প্রতিষ্ঠাতা: মুজাহিদে আযম হযরত মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.

জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ, ঢাকা-এর মুখপত্র

প্রতিষ্ঠাকালঃ ১৯৩৭ ঈসায়ী

মানুষ ও তার ভাষা : একটি দার্শনিক বিশ্লেষণ

মানুষ ও তার ভাষা : একটি দার্শনিক বিশ্লেষণ

মানুষ আল্লাহর সেরা সৃষ্টি। গোটা সৃষ্টিজগতে সব সৃষ্টিই অত্যাশ্চর্য ও অবিশ্বাস্য রকম বিস্ময়কর। এর মধ্যে মানুষ সেরা। মহান আল্লাহ বলেছেন,

وَلَقَدْ کَرَّمْنَا بَنِیْۤ  اٰدَمَ

আমি আদমসন্তানকে বিশেষ সম্মান দিয়েছি।—সূরা বনী ইসরাঈল, ১৭ : ৭০

অপর জায়গায় আল্লাহ বলেন,

اِنِّیْ جَاعِلٌ فِی الْاَرْضِ خَلِیْفَۃً

আমি পৃথিবীতে প্রতিনিধি তৈরি করতে চাই।—সূরা বাক্বারা, ০২ : ৩০

পৃথিবীর শুধু নয়, সৃষ্টিজগতের অন্যান্য বস্তু, পদার্থ, প্রাণী ও বিষয়কে করায়ত্ত, শাসন ও পরিচালনার দায়িত্ব মানুষকে অর্পণ করা হয়েছে। আল্লাহ আরও বলেন,

اَلرَّحْمٰنُ ۙ﴿۱﴾  عَلَّمَ الْقُرْاٰنَ        ؕ  ﴿۲﴾  خَلَقَ  الْاِنْسَانَ ۙ﴿۳﴾  عَلَّمَهُ الْبَیَانَ ﴿۴﴾

পরম করুণাময়। শিক্ষা দিয়েছেন কোরআন। মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আর তাকে শিখিয়েছেন মনের ভাব বর্ণনা করতে।—সূরা রহমান, ৫৫ : ১—৪

আল্লাহ বলেন,

اَلَمْ نَجْعَلْ لَّهٗ عَیْنَیْنِ ۙ﴿۸﴾  وَ لِسَانًا وَّ شَفَتَیْنِ ۙ﴿۹﴾  وَ هَدَیْنٰهُ  النَّجْدَیْنِ ﴿ۚ۱۰﴾

আমি কি তাকে দুটি চোখ দিইনি। একটি জিহ্বা ও দুটি ঠোঁট দিইনি। মানুষকে তো ভালো ও মন্দ দুটি পথেরও সন্ধান দিয়েছি।—সূরা বালাদ, ৯০ : ৮—১০

দার্শনিকদের দৃষ্টিতে মানুষ হলো সামাজিক, বুদ্ধিমান ও বাকশক্তিসম্পন্ন প্রাণী। আরবী পরিভাষায় যাকে ‘হাইওয়ানে নাতেক’ বলা হয়। যার মধ্যে আগের সবগুলো কথাই আছে। কথা বলার শক্তি অনুভূতির সাথে মিলে তৈরি হয় কবিতা। জ্ঞান, যুক্তি, বুদ্ধি ও বিশ্বাসের মিশ্রণে বাকশক্তি ভাষা, কথা ও কাব্যে পরিণত হয়। সব মানুষের জন্য একটিমাত্র ভাষা সৃষ্টি করা আল্লাহর পক্ষে যথেষ্ট ছিল। মানুষের জন্যও তা স্বাভাবিক মনে হতো। কিন্তু আল্লাহ নিজে বলেছেন,

وَ مِنْ اٰیٰتِهٖ خَلْقُ السَّمٰوٰتِ وَالْاَرْضِ وَ اخْتِلَافُ اَلْسِنَتِكُمْ وَ اَلْوَانِكُمْ        ؕ      اِنَّ فِیْ ذٰلِکَ لَاٰیٰتٍ لِّلْعٰلِمِیْنَ ﴿۲۲﴾

