প্রতিষ্ঠাতা: মুজাহিদে আযম হযরত মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.

জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ, ঢাকা-এর মুখপত্র

প্রতিষ্ঠাকালঃ ১৯৩৭ ঈসায়ী

ভারতে হিজাব—বিতর্ক জয় শ্রীর মেঘ; আল্লাহু আকবারের বিদ্যুৎ এবং জ্বলন্ত বিশ্বাসের ঢেউ

ভারতে হিজাব—বিতর্ক জয় শ্রীর মেঘ; আল্লাহু আকবারের বিদ্যুৎ এবং জ্বলন্ত বিশ্বাসের ঢেউ

মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন

 

মুসকান! ভারত কর্নাটক রাজ্যের মেয়ে। উদুপি জেলার সরকারি গার্লস পাইলট কলেজের শিক্ষার্থী। গায়ে সম্ভ্রান্ত বোরকা। মুখে কালো মাস্ক। কলেজের আঙিনায় গাড়ি রেখে ক্লাসের দিকে যাচ্ছেন। এমন সময় একদল যুবক ‘জয় শ্রী রাম—জয় শ্রী রাম’ বলে স্লোগান দিতে দিতে মেয়েটির গতিরোধ করতে চেষ্টা করে। তাদের গায়ে সন্ন্যাসীর গেরুয়া চাদর, হাতে গেরুয়া পতাকা। একদল মারমুখী রামবাদী ষণ্ডা যুবকের ভিড়ে ওই মুসলিম ছাত্রী অকম্পিত বিশ্বাসে স্লোগান দিয়ে ওঠেন—‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবর’! একপাল হিংস্র পামরের ‘জয় শ্রীর কালোমেঘ ছিন্ন করে আকাশে উঠে যায় এই অসম সাহসিনীর তাকবীরের বিদ্যুৎ! ছড়িয়ে পড়ে এই পবিত্র স্লোগান বিশ্বময়। যাদের রক্তে জারিত ন্যায় ও ঈমান তারা জেগে ওঠেন অসীম আবেগে। অন্তর্জালের কল্যাণে পুরো পৃথিবী নড়ে উঠে এক ঈমানদার তরুণীর কণ্ঠ অনুসরণ করে। সঙ্গে দিশেহারা এবং স্তম্ভিত বেঈমান পাড়া। ঘটনাটি ৮.২.২২ তারিখের।

তারপর শুরু হয় মুসকানকে সম্মানিত ও পুরস্কৃত করার পালা। ইংরেজবিরোধী স্বাধীনতা বিপ্লবে নেতৃত্বদানের অজয় ঐতিহ্যে অম্লান জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সাহসী নেতা মাওলানা সায়্যিদ মাহমুদ মাদানী পাঁচ লাখ রুপি পুরস্কার দেন এই সাহসী তরুণীকে। তারপর দীর্ঘ হতে থাকে হিজাবের সমর্থনে আন্দোলনের সারি। ঘটনাটি একই সঙ্গে বেদনার এবং আনন্দের।

দুই.

বেদনার কেন বললাম সেই কথা আগে বলি।

ঘটনাটি ঘটেছে একটি কলেজে। যে শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্যে, সবিশেষ জাতিসংঘের মাথাব্যথার অন্ত নেই—সেই শিক্ষানিকেতনে শিক্ষা আনতে গিয়ে বাধার শিকার হচ্ছে আমাদের মেয়েরা। এও অনুপেক্ষ নয়—নানা ধরনের লোভ, সুবিধা ও স্বপ্ন দেখিয়ে মেয়েদের যে আধুনিক শিক্ষার প্রতি উন্মাদ করে তোলা হচ্ছে—মুসকানরা ওই শিক্ষা আনতেই গিয়েছিল কলেজে। তারা বাধার মুখে পড়েছে এমন এক দেশ ও সমাজে—যেখানকার চলতি স্লোগান হলো—বেটি পড়হাও; বেটি বাড়হাও—মেয়েদের শিক্ষিত করো; এগিয়ে নিয়ে যাও! যেখানে কন্যাসন্তানকে শিক্ষিত করতে এবং এগিয়ে নিয়ে যেতে উৎসাহিত করা হচ্ছে সেখানে মুসলিম মেয়েদের বাধা দেওয়া হচ্ছে বিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে! এটাকে সাম্প্রদায়িক হিংস্রর সংকীর্ণতা ছাড়া আর কী বলা যায়?

