প্রতিষ্ঠাতা: মুজাহিদে আযম হযরত মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.

জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ, ঢাকা-এর মুখপত্র

প্রতিষ্ঠাকালঃ ১৯৩৭ ঈসায়ী

ফত্ওয়া জিজ্ঞাসা

ফত্ওয়া জিজ্ঞাসা

নামায

মোহাম্মদ ইয়াসিন

নবাবগঞ্জ, ঢাকা

১৫৬৪. প্রশ্ন : ক. ফজর ও যোহরের ফরযের আগের সুন্নত পড়তে না পারলে ওই সুন্নত কখন পড়বে?

খ. ফজর ও যোহরের ফরযের আগের ছুটে যাওয়া সুন্নত কেউ আদায় না করলে কি গোনাহগার হবে?

উত্তর : ক. ফজরের নামাযের সুন্নত ফরযের আগে পড়তে না পারলে ইশরাকের সময় হওয়ার পর থেকে সূর্য হেলে যাওয়া পর্যন্ত যেকোনো সময়ই পড়ে নিতে পারবে। আর যোহর নামাযের পূর্বের চার রাকাত সুন্নত ছুটে গেলে তা ফরয নামাযের পর পরবর্তী দুই রাকাত সুন্নতের পরে পড়ে নেবে।

খ. ফজর নামাযের পূর্বের দুই রাকাত ও জোহর নামাযের পূর্বের চার রাকাত সুন্নত হলো সুন্নতে মুআক্কাদাহ। এগুলো বারবার ছেড়ে দিলে গোনাহগার হবে। কোনো কারণে কখনো ছুটে গেলে গোনাহ হবে না। কিন্তু নেকী থেকে বঞ্চিত হবে।-সুনানে তিরমিযী : ৪১৪, ৪২৩; আল মুহীতুল বুরহানী : ২/২৩৪; ফাতহুল ক্বদীর : ১/৪৯২; রদ্দুল মুহতার : ২/১২; গুনইয়াতুল মুতামাল্লী : ৩৯৯; আলবাহরুর রায়েক : ২/৮৬

 

১৫৬৫. প্রশ্ন : ক. কোনো মুসাফির ইমাম যদি নামায কসর না করে দু’রাকাতের স্থানে চার রাকাত পড়ে ফেলে, তাহলে তার নামাযের কী হুকুম হবে?

খ. এ ইমামের এক্তেদাকারী মুক্তাদিগণের নামাযের হুকুম কী হবে?

উত্তর : ক. শরঈ মুসাফিরের জন্য চার রাকাতবিশিষ্ট ফরয নামাযকে কসর করে দু-রাকাত পড়া আবশ্যক। সুতরাং কোনো মুসাফির ইমাম যদি চার রাকাতবিশিষ্ট ফরয নামাযকে কসর না করে চার রাকাত পড়ে ফেলে তাহলে দেখতে হবে, তিনি প্রথম বৈঠক করেছেন কি না? প্রথম বৈঠক করে থাকলে তার নামাযের ফরয আদায় হয়ে যাবে। তবে মাকরুহ হবে এবং সেজদায়ে সাহু করতে হবে। ওয়াক্ত বাকি থাকতে পুনরায় নামায পড়ে নিতে হবে। ওয়াক্ত শেষ হয়ে গেলে তার জন্য নামায দোহরানো আবশ্যক নয়। এমনটি (নামায কসর না করা) ইচ্ছাকৃতভাবে করে থাকলে তার গোনাহ হবে। আর যদি প্রথম বৈঠক মোটেই না করে থাকেন, তাহলে তার নামায ফাসেদ হয়ে যাবে। ওয়াক্ত বাকি থাকুক বা না থাকুক পুনরায় নামায পড়ে নিতে হবে। এই চার রাকাত নফল হিসেবে গণ্য হবে।

