প্রতিষ্ঠাতা: মুজাহিদে আযম হযরত মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.

জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ, ঢাকা-এর মুখপত্র

প্রতিষ্ঠাকালঃ ১৯৩৭ ঈসায়ী

রমযানুল মুবারক : গুরুত্ব ফযীলত ও জরুরি মাসায়েল

রমযানুল মুবারক : গুরুত্ব ফযীলত ও জরুরি মাসায়েল

হাকীমুল উম্মত মুজাদ্দিদে মিল্লাত হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী রহ.

 

রোযা রাখা ফরয

নামাযের মতো রোযাও ইসলামের একটি রুকন। অর্থাৎ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য একটি বিধান। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا كُتِبَ عَلَیْكُمُ الصِّیَامُ.

ওহে যারা ঈমান এনেছ, তোমাদের ওপর রোযা ফরয করা হয়েছে।

হযরত আম্মার ইবনে হাযম থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ—এর ওপর ঈমান আনা ছাড়াও আল্লাহ তাআলা ইসলামে (মৌলিকভাবে) চারটি বিষয় ফরয করেছেন। কেউ এর থেকে তিনটি আদায় করলেও তার পরিপূর্ণ কাজে আসবে না, যতক্ষণ না সে সবগুলো আদায় করবে। (সে চারটি ফরয বিধান হলো) নামায, যাকাত, রমযানের রোযা ও বাইতুল্লাহর হজ।—মুসনাদে আহমাদ

এ হাদীস থেকে বোঝা গেল, কেউ নামায পড়ল, যাকাত আদায় করল এবং হজও করল; কিন্তু রোযা রাখল না, তাহলে তা তার নাজাতের জন্য যথেষ্ট হবে না।

রোযা কেবল আল্লাহর জন্য

হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, আল্লাহ তাআলা বলেন,

كُلُّ عَمَلِ ابْنِ آدَمَ لَهُ إِلَّا الصِّيَامَ فَإِنَّهُ لِي.

মানুষের সব আমল তার নিজের জন্য। কিন্তু রোযা বিশেষভাবে আমার জন্য।—সহীহ বুখারী

ব্যাখ্যা : এ হাদীসে فَإِنَّهُ لِي (রোযা বিশেষভাবে আমার জন্য) বলে রোযার বিশেষ গুরুত্ব ও মর্যাদার কারণ বর্ণনা করা হয়েছে। রোযার সওয়াব অশেষ ও অফুরন্ত। কারণ আল্লাহ বলেন, তা কেবল আমার জন্য। অর্থাৎ আল্লাহ পাকের সত্তা যেহেতু কামাল ও গুণাবলির দিক থেকে অসীম, অতএব যে জিনিস বিশেষভাবে তাঁর জন্য তাও অসীমই হওয়ার কথা।

রইল এ কথা যে, আল্লাহ তাআলা বিশেষ করে রোযাকেই কেন নিজের জন্য বললেন? সকল ইবাদতই তো আল্লাহর জন্য। নামায, যাকাত, রোযা, হজ সবই তো আল্লাহর জন্য। আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য কোনো ইবাদত নেই? এ প্রসঙ্গে মুহাক্কিক ওলামায়ে কেরাম বলেছেন, আর বিষয়টি আমার মাথায় এমনিতেও এসেছে যে, রোযাকে আল্লাহ পাক বিশেষভাবে নিজের জন্য বলার কারণ হলো, রোযার মধ্যে রিয়া বা লোক দেখানোর মানসিকতা থাকে না। কারণ রোযার স্বরূপই হলো নাস্তি বা না থাকা। (অর্থাৎ বাহ্যত রোযা রাখতে কোনো কিছু করতে হয় না। বরং) রোযা কিছু বিষয় বর্জন করার দ্বারা পালিত হয়। অর্থাৎ খাওয়া, পান করা ও স্ত্রী সম্ভোগ পরিত্যাগ করা। আর কিছু বর্জন করার কোনো (বাহ্যিক) আকৃতি থাকে না যে তা কেউ জানতে পারবে। (কেউ গোপনে খেয়ে ফেললে আল্লাহ ছাড়া কেউ জানবে না।)