বড় করে ‘সাম্প্রদায়িক’ কথাটা এই কারণেও এসেছে—যারা মুসলমান মেয়েদের স্কার্ফ পরে স্কুলে কিংবা কলেজে প্রবেশে বাধা দিচ্ছে তারা—

এক. জয় শ্রী রাম সেস্নাগান দিয়ে হামলা করছে!

দুই. তাদের হাতে গেরুয়া পতাকা এবং গায়ে গেরুয়া চাদর!

আরেকটু ভেঙে বলি। ৫ ফেব্রুয়ারি ২০২২। এই দিন কর্ণাটক সরকার সম্পূর্ণ অযৌক্তিকভাবে রাজ্যের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেয়েদের স্কার্ফ পরা নিষিদ্ধ করে। আর এই নিষেধাজ্ঞাটা আসে ঠিক এমন সময়—যখন দ্বাদশ শ্রেণির চূড়ান্ত পরীক্ষার মাত্র দুই মাস বাকি। সরকারের এই নিষেধাজ্ঞার কারণে রাজ্যের অসংখ্য মেয়ের পড়াশোনার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে—যা গোপন বিষয় নয়।

এই আদেশটি যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত—ঘটনার বিবরণ থেকে তা সহজেই বোঝা যায়। কারণ, স্কার্ফ নিয়ে যে কলেজটিতে এই সাম্প্রদায়িক ঘটনাটি ঘটেছে, সেই উদুপির পিইউ কলেজসহ সেখানকার সব ক’টি কলেজের উন্নয়ন কমিটির প্রধান হলেন সেখানকার বিজেপি দলীয়  এমএলএ। পিইউ কলেজ কতৃর্পক্ষ ছাত্রীদের মাথায় স্কার্ফ পরায় কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়নি। ওই এমএলএ—ই আদেশ করেছেন—কোনো ছাত্রী স্কার্ফ পরে কলেজে ঢুকতে পারবে না।

কথা এখানেই শেষ নয়। বরং দলের উদীপি জেলা সেক্রেটারি সুরেন্দ্র কোটেশ্বর হুমকি দেন—যদি কলেজ কতৃর্পক্ষ মুসলমান ছাত্রীদের স্কার্ফ কিংবা হিজাব পরে ক্লাস করতে দেয়, তাহলে তার দল বাকি সব ছাত্র—ছাত্রীদের গেরুয়া ওড়না পরিয়ে কলেজে ঢোকাবে।

শুধু বলেই ক্ষান্ত হননি তিনি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় তা করে দেখিয়েছেন। তিনি তার দলের লোকদের গেরুয়া পোশাক পরিয়ে কলেজের সামনে সমবেত করেছেন। বজরং দলের গেরুয়া বাহিনী কলেজের ফটকে দাঁড়িয়ে স্কার্ফ কিংবা বোরকা পরা মুসলমান ছাত্রীদের কলেজে প্রবেশে বাধা দিতে থাকে। অদূরে দাঁড়িয়ে পুলিশ সেই দৃশ্য উপভোগ করতে থাকে! পরে মুসলমান মেয়েদের যারা হয়রানি করছিল তাদের কিছু না বলে উল্টো মুসলমান মেয়েদেরকেই সেখান থেকে দ্রুত চলে যেতে বাধ্য করে। সঙ্গে ব্যাখ্যা করে—আইনশৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থেই নাকি সেটা তাদের করতে হয়েছে!

কী মধুর ব্যাখ্যা, বহিরাগত সন্ত্রাসীরা কলেজের মুখে দাঁড়িয়ে ওই কলেজের শিক্ষার্থীদের বাধা দিচ্ছে। তাদের পুলিশ কিছুই বলছে না। উল্টো সরিয়ে দিচ্ছে ওখানকার শিক্ষার্থীদের! কারণ—তারা মুসলমান!

আরও ভয়ংকর তথ্য হলো, উদীপির আরেকটি কলেজ। নাম—বান্দ্রাকারস আর্টস অ্যাণ্ড সায়েন্স ডিগ্রি কলেজ। স্কার্ফ লিপিবদ্ধ করে সরকারের আদেশের পরও ওই কলেজ কতৃর্পক্ষ ছাত্রীদের স্কার্ফ পরে কলেজে প্রবেশের অনুমতি দিয়েছিল। তারা বলেছিল—স্কুল ড্রেসের রঙের সঙ্গে মিল রেখে স্কার্ফ পরে আসা যাবে। ছাত্রীরা সেই আইন মানার পরও তাদের কলেজে ঢুকতে দেওয়া হয়নি! ওই গেরুয়া পোশাকধারী বজরং দলীয় সন্ত্রাসীরাই নিয়ন্ত্রণ করছে সব!

