প্রতিষ্ঠাতা: মুজাহিদে আযম হযরত মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.

জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ, ঢাকা-এর মুখপত্র

প্রতিষ্ঠাকালঃ ১৯৩৭ ঈসায়ী

ফত্ওয়া জিজ্ঞাসা

ফত্ওয়া জিজ্ঞাসা

জানাযা—কাফন—দাফন

ইমামুল হাসান

গাজীপুর

১৫৪৯. প্রশ্ন : আমাদের এলাকায় এক মহিলা জায়গা কিনে বাড়ি নির্মাণ করেছে। বাড়ির জায়গায় পুরাতন কিছু কবর ছিল। কবরের ওপরে বাড়ি নির্মাণের কারণে এলাকার মানুষ বলাবলি করে যে, কবরের ওপর বাড়ি বানানো ঠিক না। এখন জানার বিষয় হলো, মালিকানাধীন জায়গায় পুরাতন কবরের ওপর বাড়ি নির্মাণের শরঈ হুকুম কী?

উত্তর : কবরের ওপর বাড়ি নির্মাণের শরঈ হুকুম হলো, যদি মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার পর এই পরিমাণ সময় অতিবাহিত হয়ে যায় যে, মৃত ব্যক্তির শরীর মাটির সঙ্গে মিশে মাটি হয়ে গেছে, তাহলে ওই কবরের ওপর বাড়ি নির্মাণ করা জায়েয আছে।—রদ্দুল মুহতার : ৩/১৩৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ১/২২৮; তাবয়ীনুল হাক্বায়িক : ১/৫৮৯; কিফায়াতুল মুফতী : ১০/৫০৬; কিতাবুন নাওয়াযিল : ১৪/৩২৯

 

শহিদুল্লাহ সাহেব

ঢাকা

১৫৫০. প্রশ্ন : একটি সরকারি মাঠের এক কর্ণারে চল্লিশ বছরের পুরাতন একটি কবর আছে। বর্তমানে সরকারি কাজের সুবিধার্থে কবরটি অন্যত্র স্থানান্তর করা প্রয়োজন। উল্লেখ্য, এখানে দাফন করার সময় সরকারিভাবে অনুমতি নেওয়া হয়নি। মুফতী সাহেবের কাছে জানার বিষয় হলো, উক্ত কবরটি স্থানান্তর করা শরঈ দৃষ্টিকোণ থেকে জায়েয হবে কি?

উত্তর : অন্যের মালিকানাধীন জায়গায় অনুমতি ছাড়া দাফন করা হলে যদি মৃত ব্যক্তির শরীরের অঙ্গ—প্রত্যঙ্গ খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তাহলে প্রয়োজনে কবর স্থানান্তর করার অবকাশ আছে। আর যদি যুগ যুগ সময় অতিবাহিত হওয়ায় মৃত ব্যক্তির অঙ্গ—প্রত্যঙ্গ মাটিতে রূপান্তরিত হয়ে যায়, তাহলে স্থানান্তরের কোনো প্রয়োজন নেই। প্রশ্নোক্ত কবরটি যেহেতু চল্লিশ বছরের পুরাতন, তাই মৃত ব্যক্তির অঙ্গ—প্রত্যঙ্গ খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। সুতরাং কবরটি স্থানান্তর করতে হবে না; বরং তার উপরিভাগ মাটির সাথে সমান করে সে জায়গাটি প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করা যাবে।—রদ্দুল মুহতার (আদ্দুররুল মুখতারসহ); ৩/১৭১; তাবয়ীনুল হাক্বায়িক : ১/৫৮৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ১/২২৮; রদ্দুল মুহতার (আদ্দুররুল মুখতারসহ) : ৩/১৬৩; আহসানুল ফাতাওয়া : ৪/২০৩

 

যাকাত

ডা. হেলাল উদ্দীন

আড়াইহাজার, নারায়ণগঞ্জ

১৫৫১. প্রশ্ন : আমার স্ত্রী পিতৃ সম্পত্তি হিসেবে ১ লক্ষ বিশ হাজার টাকা পায়। সে এই টাকা দিয়ে উমরা করার ইচ্ছা পোষণ করেছে। এ জন্য সে এই টাকাগুলো আমার কাছে জমা রেখেছে। এখন আমার জানার বিষয় হলো আমার কাছে থাকা তার এই টাকাগুলোর কারণে তার ওপর যাকাত ফরয হবে?

