প্রতিষ্ঠাতা: মুজাহিদে আযম হযরত মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.

জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ, ঢাকা-এর মুখপত্র

প্রতিষ্ঠাকালঃ ১৯৩৭ ঈসায়ী

যুগে যুগে আল্লাহর বিধান অমান্য করার শাস্তি

যুগে যুগে আল্লাহর বিধান অমান্য করার শাস্তি

করোনার ভয়াবহতা কিছুটা কমার পরপরই বিশ্বের ক’টি দেশে এবার দেখা দিয়েছে মাঙ্কিপক্স। বিবিসির সূত্রমতে, বিশ্বের বারোটি দেশে মাঙ্কিপক্স আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়েছে। ইউরোপের নয়টি দেশ ছাড়াও এ রোগ দেখা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও অষ্ট্রেলিয়ায়। সন্দেহজনক আরও পঞ্চাশটি দেশে আক্রান্তের বিষয়ে তদন্ত চলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অনুমান এই যে, আক্রান্তের সংখ্যা আরও ব্যাপক হতে পারে।

মাঙ্কিপক্সের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে ইউরোপে। মহাদেশটির নয়টি দেশে আক্রান্তের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এই রোগ নিয়ে করণীয় ঠিক করার জন্য জরুরি বৈঠক করছে ডব্লিউএইচও। এর আগে এই রোগটি আফ্রিকায় কিছু দেখা গেলেও কথিত উন্নত বিশ্ব এর ব্যাপ্তি এবারই বেশি। সারা বিশ্বে এটি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্কতা জারির পর বাংলাদেশসহ নানা দেশে সতর্ক অবস্থান গৃহীত হচ্ছে। দেশের বন্দরগুলোকে সতর্ক করে দেওয়া হচ্ছে প্রাণীবাহিত এই রোগটি গুটি বসন্তের মতো। এর নির্দিষ্ট কোনো টিকা বা ওষুধ নেই।

বিজ্ঞানীদের মতে বিকৃত যৌনাচার ও সমকামিতার ফলে মাঙ্কিপক্স হয়ে থাকে। ইঁদুর বা অন্য প্রাণীর মাধ্যমে পরে এটি সাধারণ মানুষকেও আক্রান্ত করতে পারে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

لَمْ تَظْهَرِ الْفَاحِشَةُ فِي قَوْمٍ قَطُّ، حَتَّى يُعْلِنُوا بِهَا، إِلَّا فَشَا فِيهِمُ الطَّاعُونُ، وَالْأَوْجَاعُ الَّتِي لَمْ تَكُنْ مَضَتْ فِي أَسْلَافِهِمُ الَّذِينَ مَضَوْا.

যখন অশ্লীলতা ও বেহায়াপনা ব্যাপক হয়ে যাবে এবং মানুষ খোলামেলাভাবে তা করতে থাকবে, তখন মহামারি ও এমন সব রোগ দেখা দেবে যা পূর্ববর্তীরা চিনত না।-সুনানে ইবনে মাজাহ

আল্লাহ তাআলা এখন থেকে কমপক্ষে সাড়ে চার হাজার বছর আগে সাদুম গোত্রকে ধ্বংস করে দেন। কোরআন শরীফে এ জাতির আলোচনা এসেছে। হযরত ইবরাহীম আ.-এর ভাইয়ের ছেলে হযরত লুত আ. তুরস্ক, সিরিয়া ও জর্ডানের মধ্যবর্তী এলাকায় নবুওয়তের দায়িত্ব পালন করেন। পৃথিবীতে তার জাতিই প্রথম সমকামিতার প্রচলন করে এবং সম্প্রদায়ের প্রায় সবাই এর সমর্থক হয়ে ওঠে। সমকামিতা, সমলিঙ্গে বিবাহ, বহুগামিতা ও দলবদ্ধ যৌনতা শয়তানের প্ররোচনায় সংঘটিত যৌন বিকৃতি বিশেষ। যা আল্লাহ হারাম করেছেন। কোরআন শরীফে একাধিক জায়গায় এই জাতির কথা বলা হয়েছে।