কলেজ কতৃর্পক্ষ গেরুয়া পতাকার সামনে অসহায়!

 

তিন.

এই সংকটের সূত্রপাত হয়েছিল সম্ভবত গত বছরের ডিসেম্বরে। হিজাব পরার কারণে শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না—এমন অভিযোগ করছিল উদীপি জেলার সরকারি গার্লস পিইউ কলেজের ছয় শিক্ষার্থী! এখানে এও লক্ষণীয়—হিজাব ইস্যুতে কর্ণাটকে মুসলিম শিক্ষার্থীদের পক্ষে মামলা লড়ছেন আইনজীবী সঞ্জয় হেগরে। তিনি ১০.২.২২ তারিখে আদালতে বলেছেন— কর্ণাটকের শিক্ষা আইনের কোথাও স্কুলের পোশাক সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি। লাইভ ল—এর খবরে বলা হয়েছে, ওই আইনজীবী বলেছেন, শিক্ষার্থীদের পোশাক কী হবে, সেটা স্কুলের বিষয়।

অবশ্য কর্ণাটক সরকারের পক্ষে শুনানিতে অংশ নেয় অ্যাডভোকেট জেনারেল। তিনি বলেছেন, রাজ্য সরকার চায় আইন হোক। কিন্তু স্কুল বা কলেজে একদল মাথা ঢেকে আসবে, আরেকদল গেরুয়া উত্তরীয় পরে আসবে—এটা হতে পারে না!’ [প্রথম আলো : ১১.২.২২]

লক্ষ করার বিষয় হলো, হিজাবের পক্ষে মামলার আইনজীবী সঞ্জয় হেগরে যেমন বলেছেন, শিক্ষার্থীদের পোশাক বিষয়ে আইনে কিছু বলা নেই; সরকার পক্ষের আইনজীবীও স্বীকার করেছেন, আইন নেই। তবে রাজ্য সরকার চাচ্ছে আইন হোক! প্রশ্ন হলো, আইন হওয়ার আগেই তাহলে এম এল এ মহোদয়ের এত উত্তেজনা কেন? বজরং দলই—বা পতাকার ভেতরে লাঠি নিয়ে ওইভাবে মারমুখী কেন? আর বেআইনি এমন একটি জ্বলন্ত অপরাধ হতে দেখেও নীরব কেন পুলিশ? এসব প্রশ্নের উত্তর দেবে কে?

তা ছাড়া গেরুয়া পতাকা এবং গেরুয়া উত্তরীয় যদি কোনো ধর্মের আবশ্যকীয় পোশাক হয়—সেটা তারা পরতেই পারে। সে নিয়ে তো মুসলিম শিক্ষার্থীগণ কোনো আপত্তি তুলেনি। তারা চাইছে কেবল ভারতীয় সংবিধান প্রদত্ত তাদের অধিকারটা। ভারতের সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘রাষ্ট্রের সব নাগরিক স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন, অনুশীলন এবং প্রচারের ক্ষেত্রে সমান অধিকার রাখে।’ ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির (মার্কসবাদী) পলিটব্যুরোর সদস্য বৃন্দা কারাত সাংবিধানিক এই অধিকারের কথা উল্লেখ করে লিখেছেন—‘কিন্তু সরকার স্কার্ফ বিতর্ক সামনে এনে এমনভাবে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে চাইছে যেন সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত—“ধর্ম লালন এবং প্রচারের অধিকার” জনশৃঙ্খলার ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। বৃন্দা কারাত দুঃখ করে লিখেছেন—‘৫ ফেব্রুয়ারি কর্ণাটক সরকার সম্পূর্ণ ভুল ও অনৈতিকভাবে রাজ্যের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মেয়েদের স্কার্ফ নিষিদ্ধ করে আদেশ দেয়ার পর হতাশাজনকভাবে কর্ণাটক হাইকোর্টের এক বেঞ্চ সেই সরকারি আদেশে অন্তর্বতীর্কালীন স্থগিতাদেশ দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।’ [প্রথম আলো : ১৩.২.২২]

রাষ্ট্রের শাসকপক্ষ, সরাসরি এমএলএ যখন সংবিধান—বিরোধী উদ্যোগ নেন এবং হাইকোর্ট তার মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকেন— পুলিশ তো তখন দাঁড়িয়ে আইন ভাঙার তামাশা দেখবেই!