খ. মুক্তাদিগণ যদি মুকিম হয়ে থাকেন তাহলে দেখতে হবে, শেষ দুই রাকাতে তারা ইমামের এক্তেদা করেছে কি না? যদি তারা প্রথম বৈঠক শেষ করে ইমামের এক্তেদা করে ইমামের সাথে দাঁড়িয়ে যায়, তাহলে তাদের নামায ফাসেদ হয়ে যাবে এবং পুনরায় নামায পড়তে হবে। কেননা শেষ দুই রাকাত মুসাফিরের জন্য নফল। আর নফল আদায়কারীর পেছনে ফরযের এক্তেদা শুদ্ধ হয় না। পক্ষান্তরে যদি তারা শেষ দুই রাকাতে ইমামের এক্তেদা না করেন, তাহলে মুক্তাদিগণের নামায শুদ্ধ হয়ে যাবে।

আর মুক্তাদিগণ যদি মুসাফির হয়ে থাকেন তাহলে তাদের নামাযের বিধান ইমামের নামাযের বিধানের মতোই। অর্থাৎ যে সুরতে ইমামের নামায ফাসেদ বলে গণ্য হবে, সে সুরতে মুসাফির মুক্তাদিগণের নামাযও ফাসেদ বলে গণ্য হবে। আর যে সুরতে ইমামের নামায দোহরাতে হবে, সে সুরতে তাদের নামাযও দোহরাতে হবে।-রদ্দুল মুহতার : ২/১২৮, ১/৫৮১; মারাকিউল ফালাহ : ৪২৫; ফাতাওয়া মাহমূদিয়া : ১১/৫৮৩

 

১৫৬৬. প্রশ্ন : নামাযে দাঁড়ানো অবস্থায় দুই পায়ের মাঝখানে কতটুকু ফাঁকা রাখা সুন্নত? অনেক ভাইকে দেখি, নামাযে দাঁড়ানোর সময় দুই পায়ের মধ্যখানে বিরাট ফাঁকা রেখে দাঁড়ায় এবং পাশের মুসল্লির পায়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে দেয়। আর বলে যে, নামাযে দাঁড়ানো থাকা অবস্থায় কোনো ফাঁকা রাখা যাবে না। একে অপরের পায়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে রাখতে হবে। কথাটা কতটুকু সঠিক?

উত্তর : ফুকাহায়ে কেরাম লিখেছেন, নামাযে দাঁড়ানো থাকা অবস্থায় দুই পায়ের মধ্যখানে হাতের চার আঙুল পরিমাণ ফাঁকা রাখা উত্তম। কারণ, উক্ত পদ্ধতি খুশু-খুজুর অধিক নিকটবর্তী। যদি কম-বেশি হয়ে যায় তাহলে নামাযের কোনো সমস্যা হবে না। তবে এ ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা ঠিক নয়। যার যেভাবে সুবিধা হয় সেভাবেই সে দাঁড়াবে। যারা বলে, নামাযে দাঁড়ানো থাকা অবস্থায় কোনো ফাঁকা রাখা যাবে না, মুসল্লিগণ একে অপরের পায়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে রাখতে হবে, তাদের কথা সঠিক নয়। তারা এ ব্যাপারে যে দলীল পেশ করে থাকেন, এর দ্বারা মুসল্লিগণ একে অপরের পায়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে রাখতে হবে, তা উদ্দেশ্য নয়। বরং উদ্দেশ্য হলো, নামাযের জামাতের সময় একে অপরের কাঁধের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানো।-রদ্দুল মুহতার : ২/১৬৩; হাশিয়াতুত তাহতাবী : ২৬২; ফাতাওয়া দারুল উলূম দেওবন্দ : ২/২৩৩; কিতাবুন নাওয়াযিল : ৪/৪৯

 

ইসমাঈল হুসাইন

চাঁদপুর

১৫৬৭. প্রশ্ন : জনাব, আমি দীর্ঘ পাঁচ বছর নামায পড়িনি (আস্তাগফিরুল্লাহ)। এখন আমি নামাযগুলো কাযা করতে চাচ্ছি। আমার জানার বিষয় হলো,

ক. ফরয-ওয়াজিবের মতো সুন্নতে মুআক্কাদাগুলোরও কাযা করতে হবে কি না?