এদেরকে স্বাভাবিক ও বৈধ যৌন জীবনের প্রতি নবী লুত আ. দাওয়াত দেন। কিন্তু চিন্তার স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের নামে এরা আল্লাহর বিধানকে অস্বীকার করে। তখন আল্লাহ আযাবের দ্বারা তাদের জনপদকে ধ্বংস করে দেন। কোরআনে বর্ণিত এই কাহিনি বেশ দীর্ঘ ও শিক্ষণীয়। দুজন ফেরেশতা পরদেশি মেহমানরূপে হযরত লুত আ.-এর কাছে আসে। তারা ছিল মানব রূপধারী অতীব সুদর্শন। তখন গোত্রের সর্বাপেক্ষা উদ্ধত ও সীমালঙ্ঘনকারী নেতারা এই অতিথিদের উত্যক্ত করে।

হযরত লুত আ. তার জাতিকে এসব অবাধ্যতা ত্যাগ করে সভ্য মানুষ হওয়ার আহ্বান জানান। বলেন, তোমরা সমকাম ও বিকৃতি পরিহার করে মেয়েদের বিয়ে করো। এমনকি আমার বংশের মেয়েদের বিয়ে করে হলেও পবিত্র জীবন যাপন করো। স্বভাব ও প্রকৃতিবিরোধী যৌনাচারের চিন্তা থেকে তওবা করে এসব নাফরমানি বাদ দাও। খারাপ লোকেরা তখন হযরত লুত আ.-কে বিদ্রূপ করে বলল, পবিত্র ও ভালো চিন্তার মানুষ আমাদের সমাজে থাকতে পারবে না। আপনি দেশ ছেড়ে চলে যান।

তারা যখন ছদ্মবেশী ফেরেশতাদের সাথে অসদাচরণ করতে শুরু করল তখন হযরত লুত আ. বললেন, গোটা জাতির মধ্যে সুস্থ ও স্বাভাবিক লোক কি নাই হয়ে গেল, তোমাদের মধ্যে কি একজনও ভালো মানুষ নেই? আল্লাহ তখন হযরত লুত আ.-কে সান্ত্বনা দিয়ে বললেন, হে নবী, আপনাকে আমি এদের ছেড়ে চলে যেতে বলছি। ফেরেশতারা তাদের কাজ শুরু করবে। আপনি দ্রুত দেশত্যাগ করুন। তবে, আপনার স্ত্রী খারাপ লোকেদের সমর্থন করত, তাই তাকে আযাবে নিমজ্জিত হতে হবে। সে আপনার সঙ্গী হতে পারবে না।

এরপর এই জাতিকে এমনভাবে ধ্বংস করা হয়, যার নজির পৃথিবীতে কমই আছে। মূল জনপদটি ফেরেশতারা আকাশে তুলে নেয় এবং উল্টো করে আবার মাটিতে ছুঁড়ে ফেলে। যে জায়গাটির কিছু নিদর্শনস্বরূপ মৃত সাগর অঞ্চলটি এখনো দুনিয়াতে রয়েছে। মুফাসসিরগণ বলেন, এই ‘ডেড সী’ এলাকাটি ছিল এই জাতির বিশাল জনপদের অংশ বিশেষ।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, অতীত যুগের সকল নাফরমান জাতির নমুনা আমার উম্মতের মধ্যেও প্রকাশ পাবে। তবে শেষ উম্মত হিসেবে তাদের সমূলে ধ্বংস করা হবে না। কিছু কিছু শাস্তি দেওয়া হবে যেন তারা সঠিক পথে ফিরে আসে। আর পরকালে রয়েছে চূড়ান্ত ও কঠিন শাস্তি। এ কথাটি পবিত্র কোরআনে এভাবে বলা হয়েছে,

ظَهَرَ الْفَسَادُ فِی الْبَرِّ وَالْبَحْرِ بِمَا کَسَبَتْ اَیْدِی النَّاسِ لِیُذِیْقَهُمْ بَعْضَ الَّذِیْ عَمِلُوْا  لَعَلَّهُمْ یَرْجِعُوْنَ.