 

চার.

এটা সচেতন ব্যক্তিমাত্রই জানেন, ভারতে মুসলমানগণ টিকে আছেন তাদের পরিচ্ছন্ন বিশ্বাস, আকাশজয়ী ঈমান, চারিত্রিক সৌন্দর্য, আদর্শিক বল এবং নিখাদ দেশপ্রেমের শক্তিতে। নিজেদের ধর্ম সম্পর্কে জানা, দ্বীনি ইলমের প্রতি শ্রদ্ধা ও যত্ন এবং তার প্রতি আস্থাপূর্ণ অনুসরণে মুসলমানদের পাশে দাঁড়াতে পারে—এমন কোনো জাতি ও গোষ্ঠী ভারতে নেই; ভারতবর্ষে নেই; বিশ্বের কোথাও নেই। মুসলমানদের প্রতি পৃথিবীর সব ধর্মের একটা একরোখা জেদ ও হিংসার হয় তো সবচে’ বড় কারণ এটা। এই জেদের আগুন যখন তখন জ্বলে ওঠে। পোড়ায়, জ্বালায়, ধূম ছড়ায়। আর মুসলমানগণ সমৃদ্ধ বাগানের উদার ও সাহসী মালিক ও মালির মতো—ঢিল আসবেই—এই বিশ্বাসে অচঞ্চল পথ চলতে থাকেন।

এও সত্য যে, মুসলমানদের এই বিশ্বাসিক দৃঢ়তা এবং আদর্শিক সততা ও উদার মানবিকতার কারণে বিশ্বের যুক্তিবাদী, সৎ ও উদার ব্যক্তিগণ—ধর্মে অমুসলিম হওয়া সত্ত্বেও মুসলমানদের বিশেষ শ্রদ্ধার নজরে দেখেন। মুসলমানদের প্রতি আরোপিত অন্যায় সব অভিযোগ এবং বিদ্বেষপূর্ণ প্রচার ও আচরণকে তারা অপছন্দ করেন, ঘৃণা করেন এবং অনেকে প্রতিবাদ করতেও কুণ্ঠিত হন না।

চলমান ঘটনার কথাই বলি! হিজাবের বিরুদ্ধে যখন উগ্রবাদী হিন্দু শিক্ষার্থীরা গেরুয়া ও উড়না পরে জয় শ্রী রাম বলে সাম্প্রদায়িক ত্রাস সৃষ্টি করার চেষ্টা করে ঠিক তখন এই ভারতের কোথাও কোথাও মুসলমান ছাত্রীদের সমর্থনে দলিত হিন্দুরা নীল চাদর পরে এসে পাশে দাঁড়ায়! [প্রথম আলো : ৯.২.২২]

রাজ্যসভায় আম—আদমী পার্টির সদস্য সঞ্জয় সিং হিজাব প্রসঙ্গ উত্থাপন করে বলেছেন, মেয়েদের সম্মান নিয়ে হেলাফেলা করা ঠিক নয়। বিজেপি ইচ্ছে করে এই বির্তকের জন্ম দিচ্ছে। ভারতের বাইরে সাম্প্রদায়িক এই সংকীর্ণতার বিরুদ্ধে আপত্তি জানিয়েছেন ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ফুটবলার পল পগবা। গত (১০.২.২২) বৃহস্পতিবার ফ্রান্সের এই খেলোয়ার ইনস্টাগ্রামে হিজাব—বিতর্কের এক ক্লিপিং জুড়ে দেন। লন্ডনভিত্তিক এক সংগঠনের দেওয়া ৫৮ সেকেণ্ডের ওই ক্লিপিংয়ের শিরোনাম : হিজাব পরার কারণে ভারতের কলেজে হিন্দুত্ববাদীরা মুসলিম ছাত্রীদের হেনস্তা করেই চলেছে। [প্রথম আলো : ১০—১২.২.২২]