আকাশ ও পৃথিবীর সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্যে রয়ে গেছে জ্ঞানবান মানুষের জন্য (আল্লাহর) নিদর্শন।—সূরা রূম, ৩০ : ২২

অপর আয়াতে আল্লাহ বলেন,

یٰۤاَیُّهَا النَّاسُ  اِنَّا خَلَقْنٰكُمْ  مِّنْ ذَکَرٍ وَّ اُنْثٰی وَ جَعَلْنٰكُمْ شُعُوْبًا وَّ قَبَآئِلَ لِتَعَارَفُوْا ؕ اِنَّ  اَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللهِ اَتْقٰكُمْ

হে মানবসম্প্রদায়, তোমাদের আমি সৃষ্টি করেছি একজন পুরুষ ও নারীর মাধ্যমে। আর তোমাদের বিভক্ত করেছি নানা জাতি ও গোত্রে। যাতে তোমরা পরস্পরে পরিচিত হতে পার। আর নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি খোদাভীরু পরহেজগার মানুষটিই আল্লাহর নিকট বেশি সম্মানিত।—সূরা হুজুরাত, ৪৯ : ১৩

জান্নাতের ভাষা আরবী। হযরত আদম আ. ও মা হাওয়া আ. পৃথিবীতে আরবী ভাষা সাথে নিয়ে এসেছিলেন। তারা ও তাদের সন্তানেরা আরবীতেই কথা বলতেন। এরপর নৃতাত্ত্বিক কারণে মানুষের শারীরিক গঠন, বর্ণ ও নাক—নকশায় পরিবর্তন আসতে থাকে। এটিও আল্লাহর অবিশ্বাস্য ও আশ্চর্যতম একটি কুদরত যে পৃথিবীর হাজার—কোটি মানুষের প্রত্যেকের চেহারাই একেকটি অনন্য মডেল। হুবহু একজনের মতো আরেকজন মানুষ কখনোই ছিল না। এখনো নেই। ঠিক এমনই মানুষের জিন। যা প্রতিটি মানুষকে আলাদা করে। বর্তমান পৃথিবীর আট শ কোটি মানুষ প্রত্যেকেই আলাদা আলাদা কণ্ঠস্বরের অধিকারী। প্রত্যেকের চোখের মণি সম্পূর্ণ ভিন্ন। একজনের মতো আরেকজন সৃষ্টিজগতে খুঁজে পাওয়া যাবে না। প্রতিটি মানুষের আঙুলের ছাপ স্বতন্ত্র। যা কোনোদিনই একের সাথে অপরের মিলার কোনো সম্ভাবনা নেই। ঠিক তেমনই তিনি স্থান, কাল, পরিবেশ, প্রকৃতি ভেদে মানুষের ভাষা পরিবর্তিত হওয়ার নীতি নির্ধারণ করে দিয়েছেন। ভাষার স্রষ্টা ও নিয়ন্তা আল্লাহ। এর বিবর্তনও আল্লাহর প্রাকৃতিক বিধান অনুযায়ীই হয়।

