প্রতিষ্ঠাতা: মুজাহিদে আযম হযরত মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.

জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ, ঢাকা-এর মুখপত্র

প্রতিষ্ঠাকালঃ ১৯৩৭ ঈসায়ী

ফত্ওয়া জিজ্ঞাসা

ফত্ওয়া জিজ্ঞাসা

নামায

মুহাম্মদ যুবায়ের

চাঁদপুর

১৩৪৫. প্রশ্ন : মসজিদের নিচ তলায় নামায আদায় করার জায়গা থাকা সত্ত্বেও যদি দ্বিতীয় তলায় নামায আদায় করে, তাহলে তার হুকুম কী?

উত্তর : মসজিদের নিচ তলায় জায়গা থাকা সত্ত্বেও ওজর ব্যতীত দ্বিতীয় তলায় নামায আদায় করা পছন্দনীয় নয়।—আদ্দুররুল মুখতার : ১/৫৭০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ১/১৬৬;  মুহীতে বুরহানী : ২/২০২; ফাতাওয়া মাহমূদিয়া : ৯/৫০৪; নাওয়াযেল : ৪/৩৯৪; আহসানুল ফাতাওয়া : ৩/৪১২

 

মুহাম্মদ আব্দুর রহিম

অভায়নগর, যশোর

১৩৪৬. প্রশ্ন : কোনো ইমাম সাহেব যদি এক মুষ্ঠি থেকে কম দাড়ি রাখে, বেগানা নারীদেরকে দেখা দেয়, টিভি দেখে এবং মিলাদ—কিয়াম ও বেদআতী কাজ করে, এমন ইমামের পিছনে নামায পড়ার হুকুম কী? এ ধরনের ইমাম সাহেবকে বাদ দেওয়া যাবে কি না?

উত্তর : এক মুষ্ঠির কম দাড়ি রাখা, টিভি দেখা ও গায়রে মাহরাম নারীর সঙ্গে দেখা দেওয়া কবীরা গোনাহ। আর শরীয়তের দৃষ্টিতে প্রচলিত মিলাদ—কিয়াম করা বিদআত। কবীরা গোনাহে লিপ্ত ও বিদআতী ব্যক্তির ইমামতি মাকরুহে তাহরীমী। তার পেছনে নামায পড়লে নামায হয়ে যাবে, তবে সওয়াব কম হবে। উল্লেখ্য, উক্ত ইমামের জন্য উল্লিখিত গোনাহের কাজগুলো পরিহার করে একনিষ্ঠভাবে তওবা করে নেওয়া আবশ্যক। অন্যথায় সে ইমামতির অনুপযুক্ত বলে বিবেচিত হবে এবং তার ইমামতি করা মাকরুহে তাহরীমী হবে। এমতাবস্থায় মসজিদ কমিটির কর্তব্য হলো তার স্থানে নেককার মুত্তাকী ইমাম নিয়োগ দেওয়া।—হাশিয়াতুত তাহ্তাবী আলাল মারাক্বী : ৩০২; আদ্দুররুল মুখতার : ১/৫৬০—৫৬২; আহসানুল ফাতাওয়া : ৩/২৮৮; ফাতাওয়া উসমানী : ১/৪০০; ফাতাওয়া দারুল উলূম করাচী : ২/২৮৭

 

মুহাম্মদ আদনান

মিরপুর, কুষ্টিয়া

১৩৪৭. প্রশ্ন : আমি একজন কলেজ পড়–য়া ছাত্র। এইচএসসি পরীক্ষার পরে আমি চিল্লায় বের হই এবং চিল্লার পরে আমার মধ্যে পরিবর্তন আসে। তাই আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামায জামাতের সাথে পড়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করি। একদিন জুমার নামাযের পর এক আহলে হাদীস ভাই বললেন, জুমার পরে চার রাকাত সুন্নত নয়; বরং দু রাকাত সুন্নতে মুআক্কাদা। তাই আমাদেরকে সহীহটা ফলো করা উচিত। এখন আমার জানার বিষয় হলো, আসলে সহীহ কোনটা? আর উক্ত ব্যক্তির কথা সঠিক কি না?