মুসলিম শিক্ষার্থীদের পক্ষে কর্ণাটকে মামলা লড়ছেন আইনজীবী সঞ্চয় হেগরে। তিনি আদালতে দাঁড়িয়ে বলেছেন, কর্ণাটকের শিক্ষা আইনের কোথাও স্কুলের পোশাক নিয়ে কিছু বলা নেই।

আরও মজার তথ্য হলো, মুসলমান এবং হিজাবের পক্ষে যারা মামলা লড়ছেন তাদের মধ্যে আছেন দেবদত্ত কামাত। তিনি সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী। পত্রিকার ভাষায়—স্কুল কলেজগুলোয় হিজাব পরার অধিকারের জন্য লড়াইরত শিক্ষার্থীদের রক্ষায় পবিত্র কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করায় কট্টরপন্থীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন তিনি।

সাম্প্রদায়িক উগ্র গোষ্ঠী যখন দেবদত্তের বিরুদ্ধে বহ্নিমান তখন তার পক্ষে মুখ খুলেন রামকৃষ্ণ আশ্রমের প্রধান পুরোহিত স্বামী ভবেশানন্দ। তিনি বলেছেন, মুসলিম শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব করে আইনজীবী দেবদত্ত হিন্দুধর্মের কোনো ক্ষতি করেননি। তাছাড়া আইনজীবী দেবদত্ত আদালতকে বলেছেন, আমাদের মৌলিক অধিকার এখন কলেজ উন্নয়ন কমিটির কাছে জিম্মি। সরকারি আদেশেও বলা হয়েছে, শিক্ষার্থীদের হিজাব সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদের লংঘন নয়। সরকারি আদেশকে রাজ্য সরকার যতটা নির্দোষ বলেছে, সেটা ততটা নির্দোষও নয়। [ওই : ১৪.২.২২]

আইনজীবী দেবনাথ কামাত হিজাবের পক্ষে কর্ণাটকের হাইকোর্টে বলেছিলেন—শিক্ষালয়ে হিজাব নিষিদ্ধ এমন কোনো আইন নেই। হিজাব পরে শিক্ষাক্ষেত্রে ঢুকা যাবে না—এমন কোনো আইনও নেই। হিজাব পরলে আইন—শৃঙ্খলাও নষ্ট হয় না।

হিজাবের পক্ষে লড়াই করেছেন আরেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবি রবিবর্মা কুমার। তিনি বলেছেন, কলেজ উন্নয়ন পর্ষদের তৈরি এই নিয়ম সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদের পরিপন্থি। কারণ, এই নিয়মের মধ্য দিয়ে ধর্ম ও বিশ্বাসের ক্ষেত্রে বৈষম্য সৃষ্টি করা হচ্ছে। তা ছাড়া এ নিয়ম  সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদও লঙ্ঘন করেছে।

কর্ণাটক হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি রিতুরাজ অবস্থি, বিচারপতি কৃষ্ণা এস দীক্ষিত ও বিচারপতি জে এম খাজির এজলাসে রবিবর্মা কুমার আরও বলেছেন—‘ভারতের মতো বৈচিত্র্যপূর্ণ দেশে বহু মত ও বিশ্বাসের মানুষের বসবাস। তারা নিজ নিজ বিশ্বাসমতো বহু ধরনের ধর্মীয় প্রতীক ধারণ করেন। ওড়নায় শরীর ঢাকা, ঘোমটা দিয়ে মাথা ঢাকা, শাখা—সিঁদুর—টিপ—চুড়ি পরা, পাগড়ি পরা হয়। খ্রিষ্টানরা বুকে ক্রুসও ঝোলান। কোনো ধর্মীয় বিশ্বাসকে এই নিয়মের আওতায় না এনে শুধু মুসলিম মেয়েদের হিজাবকে বিবেচনা করা হয়েছে। এটা নিছক ধর্মীয় বৈষম্য এবং সংবিধান পরিপন্থী।’ [ওই : ১৭.২.২২]

বৃন্দা কারাতের কথা আরেকবার বলি। তিনি ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য। তিনি লিখেছেন, মুসলমান মেয়েরা নির্ধারিত ইউনিফর্ম পরছে। উপরন্তু একটি স্কার্ফ দিয়ে তাদের মাথা ঢাকছে।… শিখ ধর্মের ছেলেরা ইউনিফর্মের পাশাপাশি পাগড়ি পরে। তারা কি ইউনিফর্মের বিষয়ে সরকারের আদেশ অমান্য করছে? ভারতের কোথাও কি এমন কোনো নিয়ম আছে যা শিখ ছেলে বা মেয়েরা তাদের মাথা ঢেকে রাখতে বাধা দেয়? তাহলে মুসলমান মেয়েদের বেলায় কেন দ্বৈতনীতি থাকতে পারে?