আরবীকে বলা হয় সকল ভাষার মা। নূহ আ. পর্যন্ত আরবী ভাষাই ছিল পৃথিবীর একমাত্র ভাষা। নূহ আরবী শব্দ। এরপর নূহ আ. এর তিন সন্তান সাম, হাম, ইয়াফেস বিভিন্ন দেশে গিয়ে বসতি স্থাপন করলে তাদের থেকে বহু জাতি ও ভাষার সৃষ্টি হয়। সাম থেকে সকল সেমেটিক ভাষার জন্ম। ইয়াফেস থেকে চৈনিক ও দক্ষিণ—পূর্ব এশিয়ার অন্যান্য ভাষার জন্ম। আরব—আফ্রিকার বহু ভাষা হাম থেকে এসেছে। বর্তমানে পৃথিবীতে চার হাজার ভাষা আছে। আমাদের ভারতবর্ষেই কম—বেশি ২৭০টি ভাষা। এর মধ্যে ১৩/১৪টিতে বর্ণমালা, বইপত্র এমনকি পত্রিকাও আছে। বাংলাদেশের মানুষ খুবই সৌভাগ্যবান যে সামান্য কিছু আঞ্চলিক শব্দ ও টান সত্ত্বেও এ দেশের ১৬/১৭ কোটি মানুষের একই ভাষা। এর বাইরে পূর্ববঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা মিলিয়ে অন্তত ত্রিশ কোটি মানুষ বাংলায় কথা বলে। সারা আরব বিশ্ব মিলিয়েও এর এক—তৃতীয়াংশ লোক হবে না।

আরবী যেসব ভাষার মা, তা একটি গবেষণার বিষয়। এ নিয়ে আমাদের গবেষকদের কাজ করা উচিত। কারণ, মায়ের মতো মেয়ে হয়। সেই মেয়ের ঘরের নাতনিও নানির মতো হয়। তবে এটি সে ব্যক্তিই বুঝতে পারে, যে নানি, মা ও নাতনি তিন জনকেই দেখেছে। এরপরও তা খুবই খেয়াল করলে বুঝতে পারবে। কারণ, একজন মানুষ আরেকজন হয় না। আরেক জনের মতো হয়। এভাবেই গবেষকের চোখে পৃথিবীর সব ভাষা আরবীর সাথে সাদৃশ্যসহ ভেসে উঠে, যিনি আরবী ও অন্যান্য ভাষার ভাষাতত্ত্ববিদ পণ্ডিত। একমুখী শিক্ষিত গবেষকদের চোখে তা ধরা পড়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। কারণ, তারা হয়তো নাতনিটিকে চেনেন। মাকে দেখেননি। নানির কথা শোনেনওনি। তারা কী করে বুঝবেন নাতনিটি কার মতো হয়েছে। এটি তাদের অজ্ঞতা নয়, সীমাবদ্ধতা। এমন ব্যক্তি, যিনি পাঁচ সিড়ির দর্শক, তিনি ভালো করে বলতে পারেন, কে কার মতো।

ধরা যাক, উপমহাদেশের একটি মূল ভাষা সংস্কৃতের কথা। এটি সরাসরি আরবী ভাষার প্রপৌত্রী। সংস্কৃত কথাটি মূলত সুন্নত। সুন্নতের অপভ্রংশ হলো সংস্কৃত। সুন্নত অর্থ সব মানুষ মিলে যে নীতি অবলম্বন করে। সংস্কৃত অর্থও তা—ই। এটি সম+কৃতী। অর্থাৎ সব মানুষ মিলে যে কাজ করে। সভ্যতা শব্দটিও আরবী ‘সোহবত’ থেকে এসেছে। সভা এসেছে ‘সোহবাহ’ থেকে। সংস্কৃত শব্দ বাংলা ডিকশনারিতে মূলসহ পাওয়া যায়। যেমন গত শতাব্দীর সকল বাংলা ডিকশনারি বই শব্দের অর্থে লিখেছে, পুস্তক, গ্রন্থ, কিতাব। এর মূল তারাই লিখেছে, আরবী ‘ওয়াহী’ বা ‘ওহী’। ‘ওয়াও’ এর উচ্চারণ বাংলা বর্ণমালা থেকে কিছু লোকের অদূরদর্শিতার জন্য তুলে দেওয়ার ফলে বলতে হচ্ছে ‘বহি’। এখনো সাধু ভাষায় বইকে বলে ‘বহি’। যার চলিত রূপ ‘বই’। ছোট্ট নিবন্ধে এই গবেষণা বেশি দূর বর্ণনা করা সমীচীন হবে না। কলকাতার প্রতিটি নির্ভরযোগ্য ডিকশনারি পড়লে দেখা যাবে, বহু সংস্কৃত শব্দের মূল আরবী। সামান্য বিশ্লেষণ করলেই এই অপভ্রংশটি থেকে বেরিয়ে আসবে মূল আরবী।

