প্রতিষ্ঠাতা: মুজাহিদে আযম হযরত মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.

জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ, ঢাকা-এর মুখপত্র

প্রতিষ্ঠাকালঃ ১৯৩৭ ঈসায়ী

বিপদগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের ঈমানী দায়িত্ব

বিপদগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের ঈমানী দায়িত্ব

মাওলানা আব্দুল কুদ্দুছ


এক.

এ বছর দেশের বহু এলাকা বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। বিশেষ করে সিলেট ও সুনামগঞ্জের পরিস্থিতি খুবই উদ্বেগের। পত্রিকার ভাষ্য অনুযায়ী ১২২ বছরের ইতিহাসে সিলেট ও সুনামগঞ্জে এমন বন্যা হয়নি। কুড়িগ্রাম, মোমেনশাহী ও নেত্রকোনায়ও বন্যায় অনেক ক্ষয়—ক্ষতি হয়েছে। এছাড়া আরও অনেক এলাকায় স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি বন্যা হয়েছে। বন্যায় মানুষের ঘর—বাড়ি, ফল—ফসল, আসবাব—পত্রসহ বহু কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পত্র—পত্রিকার সংবাদ মতে এ যাবত বন্যায় প্রায় ৯০ জন মৃত্যুবরণ করেছে। এর আগে গত ৪ জুন সীতাকুণ্ডের একটি কন্টেইনার ডিপোতে আগুন লেগে বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে ৪৯ জন প্রাণ হারিয়েছেন। এ দুই দুর্ঘটনায় যেসকল মুসলমান মৃত্যুবরণ করেছেন আল্লাহ তাদের শাহাদাতের মর্যাদা দান করুন। তাদের পরিবার—পরিজনদের সবর করার তাওফীক দান করুন। আহতদের দ্রুত সুস্থ করে দিন। আমাদের সকলকে আল্লাহ পাক এ ধরনের দুর্ঘটনা থেকে হেফাজত করুন।

 

দুই.

ঘটনা হোক আর দুর্ঘটনা—বুদ্ধিমানের জন্য তাতে থাকে শিক্ষার অনেক উপাদান। মুমিন বিপদে ধৈর্য ধারণ করে, অন্যের বিপদে এগিয়ে আসে, সাহায্য করে, নিজে সতর্ক হয় এবং শিক্ষাগ্রহণ করে। আল্লাহর দরবারে প্রতিদানের আশা করে। মনে রাখতে হবে, মানুষের জীবন মৌলিকভাবে দুই ভাগে বিভক্ত থাকে। এক ভাগ সুখ ও শান্তির, অপর ভাগ দুঃখ ও কষ্টের। মুমিন বান্দা যখন সুখ—শান্তিতে থাকবে তখন আল্লাহ পাকের শোকর আদায় করবে। এটা হলো, তার শোকরের অবস্থা। যখন সে কোনো দুঃখ—কষ্টে পতিত হবে তখন সবর করবে। এটা তার সবরের অবস্থা। হাদীস শরীফে এসেছে, হযরত আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

الإيْـمَانُ نِصْفَانِ نِصْفٌ فِيْ الصَّبْرِ وَنِصْفٌ فِيْ الشُّكْرِ.

ঈমান দুই ভাগে বিভক্ত। এক ভাগ সবরের মধ্যে অপর ভাগ শোকরের মধ্যে।—বাইহাকী, শুআবুল ঈমান : ৯৭১৫

ঈমানদার জীবনের সব পরিস্থিতিতে উপকৃত হয়, সওয়াব লাভ করে। আনন্দের সময় শোকর আদায় করে নেকী অর্জন করে। দুঃখ—কষ্টে ধৈর্য ধারণ করে সওয়াব লাভ করে।

এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

عَجَبًا لأمْرِ الْمُؤْمِنِ أَنَّ أَمْرَه كُلَّه لَه خَيْر وَلَيْسَ ذلِكَ لِأحَدٍ إِلَّا لِلْمُؤْمِنِ، إِنْ أَصَابَتْهُ سَرَّاءُ شَكَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَه وَإِنْ أَصَابَتْه ضَرَّاءُ صَبَرَ فَكَانَ خَيْرًا لَه.