বৃন্দা কারাত অতীতের উদাহরণ টেনে লিখেছেন—২০১৬ সালে কেরালার সেন্ট্রাল বোর্ড অব সেকেন্ডারি এডুকেশন (সিবিএসই) মেয়েদের মাথায় স্কার্ফ এবং লম্বা হাতাওয়ালা জামা পড়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ড্রেস কোড চালু করতে চেয়েছিল। তার বিরুদ্ধে আমেনা বিনতে বশীর নামের এক নারী রিট করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে কেরালা হাইকোর্ট সিবিএসইর সিদ্ধান্তকে বেআইনি ঘোষণা করেন। হাইকোর্ট রায়ে বলেন, মাথায় স্কার্ফ পরা এবং লম্বা হাতাওয়ালা জামা পড়া মুসলমান নারীর জন্যে অতি প্রয়োজনীয় একটি ধর্মীয় চর্চা।’ [ওই : ১৩.২.২২ উপসম্পাদকীয়]

এ ছিল সাম্প্রদায়িক উগ্র বৈষম্যপূর্ণ একটি অন্যায় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিখ্যাত পদস্থ ও প্রভাবশালী কজন অমুসলিমের মত। তারা কথা বলেছেন ন্যায়ের পক্ষে, যুক্তির পক্ষে এবং উদারতার পক্ষে। সুতরাং ভারত মানেই বজরং কিংবা মোদি নয়। অমুসলিম মানেই সাম্প্রদায়িক এবং উগ্র নয়। যারা আশাবাদী, যৌক্তিক ও দালীলিক সংগ্রামে বিশ্বাসী—এই তথ্যটা তাদের পথের পিদিম।

 

পাঁচ.

ঘটনাটি আন্দোলনেরও!

আগুন ফুঁ দিলে বাড়ে, প্রসারিত হয়। বাতাসের উসকানি পেলে নিহত অঙ্গারও জ্বলে ওঠে পূর্ণ যৌবনে। এটাও একটা তথ্য, পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সে দেশে নিযুক্ত ভারতীয় দূতকে ডেকে পাঠিয়েছে এবং হিজাব—বিতর্ক বিষয়ে তাদের ক্ষোভ ও অসন্তোষের কথা জানিয়ে দিয়েছে। ভারতের গভীর ধর্মীয় অসহিষ্ণুতায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের আইআরএফের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে—স্কুলে হিজাব নিষিদ্ধ করা ধর্মীয় স্বাধীনতার লঙ্ঘন। এতে নারীদের অন্তর্বাসী করে রাখা হবে। মজার সংবাদ হলো, নোবেলবিজয়ী মালালাও শরিক হয়েছে এই প্রতিবাদ মিছিলে। টুইটে বলেছেন—‘মুসলিম নারী শিক্ষার্থীদের হিজাব পরে শিক্ষাঙ্গনে যেতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত ভয়ঙ্কর। মুসলিম শিক্ষার্থীদের হিজাব ও লেখাপড়ার মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে যেন বাধ্য করা না হয়।’ [প্রথম আলো : ১৩.২.২২]

ছয়.

আমরা বলি, হিজাব আমাদের গর্বের ধর্ম ইসলামের অকাট্য বিধান; আমাদের ধর্মের প্রতীক; পরম শ্রদ্ধায় লালিত সম্ভ্রমের রক্ষাকবচ। আমাদের পবিত্র ঐতিহ্যের আতরমাখা শিরোনাম হিজাব। বর্বর ভোগবাদী পশ্চিমা সভ্যতার বন্য আগুনে মানবতার সকল পুষ্পবৃক্ষ ও বর্ণমালা পুড়ে যখন ছাই তখনও পৃথিবীতে সৌন্দর্য, সততা, পবিত্রতা ও বিশ্বস্ততার যতটুকু আলো ও সুবাস পৃথিবীকে আরও কিছুদিন বেঁচে থাকবার স্বপ্ন দেখায়—সে তো ধর্মই। আর ওই ধর্মের বিচ্ছুরিত বিভাই হলো চারিত্রিক পবিত্রতা। পৃথিবীর কথিত সকল উন্নত দেশের মতো ভারতও যখন প্রতিদিন কথিত আধুনিক সভ্যতার দেনা শোধ করে ধর্ষিতা নারীর কলঙ্কিত রক্তে; জরিপে সম্ভ্রমহারা নারীর সংখ্যা প্রতিদিনই দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধŸ গতিকে থাপ্পড় মেরে নুইয়ে রেখে যায়; আদালত নারীর আঁটোসাঁটো উগ্র পোশাকের উসকানিকে ধর্ষণের দায় দিতে বাধ্য হয়—তখন সম্মান, সভ্যতা, পবিত্রতা ও রক্তের শুচিতা রক্ষায় হিজাব ছাড়া আর আশ্রয় কোথায়?