আমাদের বাংলা ভাষা এই অঞ্চলের একটি আদি ও মূল ভাষা। এটি আরবীভাষী মূল ব্যক্তিদের থেকেই সৃষ্ট। সংস্কৃতির সমমানের বোন, কিন্তু সন্তান নয়। আর উদুর্ এটি তো আমাদের জানামতে পৃথিবীর একমাত্র কৃত্রিম ভাষা। যা বলতে বলতে সৃষ্টি হয়নি। মজলিসে বসে পরামর্শ করে তৈরি করা হয়েছে। আরব, পারস্য ও ভারতীয় পণ্ডিতেরা করেছেন। এতে ছিলেন আমীর ফতহুল্লাহ শিরাজী, মোল্লা আবুল ফজল ও ফয়েজী, তানসেন প্রমুখ নবরত্নের সদস্যগণ। এটি বাদশাহ আকবরের নির্দেশে সর্বভারতীয় সেনাবাহিনীর সমন্বিত ভাষা হিসাবে তৈরি করা হয়। নাম দেওয়া হয় ‘উদুর্’। উদুর্ মানেই লশকর বা সেনা। এতে বাংলা, হিন্দি, আরবী, ফারসি, তামিল, তেলেগু, মারাঠি, অহমিয়া, গুজরাটি, উড়িয়া—এমন বহু ভাষার শব্দ ও ব্যবহার রয়েছে। বর্তমানে এটি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা। উদুর্ মুসলমানদের তৈরি বলে ভারত একে বর্জন করেছে। তারা রাষ্ট্রভাষা হিসাবে বেছে নিয়েছে হিন্দিকে, যা ভারতের কোথাও প্রচলিত ছিল না। এটি কোনো উন্নত ও ভদ্র ভাষা নয়। দিল্লির গাড়োয়ানরা এ ভাষা ব্যবহার করত। তবে সারা ভারতকে এক ভাষায় অভ্যস্ত করে ঐক্যবদ্ধ রাখার জন্য ইন্ডিয়ান নেতারা এটিকেই রাষ্ট্রভাষা করেন। যদিও সর্বভারতীয় ভাষা হিসাবে আন—অফিসিয়ালি উদুর্ সবচেয়ে জনপ্রিয়। এ সময় অবশ্য ভারতের শিক্ষা ও বিজ্ঞান মন্ত্রী মাওলানা আবুল কালাম আজাদ উদুর্কে রাষ্ট্রভাষা রাখার চেষ্টা করেছিলেন। তার সচিব হুমায়ুন কবির প্রস্তাব করেছিলেন ইংলিশকে রাষ্ট্রভাষা করার। যেন ভারতের বহু রাজ্যে প্রচলিত ইংরেজি ভাষা শিখে গোটা ভারতবাসী আন্তর্জাতিক বলয়ে সহজ প্রবেশাধিকার পায়। এর পর গর্ব করে বলা যায়, আমাদের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। মাতৃভাষাও বাংলা। আগেই বলেছি, হিন্দি ভারতের ১২০ কোটি মানুষের কারোরই মাতৃভাষা নয়। এটি কৃত্রিমভাবে তৈরি একটি চাপিয়ে দেওয়া ভাষা। পাকিস্তানেরও কোনো অঞ্চল বা প্রদেশের মাতৃভাষা উদুর্ নয়। সব প্রদেশের মাতৃভাষা আলাদা। সিন্ধি, পাঞ্জাবি, বালুচ, পাখতুন প্রভৃতি ভাষা তাদের মাতৃভাষা।