উত্তর : জুমার ফরজের পরেও চার রাকাত এক সালামে পড়া সুন্নতে মুআক্কাদা। মুসলিম শরীফে আছে—নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘যখন তোমাদের মধ্যে কেউ জুমার নামায আদায় করে সে যেন ফরযের পরে চার রাকাত পড়ে।’ অপর বর্ণনায় আছে, ‘তোমাদর মধ্যে যে ব্যক্তি জুমার পরে নামায পড়তে চায় সে যেন চার রাকাত পড়ে।’ অতএব জুমার পরের চার রাকাত সহীহ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত। সুতরাং উক্ত ব্যক্তির কথা সঠিক নয়।—সহীহ মুসলিম : ১/২৮৮; মাজমাউল আন্হুর : ১/১৯৪; ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ১/১১২; ফাতাওয়া রহীমিয়া : ৫/২২৬

 

মুহাম্মদ শরীফ উদ্দিন

মিরপুর, কুষ্টিয়া

১৩৪৮. প্রশ্ন : আমাদের মহল্লার মসজিদটি একতলাবিশিষ্ট। রমযান মাসে বিদ্যুৎ লোডশেডিং এর কারণে মসজিদের ভেতরে অনেক গরম পড়ে। যার ফলে ইশার নামায ও তারাবীতে অনেক কষ্ট হয়। কিছু মুসল্লী প্রস্তাব করেন যে আমরা ছাদ পরিষ্কার করে সেখানে নামায পড়ব। এখন আমার জানার বিষয় হলো, এভাবে মসজিদ ফাঁকা রেখে মসজিদের ছাদে নামায পড়া যাবে কি না?

উত্তর : প্রয়োজন ছাড়া মসজিদ খালি রেখে ছাদে জামাত পড়া মাকরুহ। জামাতে মসজিদ ভরে গেলে ছাদ থেকে ইক্তেদা করা মাকরুহ নয়। তবে যদি প্রচণ্ড গরম পড়ে, যার কারণে মুসল্লীদের অসহনীয় কষ্ট হয়, পাখা বা এসির ব্যবস্থা না থাকে এবং ছাদে নামায পড়লে বেপর্দার আশংকা না থাকে, তাহলে ছাদে নামায পড়তে পারবে।—ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ৫/৩২২; রদ্দুল মুহতার : ১/৬৫৬; কিফায়াতুল মুফতী : ৪/৩০৩; ফাতাওয়া কাসেমিয়া : ৬/১০৬

 

মুহাম্মদ নোমান

বরিশাল

১৩৪৯. প্রশ্ন : কোনো ব্যক্তি যদি নামাযের মধ্যে ইচ্ছা করে ছানা, আউযুবিল্লাহ, দুরূদ শরীফ পড়া ছেড়ে দেয় তাহলে তার সে নামায শরীয়তের দৃষ্টিতে সহীহ হবে কি না?

উত্তর : নামাযের মধ্যে ছানা, আউযুবিল্লাহ এবং শেষ বৈঠকে তাশাহহুদের পর দুরূদ শরীফ পড়া—এই সবগুলো সুন্নত। এই কাজগুলো ছাড়ার কারণে নামাযের নেকি কমে যাবে। আর ইচ্ছা করে বারবার ছাড়ার কারণে গোনাহগার হবে।—হালাবী কাবীর : ৩৮২; হাশিয়াতুত তাহতাবী আলাল মারাক্বী : ২৫৬; খোলাসাতুল ফাতাওয়া : ১/৫৩

 

যাকাত

মাও. হাবিবুর রহমান

কুড়িগ্রাম

১৩৫০. প্রশ্ন : কোনো ব্যক্তি যাকাতের হকদার মনে করে কাউকে যাকাত দেয়; কিন্তু সে ব্যক্তি যাকাতের খাত নয়। পরে সেই ব্যক্তি ওই টাকা নিয়ে যারা যাকাতের হকদার তাদেরকে দিয়ে দেয়। এখন জানার বিষয় হলো, প্রথম ব্যক্তির যাকাত আদায় হয়েছে কি না?

উত্তর : কোনো ব্যক্তি যদি কাউকে যাকাতের হকদার মনে করে যাকাত দিয়ে দেয় তাহলে তার যাকাত আদায় হয়ে যাবে। দ্বিতীয় বার যাকাত দিতে হবে না।—ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ১/২৫১; আলবাহরুর রায়েক : ২/৪৩১; মারাক্বিউল ফালাহ : ৭২১

 

মুহাম্মদ ইব্রাহীম

সদর লালমোহন, ভোলা

১৩৫১. প্রশ্ন : আমি একজন পুস্তক ব্যবসায়ী। বর্তমানে আমার দোকানে তিন লক্ষ টাকার ব্যবসায়িক পুস্তক রয়েছে। মার্কেটে বাকি আছে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা। আর আমি দেনা আছি সাড়ে ছয় লাখ টাকা। এখন আমার জানার বিষয় হলো, আমার উপর কি যাকাত ফরজ হয়েছে?