মুমিনের ব্যাপারটা বড়ই আশ্চর্যের, তার সবকিছুই তার জন্য কল্যাণকর। মুমিন ছাড়া আর কারও এ অবস্থা নেই। সে সুখকর কিছু লাভ করলে আল্লাহর শোকর আদায় করে। এ শোকর তার জন্য কল্যাণকর। কষ্টদায়ক কোনো কিছুর (যেমন অসুস্থতা বা বালা—মুসিবতের) সম্মুখীন হলে সে সবর করে। এ সবরও তার জন্য কল্যাণকর।—সহীহ মুসলিম : ২২৯৫; সুনানে আবু দাউদ : ১৬২২

বন্যায় বা অগ্নিকাণ্ডে যারা মৃত্যুবরণ করেছে তাঁদের জন্য আমরা আল্লাহর কাছে দুআ করব। প্রিয়জনের এমন করুণ মৃত্যুতে কষ্ট লাগবে এটাই স্বাভাবিক। এখন আমাদের হা—হুতাশেও তো কিছু হবে না। আল্লাহর ফায়সালা মনে করে ধৈর্য ধারণ করি। আল্লাহ আমাদেরকে অবশ্যই এর প্রতিদান দেবেন। যারা আমাদের থেকে বিদায় নিয়েছেন তারাও আল্লাহর কাছে অবশ্যই উত্তম বিনিময় পাবেন। কষ্টের এ মৃত্যু তাদের জন্য শাহাদাতের মর্তবা লাভের কারণ হবে, ইনশাআল্লাহ।

হাদীস শরীফে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

الشَّهَادَةُ سَبْعٌ سِوَى الْقَتْلِ فِيْ سَبِيلِ اللهِ: الْـمَطْعُوْنُ شَهِيْدٌ وَالْغَرِقُ شَهِيْدٌ وَصَاحِبُ ذَاتِ الْجَنْبِ شَهِيْدٌ وَالْـمَبْطُوْنُ شَهِيْدٌ وَصَاحِبُ الْحَرِيْقِ شَهِيدٌ وَالَّذِى يَمُوْتُ تَحْتَ الْهَدْمِ شَهِيدٌ وَالْمَرْأَةُ تَمُوْتُ بِجُمْع شَهِيْدٌ.

আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে নিহত হওয়া ছাড়াও শাহাদাতের মর্যাদা লাভের সাতটি উপায় রয়েছে :

০১. মহামারিতে আক্রান্ত ব্যক্তি শহীদ।

০২. পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি শহীদ।

০৩. ফোড়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারী শহীদ।

০৪. পেটের পীড়ায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণকারী শহীদ।

০৫. আগুনে পুড়ে মৃত্যুবরণকারী শহীদ।

০৬. ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মৃত্যুবরণকারী শহীদ।

০৭. গর্ভবতী অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী মা—ও শহীদ।—সুনানে আবু দাউদ : ৩১১১

এ হাদীসে পানিতে ডুবে ও আগুনে পুড়ে মৃত্যুবরণকারীকে শহীদ বলা হয়েছে। এরা দুনিয়ার বিধানে শহীদ নয়। অর্থাৎ জিহাদের ময়দানে যারা শহীদ হয় তারা দুনিয়া—আখেরাত উভয় হিসাবেই শহীদ। দুনিয়াতে তাদের গোসল দেওয়া হয় না। রক্তমাখা অবস্থায়ই দাফন করা হয়। কিন্তু এ হাদীসে উল্লিখিত শহীদদের গোসল দেওয়া হবে। তবে আখেরাতে তারা শহীদের মর্যাদা লাভ করবে। শহীদরা বিনা হিসাবে জান্নাতে প্রবেশ করবে। শহীদরা অন্যদের জন্য সুপারিশ করার ক্ষমতা লাভ করবে। সুবহানাল্লাহ!

আমরা আশা করি, যারা বন্যায় ও অগ্নিকাণ্ডে নিহত হয়েছেন তাদের সকলকেই আল্লাহ পাক শহীদের মর্যাদা দান করবেন। দুনিয়া থেকে একসময় সবাইকেই বিদায় নিতে হবে। সে বিদায় যদি হয় শাহাদাতের তাহলে তো তার জন্য জান্নাতের অফুরন্ত নেয়ামত ও সুখের ঠিকানা প্রস্তুত। তাদের পরকালীন জীবন সুখের হবে জেনেও একজন মুমিন তার প্রিয়জন হারিয়েও অধৈর্য হবে না। সবর করবে এবং আল্লাহ পাকের দরবারে প্রতিদানের আশা করবে। প্রতিদান ও সওয়াব কেবল নিহত ব্যক্তিই পাবেন না, পাবেন প্রিয়জনের মৃত্যুতে সবরকারী আত্মীয়—স্বজনও। হাদীস শরীফে এসেছে, আল্লাহ পাক বলেন,

مَا لِعَبْدِي الْمُؤْمِنِ عِنْدِي جَزَاءٌ إِذَا قَبَضْتُ صَفيَّهُ مِنْ أَهْلِ الدُّنْيَا ثُمّ احْتَسَبَهُ إِلا الْجَنّةُ.