বাংলা বর্ণমালাকে বিশ্বের সেরা বর্ণমালা বলতে আমার গর্বে বুক ভরে ওঠে যখন দেখতে পাই, পবিত্র কোরআনের উচ্চারণে বাংলা ভাষার চেয়ে আরবীর অধিক নিকটবতীর্ অনারব ভাষা পৃথিবীতে খুব কমই আছে। মুসলিম শাসক ও পণ্ডিতদের পৃষ্ঠপোষকতায়, আলেম—সমাজের তত্ত্বাবধানে এর নবজন্ম, বিকাশ ও উন্নয়ন ঘটেছে বলে আরবী ভাষার সাথে এর সাযুজ্য অসামান্য। আরবী ভাষায় ‘আদব’ শব্দটির অর্থ সাহিত্যর চেয়ে বেশি সুন্দর ও আক্ষরিক আর কিছু কি হতে পারে? লিটারেচার শব্দে সাহিত্য বা আদবের পূর্ণতর অর্থ কোনোদিনই খুঁজে পাওয়া যাবে না। আরবীতে হরফের উচ্চারণ ও উচ্চারণস্থল (মাখরাজ) আলাদা শাস্ত্রে বর্ণিত হয়েছে। যাকে তাজভীদ বা পাঠ্যোৎকর্ষ বলা হয়। কিন্তু বাংলা বর্ণমালায় বর্ণের নামই রাখা হয়েছে তাজভীদের আলোকে মাখরাজ নির্দেশ করে। যেমন, আরবী ‘সীন’ এর জন্য ‘দন্ত—স’। দাঁতের সামনে জিহ্বা লাগালে যেটি উচ্চারণ করা যায়। ইংরেজি ‘এস’ এর উচ্চারণ। ‘শীন’ এর উচ্চারণ তালব্য—শ। তালুর সাথে জিহ্বা সংযুক্ত করলে যেটি উচ্চারিত হয়। ইংরেজি ‘এস এইচ’ সংযুক্ত হওয়ার মতো। যেমন, শামস্। এখানে ‘সীন’ ‘শীন’ দুটিই সঠিক উচ্চারণে ব্যবহৃত হয়েছে। এবার দেখুন, ‘সোয়াদ’ এর জন্য ‘ষ’—মূর্ধণ্য—স। যদি সঠিক উচ্চারণ জানা থাকে তাহলে ‘স্ব’ সংযুক্ত করেও সীন, শীন, সোয়াদ ও সা (ছা) এর উপযোগী বানানরীতি তৈরি করে নেওয়া সম্ভব। জীম, জোয়া, যাল ও যা উচ্চারণের জন্য ‘জ’ অন্তঃস্থ ‘য’ এর অর্থপূর্ণ ব্যবহারবিধি তৈরিও গবেষণার মাধ্যমে সম্ভব। ‘ওয়াও’ উচ্চারণের জন্য ‘ব’ এবং ‘ভ’ ব্যবহৃত হয় কিন্তু ‘বা’ উচ্চারণের জন্য পেটকাটা ‘ব’ বর্তমানে বর্ণমালায় আর নেই। যেমন ব্যবহারের জায়গা না থাকায় অনেক হরফই আর ছাপা হয় না। কিন্তু তাজভীদ বিজ্ঞানীরা বাংলা বর্ণমালা নিয়ে সামঞ্জস্যবিধানে নামলে খুব সহজেই কোরআনী উচ্চারণ বাংলা বর্ণমালায় রূপায়িত করা সম্ভর হতে পারে। আলিফ যের ‘ই’ বোঝাতে বাংলাতে পাওয়া যাবে হ্রস্ব—ই। আলিফ ইয়া যের বোঝাতে রয়েছে দীর্ঘ—ই। এক আলিফ মাদের জন্য আলাদা স্বরবর্ণ আর কয়টি ভাষায় পাওয়া যাবে? বাংলাভাষায় তো হ্রস্ব—উ আর দীর্ঘ—উ—ও আছে। যবরের জন্য আকারকে মাদের চিহ্নবিশিষ্ট আরেকটি রূপ তো আলেমগণ দিতেই পারেন। যেমনটি অভিধান ও বিশ্বকোষ রচয়িতারা করে থাকেন।