আর বর্তমানে কত টাকা থাকলে যাকাত দিতে হবে। দলীলসহ জানতে আগ্রহী।

উত্তর : প্রশ্নে বর্ণিত দোকানের সম্পদ হিসেবে আপনার ব্যবসায়িক পণ্যের মূল্যের চেয়ে ঋণ বেশি। যাকাত ফরজ হওয়ার মতো অন্য কোনো সম্পদ না থাকলে আপনার উপর যাকাত ফরজ হবে না।

কারও কাছে যদি সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপা বা তার মূল্য সমপরিমাণ যাকাতযোগ্য সম্পদ থাকে তাহলে তার উপর যাকাত ফরজ হবে। আর রুপার দাম যেহেতু উঠানামা করে তাই তা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের থেকে জেনে নেওয়া যেতে পারে।—বাদায়েউস সানায়ে : ২/৮৩; হেদায়া : ১/১৮৬; ফাতাওয়া মাহমূদিয়া : ১৪/৩৭

 

মসজিদমাদরাসাওয়াকফ

মুহাম্মদ আব্দুল মান্নান

মুন্সীগঞ্জ

১৩৫২. প্রশ্ন : মসজিদের ওয়াকফের জমিনের ফল মোতাওয়াল্লী সাহেব তাবলীগ জামাতের সাথিদেরকে খাওয়াতে পারবে কি?

উত্তর : প্রশ্নে বর্ণিত ক্ষেত্রে গাছ রোপণকারী যদি তা মসজিদের জন্য ওয়াকফ করে থাকে বা তার উদ্দেশ্য জানা না থাকে, তাহলে মোতাওয়াল্লীর জন্য ফলের যথাযথ মূল্য পরিশোধ করা ব্যতীত তাদেরকে খাওয়ানো বৈধ হবে না। আর যদি গাছ রোপণকারী তা মুসল্লীদের উদ্দেশ্যে বা জনসাধারণের উদ্দেশ্যে ওয়াকফ করে থাকে তবে মোতাওয়াল্লীর জন্য তাদেরকে তা বিনামূল্যে খাওয়ানো বৈধ হবে।—আদ্দুররুল মুখতার (রদ্দুল মুহতারসহ) : ৬/৬৬৪; আলবাহরুর রায়েক : ৫/৩৪২; ফাতাওয়া মাহমূদিয়া : ২২/২১৩; ইমদাদুল ফাতাওয়া : ৬/৬৪

 

মুহাম্মদ নুর আলম

মতলব, চাঁদপুর

১৩৫৩. প্রশ্ন : আমার বাবা এলাকার মসজিদের জন্য নির্দিষ্ট কিছু জমি ওয়াক্ফ করেন। আমরা (ছেলেরা) চাচ্ছি, নিজেদের বাড়ির সুবিধার জন্য বাবার ওয়াকফকৃত জমির পরিবর্তে মসজিদের জন্য অন্য জায়গা থেকে জমি দিব। জানার বিষয় হলো, আমাদের এ কাজ শরীয়তসম্মত হবে কি না?

উত্তর : আপনার বাবা মসজিদের নামে যে জমি ওয়াকফ করে দিয়েছেন সে জমি স্থায়ীভাবে মসজিদের হয়ে গেছে। এটাকে রদবদল করা যাবে না। উক্ত জমি মসজিদ সংশ্লিষ্ট কাজেই ব্যবহার করতে হবে। অন্য জমির সাথে পরিবর্তন করা জায়েয নেই।—রদ্দুল মুহতার : ৪/৩৮৪; আদ্দুররুল মুখতার (রদ্দুল মুহতারসহ) : ৪/৩৫১; কিফায়াতুল মুফতী : ৯/৪২৩; ফাতাওয়া মাহমূদিয়া : ২১/১২৩

 

বিবাহতালাকইদ্দত

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক

১৩৫৪. প্রশ্ন : আমার স্ত্রী দীর্ঘদিন যাবত পরকীয়ায় লিপ্ত ছিল। কয়েকজন ছেলের সাথে তার খারাপ সম্পর্ক ছিল। একদিন রাতে আমার বাসায় আমি একজনকে হাতেনাতে ধরতে পারি। তখন আমি আমার স্ত্রীকে তার বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিই এবং কয়েকজন সাক্ষীর সামনে আমি তাকে ‘তিন তালাক’ দিই। অতঃপর তার পরিবারের কাছে তালাকনামা পাঠিয়ে দিই। এখন তার পরিবারের লোকজন আমার উপর চাপ প্রয়োগ করছে তাকে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য। এখন আমার করণীয় কী? তাকে ফিরিয়ে নেওয়া আমার জন্য বৈধ হবে কী?