আমি যখন আমার মুমিন বান্দার কোনো আপনজনকে মৃত্যু দিই আর সে সবর করে, তখন আমার কাছে তার একমাত্র প্রতিদান হলো জান্নাত।—সহীহ বুখারী : ৬৪২৪

 

তিন.

পৃথিবীতে যত বিপর্যয় ও বিপদাপদ আসে তার সবই আমাদের কৃতকর্মের ফল। বর্তমান পৃথিবীতে যত অশান্তি ও অস্থিরতা সবই আমাদের বদআমলের বিষফল। উম্মত সামগ্রিকভাবে দ্বীন—শরীয়ত থেকে দিন দিন দূরে সরে যাচ্ছে। আখেরাতে আল্লাহ পাকের নেয়ামত ও গজব মানুষ লাভ করবে প্রত্যেকের নিজ নিজ আমলের হিসাবে। ওখানে একজনের বদআমল আরেকজনের কোনো ক্ষতি করবে না। কিন্তু দুনিয়াতে আল্লাহ পাকের হিসাব ভিন্ন। শান্তি—শৃঙ্খলা ও অশান্তি—অস্থিরতা এখানে আসে উম্মতের সামগ্রিক অবস্থা বিচার করে। উম্মতের সামগ্রিক অবস্থা ভালো হলে আল্লাহ পাক রহমত ও বরকতের দরজা খুলে দেন আর সামগ্রিক অবস্থা খারাপ হলে তাঁর রহমত ও বরকত উঠে যায়। আল্লাহর আযাব নেমে আসে। হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানি, খুন—খারাবি বৃদ্ধি পায়। ফলে অন্যায়কারীদের পাশাপাশি আল্লাহর প্রিয় বান্দা, নিষ্পাপ শিশু ও অবোধ পশু—পাখিও কষ্ট ভোগ করে। তো যেকোনো বিপদকেই নিজের গোনাহের ফল মনে করে আল্লাহর দরবারে তওবা করতে হবে। চাই সে বিপদ আমার ওপর আসুক বা অন্য কারও ওপর।

বিপর্যয় ও দুর্ঘটনা যখন ঘটে তখন এ কথা বলার সুযোগ নেই, আক্রান্ত ব্যক্তিদের গোনাহের ফলেই এ বিপদ এসেছে। কারণ, দেখা যাবে সেখানে অনেক নিষ্পাপ ও আল্লাহওয়ালা মানুষও আক্রান্ত হয়েছে। বন্যায় বহু শিশু মৃত্যুবরণ করেছে। তো এ শিশুদের কী অপরাধ ছিল। বরং আমাদের সবার গোনাহের ফলেই এ বিপর্যয় এসেছে। আল্লাহ পাক এ উম্মতকে একেবারে ধ্বংস করবেন না। তাই বিভিন্ন জায়গায় খণ্ডিতভাবে বিপর্যয় নেমে আসে। তাই আমরা সকলে আল্লাহর দরবারে তওবা করি। মনে করতে হবে, এ বিপর্যয় আমার গোনাহেরই ফল। আল্লাহ পাকের কাছে পানাহ চাইতে হবে যেন আল্লাহ পাক এ ধরনের বিপর্যয় থেকে সবাইকে হেফাজত করেন।

 

চার.

আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেদিন হেরা গুহায় প্রথম ওহী লাভ করছিলেন সেদিনের ঘটনায় ভীত—সন্ত্রস্ত অবস্থায় ঘরে ফিরে এলেন। হযরত খাদিজা রাযি. কে বললেন,

لَقَدْ خَشِيتُ عَلَى نَفْسِي.