আদিকাল থেকে কোরআন, হাদীস ও ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বাংলা ভাষাকে মাতৃভাষা ও খোদার সেরা দান হিসাবে বরণ করে নিয়েছিলেন মুসলিম মনীষী ও সাধারণ মানুষ। কারণ, ইসলামে মাতৃভাষার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। মানবজাতির প্রতি আল্লাহ তাআলার যত প্রত্যাদেশ সবই এসেছে মাতৃভাষায়। মানুষের ভাষায়। মহান আল্লাহ বলেছেন,

وَمَاۤ  اَرْسَلْـنَا مِنْ رَّسُوْلٍ  اِلَّا بِلِسَـانِ قَوْمِــهٖ  لِـیُـبَیِّنَ لَهُمْ

আমি যত রাসূল প্রেরণ করেছি, তাদের প্রত্যেককেই প্রেরণ করেছি তাদের নিজ সম্প্রদায়ের ভাষায়, যাতে তারা আমার বাণী তাদের ভালো করে বুঝিয়ে বলতে পারে।—সূরা ইবরাহীম, ১৪ : ০৪

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—এর উপর সর্বশেষ আসমানি গ্রন্থ পবিত্র কোরআন আরবী ভাষায় নাযিল করার পেছনেও আল্লাহ তাআলার মাতৃভাষানীতিই কার্যকর ছিল। মহান আল্লাহ বলেন,

اِنَّاۤ اَنْــزَ لْنٰهُ  قُــرْءٰنًا عَــرَ بِـیًّا لَّـعَـلَّـكُمْ تَعْــقِلُوْنَ

(আরব্য পরিবেশে) আরবী ভাষায়ই আমি কোরআন নাযিল করেছি, যেন তোমরা তা বুঝতে পার।—সূরা ইউসূফ, ১২ : ০২

মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজের সম্পর্কে বলেছেন,

أنا أعرب العرب

আমি আরব্য সম্প্রদায়ের বিশুদ্ধতম ভাষার অধিকারী ব্যক্তি।—মু’জামুত তাবরানী : ৫৪৩৭

বিশ্বব্যাপী ইসলাম প্রচারের জন্য সাহাবী ও তাবেয়ী—যুগে যত মনীষী দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়েছেন, ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, তারা প্রত্যেকেই যে এলাকায় স্থিত হয়েছেন সেখানকার মানুষের ভাষা আত্মস্থ করে নিয়েছেন। স্থানীয় ইসলাম প্রচারকদের নিজ নিজ মাতৃভাষায় দ্বীনের চর্চা করার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। সুদূর চীন থেকে জাভা, সুমাত্রা, চট্টলা, মালাবার, সিন্ধু অববাহিকা হয়ে আরব্য উপসাগর সবই অনারব ভাষা—সংস্কৃতির নতুন চারণভূমি, যা আরব প্রচারকরা স্থানীয়দের মাতৃভাষা দিয়েই আবাদ করেছিলেন। জুড়েছিলেন প্রেমময় হৃদয় ও মননচর্চার চাষবাস। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম ছিল না।