মানুষের কৃতকর্মের দরুন স্থলে ও সমুদ্রে ফাসাদ প্রকাশ পেয়েছে। যার ফলে আল্লাহ তাদের কতিপয় কৃতকর্মের স্বাদ তাদের আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে।-সূরা রুম : আয়াত ৪১

উন্নত বিশ্ব হিসেবে পরিচিত ইউরোপ-আমেরিকা সেই লুত আ.-এর জাতির মতো মুক্তচিন্তা ও মানবাধিকারের কথা বলে সব ধরনের সমকাম ও যৌন বিকৃতি বৈধ করার পক্ষে। পৃথিবীর বহু দেশে এর পক্ষে আইন পাস করা হয়েছে। এমনকি সমলিঙ্গের বিবাহের আইন ও প্রথা চালু করা হচ্ছে। অনেক মুসলিম দেশ এমনকি আমাদের বাংলাদেশেও পশ্চিমাদের উৎসাহ ও উদ্যোগে এসব অপকর্ম প্রচলনের চেষ্টা চলছে। কোরআন-সুন্নাহর অনুসারীরা আল্লাহর বিধানের, স্বাভাবিক প্রকৃতির ও দেশীয় ঐতিহ্য সংস্কৃতির দোহাই দিয়েও খারাপ মনের লোকদের ফেরাতে পারছেন না।

ওলামা-মাশায়েখগণ আপ্রাণ চেষ্টা করেও অসভ্যতা থেকে খারাপ মানসিকতার লোকদের ফেরাতে ব্যর্থ হচ্ছেন। তা ছাড়া ইসলামের দাওয়াত আজ পূর্ব-পশ্চিমের প্রতিটি সমাজেই পৌঁছে যাচ্ছে। কোরআন ও সুন্নাহর বার্তা এখন সকলের হাতেই আছে। মৃত সাগর ও এর মূল জনপদ ইতিহাসে বিখ্যাত। মানুষের জুলুম ও পাপাচারে ধ্বংস হওয়া পম্পেই, ট্রয় নগরী মানবসভ্যতার চরম উন্নতি লাভের পর আল্লাহর আযাবে ধ্বংসযজ্ঞের জন্য বিখ্যাত হয়ে আছে। এসব নগরীতে পাথরে পরিণত হওয়া মানুষের জীবনচিত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। বহু হাড় ও ফসিলের মধ্যে পক্সের জীবাণু পাওয়া গেছে। মেরু অঞ্চলে বরফের স্তরের নিচে মানুষ ও পশুর দেহাবশেষ থেকে পাওয়া যায় মহামারির বীজ। মধ্যপ্রাচ্যে আদ, সামুদ আসহাবুল আইকা, ইরাম ছাড়াও নমরুদ, ফেরাউন, হামান, কারুন সকলের খোদাদ্রোহিতা এবং এর কঠিন শাস্তি শিক্ষিত মানুষমাত্রই জানা থাকার কথা।

এরপরও মানুষ আল্লাহর হুকুম লঙ্ঘন করার ক্ষেত্রে মোটেও ভয় পায় না। সমকাম ও যৌন বিকৃতির অধিক চর্চা যেসব দেশে মূলত সেখানেই মাঙ্কিপক্স বেশি দেখা যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি ও সংস্থা নতুন মহামারির জন্য প্রস্তুতি নিতে বলছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের নানা স্থানে ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভূমিধস, পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়া, দাবানল, খাদ্য ও জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় সামগ্রীর অপ্রতুলতা দেখা যাচ্ছে। বিশ্ব মিডিয়ার নিয়ন্ত্রণ পশ্চিমাদের হাতে থাকায় সেসবের সামগ্রিক ও সমন্বিত চিত্র পৃথিবীর সামনে তুলে ধরা হয় না। কিন্তু কোরআনের বাণী অবশ্যই সত্য। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ভবিষ্যদ্বাণী চরম বাস্তব। যৌন নৈরাজ্য কেবল নয়, বিশ্বের নানা জায়গায় নিরীহ মানুষ হত্যা, মুসলিম উম্মাহর ওপর অকথ্য নির্যাতন-নিপীড়ন, শোষণ, মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করার ফলস্বরূপ পাশ্চাত্যের ভয়াবহ পরিণতি সময়ের ব্যাপার মাত্র।