 

রোযার অফুরন্ত সওয়াব

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, বনী আদমের সকল আমল বৃদ্ধি করা হয় এমনভাবে যে, এক একটি নেক আমল দশ গুণ হয়ে যায়। এভাবে সাতশ গুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, তবে রোযা এর ব্যতিক্রম। কারণ, রোযা আমার জন্য। স্বয়ং আমিই এর প্রতিদান দেব। রোযাদার নিজের খাহেশাত ও পানাহার পরিত্যাগ করে আমার জন্য। রোযাদারের জন্য দুটি আনন্দ রয়েছে। এক আনন্দ ইফতারের সময়, আরেক আনন্দ রবের সঙ্গে সাক্ষাতের সময়। নিঃসন্দেহে রোযাদারের মুখের দুর্গন্ধ আল্লাহর কাছে মেশকের ঘ্রাণের চেয়ে বেশি উত্তম। রোযা জাহান্নাম থেকে রক্ষার ঢাল। অতএব তোমাদের কেউ রোযা রাখলে সে যেন অশ্লীল কথাবার্তা না বলে। অনর্থক কার্যকলাপে লিপ্ত না হয়। কেউ তাকে গালমন্দ করলে বা তার সঙ্গে ঝগড়া করতে এলে সে যেন বলে দেয় আমি রোযাদার।—সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম

ব্যাখ্যা : হাদীসের উদ্দেশ্য হলো, সকল আমলের ক্ষেত্রে দুটি বিধান :

এক. আমলকে সীমিত পরিমাণে বৃদ্ধি করা হয়। অর্থাৎ সওয়াব বৃদ্ধি করা হবে, তবে একটি সীমা পর্যন্ত।

দুই. সওয়াব প্রদান করা হবে ফেরেশতাদের মাধ্যমে।

রোযা এ দুই বিধানের ব্যতিক্রম। আর তা এভাবে যে, অন্যান্য আমলের সওয়াব সীমিত অর্থাৎ একটি সীমায় গিয়ে শেষ হয়ে যায়। কিন্তু রোযার সওয়াব অসীম ও অফুরন্ত (কখনো শেষ হবে না)। দ্বিতীয়ত অন্যান্য আমলের সওয়াব ফেরেশতাদের মাধ্যমে প্রদান করা হয়, কিন্তু রোযা এমন ইবাদত, যার প্রতিদান স্বয়ং আল্লাহ পাক প্রদান করবেন। এর কারণ হলো, অন্যান্য ইবাদতের সওয়াব যেহেতু সীমিত তাই তা ফেরেশতাদের মাধ্যমে প্রদান করবেন, আর রোযার প্রতিদান যেহেতু অসীম তাই তা আল্লাহ পাক নিজে প্রদান করবেন। আমার ধারণা ছিল এ বিশ্লেষণ কোনো কিতাবে হয়তো মিলবে না। পরে মেশকাত শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ মেরকাতে বিষয়টি পেয়েছি।

সারকথা, ইবাদত দুই ধরনের। এক ধরনের ইবাদতের সওয়াব ফেরেশতাদের মাধ্যমে লাভ হবে আর আরেক ধরনের ইবাদতের সওয়াব আল্লাহ পাক স্বয়ং প্রদান করবেন। বিষয়টি একটি উদাহরণের মাধ্যমে বুঝুন। এক হলো কর্মচারীর মাধ্যমে পুরস্কার দেওয়া, আরেক হলো নিজ হাতে পুরস্কার প্রদান করা। বাদশাহদের নিয়ম হলো সাধারণ জিনিস খাজাঞ্চির মাধ্যমেই দিয়ে দেয়। যখন কাউকে অনেক বেশি পরিমাণে দিতে হয় বা মূল্যবান পোশাক উপহার দিতে হয়, তখন নিজ হাতে তা প্রদান করে।