উত্তর : আপনি যেহেতু আপনার স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়েছেন, তাই আপনার স্ত্রীর উপর তিন তালাক কার্যকর হয়ে আপনাদের বৈবাহিক সম্পর্ক সম্পূর্ণরূপে ছিন্ন হয়ে গেছে। আপনার স্ত্রীর পরিবারের লোকজন আপনার উপর চাপ প্রয়োগ করলেও আপনার জন্য শরঈ হালালা ছাড়া তাকে ফিরিয়ে আনা বৈধ হবে না। শরঈ হালালা হচ্ছে, প্রথম স্বামী তিন তালাক দেওয়ার পর স্ত্রী ইদ্দত পালন করবে অর্থাৎ পূর্ণ তিনটি ঋতুরাব অতিবাহিত করবে। ইদ্দত পালন শেষে নিয়মতান্ত্রিকভাবে অন্যত্র কোনো বালেগ পুরুষের সাথে বিবাহ—বন্ধনে আবদ্ধ হবে। এই দ্বিতীয় স্বামী যদি দৈহিক মিলনের পর তাকে তালাক প্রদান করে অথবা মৃত্যুবরণ করে তাহলে পুনরায় ইদ্দত পালন শেষে প্রথম স্বামীর সঙ্গে বিবাহ—বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারবে।—বাদায়েউস সানায়ে : ৩/২৯৫; ফাতহুল ক্বাদীর : ৩/৪৪৯; ফাতাওয়া মাহমূদিয়া : ১৮/৩৩০

 

আব্দুল জব্বার

রসূলপুর, চরফ্যাশন, ভোলা

১৩৫৫. প্রশ্ন : আমি একজন ড্রাইভার মানুষ। গত ৯/২/১৮ইং তারিখে আমি আমার গাড়িসহ এক্সিডেন্ট করি। যার কারণে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ওই অবস্থায় আমার মেজাজ ঠিক ছিল না এবং ওই রাতেই আমি যখন বাসায় গিয়ে খানা খেতে বসি তখন আমার স্ত্রীর সাথে ঝগড়া হয়। আর কথা বাড়াবাড়ি হতে হতে আমার রাগ বেড়ে যায় এবং একপর্যায়ে রাগে আমি আমার স্ত্রীকে অনিচ্ছায় ‘তিন তালাক’ দিয়ে দিই। অতঃপর এ বিষয়ে একটি মাদরাসায় ফত্ওয়া চাইলে তারা তালাক হয়নি মর্মে ফত্ওয়া দেন। তবে ওই প্রশ্নপত্রে কিছু বিষয় যেমন ‘আমার হুশ ছিল না ও আমি কী বলেছি কিছুই বলতে পারি না’ উক্ত কথাগুলো বাস্তবতার পরিপন্থি। এগুলো আমাকে দিয়ে লেখানো হয়েছিল।

আর এদিকে গত কয়েক দিন আগে একজন আলেম উক্ত ঘটনা শুনে বলেন যে, আপনার বিবাহ ভেঙে গেছে, এমতাবস্থায় আমি উক্ত ফত্ওয়া নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যাই। এখন জানার বিষয় হলো—আমার উক্ত কথাগুলোর মাধ্যমে আমার বিবাহ কি ভেঙে গেছে? যদি ভেঙে যায় তাহলে আমার করণীয় কী?