খ. আসরের পর ও ফজরের সুন্নতের পর কাযা নামায পড়তে পারব কি না?

কোরআন-হাদীসের আলোকে জানিয়ে বাধিত করবেন। আল্লাহ তাআলা আপনাদেরকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।

উত্তর : ক. বিগত দিনের ছুটে যাওয়া সুন্নতে মুআক্কাদাগুলোর কাযা করতে হবে না।

খ. আসরের পর সূর্য বিবর্ণ হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত এবং ফজরের সুন্নতের পর কাযা নামায পড়া জায়েয আছে। তবে শর্ত হলো, তা কাযা হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া। অর্থাৎ শুধু ধারণা কিংবা সতর্কতাবশত যা কাযা করা হয় তা এই সময়ে পড়া উচিত নয়।-রদ্দুল মুহতার : ২/৫৮; হিদায়া : ১/৩১৯, ১/১৫৫; ফাতাওয়া কাসেমিয়া : ৭/৫১৯

 

মাহবুবুর রহমান

চাঁদপুর

১৫৬৮. প্রশ্ন : ইমাম সাহেবের সাথে মাসবুক ব্যক্তি স্বাভাবিকভাবে নামায শেষ করতে গেলে মুসল্লিদের ভিড়ের কারণে নিজের ব্যাপারে জানের ক্ষতির আশঙ্কা করে। উক্ত অবস্থায় ইমামের সালাম ফেরানো পর্যন্ত অপেক্ষা না করে নিজের তাশাহহুদ শেষ করে দাঁড়িয়ে ছুটে যাওয়া নামায আদায় করলে নামায হবে কি না? জানালে বিশেষভাবে উপকৃত হব।

উত্তর : ইমাম সাহেব সালাম ফেরানো পর্যন্ত ইমামের অনুসরণ করা মাসবুকের ওপর ওয়াজিব। তাই ইমামের সালাম ফেরানোর পূর্বে মাসবুক তাশাহহুদ শেষ করে দাঁড়িয়ে যাওয়া মাকরুহ ও নাজায়েয। তবে বিশেষ কোনো প্রয়োজন হলে (যেমন : হদসের আশঙ্কা হওয়া, ফজরের ওয়াক্ত শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা হওয়া ইত্যাদি কারণে) জায়েয হয়। শুধুমাত্র ভিড়ের ভয়ে তাশাহহুদ শেষ করে দাঁড়িয়ে ছুটে যাওয়া নামায আদায় করা জায়েয হবে না।-আদ্দুররুল মুখতার : ১/৫৯৭-৫৯৮; আযযাখিরাতুল বুরহানিয়্যাহ : ২/৬৪; জাওয়াহিরুল ফাতাওয়া : ৪/২৭২

 

১৫৬৯. প্রশ্ন : মুহতারাম মুফতী সাহেব, কেউ চার রাকাতবিশিষ্ট ফরয নামাযে প্রথম অথবা দ্বিতীয় রাকাতে সূরা ফাতেহার পর অন্য সূরা পড়তে ভুলে গেল। তারপর তৃতীয় অথবা চতুর্থ রাকাতে স্মরণ হলে তৃতীয় অথবা চতুর্থ রাকাতে সূরা ফাতেহার সাথে অন্য কোনো সূরা পড়ে নামায শেষে সেজদা সাহু আদায় করে নিল। এমতাবস্থায় কি নামায সহীহ হবে?

উত্তর : জি হ্যাঁ, নামায সহীহ হয়ে যাবে।-ফাতাওয়া তাতারখানিয়া : ২/৭৬; ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ১/১৮৬; ইমদাদুল ফাতাওয়া : ১/২৬১; ফাতাওয়া দারুল উলূম দেওবন্দ : ৪/৩৯৯

 