উত্তর : যাকাত ফরজ হবে।—রদ্দুল মুহতার : ৩/১৭৯; আলবাহরুর রায়েক : ২/৩৬১; ফাতাওয়া দারুল উলূম দেওবন্দ : ৬/৬৪; ফাতাওয়া কাসেমিয়া : ১০/৩০৬

 

ইতেকাফ

নিয়ামাতুল্লাহ

নড়িয়া, শরীয়তপুর

১৫৫২. প্রশ্ন : মুহতারাম, আমি কয়েক বছর পূর্বে রমযানে ইতেকাফে বসি। দুদিন মসজিদে অবস্থানের পর অসুস্থতার দরুন বাড়িতে চলে যাই। সুতরাং জানার বিষয় হলো উক্ত ইতেকাফ ভেঙে বাড়িতে চলে যাওয়ার কারণে আমার ওপর শরঈ কী বিধান বর্তাবে? দশ দিনের ইতেকাফ কাযা করব, না যেদিন বাড়িতে এসেছি সেদিনের?

উত্তর : প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী একদিনের ইতেকাফ কাযা করাই যথেষ্ট। তবে পূর্ণ দশ দিনের ইতেকাফ কাযা করে নেওয়া উত্তম। উল্লেখ্য, উক্ত ইতেকাফের সাথে রোযা রাখা আবশ্যক।—রদ্দুল মুহতার : ২/৪৪৫; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া : ৩/৪৪৭; আলজাওহারাতুন নাইয়্যিরাহ : ২/৩০৫; ফাতাওয়া মাহমূদিয়া : ১৫/২৫৮; ফাতাওয়া উসমানী : ২/১৯৬

হজ

মুহা. সাজিদুর রহমান

সূত্রাপুর, ঢাকা।

১৫৫৩. প্রশ্ন : ক. আমার বয়োবৃদ্ধ নানার ওপর হজ ফরয হয়ে আছে, কিন্তু তিনি শারীরিক দুর্বলতা ও অসুস্থতার দরুন নিজে গিয়ে হজ আদায় করতে সক্ষম নন। এমতাবস্থায় তার জীবদ্দশায় তার পক্ষ থেকে বদলি হজ করানো যাবে কি?

খ. করানো গেলে কারা তার পক্ষ থেকে বদলি হজ করতে পারবে?

গ. আর এই হজের ব্যয়ভার কে বহন করবে?

উত্তর : ক. আপনার নানা যদি এমন অসুস্থ হন যে, মৃত্যুর আগে সুস্থ হয়ে নিজে গিয়ে হজ আদায় করতে পারবেন—এমন সম্ভাবনা নেই, তাহলে তার জীবদ্দশায় তার পক্ষ থেকে বদলি হজ করানো যাবে। কিন্তু যদি এর পরে আপনার নানা সুস্থ হয়ে যান (এবং তার কাছে হজ ফরয হওয়ার মতো সম্পদ থাকে) তাহলে পুনরায় তার হজ করতে হবে।

খ. যে—কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের বালেগ মুসলিম ব্যক্তিই বদলি হজ করতে পারবে। তবে উত্তম হলো এমন ব্যক্তিকে দিয়ে বদলি হজ করানো, যে নিজের হজ আদায় করেছে এবং তার হজের মাসায়েল ভালোভাবে জানা আছে। তবে যে ব্যক্তির ওপর হজ ফরয হয়ে আছে কিন্তু সে তার হজ আদায় করেনি, এমন ব্যক্তির দ্বারা বদলি হজ করা মাকরুহ।