পৃথিবীতে মানবীয় দুর্বলতা, বিদ্বেষ ও কলুষময় নীতির ফলে মানুষের জন্মগত অধিকার নিয়েও ছিনিমিনি খেলা চলে। যার ফলে গাঙ্গেয় ব—দ্বীপ বাংলাদেশেও বাংলা ভাষার উন্নয়ন, বিকাশ ও অস্তিত্ব নিয়ে প্রাচীনকাল থেকেই হয়েছে অনেক অপ—রাজনীতি। বাংলাদেশের ভূমিপুত্র কথিত নিচু জাতের হিন্দু—বৌদ্ধ সমাজে বাংলা ভাষার প্রচলন ছিল প্রাকৃতিক সত্য। পারস্য ইহুদী বংশোদ্ভূত আর্যদের যে অংশটি দক্ষিণ ভারত থেকে এ দেশে শাসক ও নিয়ন্ত্রক হয়ে আসে, বহিরাগত এ অপশক্তিটি এ দেশে শুরু করে জাতপাত প্রথা আর হিংসার রাজনীতি। বৌদ্ধ সভ্যতা তো মানব—ইতিহাসের মর্মান্তিক জাতিগত গণহত্যার মাধ্যমে শেষই করে দেওয়া হয়। ভূমিপুত্র হিন্দুদেরও ব্রাহ্মণ্যবাদের নাগপাশে জড়িয়ে করে দেওয়া হয় চির অথর্ব। এমনকি সংস্কৃত ভাষা ও দক্ষিণ ভারতীয় বিক্রমী বচন প্রচলনের লক্ষ্যে মনগড়া বিধান প্রচার করা হয়। বলা হয়, যারা বাংলা ভাষায় কথা বলবে তারা ‘রৌরব’ নরকে নিক্ষিপ্ত হবে। আবার বাংলাদেশের সাধারণ হিন্দুদের কেউ যদি ধর্মগ্রন্থ পাঠ বা শ্রবণ করে তাহলে ব্রাহ্মণগণ তার কানে গলিত সিসা ঢেলে দেওয়ার বৈধতা রাখে। যারা একে হিংসা নিন্দা ও বাধাগ্রস্ত করেছে তাদের প্রতিবাদ করতে গিয়ে বিগত সময়ের কবি আব্দুল হাকিমকে রচনা করতে হয়েছে ‘যে জন বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী, সেজন কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি’র মতো কটুক্তিমূলক কবিতা।

ভারতীয় বাংলাভাষীরা আজ জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে হিন্দিকে প্রধান ভাষা মেনে আঞ্চলিক পর্যায়ে মাতৃভাষা বাংলার ব্যবহার করেছেন। যা মিশ্র ভাষা সংস্কৃতির দাপটে উদুর্, হিন্দি, ইংরেজি, অসমীয়সহ অন্য অনেক ভারতীয় ভাষার সাথে মিলে—মিশে বিচিত্র রূপ ধারণ করছে। অমিশ্রিত আসল বাংলা এখন বাংলাদেশেই আছে। স্বাধীন দেশে মুক্ত বাংলা ভাষা। এ আত্মবিশ্বাস, দৃঢ় অবস্থান ও মাথাউঁচু অস্তিত্ব হাজার বছরে বাংলার মুসলিম শাসক, পণ্ডিত আলেম—সমাজ এবং মুক্তিকামী জনতার সংগ্রাম ও সাধনার ফসল।