তদ্রূপ আল্লাহ পাকও আমাদের অভ্যাসমতোই আচরণ করেছেন। যে সওয়াব সীমিত ও সসীম তা ফেরেশতাদের মাধ্যমে প্রদান করবেন, আর যে প্রতিদান হবে অসীম ও সীমাহীন তা নিজ হাতে প্রদান করবেন। কেননা তা শাহি প্রতিদান। যার কোনো সীমা—পরিসীমা নেই। এর সওয়াব এতটাই অসীম ও সীমাহীন যে, জান্নাতে যতদিন থাকবে (আর জান্নাতে তো চিরকালই থাকবে) কখনো এর সওয়াব ও প্রতিদান শেষ হবে না। এ হাদীস হয়তো আপনারা বহুবার শুনেছেন, কিন্তু এই হাকীকত ও মর্ম হয়তো শুনেননি। এ আলোচনায়ও আর কতটুকু শুনেছেন? রোযার প্রতিদান যেমন শেষ হয় না তেমনই রোযার ফযীলত ও বরকতের কথা বয়ান করে শেষ করা যাবে না।

মুহাদ্দিসগণের কেউ কেউ এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, হুকুকুল ইবাদের ক্ষেত্রে বান্দার অন্যান্য সব আমলই নিয়ে নেওয়া হবে, কিন্তু রোযা নেওয়া হবে না। কারণ, রোযা কোনো হকের বিনিময়েই দেওয়া হবে না।

বড় আফসোসের বিষয় হলো রোযাকে আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীন তার নিজের সম্পদ বলে ঘোষণা করেছেন, আর আমরা এর মূল্যায়ন এভাবে করলাম যে, রোযার মধ্যে গীবত করি, মিথ্যা বলি, কুদৃষ্টি দিই, হারাম খাদ্য গ্রহণ করি, নিজেদের বেশ—ভূষাও শরীয়তের পরিপন্থি করে রেখেছি। সরকারি এ মূল্যবান সম্পদের এ কেমন মূল্যায়ন করলাম? সরকারি সম্পদ তো এমন হয় যে, এর সামান্য অবমূল্যায়ন করাও জায়েয নেই।

 

একটি শিক্ষণীয় চমকপ্রদ গল্প

এ প্রসঙ্গে আমার একটি সূক্ষ্ম বিষয় মনে এলো। এক বাদশাহ তার উজিরকে জিজ্ঞেস করল, পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান জাতি কারা আর সবচেয়ে নির্বোধ জাতি কারা?

উজির দুই জাতির নাম ধরে বলল, অমুক জাতি সবচেয়ে বুদ্ধিমান আর অমুক জাতি সবচেয়ে নির্বোধ।

বাদশাহ বললেন, ঠিক আছে, এর পরীক্ষা হয়ে যাক।

উজির প্রথমে বোকা সম্প্রদায়ের এক লোককে দরবারে ডেকে পাঠালেন। লোকটি হাজির হলে উজির বললেন, তুমি তোমার দাড়ি বিক্রি করবে?

লোকটি খুবই রাগান্বিত হয়ে বলল, সাহেব, এ দাড়ির ওসিলায় আমার সব কারবার চলে। দশ জন মানুষ আমাকে নির্ভরযোগ্য ও দ্বীনদার মনে করে। কাজ—কর্মে ভরসা করে। এতেই ব্যবসা চলে। এটাকে কীভাবে বিক্রি করব? আপনি তো ভালোই বলেছেন!

(এরপর) উজির বলল, ভাই রাগ করো না। ব্যবসা—বাণিজ্যে যে লাভ হয় তার চেয়ে বেশি আমার থেকে নিয়ে নিয়ো। আর দাড়ি তো পরে আবার উঠেই যাবে। মোটকথা কিছু টাকা দিয়ে তাকে রাজি করাল। সে রাজি হয়ে গেল। দাড়ি মুণ্ডিয়ে টাকা নিয়ে বাড়ি চলে গেল।

লোকটির স্ত্রী এ অবস্থা দেখে বেজায় ক্ষুব্ধ হলো। বলল, এ কেমন নিবুর্দ্ধিতা চাপল? এখন এত সব কারবার কীভাবে চলবে? ব্যবসা—বাণিজ্যে তোমার প্রতি আর কে ভরসা করবে?