আমি আমার জীবন নিয়ে শঙ্কিত।

তখন আম্মাজান খাদিজা রাযি. নবীজিকে যে কথাগুলো বলে সান্ত্বনা দিয়েছিলেন সে কথাগুলো ছিল এমন :

كَلّا وَاللهِ مَا يُخْزِيكَ اللهُ أَبَدًا، إِنّكَ لَتَصِلُ الرّحِمَ، وَتَحْمِلُ الكَلّ، وَتَكْسِبُ المَعْدُومَ، وَتَقْرِي الضّيْفَ، وَتُعِينُ عَلَى نَوَائِبِ الحَقِّ.

কক্ষনো নয়। খোদার কসম, আল্লাহ আপনাকে কখনো লাঞ্ছিত করবেন না। আপনি আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করেন। অসহায়ের দায়—দায়িত্ব গ্রহণ করেন। নিঃস্বের জন্য উপার্জন করেন। মেহমানের আপ্যায়ন করেন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে সহযোগিতা করেন।—সহীহ বুখারী : ০৩

এ হলো আমাদের নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—এর কেন্দ্রীয় বৈশিষ্ট্য, যা তিনি আজীবন লালন করেছেন। অতএব বন্যায় ও অগ্নিকাণ্ডে যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে যথাসাধ্য তাদের সহযোগিতা করা আমাদের কর্তব্য। প্রত্যেকেই সাধ্যমতো তাদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করি। বিপদগ্রস্তদের ব্যথায় ব্যথিত হওয়া, তাদের পাশে দাঁড়ানো, সাধ্যমতো সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া মুসলমানদের ঈমানী কর্তব্য। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

مَثَلُ الْمُؤْمِنِينَ فِيْ تَوَادِّهِمْ وتَرَاحُمِهِمْ وتَعاطُفِهِمْ مَثَلُ الْجَسَدِ إَذَا اشْتَكى مِنْهُ عُضْوٌ تَدَاعى لَه سَائِرُ الْجَسَدِ بِالسَّهْرِ وَالْحُمّى.

পরস্পর মহব্বত, সহমর্মিতা ও সহযোগিতার ক্ষেত্রে ঈমানদাররা এক দেহের মতো। তার কোনো একটি অঙ্গ আক্রান্ত হলে এর কারণে সারা দেহ রাত্রি জাগরণ করে ও জ¦রে ভোগে।—সহীহ মুসলিম : ৬৫৮৬

অপর এক হাদীসে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

وَاَللهُ فِيْ عَوْنِ الْعَبْدِ مَا كَانَ الْعَبْدُ فِي عَوْنِ أَخِيهِ.

যতক্ষণ কোনো বান্দা অপরের সাহায্য—সহযোগিতা করে ততক্ষণ আল্লাহ তার সাহায্য করেন।—সহীহ মুসলিম : ২৬৯৯

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

وَمَنْ كَانَ فِيْ حَاجَةِ أَخِيْهِ كَانَ اللهُ فِيْ حَاجَتِه وَمَنْ فَرَّجَ عَنْ مُسْلِمٍ كُرْبَةً فَرَّجَ اللهُ عَنْهُ كُرْبَةً مِنْ كُرَبِ يَوْمِ الْقِيَامَةِ.

মুসলমান মুসলমানের ভাই। তাই এক মুসলমান আরেক মুসলমানের উপর জুলুম করতে পারে না। এমনিভাবে মুসলিম ভাইকে কোনো জালেমের মুখে ছেড়ে আসতে পারে না। যে তার ভাইয়ের প্রয়োজন পূরণ করে স্বয়ং আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করে দেবেন। যে মুসলমানের কষ্ট দূর করে আল্লাহ তাআলা কেয়ামতের দিন তার কষ্ট দূর করে দেবেন।—জামে তিরমিযী : ১৪৮৯

