, তোমার দৃষ্টান্ত হলো ওই ব্যক্তির মতো যার সারা গায়ে সাপ—বিচ্ছু লেপ্টে আছে। পক্ষান্তরে অন্যের গায়ে একটি মাছি বসে আছে আর তুমি তাকে মাছি বসে থাকার বিষয় নিয়ে তিরস্কার করছ। অথচ নিজের গায়ে লেপ্টে থাকা সাপ—বিচ্ছুর খবর নেই, যা যে—কোনো মুহূর্তে দংশন করে তোমাকে ধ্বংস করে দিতে পারে।

আরেক বুযুর্গ বলেন, আমাদের নিজের চোখের শাহতীরও নজরে পড়ে না, অথচ অন্যের চোখের তিনকাও আমাদের দৃষ্টি এড়ায় না। তা নিয়েই আমাদের যত আলোচনা—সমালোচনা, অথচ এ দুটো আলাদা আলাদা দোষ। কেননা নিজের দোষত্রুটি না দেখা যেমন গোনাহ তেমনই বিনা প্রয়োজনে অন্যের দোষত্রুটি দেখাও গোনাহ। আর বিনা প্রয়োজন দ্বারা উদ্দেশ্য হলো—তা শরীয়তের দৃষ্টিতে জরুরি নয়।

[চলবে, ইনশাআল্লাহ]

Avatar

zobayer

একটি কমেন্ট করুন