যাকাত

হাফেজ মুহাম্মদ রফিকুল ইসলাম

মুন্সীগঞ্জ সদর

১৫৭০. প্রশ্ন : আমাদের ত্রিশ সদস্য-বিশিষ্ট একটি সমিতি আছে। বর্তমানে সমিতির জমানো টাকার পরিমাণ ৩,০০,০০০ (তিন লক্ষ) টাকা। এই টাকা দিয়ে আমরা একটি কাপড়ের দোকান দিয়েছি। যার সময়কাল এক বছর অতিবাহিত হয়েছে। এখন আমার জানার বিষয় হলো, যেহেতু সবার টাকা দিয়ে ব্যবসা করা হচ্ছে আর সবার সমষ্টিগত টাকা যাকাতের নেসাব অতিক্রম করেছে, এমতাবস্থায় এই টাকার ওপর যাকাত ফরজ হবে কী?

উত্তর : যাকাত ফরজ হয় নিজ মালিকানাধীন সম্পদের ওপর, যদি তা নেসাব পরিমাণ হয় এবং তাতে যাকাত ফরয হওয়ার অন্যান্য শর্তাবলি পাওয়া যায়। সুতরাং সমিতির কোনো সদস্যের অংশ নেসাব পরিমাণ হলে অথবা তার অন্যান্য যাকাতযোগ্য সম্পদ মিলে নেসাব পরিমাণ হলে তার ওপর যাকাত ফরয হবে। সমিতির সমষ্টিগত সম্পদের ওপর যাকাত ফরয হবে না।-বাদায়েউস সানায়ে : ২/১০১; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া : ৩/২৪২; ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ১/২৪২; তুহফাতুল ফুকাহা : ১/২৯২; ফাতাওয়া কাসেমিয়া : ১০/৪২৪

 

বিবাহ-তালাক-ইদ্দত

আব্দুল্লাহ

আড়াইহাজার

১৫৭১. প্রশ্ন : মুহতারাম, আমার জানার বিষয় হলো, এক তালাক পতিত হওয়ার পর স্বামী যদি তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে চায় তাহলে কি ইদ্দত চলাকালীন নতুন করে বিবাহ করতে হবে? নাকি ইদ্দত পূর্ণ হলে বিবাহ করতে হবে? নাকি বিবাহ না করেও আগের মতো সংসার করা যাবে?

উওর : প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী যদি তালাকটা তালাকে রজঈ হয়ে থাকে তাহলে তালাকের ইদ্দত চলাকালীন স্বামী তার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিতে পারবে। এ জন্য (তাকে) পুনঃবিবাহ করার প্রয়োজন নেই। ফিরিয়ে নেওয়ার পদ্ধতি হলো, স্বামী-স্ত্রীসুলভ কোনো আচরণ করা অথবা মুখে বলা যে, আমি তোমাকে ফিরিয়ে নিলাম। তবে উত্তম হলো, দুইজন সাক্ষীর উপস্থিতিতে বলবে যে, আমি আমার স্ত্রীকে ফিরিয়ে নিলাম। ইদ্দত শেষ হওয়ার পূর্বে স্ত্রীরূপে গ্রহণ না করলে উক্ত তালাক তালাকে বায়েনে পরিণত হবে এবং বিবাহ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। তখন তাকে স্ত্রী হিসেবে পেতে চাইলে উভয়ের সম্মতিতে নতুনভাবে বিবাহ করতে হবে।

আর যদি তালাকটা তালাকে বায়েন হয় তাহলে ইদ্দত চলাকালীন হোক বা ইদ্দত শেষ হওয়ার পরে হোক, উভয়ের সম্মতিতে মহর নির্ধারণ করে বিবাহ করতে হবে।-হিদায়া : ৩/২১৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ১/৪৭০; আপ কে মাসায়েল আওর উন কা হল : ৬/৪৩৯

 