বিপদগ্রস্তের সাহায্যে পাশে না দাঁড়ালে, তার দুঃখ—কষ্ট দূর করার চেষ্টা না করলে কিয়ামতের ময়দানের আল্লাহ পাকের সামনে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ يَقُولُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ: يَا ابْنَ آدَمَ! مَرِضْتُ فَلَمْ تَعُدْنِيْ، قَالَ: يَا رَبِّ! كَيْفَ أَعُودُكَ؟ وَأَنْتَ رَبُّ الْعَالَمِينَ! قَالَ: أَمَا عَلِمْتَ أَنَّ عَبْدِيْ فُلَانًا مَرِضَ فَلَمْ تَعُدْهُ، أَمَا عَلِمْتَ أَنَّكَ لَوْ عُدْتَه لَوَجَدْتَنِيْ عِنْدَه؟ يَا ابْنَ آدَمَ! اسْتَطْعَمْتُكَ فَلَمْ تُطْعِمْنِيْ، قَالَ: يَا رَبِّ! وَكَيْفَ أُطْعِمُكَ؟ وَأَنْتَ رَبُّ الْعَالَمِينَ! قَالَ: أَمَا عَلِمْتَ أَنَّه اسْتَطْعَمَكَ عَبْدِيْ فُلَانٌ، فَلَمْ تُطْعِمْهُ؟ أَمَا عَلِمْتَ أَنَّكَ لَوْ أَطْعَمْتَه لَوَجَدْتَ ذَلِكَ عِنْدِيْ، يَا ابْنَ آدَمَ! اسْتَسْقَيْتُكَ، فَلَمْ تَسْقِنِيْ، قَالَ: يَا رَبِّ! كَيْفَ أَسْقِيكَ؟ وَأَنْتَ رَبُّ الْعَالَمِينَ! قَالَ: اسْتَسْقَاكَ عَبْدِيْ فُلَانٌ فَلَمْ تَسْقِهٖ، أَمَا إِنَّكَ لَوْ سَقَيْتَه وَجَدْتَ ذَلِكَ عِنْدِيْ.

আল্লাহ তাআলা কেয়ামতের দিন বলবেন, হে আদমসন্তান, আমি অসুস্থ হয়েছি তুমি দেখতে যাওনি।

বান্দা বলবে, হে প্রভু, কীভাবে আপনাকে দেখতে যাব অথচ আপনি বিশ্বজাহানের রব!

আল্লাহ বলবেন, তুমি কি জানো না, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল? তুমি তো তাকে দেখতে যাওনি। তাকে দেখতে গেলে সেখানে আমাকেই পেতে।

আল্লাহ বলবেন, হে আদমসন্তান, আমি তোমার কাছে খাবার চেয়েছি কিন্তু তুমি খাবার দাওনি।

বান্দা বলবে, হে প্রভু, আমি কীভাবে আপনাকে খাবার খাওয়াব, আপনি তো বিশ্বপ্রতিপালক!

আল্লাহ বলবেন, তুমি কি জানো না, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে খাবার চেয়েছিল। তুমি তাকে খাবার দাওনি। তুমি তাকে খাবার খাওয়ালে তার প্রতিদান আমার কাছে পেতে।

আল্লাহ বলবেন, হে আদমসন্তান, আমি তোমার কাছে পানি চেয়েছিলাম কিন্তু তুমি পান করাওনি।

বান্দা বলবে, হে প্রভু, কীভাবে আপনাকে পান করাব, আপনি তো রাব্বুল আলামীন!

আল্লাহ বলবেন, তুমি কি জানো না, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে পানি চেয়েছিল। তুমি তাকে পান করাওনি। তুমি তাকে পান করালে তার প্রতিদান আমার কাছে পেতে।—সহীহ মুসলিম : ৬৫৫৬

 

পাঁচ.

ভালো—মন্দ সবকিছুই আল্লাহ পাকের পক্ষ থেকে হওয়ার ইয়াকিন যেমন আমাদের রাখতে হবে তেমনি বিপদাপদ থেকে আত্মরক্ষার সর্বাত্মক চেষ্টা করাও আমাদের কর্তব্য। তাকদীরে যা আছে হবে বলে বাহ্যিক উপায়—উপকরণ অবলম্বন না করার শিক্ষা ইসলাম দেয় না। বরং বাহ্যিক সতর্কতা অবলম্বন করা অবশ্য কর্তব্য। মনে রাখতে হবে, সতর্কতা অবলম্বন করাও শরীয়তের নির্দেশ।

হযরত আনাস রাযি. বলেন,

قَالَ رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللهِ أَعْقِلُهَا وَأَتَوَكَّلُ أَوْ أُطْلِقُهَا وَأَتَوَكَّلُ؟

قَالَ: اِعْقِلْهَا وَتَوَكَّلْ.

এক লোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর কাছে এসে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, আমি কি আমার উটনী বেঁধে রেখে আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করব? নাকি ছেড়ে দিয়ে তাওয়াক্কুল করব?