গ. বদলি হজ করানোর জন্য হজের যাবতীয় খরচ অথবা তার অধিকাংশ আপনার নানার পক্ষ থেকে প্রদান করতে হবে। তবে যাকে দিয়ে হজ করানো হচ্ছে সে ইচ্ছে করলে নিজের পক্ষ থেকেও সামান্য কিছু ব্যয় করতে পারবে।—আদ্দুররুল মুখতার : ২/৫৯৮—৬০০, ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ১/৩২১—৩২২; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া : ৩/৬৪৬; ফাতাওয়া মাহমূদিয়া : ১০/৪১৮

 

মুআমালা—লেনদেন

১৫৫৪. প্রশ্ন : বর্তমানে প্রায় সকল লেখকই নিজ গ্রন্থের প্রকাশনা স্বত্ব নিজ হাতে সংরক্ষিত রাখে অথবা অন্য কোনো প্রকাশনা সংস্থার কাছে বিক্রি করে দেয়, যাতে অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য বিনা অনুমতিতে মুদ্রণ ও বাজারজাত করার অধিকার থাকে না। এতৎসত্ত্বেও দেশি—বিদেশি বহু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বিনা অনুমতিতে তা মুদ্রণ ও বাজারজাত করে থাকে। আবার অনেকেই বিদেশি বই অত্যন্ত ব্যয়বহুল কিংবা দুষ্প্রাপ্য হওয়ায় ব্যক্তিগতভাবে ফটোকপি করে উপকৃত হয়ে থাকে। এখন জানার বিষয় হলো,

ক. প্রকাশনা স্বত্ব সংরক্ষিত রাখা কিংবা অন্যের কাছে বিক্রি করার হুকুম কী?

খ. ‘স্বত্ব সংরক্ষিত’ এমন কোনো গ্রন্থ লেখকের অনুমতি ব্যতীত বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ছাপিয়ে বাজারজাত করার বিধান কী?

গ. বিদেশি বই অত্যন্ত ব্যয়বহুল কিংবা দুষ্প্রাপ্য হওয়ায় (কোনো বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য ছাড়া) ব্যক্তিগতভাবে অধ্যয়নের জন্য ফটোকপি করার বিধান কী?

উত্তর : ক. যখন কোনো ব্যক্তি নতুন কোনো বস্তু উদ্ভাবন করে, নিঃসন্দেহে সে অন্যদের তুলনায় তা দ্বারা উপকৃত হওয়া এবং বাণিজ্যিকভাবে তা বাজারজাত করার অধিক হকদার। হাদীস শরীফে এসেছে, হযরত আসমার বিন মুযাররিস রাযি. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—এর কাছে উপস্থিত হয়ে বাইয়াত গ্রহণ করি। তখন তিনি বলেন, যখন কোনো ব্যক্তি এমন কোনো বস্তুতে অগ্রগামী হয়, যাতে অন্য কোনো মুসলিম অগ্রগামী হয়নি, সেটা তার।—সুনানে আবু দাউদ, হাদীস নং ৩০৭১

তেমনইভাবে যখন কোনো লেখক নিজ মেধা, শ্রম, সময় ও অর্থ ব্যয় করে কোনো কিতাব রচনা করেন, তখন খুব স্বভাবিকভাবেই তা বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করার অধিকারও তারই। ইলমের প্রচার—প্রসারের পাশাপাশি লেখকের আর্থিক লাভ—ক্ষতির বিষয়টিও এর সঙ্গে জড়িত। তাই লেখক কর্তৃক কোনো কিতাবের স্বত্ব সংরক্ষিত রাখা দূষণীয় কিছু নয়। বিশেষত সরকারি কপিরাইট অধিদপ্তর কর্তৃক লেখক যখন তাঁর বইয়ের নিবন্ধন করে নেয়, তখন রাষ্ট্রীয় নীতি ও জনসাধারণের প্রচলন অনুযায়ী সেটা তার জন্য বিক্রয়যোগ্য মূল্যবান সম্পদ হিসেবে পরিগণিত হয়। তখন সেটা বিক্রি করা তার জন্য বৈধ হয়ে যায়।