মুহা. মানযুর

১৫৭২. প্রশ্ন : আমার স্ত্রী কিছুদিন পূর্বে তার বাবার বাড়িতে চলে যায়। এরপর সে আমার ও আমার পরিবারের নামে কিছু বিষয়ে অভিযোগ আনে এবং আগামীতে আমার সাথে আর ঘর-সংসার করবে না বলে জানিয়ে দেয়। আমার পক্ষ থেকে তাকে বোঝানো হয় এবং ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু সে কিছুতেই আসতে চায় না। তার পরিবারও তাকে এ সংসারে দিতে চায় না। উক্ত বিষয়টি তার পরিবার সালিশের মাধ্যমে জানিয়ে দেয়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে কিছুদিনের মধ্যে তারা তালাক চেয়ে আমার কাছে কাগজ পাঠাবে। তাকে তালাক দিলে আমরা সামাজিক ও আর্থিকভাবে অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হব। এখন আমার জানার বিষয় হলো,

ক. এ ক্ষেত্রে ক্ষতিপূরণ চেয়ে আমি তালাক দিতে পারব কি না?

খ. এভাবে তালাক দিলে কোন ধরনের তালাক কার্যকর হবে এবং কয়টি তালাক হবে?

উত্তর : ক. মেয়েপক্ষের তালাক চাওয়ার প্রেক্ষিতে টাকার বিনিময়ে তালাক দেওয়াকে খোলা তালাক বলে। খোলা তালাকের ক্ষেত্রে স্ত্রী যদি স্বামীর ত্রুটির কারণে তালাক চেয়ে থাকে তাহলে এর বিনিময় নেওয়া স্বামীর জন্য জায়েয হবে না। আর যদি স্ত্রীর ত্রুটি প্রমাণিত হয় অথবা উভয়ের ত্রুটি প্রমাণিত হয়, তাহলে খোলা তালাক দিয়ে স্বামীর জন্য বিনিময় নেওয়া জায়েয হবে। তবে মহরের পরিমাণের চেয়ে বেশি টাকা নেওয়া মাকরুহ ও অনুত্তম।

খ. খোলা করলে এর মাধ্যমে এক তালাকে বায়েন কার্যকর হবে। খোলার পর নতুন বিয়ে ব্যতীত একে অপরের জন্য হালাল হবে না।-সহীহ বুখারী : ২/৩৬৯; বাদায়েউস সানায়ে : ৩/২৩৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ১/৫৪৮; ইমদাদুল ফাতাওয়া : ৫/৩৬১; ফাতাওয়া দারুল উলূম দেওবন্দ : ১০/১৮৫

 

মুআমালা-লেনদেন

মাওলানা ফয়জুল্লাহ

ফরিদাবাদ মাদরাসা

১৫৭৩. প্রশ্ন : একটি কোম্পানি রিং আইডি নামে একটি অ্যাপ বানিয়েছে। এই অ্যাপে আইডি খুলে টাকা কামানো যায়। এতে আইডি খোলার বিভিন্ন প্যাকেজ আছে। যেমন ১২ হাজার টাকার প্যাকেজে আইডি খুললে দৈনিক ৫০টি এ্যাড আসবে। ২২ হাজার টাকার প্যাকেজে আইডি খুললে দৈনিক এ্যাড আসবে ১০০টি। এ ছাড়াও আরও বিভিন্ন প্যাকেজ আছে। প্রতিটি এ্যাড দেখার বিনিময়ে ৫ টাকা গ্রাহকের একাউন্টে জমা হয়। এই আইডিতে বিভিন্ন কোম্পানির বিভিন্ন পণ্যের এ্যাড থাকে। অধিকাংশ এ্যাডের ভিডিওতে মেয়েদের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। আমার জানার বিষয় হলো, রিং আইডি খোলা ও তাতে আসা এ্যাড দেখে টাকা কামানো জায়েয আছে কি না?