উত্তর : প্রশ্নোক্ত ঘটনায় আপনার প্রদত্ত চূড়ান্তভাবে ‘তিন তালাক’ এর মাধ্যমে আপনার স্ত্রীর উপর তিন তালাক পতিত হয়েছে অর্থাৎ আপনার বিবাহ ভেঙে গেছে। আর স্পষ্টভাবে তিন তালাক বলার ক্ষেত্রে নিয়তের প্রয়োজন নেই। তাই এখন শরঈ হালালা ব্যতীত উক্ত স্ত্রীর সাথে ঘর—সংসার করা আপনার জন্য সম্পূর্ণরূপে হারাম।

আর শরঈ হালালা হলো, স্ত্রী নিয়মতান্ত্রিকভাবে এ তালাকের ইদ্দত পালনের পর অন্য বালেগ পুরুষের সাথে নিয়মমতো বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হবে এবং দ্বিতীয় স্বামীর সাথে দৈহিক মিলনও হতে হবে। তারপর সে তাকে তালাক দিলে তালাকের ইদ্দত পালনের পর পুনরায় প্রথম স্বামী নিয়মমতো বিবাহ করতে পারবে।—সূরা বাক্বারা : ২২৯—২৩০; সহীহ বুখারী, হাদীস নং : ৫২৬৪; ফাতহুল ক্বাদীর : ৪/১৫৮; রদ্দুল মুহতার : ৩/২৪৪; ইমদাদুল ফাতাওয়া : ৫/১৮৫

 

মজিবুর রহমান

ঢাকা

১৩৫৬. প্রশ্ন : হুজুর! আমার জানার বিষয় হলো, আমার জন্য আমার পিতার খালাতো বোনকে বিবাহ করা কি বৈধ হবে?

উত্তর : হ্যাঁ, আপনার জন্য আপনার পিতার খালাতো বোনকে বিবাহ করা বৈধ হবে।—ফাতহুল ক্বদীর : ৩/১৯৯; রদ্দুল মুহতার : ৩/২৮; আপ কে মাসায়েল আওর উন কা হল : ৬/১৮০

 

মুহাম্মদ আদনান

ঢাকা

১৩৫৭. প্রশ্ন : জনৈক পুরুষ তার চাচাতো বোনকে কামভাবের সাথে চুমো দেয় এবং বক্ষ স্পর্শ করে। তবে বক্ষ স্পর্শ করার সময় তার বোন ঘুমন্ত অবস্থায় ছিল। পরে সে তার চাচাতো ওই বোনের মেয়েকে বিয়ে করে। বর্তমানে তাদের সংসার ভালোই চলছে। সে জানতে পারে, তাদের এ বিয়ে নাকি সঠিক হয়নি। এখন আমার জানার বিষয় হলো, সে কি তার চাচাতো বোনের এ মেয়ের সাথে ঘর—সংসার করতে পারবে? দলীলের আলোকে জানালে আপনাদের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ থাকব।

উত্তর : উল্লিখিত বর্ণনানুযায়ী উক্ত ব্যক্তির চাচাতো বোনের মেয়ের সাথে বিয়ে সঠিক হয়নি। হুরমতে মুসাহারার কারণে সে মেয়ে তার জন্য চিরদিনের জন্য হারাম হয়ে গেছে। তাই তার কর্তব্য হলো, এখনই ওই মেয়ের সাথে বিয়ে ছিন্ন করে আলাদা হয়ে যাওয়া এবং আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে ভুলের কারণে তওবা—ইস্তেগফার করা। পর্দার বিধান লঙ্ঘন ও ফাহেশা কাজের এ পরিণতি থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতে গোনাহমুক্ত জীবন পরিচালনায় আত্মনিয়োগ করা।—ইলাউস সুনান : ৩২২০; মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা : ৯/৯৯; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া : ৪/৫৭

 

মুআমালা—লেনদেন

১৩৫৮. প্রশ্ন : আমি জানতে চাচ্ছি, এখন এনজিওগুলো সুদ দিয়ে ঋণ দিচ্ছে, যা সমাজ ও ইসলামের জন্য খারাপ। ইসলামিক উপায়ে কোনো সমবায় বা সমিতি করা যাবে কি না, যার দ্বারা সমাজের উপকারও হবে, ব্যবসাও হবে।

উত্তর : শিরকত, মোশারাকা ও মোদারাবার পদ্ধতিতে সমিতি করলে জায়েয হবে। অভিজ্ঞ আলেমের কাছ থেকে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত মাসায়েল শিখে ও বুঝে নেবেন।

 

আ. হাফিজ

লালমোহন, ভোলা

১৩৫৯. প্রশ্ন : আমি আমার দশ কাঠা জমি বিক্রয় করার জন্য দালালের সাথে এভাবে চুক্তি করি, যদি সে জমি একুশ লক্ষ টাকা বিক্রয় করে দিতে পারে তাহলে এক লক্ষ টাকা দালালের আর বাকি টাকা আমার। এখন আমার জানার বিষয় হলো এভাবে আমাদের চুক্তি করা সহীহ হয়েছে কি না? এবং দালালের জন্য উক্ত টাকা গ্রহণ করা জায়েয হবে কি না?