বাংলা ভাষা—সাহিত্য পূর্ণতই ইসলামী ভাবধারায় লালিত ও বিকশিত। মুসলিম শাসন আমলের বাদশাহ ও সুলতানগণ, বিশেষ করে সুলতানী আমলের শাসকগণ, আরও বিশেষভাবে মহান আরব সুলতান আলাউদ্দীন হোসেন শাহকে আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা বলা হয়। বাংলাদেশের নামকরণ যেমন তিনি করেছেন, আমাদের বর্তমান মানচিত্রটিও তার ভাবনার প্রতিফলন। তিনি এ দেশে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় মসজিদ নির্মাণ, মাদরাসা, পান্থশালা, খানকার ব্যয় নির্বাহ চালু করেন। আনুষ্ঠানিক মুদ্রা—ব্যবস্থা, ভূমিনীতি ও প্রজাহিতৈষী নানা পদ্ধতির তিনিই প্রবক্তা। বাংলা ভাষাকেও তিনি সর্বপ্রথম রাষ্ট্রীয় সামাজিক ও ব্যবহারিক মর্যাদায় ভূষিত করেন। বাংলাদেশে বাংলা ভাষার দুর্দিনে আরাকান রাজসভায় বাংলাভাষী কবি—সাহিত্যিকের কদর, মূল্যায়ন ও পৃষ্ঠপোষকতা ইতিহাসে বিবৃত রয়েছে। মুসলিম পণ্ডিত ও আলেমদের হাতেই পুঁথিসাহিত্য বিকশিত হয়। বাংলার লোকসাহিত্য এখনো মুসলিম ইতিহাস, ঐতিহ্য ও হিরোদের এ কারণেই ধারণ করে আছে।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রাচীন ও আধুনিক বিশ্বসাহিত্যের কী পরিমাণ বাংলায় ভাষান্তরিত হয়েছে জানা নেই। কিন্তু দেড় হাজার বছরের বিশাল ইসলামী গ্রন্থাগার প্রায় সবটুকুই বাংলায় অনূদিত হয়ে গেছে। আদালতে ও অফিসপাড়ায় বাংলা প্রচলন কতটুকু হয়েছে জানা নেই। তবে ইসলামী অঙ্গনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলার প্রচলন বহু আগেই সম্পন্ন হয়েছে। সাধারণ উচ্চশিক্ষায় বাংলা ব্যবহার শতভাগ সম্ভব হয়েছে কি না বলা যাবে না, তবে ইসলামী শিক্ষাঙ্গনের সর্বস্তরে বাংলার ব্যবহার খুবই সাবলীল। সাড়ে চার লাখ মসজিদ ও নামায—কক্ষে বছরের ৩৬৫ দিনই বাংলা চলে। চার লক্ষাধিক মসজিদ ও জামে মসজিদে জুমার বয়ান, তাফসীর, তালীম হয় মাতৃভাষা বাংলায়। প্রতিদিন বাংলাদেশে হাজারো ধমীর্য় সভা—সম্মেলনে কথা হয় বাংলায়। স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে যতগুলো বই প্রকাশিত হয়েছে এর অর্ধেকের বেশি হয়েছে ধমীর্য় জ্ঞান ও সাহিত্য—সংক্রান্ত। যার প্রায় সব লেখকই আলেম—উলামা। দেশে গড়ে প্রতিদিন বিশটি নতুন বই প্রকাশিত হয়ে থাকলে এর অধিকাংশই ইসলামী বই, যার প্রায় সবগুলোর লেখকই নবীন—প্রবীণ আলেম। এদের মধ্যে অনেক গ্রন্থকার সংকলক ও অনুবাদকও রয়েছেন। আধুনিক বাংলাদেশের মুসলিম সাংবাদিকতার জনক মাওলানা আকরাম খাঁ থেকে শুরু করে মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদী, মাওলানা আব্দুল্লাহিল কাফি কোরাইশি, আল্লামা শামছুল হক ফরিদপুরী, মাওলানা নূর মোহাম্মদ আজমী, মাওলানা মুহিউদ্দীন খানসহ অসংখ্য আলেম অতিবাহিত হয়েছেন, যাঁদের জ্ঞান সাহিত্য ও ভাষাগত অবদান এ দেশের ভবিষ্যৎ আলেম প্রজন্মকে দীর্ঘদিন উজ্জীবিত রাখবে। নতুন প্রজন্মের অসংখ্য লেখক, কবি, সাহিত্যিক, ভাষা চর্চাকারী এমন রয়েছেন, যারা নিঃসন্দেহে জাতির বুকের জীবন্ত আশাবাদ। আমরা তাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় থাকব, যাদের সাধনা ও অবদানে এ দেশ এগিয়ে যাবে, তার অভীষ্ট লক্ষ্যে এবং সুন্দর আগামীর দিকে। আমাদের একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আর ভাষাদিবস থেকে যায়নি। বর্তমানে এটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। ভাষা নিয়ে এই গৌরব বাংলাদেশের মুসলমানের। আল্লাহর দেওয়া ভাষা বাংলাদেশে ইসলাম প্রতিষ্ঠার সিঁড়ি হয়ে থাকুক। হোক আল্লাহর প্রশংসা ও বড়ত্ব বর্ণনার বাহন।

-মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী

Avatar

niyamot

একটি কমেন্ট করুন