উত্তর : প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী রিং আইডিতে কাজ হচ্ছে, আইডি খোলা এবং তাতে আসা এ্যাড দেখে টাকা উপার্জন করা। শরঈ দৃষ্টিকোণ থেকে এ চুক্তি হচ্ছে ইজারা বা শ্রম চুক্তি। আর ইজারা বা শ্রম চুক্তিতে অন্তর্ভুক্তির জন্য কাজের শুরুতে মালিকপক্ষকে টাকা দেওয়ার দৃষ্টান্ত শরীয়তে নেই। অথচ এখানে শ্রমিক কাজ পাওয়ার জন্য কাজের শুরুতে মালিকপক্ষকে টাকা দিচ্ছে, যা এক প্রকার ঘুস। দ্বিতীয়ত রিং আইডিতে আসা এ্যাডগুলোতে অনেকসময় মেয়েদের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। তাই রিং আইডি খোলা এবং তাতে আসা এ্যাড দেখে টাকা উপার্জন করা জায়েয হবে না।-রুহুল মাআনী : ৫/২৩; ফিকহুল বুয়ু : ১/২৭৩; মাজমাউল আনহুর : ৩/৫৩৩; কিতাবুন নাওয়াযিল : ১১/১১৮

 

এম আর ইসলাম

কামরাঙ্গীরচর, ঢাকা

১৫৭৪. প্রশ্ন : জনাব, আমি বাৎসরিক ৬০০০ টাকার বিনিময়ে ৫৮ বছর মেয়াদে দুই রুমের একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়েছি। ফ্ল্যাটের মালিককে ভাড়া বাবদ অগ্রিম ৩,৪৮,০০০ টাকা পরিশোধ করি এই মর্মে যে, পরবর্তী সময়ে প্রয়োজনে উভয় পক্ষেরই চুক্তি প্রত্যাহার করার অধিকার থাকবে। চুক্তি প্রত্যাহার করা হলে ৩,৪৮,০০০ টাকা থেকে সমপরিমাণ ভাড়া কর্তন করে বাকি টাকা ফেরত দেওয়া হবে। অতঃপর আমি এই ফ্ল্যাট বাৎসরিক ৭৮,০০০ টাকায় অন্যত্র ভাড়া দিই। এখন জানার বিষয় হলো,

ক. এভাবে চুক্তি করা জায়েয আছে কি না?

খ. এভাবে ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে অন্য কারও কাছে প্রথম চুক্তির ভাড়ার মূল্যের চেয়ে অধিক মূল্যে ভাড়া দেওয়া জায়েয হবে কি না?

উত্তর : ক. প্রশ্নের বর্ণিত পদ্ধতিতে চুক্তি করা জায়েয হওয়ার জন্য শর্ত হলো, মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পূর্বে চুক্তি প্রত্যাহারের ব্যাপারে কোনো পক্ষের জন্য একতরফা অধিকারের শর্ত করা যাবে না। তবে উভয় পক্ষ সম্মত হলে তাদের জন্য যে-কোনো সময় চুক্তি প্রত্যাহার করে অবশিষ্ট মেয়াদের ভাড়া ফেরত নেওয়া জায়েয হবে।

খ. ইজারাকৃত ঘর অন্যের কাছে ইজারা দেওয়ার জন্য তিনটি শর্ত রয়েছে। তিন শর্ত পাওয়া গেলেই কেবল তা ইজারা দেওয়া জায়েয হবে। শর্তগুলো হলো :

১. ইজারাকৃত ঘর অন্যের কাছে ইজারা দেওয়ার পূর্বে নিজের কব্জায় নেওয়া।

২. প্রথম ইজারাদার যে উদ্দেশ্যে ভাড়া দিয়েছে সে উদ্দেশ্যে ভাড়া দেওয়া।

৩. ভাড়াগ্রহীতা যে মূল্যে ভাড়া নিয়েছে তার চেয়ে অধিক মূল্যে ভাড়া না দেওয়া। তবে দুটি শর্তের কোনো একটির ভিত্তিতে অতিরিক্ত মূল্যে ভাড়া দেওয়া জায়েয হবে :

১. প্রথম ভাড়াগ্রহীতা ইজারাকৃত ঘরে স্থায়ী অথবা উল্লেখযোগ্য সংস্কার বা সংযোজনমূলক কাজ করে দিতে হবে। অথবা ইজারাকৃত ঘরের সাথে নিজের কোনো বস্তু ভাড়া দিতে হবে। যেন অতিরিক্ত মূল্য অতিরিক্ত বস্তু বা কাজের বিনিময়ে হয়।