খ. কেউ যদি যথানিয়মে প্রকাশনা স্বত্ব সংরক্ষণ করে তাহলে অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য লেখকের অনুমতি ব্যতীত তা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পুনঃমুদ্রণ ও বাজারজাত করা জায়েয হবে না।

গ. যথানিয়মে প্রকাশনা স্বত্ব সংরক্ষণ করলে অন্যের জন্য এর বাণিজ্যিক ব্যবহার নাজায়েয হলেও ব্যক্তিগতভাবে অধ্যয়নের জন্য কিংবা কাউকে হাদিয়া দেওয়ার উদ্দেশ্যে ফটোকপি করা না জায়েয হবে না।—সুনানে আবু দাউদ : ৩০৭১; রদ্দুল মুহতার : ১/৬৬১; আলফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু : ৪/২৮৬; ফিকহুল বুয়ু : ১/২৮৩—২৮৬; কিতাবুন নাওয়াযিল : ১১/৫৩

 

মুহাম্মদ সাইফুল ইসলাম

রায় সাহেব বাজার জামে মসজিদ, ঢাকা

১৫৫৫. প্রশ্ন : কেউ সিকিউরিটি মানি হিসেবে এডভান্স টাকা দিয়ে কোনো ফ্ল্যাট ভাড়া নিল। এডভান্স দেওয়ার সময় সে শর্ত করল যে, সে মাসিক ফ্ল্যাট ভাড়া দেবে না অথবা নামমাত্র ভাড়া দেবে, যা নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অনেক কম। আর ফ্ল্যাট ছেড়ে যাওয়ার সময় বাড়িওয়ালা তাকে এডভান্সের পূর্ণ টাকা ফেরত দিয়ে দেবে। এইভাবে ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়া জায়েয আছে কি না?

উত্তর : এডভান্সের টাকার কারণে ফ্ল্যাটের ভাড়া না দেওয়া বা কম দেওয়ার শর্ত করা বৈধ নয়। এভাবে এটা সুদি কারবারের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। কারণ, এডভান্সের টাকা বাড়িওয়ালার কাছে করজ বা ঋণ হিসেবে থাকে। আর ঋণ দিয়ে কোনো ধরনের সুবিধা ভোগ করাকে ইসলামী শরীয়তে সুদ বলে। তাই এভাবে ফ্ল্যাট ভাড়া নেওয়া জায়েয নয়।—­মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক : ৮/১৪৫; রদ্দুল মুহতার : ৭/৪১৩; আপ কে মাসায়েল আওর উন কা হল : ৭/১৬৭

তানভীর আহমদ

নরসিংদী

১৫৫৬. প্রশ্ন : জনৈক ব্যক্তি এক মাসের ভাড়া অগ্রিম নিয়ে বাড়ি ভাড়া দিল এই শর্তে যে, ভাড়াটিয়া প্রতি মাসের ভাড়া নিয়মিত দিয়ে যাবে এবং অগ্রিম নেওয়া এক মাসের ভাড়ার টাকাটা সর্বশেষ যে মাসে ভাড়াটিয়া চলে যাবে সে মাসের ভাড়া হিসেবে গণ্য হবে। অতএব, মাননীয় মুফতী সাহেবের নিকট আমার জানার বিষয় হলো, উল্লিখিত পদ্ধতিতে ভাড়া দেওয়া—নেওয়া বৈধ হবে কি না এবং ভাড়াদাতা এই অগ্রিম ভাড়ার টাকা দিয়ে উপকৃত হতে পারবে কি না?