উত্তর : হ্যাঁ, প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে আপনাদের চুক্তি সহীহ হয়েছে এবং দালালের জন্য উক্ত এক লক্ষ টাকা গ্রহণ করা জায়েয হবে।—আলমাবসূত, সারাখসী : ১৫/১১৫; রদ্দুল মুহতার : ৬/৬৩; ফাতাওয়া মাহমূদিয়া  : ২৫/২৮৬

 

জায়েযনাযায়েয

মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ

মুন্সিগঞ্জ

১৩৬০. প্রশ্ন : আমাদের এলাকায় একটি প্রচলন হলো, কোনো মহিলা শাড়ি পরিধান করলে অনেকে বলে, এটা হিন্দুদের প্রথা বা পোশাক, এজন্য কেউ কাপড় পরিধান করতে পারবে না। যদি কেউ তা পরে তাকে তুচ্ছ—তাচ্ছিল্য করা হয়, এমনকি ফাসেকও বলা হয়। এখন কথা হলো, সাধারণত গ্রামের মহিলারা শাড়ী কাপড় পরায় অভ্যস্ত হয়ে থাকে, এখন তাদের জন্য করণীয় কী? এবং শরয়ী দৃষ্টকোণ থেকে শাড়ী কাপড় পরার বিধান কী?

উত্তর : যেসব এলাকায় শাড়ি পরিধান করা হিন্দুদের বৈশিষ্ট্য মনে করা হয় বা কেবল হিন্দুরাই শাড়ি পরিধান করে, সেসব এলাকার মুসলিম নারীদের জন্য এটা পরিহার করা আবশ্যক। তবে যেখানে এমন নয়; বরং সকলেই শাড়ি পরিধান করে সেখানকার মুসলিম নারীদের জন্য এ শর্তে শাড়ি পরা জায়েয হবে যে, শরীরের কোনো অংশ খোলা থাকতে পারবে না এবং পর্দা পরিপূর্ণভাবে আদায় হতে হবে, কিন্তু খুব কম মহিলারাই এভাবে শাড়ি পরতে পারে। তাই মুসলিম নারীদের জন্য শাড়ি না পরে ঢিলেঢালা কামিছ পরা উত্তম। আর এটা পর্দার জন্যও সহায়ক।—মিশকাতুল মাসাবীহ : ৩৭৫; আল—মাওসুআতুল ফিকহিয়্যাহ : ৩৫/১৯২; ফাতাওয়া মাহমূদিয়া : ২৭/৪৩২; আপ কে মাসায়েল আওর উন কা হল : ৮/৩৬৬

 

১৩৬১. প্রশ্ন : যে ব্যক্তি মসজিদের জন্য ওয়াকফকৃত দলিল করা জমিন জোরপূর্বক আত্মসাৎ করেছে তার সাক্ষ্য শরীয়তে গ্রহণযোগ্য হবে কি না? যারা তার সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করে তাদের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য হবে কি না?

উত্তর : জোরপূর্বক অন্যের সম্পদ আত্মসাৎ করা কবীরা গোনাহ। কবীরা গোনাহে লিপ্ত ব্যক্তি শরীয়তের দৃষ্টিতে ফাসেক বলে গণ্য হয়। ফাসেক ব্যক্তি সাক্ষ্য দিলে তা গ্রহণযোগ্য হয় না, যতক্ষণ না সে তওবা করে। জোরপূর্বক জমিন আত্মসাৎকারীর সাথে যারা ঐকমত্য পোষণ করেছে তারা যদি অন্যায়ভাবে তার পক্ষ নিয়ে থাকে তাহলে তারাও ফাসেক বলে গণ্য হবে। কিন্তু তারা যদি এ দৃষ্টিকোণ থেকে একমত পোষণ করে যে, তাদের জানামতে ওই জমিনের হকদার সেই ব্যক্তি তাহলে তারা ফাসেক বলে গণ্য হবে না।—বাদায়েউস সানায়ে : ৫/৪০৫; ফাতাওয়া তাতারখানিয়া : ১১/৪২৩; আলবাহরুর রায়েক : ৭/১৫০

 

মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ

মুন্সিগঞ্জ

১৩৬২. প্রশ্ন : এলাকার কিছু লোক খাল—বিল থেকে কাঁকড়া সংগ্রহ করে বৈদেশিক বিভিন্ন হোটেল ও ঔষধ কোম্পানিতে রপ্তানিকারী কতক লোকের কাছে চড়া মূল্যে বিক্রি করে থাকে। এটা তাদের নিয়মিত পেশায় পরিণত হয়েছে। সহজলভ্য হওয়ায় তাদের দেখাদেখি অন্য লোকেরাও উক্ত কাজে অনুপ্রাণিত হচ্ছে। মুফতী সাহেবের নিকট জানার বিষয় হলো, কাঁকড়া বিক্রি করা বৈধ কি না?