নির্বোধ : শোনো, কারবারে যে লাভ হয় আমি তা নিয়েই এসেছি।

স্ত্রী : টাকা তো নিয়ে এসেছ বুঝলাম, কিন্তু মানুষের তোমার প্রতি যে আস্থা ও বিশ্বাস ছিল তা ফিরিয়ে আনবে কীভাবে?

তুমি তো ঠিক কথাই বলেছ—এ কথা বলে নির্বোধ লোকটি উজিরের কাছে ফিরে গেল। বলল, আমি দাড়ি বিক্রি করব না। এ কথা বলে টাকা ফেরত দিয়ে তার কাটা দাড়ি নিয়ে এলো।

লোকটি সত্যিই নির্বোধ ছিল। কাটা দাড়ি দিয়ে কি মানুষের আস্থা ফেরানো যাবে? কিছুই হলো না। উল্টো যে টাকা পেয়েছিল তা—ও হারাল।

এরপর উজির বুদ্ধিমান সম্প্রদায়ের এক লোককে ডেকে পাঠাল। তার কাছেও একই নিবেদন করল। সেও রাগান্বিত হলো।

উজির : বিনিময়ে আমি তোমাকে টাকা দেব?

বুদ্ধিমান : কত?

উজির : পাঁচশ।

বুদ্ধিমান : পাঁচশ কোনো টাকা হলো যে এর জন্য আমি আমার সারা জীবনের দাড়ি সেভ করে ফেলব?

এরপর দশ হাজারে রাজি হলো। চুক্তিমতো লোকটি দশ হাজার টাকা গ্রহণ করল। নাপিত দাড়ি মুণ্ডাতে এলে বলল, একটু দাঁড়াও। এরপর সে চেঁচিয়ে বলতে লাগল, দাড়ি বিক্রি হওয়ার আগ পর্যন্ত আমার ছিল। বিক্রি হওয়ার পর এ দাড়ি বাদশাহর। এখন ভাই দেখো, বাদশাহর দাড়ি মুণ্ডানো হচ্ছে…।

এ কথা শুনে দরবারে হইচই পড়ে গেল। পরিস্থিতি দেখে বাদশাহ বললেন, আমার দাড়ি মুণ্ডন করা যাবে না। ফলে আর দাড়ি মুণ্ডনো হলো না। কিন্তু ওদিকে শহরে এ কথা ছড়িয়ে পড়ল যে, বাদশাহর দাড়ি মুণ্ডনো হয়েছে। এরপর বাদশাহ ওই লোকের দাড়ির সুরক্ষা ও যত্নের জন্য মাসিক ভাতা নির্ধারণ করে দিলেন।

উজির বলল, জাহাপনা দেখুন, ওই লোকের নিবুর্দ্ধিতা। সে দাড়িও মুণ্ডিয়েছে, টাকাও ফেরত দিয়ে গেছে। আর একে দেখুন, টাকাও নিল আবার দাড়িও রক্ষা করল।

এমনইভাবে রোযা যখন আল্লাহ পাকের শাহি সম্পদে পরিণত হলো (যেহেতু আল্লাহ পাক বলেছেন রোযা আমার জন্য), তখন কেউ তা নিজের হকের বিনিময়ে নিতে পারে না। তো রোযা হলো সরকারি সম্পদ। আর স্বয়ং সরকারও সরকারি সম্পদের অবমূল্যায়ন করে না। আশ্চর্যের ব্যাপার হলো, আপনারা এ সম্পদকে একেবারে মাটিতে মিলিয়ে দেন। একটু তো খেয়াল করুন। অন্ততপক্ষে রমযানে তো গোনাহ ছেড়ে দিন।