পশ্চিমে সাদাদের জন্মহারও অবিশ্বাস্যভাবে কমে আসছে। বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বিশাল পরিবর্তনের পূর্বাভাস স্পষ্ট। পবিত্র কোরআনের ভাষায়,

مَنْ یَّرْتَدَّ مِنْكُمْ عَنْ دِیْنِهٖ فَسَوْفَ یَاْتِی اللهُ بِقَوْمٍ یُّحِبُّهُمْ وَیُحِبُّوْنَهٗۤ.

তোমাদের যারা দ্বীন থেকে ফিরে যাবে (তারা ফিরে যাক), আল্লাহ এমন লোক সৃষ্টি করবেন যাদের তিনি ভালোবাসবেন এবং তারাও তাঁকে ভালোবাসবে।-সূরা মায়িদা : ৫৪

পবিত্র কোরআনের অন্য জায়গায় আল্লাহ বলেন,

وَتِلْکَ الْاَیَّامُ نُدَاوِلُهَا بَیْنَ النَّاسِ.

এই সময়কে আমি মানবজাতির মধ্যে আবর্তিত করে থাকি।-সূরা আলে ইমরান : ১৪০

সময় কারও একরকম যায় না। আল্লাহর বিধান না মানলে এবং অত্যাচার-অবিচারে সীমাতিক্রম করলে আযাব অবশ্যম্ভাবী হয়ে ওঠে। মানুষ যা ভাবতেও পারে না। এমন বিপর্যয় জীবন ও সভ্যতায় দেখা দেয়। এ সবই পরম ক্ষমতাধর, সর্বশক্তিমান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কুদরতের হাতের মুঠোয়। মানুষের রক্ষা ও মুক্তির জন্য আসলে প্রয়োজন ঈমান ও তওবার। অতীত জাতিগুলোর মতো ধ্বংস হওয়ার আগে আল্লাহর হুকুম লঙ্ঘনকারী দেশ ও সম্প্রদায়ের পরম সত্যকে দ্রুত উপলব্ধি করা উচিত। কেননা, একের পর এক আযাব-গযব ও আসমানী শাস্তি সহ্য করার ক্ষমতা উন্নত-অনুন্নত কোনো বিশ্বেরই নেই। অতএব প্রতিটি বান্দার উচিত আল্লাহর ক্ষমতাকে স্বীকার করে তার আনুগত্য মেনে নেওয়া। বিশেষ করে পাশ্চাত্য ও তাদের অনুসরণকারী লোকদের কর্তব্য মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তাআলার প্রতিটি বিধিবিধানকে গুরুত্ব দেওয়া, কেননা পশ্চিমা জাতিগুলোকে কোরআন অনেক গুরুত্ব দিয়েছে। মেরির নামে পবিত্র কোরআনের সূরাটি তাদের হেদায়েতের জন্য যথেষ্ট। সেখানে যীশুকে শ্রদ্ধার সাথে উল্লেখ করা হয়েছে আর বারবার আল্লাহ তাদের সম্বোধন করেছেন, ইয়া আহলাল কিতাব এবং ইয়া বনী ইসরাঈল বলে। মহান আল্লাহর এ পবিত্র আহ্বানে তাদের সাড়া দিতেই পারে। ইসলামের দাওয়াত সবার জন্য অবারিত আর আল্লাহ গোটা মানবজাতির প্রভু।

-মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী

Avatar

zobayer

একটি কমেন্ট করুন