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তুমি প্রথমে উটনী বাঁধো এরপর আল্লাহর ওপর তাওয়াক্কুল করো।—জামে তিরমিযী : ২৫১৭

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বোঝালেন, আল্লাহর ওপর বান্দার তাওয়াক্কুল ও ভরসা থাকবে, পাশাপাশি নিজেকেও সচেতন হতে হবে। সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। সতর্কতা ও সচেতনতার পর আল্লাহর ওপর ভরসা করতে হবে যে, বিপর্যয় থেকে রক্ষার মালিক তো আল্লাহ।

অতবএ এ সকল দুর্ঘটনার বাহ্যিক কারণ অনুসন্ধান করা জরুরি। যে যে কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে থাকে, যে যে কারণে বন্যায় ক্ষয়—ক্ষতির আশঙ্কা বেশি থাকে সেগুলো থেকে আত্মরক্ষার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। পত্র—পত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী এক্ষেত্রে কতৃর্পক্ষের গাফলতি ও অবহেলাও অনেকাংশে দায়ী। সরকার ও সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের এ বিষয়ে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। তাদের অবহেলার কারণে মানুষের ক্ষয়—ক্ষতি হয়ে থাকলে অবশ্যই তারা অপরাধী সাব্যস্ত হবেন। দুনিয়ার আইনের ফাঁক গলিয়ে তার বেরিয়ে গেলেও আল্লাহর দরবারে কোনোভাবেই ছাড় পাবেন না।

 

ছয়.

আমরা জরুরি সতর্কতা অবলম্বন করব, আল্লাহর কাছে দুআ করব এবং রাসূলের শেখানো দুআগুলো পূর্ণ বিশ্বাসের সঙ্গে পড়ব। হাদীসে অনেক দুআর কথা এসেছে, যা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দৈনিক পাঠ করতেন। এখানে কিছু বিশেষ আমলের কথা উল্লেখ করছি।

তিরমিযী শরীফে (হাদীস নং : ৩৪৩২) এসেছে, হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি বালা—মুসিবতে আক্রান্ত কোনো ব্যক্তিকে দেখে এ দুআ পড়বে, ওই বালা—মুসিবত তাকে আক্রান্ত করবে না। দুআটি হলো :

اَلْحَمْدُ لِلهِ الَّذِيْ عَافَانِـيْ مِمَّا ابْتَلَاكَ بِهٖ وَفَضَّلَنِيْ عَلىٰ كَثِيْرٍ مِّمَّنْ خَلَقَ تَفْضِيْلًا.

দুআটি মনে মনে পড়ে নেবে। দুআটি বেশি বড় নয়। ছোট দুআ। আগ্রহ থাকলে অল্প সময়েই আমরা শিখে নিতে পারি। এর লাভ কত ভেবে দেখুন। কোনো বিপদগ্রস্তকে দেখে এ দুআ পড়লে আল্লাহ পাক ওই বিপদ থেকে তাকে রক্ষা করবেন।

ইমাম নববী রহ. তাঁর বিখ্যাত হাদীসগ্রন্থ আল—আযকারে লেখেন, একবার এক লোক হযরত আবু দারদা রাযি. এর কাছে এসে বলল, আবু দারদা, আপনার বাড়ি পুড়ে গেছে।

আবু দারদা রাযি. বললেন, না পোড়েনি। আল্লাহ পাক এমনটি হতে দেবেন না ওই দুআর কারণে, যা আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি। তিনি বলেন, যে এ দুআ পাঠ করবে দিনের শুরুতে সন্ধ্যা পর্যন্ত তার কোনো বিপদ হবে না। আর যে তা পাঠ করবে দিনের শেষে সকাল পর্যন্ত তার কোনো বিপদ ঘটবে না। দুআটি হলো :

اَللّٰهُمَّ أَنْتَ رَبِّيْ، لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ عَلَيْكَ تَوَكَّلْتُ وَأَنْتَ رَبُّ العَرْشِ الْعَظِيْمِ، ما شاءَ اللهُ كَانَ، وَمَا لَمْ يَشأْ لَمْ يَكُنْ، لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلاَّ بِاللهِ الْعَلِيِّ الْعَظِيمِ، أَعْلَمُ أَنَّ اللهَ عَلىٰ كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْـرٌ، وَأَنَّ اللهَ قَدْ أَحَاطَ بِكُلِّ شَيْءٍ عِلْماً، اَللّٰهُمَّ إِنِّيْ أَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّ نَفْسِيْ، وَمِنْ شَرِّ كُلِّ دَابَّةٍ أَنْتَ آخِذٌ بِنَاصِيَتِهَا، إِنَّ رَبِّيْ عَلىٰ صِرَاطٍ مُّسْتَقِيْمٍ.