রমযানে শয়তানকে বন্দি করে রাখা হয়

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, বরকতময় রমযান মাস আগমন করেছে। আল্লাহ তাআলা এ মাসের রোযা তোমাদের ওপর ফরয করেছেন। এ মাসে জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয়। জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। উচ্ছৃঙ্খল শয়তানকে শেকলে আবদ্ধ করা হয়। (অর্থাৎ বন্দি করে রাখা হয়।) এ মাসে একটি রাত আছে যা হাজার মাস থেকে উত্তম। যে ব্যক্তি এ রাতের বরকত থেকে বঞ্চিত হলো সে একেবারেই বঞ্চিত রয়ে গেল। আর এ রাতের বরকত থেকে বঞ্চিত থেকে যায় কেবল দুর্ভাগারাই।—মুসনাদে আহমাদ, সুনানে নাসাঈ, সুনানে ইবনে মাজাহ

অপর এক হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, রমযানের প্রথম রাতে উচ্ছৃঙ্খল শয়তান ও জিনদের বন্দি করা হয়। দোজখের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়। পুরো মাসে একটি দরজাও আর খোলা হয় না। জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়। পুরো মাসে একটি দরজাও আর বন্ধ করা হয় না। একজন আহ্বানকারী বলতে থাকে, হে কল্যাণের প্রত্যাশী, অগ্রসর হও। হে মন্দের প্রত্যাশী ক্ষান্ত হও। রমযানের বরকতে বহু লোক দোজখ থেকে মুক্তি লাভ করে। এভাবে প্রতি রাতেই আহ্বান করা হয়।—জামে তিরমিযী, মুসনাদে আহমাদ, সুনানে ইবনে মাজাহ

ব্যাখ্যা : এ বিষয়টি তো স্পষ্টই যে দুনিয়াতে সাধারণত মন্দ কাজ ও গোনাহ হয়ে থাকে মানুষের পেট ভরে আহার ও শারীরিক শক্তির কারণে। রোযার কারণে যখন শারীরিক শক্তি কমে আসে তখন গোনাহও কমে যায়। মানুষ যখন আল্লাহর জন্য ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত থাকে এবং গোনাহ থেকে বিরত থাকে, তখন আল্লাহ পাকের রহমতে জোয়ার আসে। জান্নাতের দরজা তার জন্য খুলে দেওয়া হয়। আর দোজখের দরজা বন্ধ করে দেওয়ার বিষয়টিও স্পষ্ট। কারণ, যখন গোনাহের দরজা বন্ধ হয়ে গেল, যা আল্লাহ পাকের ক্রোধের আগুনকে উত্তেজিত করে তখন অবশ্যই দোজখের দরজাও বন্ধ হয়ে যাবে।

হাদীসের শব্দ থেকে বুঝে আসে যে, শয়তানদের বাস্তবিক অর্থেই বন্দি করে রাখা হয়। আমরা দেখি, কোনো গুরুত্বপূর্ণ ও সম্মানীত মেহমান আগমন করলে বিশৃঙ্খলাকারীদের তথা শত্রু, বিদ্বেষী ও সন্ত্রাসীদের বিশেষভাবে নজরবন্দি করে রাখা হয়। এমনইভাবে রমযান মাসে যেহেতু বিশেষ নূর, বরকত ও জ্যোতির উন্মেষ ঘটে, তাই এ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। এরপরও যে গোনাহ করে সে নফসের কারণে করে, শয়তানের কারণে নয়।

ওলামায়ে কেরামের কেউ কেউ বলেন, বন্দি করার অর্থ হলো, যখন বনী আদমের শিরা—উপশিরায় ও শরীরে সক্ষমতা ও শক্তি থাকে, তখন গোনাহের প্রতি আকর্ষণও থাকে। আর ভেতর থেকে শয়তানের চক্রান্তও কাজ করতে থাকে। কিন্তু যখন সমগ্র শরীরে ক্ষুধা ও পিপাসার প্রভাব পড়ে এবং আল্লাহ পাকের হুকুমে রোযা রেখে প্রবৃত্তির কামনাকে দমন করা হয়, তখন সন্দেহ নেই যে শয়তান আটকা পড়ে যায়। কেননা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, নিঃসন্দেহে শয়তান বনী আদমের শিরা—উপশিরায় রক্তের মতো চলাচল করতে থাকে। এ হাদীস থেকে সুস্পষ্ট বুঝে আসে, শয়তানের অবস্থানস্থল হলো মানুষের শিরা—উপশিরা। রোযা রাখার কারণে শিরা—উপশিরার শক্তি কমে যায় এবং শয়তানের চক্রান্ত প্রকাশ পেতে পারে না। (অর্থাৎ শয়তান আগের মতো চলাচল করতে পারে না।) কারও কারও মতে শয়তান বন্দি থাকার অর্থ এটাই। আল্লাহ পাকই ভালো জানেন।