২. ভাড়াগ্রহীতা যে মুদ্রায় ভাড়া নিয়েছে তা ভিন্ন অন্য কোনো মুদ্রায় (যেমন : টাকায় ভাড়া নিয়ে ডলারে) ভাড়া দেওয়া। অথবা মুদ্রায় ভাড়া নিয়ে পণ্য-দ্রব্যের বিনিময়ে ভাড়া দেওয়া।-মুসান্নাফে আব্দুর রাজ্জাক : ৮/২২২; আদ্দুররুল মুখতার : ৫/২৭৬; রদ্দুল মুহতার (আদ্দুররুল মুখতারসহ) : ৬/২৮-২৯; ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ৪/৪৫৭; আল-মুহীতুল বুরহানী : ১১/২৩৭; শরহুল মাজাল্লাহ : ২/৫৫৭; ফাতাওয়া মাহমূদিয়া : ২৫/১১২

 

আ. সবুর

সুত্রাপুর, ঢাকা

১৫৭৫. প্রশ্ন : ক. আমরা কয়েকজন কাপড়ের ব্যবসা করি। আমাদের পুঁজি কম থাকার কারণে কয়েকজনের সঙ্গে মুরাবাহা ক্রয়-বিক্রয়ের চুক্তি করি যে, তারা আমাদের চাহিদা অনুযায়ী কাপড় কিনে আমাদের কাছে বিক্রি করবেন। আমরা তাদের থেকে গজপ্রতি দর-দামে যা নির্ধারিত হবে সেই হিসেবে খরিদ করব। পণ্য কেনার পর নতুন করে দর-দাম নির্ধারণ করে তাদের থেকে কিনে আমরা পণ্য বুঝে নিই এবং তাদের কাছ থেকে ম্যামোও গ্রহণ করি। কখনো কখনো আমরা তাদের পক্ষ থেকে উকিল হিসেবে পণ্য কিনে তাদের বুঝিয়ে দিই, তারপর তাদের কাছ থেকে দর-দাম নির্ধারণ করে পণ্য কিনি। আবার কখনো কখনো তাদেরকে মোবাইলের মাধ্যমে যোগাযোগ করে বুঝিয়ে দিয়ে তাদের থেকে কিনে নিই এবং পরবর্তী সময়ে ম্যামো গ্রহণ করি। এভাবে ক্রয়-বিক্রয় শরীয়তসম্মত কি না?

খ. ক্রয়-বিক্রয়ের সময় বিক্রেতা বলবে যে, আমি এই দামে খরিদ করেছি এবং এত টাকা লাভে এই দামে আপনার কাছে বিক্রি করলাম। আর ক্রেতা বলবে যে, আমি আপনার কাছ থেকে এই দামে খরিদ করলাম। মুরাবাহা ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে এভাবে বলা আবশ্যক কি না? যদি হুবহু এভাবে না বলে অন্যভাবে বলে, যেমন একজন বলল, গজপ্রতি এত টাকা পড়েছে, গজপ্রতি এত টাকা লাভ দিয়ে নিয়ে নেন। অপরজন বলল, ঠিক আছে। অথবা এ জাতীয় কোনো আলোচনা করল, যার ওপর উভয় একমত হয়ে বেচা-কেনা করল। এভাবে মুরাবাহা ক্রয়-বিক্রয় করলে আমাদের ক্রয়-বিক্রয় সহীহ হবে কি না? যদি সহীহ না হয় তাহলে আমাদের জন্য করণীয় কী?