উত্তর : উল্লিখিত পদ্ধতিতে ভাড়া দেওয়া—নেওয়া বৈধ হবে এবং ভাড়াদাতা উক্ত অগ্রিম ভাড়ার টাকা দিয়ে উপকৃতও হতে পারবে। উল্লেখ্য, ভাড়াদাতা চুক্তি করে অগ্রিম ভাড়া গ্রহণের সাথে সাথে তার মালিক হয়ে যায়।—আদ্দুররুল মুখতার (রদ্দুল মুহতারসহ) : ৬/১০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ৪/৪৪৩; আলমুহীতুল বুরহানী : ১১/২৩৭

 

নাইমুল ইসলাম

গোপালগঞ্জ

১৫৫৭. প্রশ্ন : আমরা দুজন বন্ধু মিলে পনেরো হাজার টাকা মাসিক চুক্তিতে একটি বাসা ভাড়া নিই। এরপর অন্য একজনের কাছে বাসাটি মাসিক বিশ হাজার টাকার চুক্তিতে ভাড়া দিয়ে দিই। প্রতি মাসে বাসার মালিককে তার সাথে চুক্তি পরিমাণ পনেরো হাজার টাকা দিয়ে বাকি পাঁচ হাজার টাকা আমরা দুই বন্ধু মিলে ভাগ করে নিই। প্রশ্ন হলো, আমাদের এভাবে টাকা উপার্জন শরীয়তসম্মত কি না?

উত্তর : শরীয়তের দৃষ্টিতে নির্ধারিত মূল্যে বাসা ভাড়া নিয়ে অন্যের কাছে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত মূল্যে ভাড়া দেওয়ার জন্য দুটি শর্ত আছে :

১. ভাড়াটিয়া বাসায় কোনো কাজ করাবে যেমন রং করানো, যাতে করে অতিরিক্ত ভাড়া অতিরিক্ত কাজের বিনিময়ে হয়ে যায়।

২. ভাড়াটিয়া যে মুদ্রা দিয়ে বাসা ভাড়া নিয়েছে তা পরিবর্তন করে অন্য মুদ্রা দিয়ে অন্যের কাছে ভাড়া দেওয়া। যেমন ভাড়াটিয়া টাকা দিয়ে ভাড়া নিয়ে থাকলে অন্যের কাছে ডলার দিয়ে ভাড়া দেওয়া। অথবা ফসল ইত্যাদির বিনিময়ে ভাড়া দেওয়া।

সুতরাং কোনো ভাড়াটিয়া যদি ভাড়া বাসায় অতিরিক্ত কাজ না করে অথবা মুদ্রা পরিবর্তন না করে ভাড়া দেয়, তাহলে ভাড়াটিয়ার জন্য নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া জায়েয হবে না। যদি অতিরিক্ত ভাড়া গ্রহণ করে থাকে তাহলে অতিরিক্ত ভাড়া সদকা করে দিতে হবে।—মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক : ৮/২২২; আদ্দুররুল মুখতার (রদ্দুল মুতহারসহ) : ৯/৪৭—৪৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ৪/৪৫৭; কিতাবুন নাওয়াযিল : ১২/৩৩৯—৩৪০

 

মসজিদ—মাদরাসা—ওয়াক্ফ

মো: মোশারফ হোসেন

শিবচর, মাদারীপুর

১৫৫৮. প্রশ্ন : বিনীত নিবেদন এই যে, আমি প্রায় ৯ বছর যাবৎ পদ্মা সেতু বহুমুখী প্রকল্পের আওতাধীন মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলায় অবস্থিত বাখরের কান্দি পুনর্বাসন সাইট জামে মসজিদের খতিব ও ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছি। এ পুনর্বাসন সাইটে ৫১২ টি পয়েন্টে বর্তমানে ১০০০ লোক বসবাস করে। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য—সংখ্যক শিশু রয়েছে। তাদের লেখাপড়ার জন্য এখানে একটিমাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। স্থানীয় জনগণ তাদের সন্তানদের হাফেযে কোরআন বানানোসহ দ্বীনি ইলম প্রদানে বিশেষভাবে আগ্রহী। এমতাবস্থায় উক্ত মসজিদে নূরানী, নাজেরা ও হিফয মাদরাসা চালু করা যাবে কি না? এ বিষয়ে শরীয়তের নির্দেশনা জানাতে আপনার সদয় আজ্ঞা হয়।