উত্তর : খাওয়ার জন্য কাঁকড়া ক্রয়—বিক্রয় কোনোটাই বৈধ নয়। তবে যদি তা ঔষধ বা অন্য কোনো উপকারী কাজে ব্যবহৃত হয়, তবে তার ক্রয়—বিক্রয় বৈধ। অতএব, প্রশ্নোক্ত ক্ষেত্রে তাদের জন্য ঔষধ কোম্পানিতে রপ্তানিকারী লোকদের কাছে কাঁকড়া বিক্রি করা বৈধ হবে। তবে হোটেলের লোকদের কাছে তা বিক্রি করা বৈধ হবে না।—আদ্দুররুল মুখতার (রদ্দুল মুহতারসহ) : ৫/৬৮; ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ৩/১১৫; ফাতাওয়া মাহমূদিয়া : ২৭/১৭৪

 

আব্দুল্লাহ

ফরিদাবাদ, ঢাকা

১৩৬৩. প্রশ্ন : আমাদের দেশে বিভিন্ন মসজিদে লেখা থাকে ‘মসজিদে দুনিয়াবি কথা বলা হারাম’। শরীয়তের দৃষ্টিতে এ কথার সত্যতা কতটুকু? পরস্পর কুশল বিনিময় করে কথাবার্তা বলা, জায়েয দুনিয়াবী কথা বলাও কি নাজায়েয?

উত্তর : মসজিদে গীবত করা, মিথ্যা বলা, ফাহেশ কথা, প্রয়োজন ব্যতীত অনর্থক ও অন্যায় কথাবার্তা বলা এবং দুনিয়াবি কথা বলার উদ্দেশ্যেই বসা, মসজিদকে গল্পের আড্ডাখানা বানানো হারাম। মসজিদে নিয়মতান্ত্রিক অবস্থানকারী বা ইতিকাফকারীর জন্য মসজিদের আদব রক্ষা করে দুনিয়াবি জায়েয কথা বলার অবকাশ আছে। ‘মসজিদে দুনিয়াবী কথা বলা হারাম’— ঢালাওভাবে এমন কথা ঠিক নয়। যদি মসজিদে দুনিয়াবি কথা বলার জন্য না বসে বরং ইবাদতের জন্য বসে দুনিয়াবি কথা বলার প্রয়োজন পড়ে তাহলে জায়েয আছে; কিন্তু না বলা উত্তম।—মিশকাতুল মাসাবীহ : ৭১; রদ্দুল মুহতার : ১/৬৬২; ফাতাওয়া দারুল উলূম দেওবন্দ : ১/২২৭; আহসানুল ফাতাওয়া : ৬/৪৬৬

 

মিজানুর রহমান

সূত্রাপুর, ঢাকা

১৩৬৪. প্রশ্ন : আমরা কয়েক জন মিলে একটি সমিতি করেছি। সমিতির টাকাগুলো ব্যাংকের সেভিংস একাউন্টে জমা আছে। কিন্তু এতে আমরা নিরাপদ মনে করি না। কারণ যাদের নামে একাউন্ট তারা টাকা উঠিয়ে নিতে পারে। তাই আমরা ডিপিএস একাউন্ট করে টাকাগুলো রাখতে চাই। এতে যে সুদ আসবে তা কোনো গরিবকে দিয়ে দেব, আমরা নেব না। আমরা জানার বিষয় হলো, এভাবে নিরাপত্তার জন্য ডিপিএস একাউন্টে টাকা রাখা জায়েয আছে কি না?