উত্তর : ক. পণ্য কেনার পূর্বে মুরাবাহা ক্রয়-বিক্রয় জায়েয হবে না। তবে উভয়ে পরস্পর ওয়াদাবদ্ধ হতে পারবে। বিক্রেতা নিজে কিনুক অথবা আপনারা তার পক্ষ থেকে উকিল হিসেবে কিনেন, কেনার পর বিক্রেতা পণ্যকে কবজা করা এবং পণ্যকে বুঝে পাওয়ার পর ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি করতে হবে। প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী পণ্য কেনার পর বিক্রেতা পণ্যকে বুঝে নেওয়ার পর আপনারা তার নিকট থেকে মুরাবাহা ভিত্তিতে ক্রয় করছেন, তাই আপনাদের মুরাবাহা ক্রয়-বিক্রয় সহীহ আছে।

খ. ইজাব এবং কবুলের মাধ্যমে ক্রয়-বিক্রয় সংঘটিত হয়। যেমনিভাবে ক্রয়-বিক্রয় শব্দ বলার মাধ্যমে ইজাব-কবুল হয়, তেমনিভাবে ক্রয়-বিক্রয়ের ব্যাপারে উভয়ের সম্মতি বোঝায় এমন শব্দ বলার মাধ্যমেও ইজাব কবুল হয়। সুতরাং প্রশ্নে বর্ণিত পদ্ধতিতে আপনাদের মুরাবাহা ক্রয়-বিক্রয় সহীহ আছে।-ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ৪/৩০৯; হিদায়া : ৫/৩; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া : ৯/২২১; ফিকহুল বুয়ু : ২/৬৩৩; বাদায়েউস সানায়ে : ৪/৪৯৮

জায়েয-নাজায়েয

মুহা. হাবীব

১৫৭৬. প্রশ্ন : বর্তমানে মুরগি দোকানদার বেশিরভাগই বিসমিল্লাহ ছাড়া মুরগি জবাই করে। এ অবস্থায় উম্মতকে বাঁচানোর জন্য শাফেঈ মাযহাবের ওপর ফতওয়া দেওয়া যায় কি না?

উত্তর : হানাফী মাযহাব হতে মুরগি জবাই করার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে বিসমিল্লাহ ছেড়ে দিলে সে মুরগি খাওয়া হারাম। তবে ভুলবশত বিসমিল্লাহ ছেড়ে দিলে খাওয়া জায়েয। আর এখানে হানাফী মাযহাবের ওপর থেকেই উম্মতকে বাঁচানো সম্ভব। কেননা, মানুষ ইচ্ছা করলে জবাই ছাড়া মুরগি কিনে এসে বিসমিল্লাহ বলে জবাই করতে পারে বা জবাইকারীকে জবাই করার সময় বলে দিতে পারে যেন বিসমিল্লাহ বলে জবাই করে। সুতরাং শাফেঈ মাযহাবের ওপর ফত্ওয়া প্রদানের প্রয়োজন নেই।-সূরা আনআম, ০৬ : ১১৮; আদ্দুররুল মুখতার (রদ্দুল মুহতারসহ) : ৬/২৯৯; ফাতাওয়া দারুল উলূম যাকারিয়া : ৬/১৩৩

 

জিলহজ হোসেন

ধুবিল, সিরাজগঞ্জ

১৫৭৭. প্রশ্ন : হুজুরের নিকট জানার বিষয় হলো, আমি গাড়িতে চলাফেরা করাবস্থায় যদি ছাত্র হিসেবে হাফ ভাড়া দিই তাহলে তা শরীয়তসম্মত হবে কি না? জানিয়ে বাধিত করবেন।

উত্তর : সরকার যদি কর্তৃপক্ষের ওপর হাফ ভাড়ার বিধান জারি করার পর কর্তৃপক্ষ খুশি মনে মেনে নেয়, তাহলে হাফ ভাড়া প্রদান করা জায়েয হবে। আর যদি সরকার কর্তৃপক্ষের ওপর জোরপূর্বক হাফ ভাড়ার বিধান চাপিয়ে দেয়, তাহলে হাফ ভাড়া প্রদান করা যাবে না। পরিপূর্ণ ভাড়া আদায় করা বাঞ্ছনীয়। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, কোনো মুসলমানের সম্পদ তার দিলের সন্তুষ্টি ছাড়া হালাল নয়।-শুআবুল ঈমান : ৫৪৯৩; বাদায়েউস সানায়ে : ৪/২৪, ৫/৪৪১; কিতাবুন নাওয়াযিল : ১২/৫৬

Avatar

zobayer

একটি কমেন্ট করুন