উত্তর : মসজিদকে মসজিদ হিসেবে বহাল রেখে এবং মসজিদের আদব—সম্মান সম্পূর্ণরূপে রক্ষা করে মসজিদে দ্বীনি শিক্ষার ব্যবস্থা করা জায়েয আছে। তবে পাক—পবিত্রতা সম্পর্কে অসচেতন শিশুদের মসজিদে পড়ালে মসজিদের আদব রক্ষা করা সম্ভব হয় না। হাদীস শরীফে এমন শিশুদের মসজিদে আনতে নিষেধ করা হয়েছে। সুতরাং এমন শিশুদের মসজিদে পড়ানো জায়েয হবে না। তা ছাড়া মসজিদকে নিয়মিত ছাত্রাবাস বানানোর দ্বারা যথাযথভাবে মসজিদের আদব রক্ষা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই মাদরাসার আবাসিক ব্যবস্থাপনার জন্য ভিন্ন কোনো জায়গার ব্যবস্থা করা উচিত। তবে এমন ব্যবস্থা সম্ভব না হলে পাক—পবিত্রতার ব্যাপারে সচেতন বাচ্চাদের জন্য মসজিদে অস্থায়ীভাবে মাদরাসার কার্যক্রম চালু করতে পারবে। পরবর্তীতে যখনই মাদরাসার জন্য আলাদা জায়গার ব্যবস্থা হবে সেখানে তা স্থানান্তর করতে হবে। মসজিদকে স্থায়ীভাবে মাদরাসার আবাসিক ব্যবস্থাপনার জন্য ব্যবহার করা যাবে না।—সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং : ৭৫০; আদ্দুররুল মুখতার (রদ্দুল মুহতারসহ) : ৪/৩৫৮; রদ্দুল মুহতার : ১/৬৫৬, ৬/৪২৮; আলবাহরুর রায়েক : ৫/৪১৯; ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ৫/৩৭১; ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ২/৪১১; শরহে মুনইয়াতিল মুসলী লিল হালাবী : ৬১১; কিফায়াতুল মুফতী : ১০/১৭০; ফাতাওয়া মাহমূদিয়া : ২২/৪৭

 

মুহাম্মদ আবু সাঈদ

বীরগঞ্জ, দিনাজপুর

১৫৫৯. প্রশ্ন : আমাদের গ্রামের শেষ মাথায় একটি মসজিদ আছে। গ্রামের অপর প্রান্তের মুসল্লীদের জন্য সেখানে গিয়ে নামায আদায় করা কষ্টকর। তাই এলাকার লোকজন পুরাতন মসজিদটি ভেঙে গ্রামের মধ্যবর্তী স্থানে একটি নতুন মসজিদ নির্মাণ করতে চাচ্ছেন। মুহতারাম মুফতী সাহেবের সমীপে জানার বিষয় হলো, পুরাতন মসজিদটি ভেঙে অন্যত্র নতুন মসজিদ নির্মাণ করা সহীহ হবে কি না? এমতাবস্থায় পুরাতন মসজিদের জায়গাটি কী করা হবে? দয়া করে জানালে কৃতজ্ঞ হব।

উত্তর : যখন কোনো জায়গা নিয়মতান্ত্রিকভাবে মসজিদ হিসেবে নির্ধারিত হয়, কেয়ামত পর্যন্ত তা মসজিদের হুকুমেই থেকে যায়। সেটিকে বিলুপ্ত করা জায়েয নেই। সুতরাং আপনাদের গ্রামের শেষ প্রান্তে অবস্থিত মসজিদটি একেবারে বিলুপ্ত করে দেওয়া কোনোভাবেই জায়েয হবে না। সেটিকে আপন অবস্থায় বহাল রাখা ও তাতে নিয়মিত আযান—জামাত চালু রাখা জরুরি। মুসল্লীদের যাতায়াতের সুবিধার্থে পুরোনো মসজিদটি আপন অবস্থায় বহাল রেখে নতুন আরেকটি মসজিদ নির্মাণ করাতে কোনো সমস্যা নেই।—আদ্দুররুল মুখতার (রদ্দুল মুহতারসহ) : ৪/৩৫৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ২/৪১০; ফাতাওয়া মাহমূদিয়া : ২১/২৭৬; ফাতাওয়া দারুল উলূম দেওবন্দ : ১৩/৩১৭