গরলে কলঙ্কিত পৃথিবীর মুক্তির প্রতীক এই হিজাব। কষ্টের কথা হলো, এই প্রতীকের কথা উন্মাদ সভ্যতার পাকে পড়ে মুসলমান মেয়েরাও ভুলতে বসেছিল। বিজেপি এবং বজরং দলের উগ্রবাদী নেতা, কমীর্ ও সাধুরা ‘জয় শ্রী রাম’ এর আঘাতে ওই বিস্মৃতির পর্দাটা পুড়িয়ে দিয়েছে। কর্ণাটকের এক মুসকানের কণ্ঠে উচ্চারিত স্লোগান এখন বিশ্বের কোটি কোটি তরুণীর আবেগের উচ্চারণ! হিজাব এখন তাদের আত্মমর্যাদাবোধের পরিচায়ক। তারা কার্ড উচিয়ে পৃথিবীকে জানিয়ে দিচ্ছে—ঐরলধন রং সু ওফবহঃরঃু ধহফ ঊফঁপধঃরড়হ রং সু ৎরমযঃ—হিজাব আমার পরিচয়; শিক্ষা আমার অধিকার!

কর্ণাটক—এমন একটি রাজ্য যেখানে মুসলিম নারীদের মধ্যে স্বাক্ষরতার হার সবচেয়ে বেশি এবং উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মুসলমান মেয়েদের সর্বোচ্চ ভর্তি নিশ্চিত হয়েছে। সুতরাং কর্ণাটক রাজ্য সরকারের এই হিজাব—বিতর্ক যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত—অন্তত সচেতন মহলের কাছে তা মোটেও অস্পষ্ট নয়।

এও অস্পষ্ট নয়—এটা হিন্দুত্ববাদী উগ্র গোষ্ঠীর পরাজিত বোধ থেকে উৎসারিত আগুন! মুসকান তার পবিত্র স্লোগানের ভেতর দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে—এই আগুন তাকে এবং তাদেরকে স্পর্শ করতে পারবে না। মুসলমানদের অধিষ্ঠান অনেক ঊর্ধ্বে! এই আগুন যে বামপন্থিদেরই পুড়িয়ে ছাই করবে একদা—তার নতুন এই ইঙ্গিতও দিয়েছে মিডিয়া। সংবাদ শিরোনাম : ‘এবার আসামে শুরু হচ্ছে স্থানের নাম পরিবর্তন!’ অর্থাৎ কোনো দিকে সুবিধা করতে না পেরে এবার কাগজে নামের পরিবর্তন। অর্থ সবাই বুঝে। মুসলমানদের দীর্ঘ আটশ বছরের রাজত্বের স্মৃতিচিহ্ন মোগলাই নামগুলো মুছে দাও!

কেন?

দলে দলে তোমাদের লোকেরা মুসলমান হচ্ছে বলে?

সাবাস! যত পারো মেঘ ছড়াও! জয় শ্রী রামের মেঘ ‘আল্লাহু আকবারের’ বিদ্যুৎ—আঘাতে কোথায় হারিয়ে যাবে—তার ঠিকানাও খঁুজে পাবে না। আর বিদ্যুৎ—নিনাদে জাগবে বিশ্ব আত্মমর্যাদার টানে। সাহস থাকলে জরিপ করে দেখো—এই এক আঘাতে কত নারী হিজাব ধরেছেন আবেগে, খেদে এবং জ্বলন্ত বিশ্বাসে!

জয় আমাদেরই!

ঢাকা

২০.০২.২০২২

Avatar

zobayer

একটি কমেন্ট করুন