অর্থ : হে আল্লাহ, আপনি আমার প্রভু। আপনি ছাড়া কোনো মাবুদ নেই। আপনার ওপর ভরসা করেছি। আপনি মহান আরশের অধিপতি। আল্লাহ যা চান তা হয়। তিনি যা চান না তা হয় না। শক্তি ও ক্ষমতা কেবলই সর্বোচ্চ মহান আল্লাহর। আমি জানি আল্লাহ সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। আল্লাহর জ্ঞান সবকিছু বেষ্টন করে আছে। হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে আশ্রয় চাই আমার নফসের মন্দ থেকে। আপনার নিয়ন্ত্রণাধীন সব ধরনের প্রাণী থেকে। নিশ্চয় আমার প্রভু সরল পথে রয়েছেন।

কত বরকতপূর্ণ দুআ। একীনের সাথে এ দুআর আমল আমরা নিয়মিত করি। ইনশাআল্লাহ আল্লাহ পাক আমাদেরকে মুসিবত থেকে হেফাজত করবেন।

আরেকটি দুআ বলছি। তৃতীয় খলীফা হযরত উসমান রাযি. এর ছেলে হযরত আবান রহ. বলেন, আমি হযরত উসমান রাযি. কে বলতে শুনেছি, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

مَا مِنْ عَبْدٍ يَقُوْلُ فِيْ صَبَاحِ كُلِّ يَوْمٍ وَمَسَاءِ كُلِّ لَيْلَةٍ: بِسْمِ اللهِ الَّذِيْ لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِه شَيْءُ فِيْ الْأَرْضِ وَلَا فِيْ السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْمُ ثَلَاثَ مَرَّاتٍ لَمْ يَضُرَّه شَيْءٌ.

وَكَانَ أَبَانُ قَدْ أَصَابَه طَرَفُ فَالِجٍ فَجَعَلَ الرَّجُلُ يَنْظُرُ إِلَيْهِ، فَقَالَ لَه أَبَانُ: مَا تَنْظُرُ؟ أَمَّا إِنَّ الْحَدِيْثَ كَمَا حَدَّثْتُكَ، وَلكِنِّيْ لَمْ أَقُلْهُ يَوْمَئِذٍ لِيُمْضِيَ اللهُ عَلَيَّ قَدَرَه.

যে কেউ প্রতিদিন সকাল—সন্ধ্যায় এ দুআ তিনবার পাঠ করবে পৃথিবীর কিছুই তার কোনো ক্ষতি করবে না। দুআটি হলো :

بِسْمِ اللهِ الَّذِيْ لَا يَضُرُّ مَعَ اسْمِهٖ شَيْءٌ فَيْ الْأَرْضِ وَلَا  فِيْ السَّمَاءِ وَهُوَ السَّمِيْعُ الْعَلِيْمُ.

হযরত আবান রহ. এ হাদীস বর্ণনা করলেন। তাঁর এক পা অবশের মতো ছিল। এক লোক বার বার তাকে দেখছিল। (যেন সে বোঝাতে চায়, দুআ পড়লে যদি কোনো ক্ষতিই না হয়, তা হলে আপনার এ সমস্যা হলো কীভাবে।) হযরত আবান বিষয়টি বুঝতে পারলেন। বললেন, তুমি কী দেখছ? হাদীস আমি যা বলেছি তা—ই। কিন্তু আমি সেদিন দুআটি পড়িনি। ফলে আল্লাহর পক্ষ থেকে যা ঘটার তা—ই ঘটল।—জামে তিরমিযী : ৩৩৮৮

 

আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে দ্বীনের ওপর চলার তাওফীক দান করুন। পুরো জাতিকে পূর্ণ দ্বীনদার হওয়ার তাওফীক দান করুন। এ দেশের উপর রহমত ও বরকত নাযিল করুন। সকলকে নিরাপদে বসবাস করার তাওফীক দান করুন। সকল বালা—মুসিবত থেকে হেফাজত করুন। আমীন।

Avatar

zobayer

একটি কমেন্ট করুন