 

মাহদী হাসান খালেদ

ফতুল্লা, নারায়ণগঞ্জ

১৫৬০. প্রশ্ন : মুহতারাম, আমার জানার বিষয় হলো, মেহরাব কি মসজিদের একেবারে মাঝ বরাবর হওয়া আবশ্যক?

উত্তর : মেহরাব মসজিদের একেবারে মাঝ বরাবর এমনভাবে হওয়া সুন্নত যাতে ইমামের উভয় দিকে সমপরিমাণ জায়গা থাকে। নতুবা নামায মাকরূহ হবে। কেননা বিনা কারণে কোনো একদিকে মুসল্লীর সংখ্যা বেশি হলে নামায মাকরূহ হয়ে যায়।—বাযলুল মাজহুদ : ৩/৬৩১; রদ্দুল মুহতার : ২/৪১৪, ৩১০; তাবয়ীনুল হাক্বায়িক : ১/৩৫০; ফাতাওয়া মাহমূদিয়া : ২১/৩৮২; ইমদাদুল আহকাম : ১/৪৭৫

 

জায়েয—নাজায়েয

মুহা. নাজমুস সাকিব

খুলনা

১৫৬১. প্রশ্ন : এক লোকের দশ জন ছেলে—মেয়ে আছে। সবাই একসঙ্গে থাকে। এদের মধ্যে এক ছেলে কাজ করে এবং তার কাজে তার বাবা তাকে সহযোগিতা করেন। বাবা ও ছেলে মিলে কিছু টাকা জমা করেন। জমানো টাকার অধিকাংশ ছেলের উপার্জনের টাকা। জমানো টাকা দিয়ে বাবা তার ছেলের জন্য ৫ বিঘা জমি কিনে দেয়। এখন জানার বিষয় হলো বাবার জন্য এভাবে একজনকে জমি কিনে দেওয়া অন্যদেরকে না দেওয়া শরীয়তসম্মত কি না?

উত্তর : সন্তানদের কিছু দেওয়ার ক্ষেত্রে সমতা রক্ষা করা বাবার জন্য মুস্তাহাব। তবে কোনো ন্যায়সংগত কারণে যদি বাবা কাউকে প্রাধান্য দেয় এবং বেশি দেয় তাহলে তা জায়েয আছে, যদি অন্য সন্তানদের ক্ষতি করা উদ্দেশ্য না থাকে। প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী যেহেতু ছেলে কাজ করে এবং জমানো টাকার অধিকাংশ টাকাই তার, তাই বাবার জন্য তাকে জমি কিনে দেওয়া জায়েয আছে।—সহীহ বুখারী : ১/৩৫২; আদ্দুররুল মুখতার : ৮/৫০১—৫০২; ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ৪/৪১৬; ফাতাওয়া দারুল উলূম দেওবন্দ : ১৫/২৪০; ফাতাওয়া মাহমূদিয়া : ২৫/৪১২

 

সাইফুর রহমান

সোনাগাজী, ফেনী

১৫৬২. প্রশ্ন : বর্তমান সময়ের বিয়েতে দেখা যায় বর শেরওয়ানী, রেডিমেট পাগড়ি (মুকুট) পরিধান করে, গলায় মালা পরে। এসব জায়েয আছে কি না? এক্ষেত্রে শরীয়তের বিধান কী?