উত্তর : ডিপিএস অর্থাৎ ফিক্সড ডিপোজিট একাউন্টে টাকা রাখা জায়েয নেই। কারণ এতে সুদী চুক্তি হয় এবং সুদ লেনদেন হয়। আর সুদী চুক্তি করা হারাম, যদিও সুদ না নেওয়া বা গরিবকে দিয়ে দেওয়ার নিয়ত থাকে। হাদীস শরীফে সুদের লেনদেনের ব্যাপারে কঠিন সতর্কবাণী এসেছে।—সূরা বাক্বারা, ০২ : ২৭৫; সহীহ মুসলিম : ৪০৯৩; ফাতাওয়া উসমানী : ৩/২৭৭

 

১৩৬৫. প্রশ্ন : মার্কেটে আমার মোবাইলের দোকান রয়েছে। আমাদের কাছে কিছু লোক চোরাই মোবাইল নিয়ে আসে। আমরা তা অল্প মূল্যে ক্রয় করে রেখে দিই এবং লাভজনক মূল্যে বিক্রি করি। হযরতের কাছে জানার বিষয় হলো এভাবে চোরাই মোবাইল ক্রয় করা বৈধ কি না? এবং এভাবে উপার্জিত অর্থ হালাল কি না?

উত্তর : ইসলামে চুরি একটি জঘন্যতম অপরাধ ও হারাম কাজ। এতে অন্যের হক নষ্ট হয়। সুতরাং প্রশ্নের বিবরণ অনুযায়ী এভাবে চোরাই মোবাইল বা চোরাই যেকোনো পণ্য ক্রয়—বিক্রয় কোনোটাই বৈধ নয়। চুরিকৃত বস্তু ক্রয় করার দ্বারা মালিকানা সাব্যস্ত হয় না। তাই এভাবে উপার্জিত অর্থও হালাল নয়। আর তা দ্বারা কোনোভাবে উপকৃত হওয়াও বৈধ নয়। চোরাই কোনো পণ্য ক্রয় করে থাকলে তা ফেরত দেওয়া আবশ্যক। মালিকের সন্ধান পাওয়া গেলে তার কাছে তা সোপর্দ করতে হবে। আর যদি বিক্রেতার কাছে ফেরত দেওয়া সম্ভব না হয় এবং মালিকের সন্ধানও না পাওয়া যায় তাহলে তা গরিব—মিসকিনকে সদকা করে দিতে হবে।—আলবাহরুর রায়েক : ৫/৪৩৬; ফাতাওয়া হিন্দিয়া : ৫/৪২০; কিফায়াতুল মুফতি : ১১/৭৩; ফাতাওয়া মাহমূদিয়া : ২৪/৯৬

 

আশরাফুল ইসলাম

হবিগঞ্জ

১৩৬৬. প্রশ্ন : ইন্টারনেটে আমরা বিভিন্ন ধরনের ভিডিও দেখে থাকি। তন্মধ্যে কিছু ভিডিও এমন থাকে যাতে কোনো প্রাণী থাকে না। শুধু প্রাকৃতিক দৃশ্য থাকে। কিছু ভিডিও এমন থাকে যেখানে মানুষের চেহারার উপর আবরণ দেওয়া থাকে; আর কিছু ভিডিও এমন থাকে যেখানে মানুষ ও প্রাণীর ছবিও থাকে।

অতএব, আমার জানার বিষয় হলো, কোন ধরনের ভিডিও দেখা জায়েয, আর কোন ধরনের ভিডিও দেখা নাজায়েয?

উত্তর : ভিডিও মৌলিকভাবে চিত্তবিনোদন ও অবসর সময় যাপনের অমুসলিমদের তৈরি এক নতুন আবিষ্কার। যাতে ক্ষেত্রবিশেষে আংশিক ফায়দা থাকলেও সাময়িক খেল—তামাশা বিনোদন ও সময় নষ্ট করা ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো ফায়দা নেই। তা ছাড়া ইন্টারনেটে প্রবেশকালে শরঈ নিষিদ্ধ কোনো বস্তু সামনে চলে আসা খুবই স্বাভাবিক। অধিকন্তু ভিডিও দেখার ফলে ফটোগ্রাফাররা উক্ত হারাম কাজে আরও বেশি জড়িয়ে পড়ে। তাই নেটে যেকোনো ধরনের ভিডিও দেখা থেকে বিরত থাকা উচিত।—রুহুল মাআনী : ১১/৮৫; মিশকাতুল মাসাবীহ : ৩৮৫; আহসানুল ফাতাওয়া : ৮/১৭৩; ফাতাওয়া মাহমূদিয়া : ২৯/৩২৮; কিতাবুল নাওয়াযিল : ১৬/৪৫৬

 

Avatar

editor

একটি কমেন্ট করুন