উত্তর : ইসলামী শরীয়তের সীমারেখায় থেকে বরের জন্যে বিয়ে উপলক্ষ্যে সাজ—সজ্জা গ্রহণ করার সুযোগ রয়েছে। শরীয়ত পুরুষদের জন্যে যে সকল পোশাকের অনুমোদন দিয়েছে বিয়ে উপলক্ষ্যে সে সকল পোশাক পরিধান করা জায়েয় হবে। তবে মহিলাদের সাথে সাদৃশ্য রাখে কিংবা বিজাতীয় অনুকরণে বিধর্মীদের জন্যে নির্ধারিত কোনো পোশাক পরিধান করা জায়েয হবে না। সুতরাং প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে বরের জন্যে শেরওয়ানি, পাগড়ি পরা জায়েয হবে। কিন্তু মালা যেহেতু নারীদের সজ্জার সাথে সাদৃশ্য রাখে, তাই পুরুষের জন্যে তা ব্যবহার সমীচীন নয়।—সুনানে আবু দাউদ : ২/৫৫৯; সহীহ বুখারী : ২/৮৭৪, হাদীস—৫৮৮৫; বাযলুল মাজহুদ : ১২/৫৯; ফাতাওয়া মাহমূদিয়া : ১৭/৪২০; ফাতাওয়া কাসেমিয়া : ৩/২৩০, ২৩৯; ফাতাওয়া দারুল উলূম দেওবন্দ : ১৬/১৫৩, ১৬৫

 

আবু মুহাম্মাদ

আলমপুর, শ্রীনগর, মুন্সিগঞ্জ

১৫৬৩. প্রশ্ন : যথাযথ সম্মানপ্রদর্শনপূর্বক মুফতী সাহেবের নিকট আমার জানার বিষয় হলো, মাজার ও কবরকে ফুল দিয়ে সাজানো, ভক্তি—শ্রদ্ধার উদ্দেশ্যে মাজার ও কবরে আগরবাতি জ্বালিয়ে হারমোনিয়াম ও তবলা বাজিয়ে গান—বাজনা করা, ভক্তিভরে কবরের সামনে মাথা ঝুঁকানো, কবর বা কবরস্থ ব্যক্তিকে নিজের মনোবাঞ্ছা পূরণকারী মনে করার শরঈ বিধান কী? যারা কবরে বা মাজারে গিয়ে এরূপ করে তাদের শরঈ হুকুম কী? এরূপ ব্যক্তি মসজিদ বা মাদরাসার কমিটির সদস্য হওয়ার উপযুক্ত কি না?

উত্তর : মাজার ও কবরে ফুল দেওয়া, কবরে আগরবাতি জ্বালানো, গান—বাজনা করা এবং ভক্তি—শ্রদ্ধা নিয়ে কবরের সামনে মাথা ঝুঁকানো—কোনোটাই জায়েয নেই। এগুলো নাজায়েয ও হারাম। আর কবরস্থ ব্যক্তিকে নিজের মনোবাঞ্ছা পূরণকারী মনে করা শিরক। যারা এগুলো করে তারা বিদআত ও শিরকী কাজে লিপ্ত। এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িতদেরকে মসজিদ বা মাদরাসার কমিটির সদস্য করা উচিত নয়। মসজিদ—মাদরাসা পরিচালনা করা দ্বীনদার মুত্তাকী ব্যক্তিদের দ্বারাই সম্ভব। তাই দ্বীনদার মুত্তাকী ব্যক্তিদেরকেই কমিটির সদস্য করা উচিত।—সুনানে তিরমিযী : ৩২০; রদ্দুল মুহতার (আদ্দুররুল মুখতারসহ) : ৩/৪৯১, ৯/৬৩২, ৬/৫৮৩; হাশিয়াতুত তাহতাবী আলাল মারাক্বী : ৩১৯; আলবাহরুর রায়েক : ২/৫২০; কিতাবুন নাওয়াযিল : ১৩/২৭৪

Avatar

zobayer

একটি কমেন্ট করুন