আমার মতে রমযানে শয়তান বন্দি থাকার আলামত হলো, রমযানের আগে নফস ও প্রবৃত্তির যে কামনা—বাসনা স্বভাবতই জাগ্রত হতো, শয়তান তাতে ইন্ধন জোগাত। ফলে সে কামনা আরও জোরদার হয়ে যেত। এ কারণে সে কামনা দমন করাও কঠিন হতো। আর রমযানে স্বভাবজাত সে কামনা—বাসনা জাগ্রত হয় ঠিকই। কারণ প্রবৃত্তি ও স্বভাবকে তো আর বন্দি করা হয়নি। তবে রমযানে শয়তান বন্দি থাকায় সে কামনা ও বাসনার আগুনে ইন্ধন জোগাতে পারে না। ফলে কামনা তেমন জোরদার হয় না। ফলে সে কামনা দমন করাও তেমন কঠিন হয় না। বিষয়টি পরীক্ষা করে দেখুন, একেবারেই সঠিক ও সুস্পষ্ট একটি বিষয়।

হাদীসে শরীফে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযানের ফযীলত বর্ণনা করতে গিয়ে বলেছেন, এক ফেরেশতা আহ্বান করে বলতে থাকে, হে কল্যাণের প্রত্যাশী মনোযোগী হও, অগ্রসর হও। হে মন্দের প্রত্যাশী, ক্ষান্ত হও। আল্লাহ তাআলা এ মাসের বরকতে বহু গোনাহগার বান্দাকে মুক্তি দান করেন।

ফেরেশতা বলতে চান, এখন আল্লাহর দরবারে সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করা হচ্ছে। ওহে, তুমিও মুক্তি লাভের উপযুক্ত হয়ে যাও। দেখুন, রাষ্ট্রীয় বড় কোনো আনন্দের দিনে বন্দিরা মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করে। তো এখন রমযানের বরকতময় মাস। আল্লাহ পাকের দয়া ও করুণা ব্যাপক হচ্ছে। কয়েদিরা মুক্তি লাভ করছে। তোমার ওপরও তো আখেরাতের বহু সাজা সাব্যস্ত হয়ে গেছে। অতএব তুমিও একজন কয়েদি। তুমিও চেষ্টা করো, মুক্তি পেয়ে যাবে।

 

রমযান রহমত, মাগফিরাত ও মুক্তির মাস

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, এ (রমযান) মাসের প্রথম অংশ (অর্থাৎ প্রথম দশ দিন) রহমত, মধ্যবতীর্ অংশ মাগফিরাত এবং শেষ অংশ দোজখ থেকে মুক্তির। যে ব্যক্তি এ মাসে নিজের গোলাম—বাদির (কাজের লোকের ও কর্মচারীর) কাজের বোঝা হালকা করে দেয় অর্থাৎ তাদের সেবা গ্রহণে শিথিলতা করে আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দেন এবং দোজখের আগুন থেকে মুক্তি দেন। এ মাসে যে ব্যক্তি কোনো রোযাদারকে পেট ভরে খাবার খাওয়াবে, আল্লাহ তাআলা তাকে আমার হাউজে কাওছার থেকে এমনভাবে পরিতৃপ্ত করবেন যে, জান্নাতে প্রবেশের আগ পর্যন্ত তার আর পিপাসা লাগবে না।—বায়হাকী

ব্যাখ্যা : রমযানের প্রথম দশ দিন রহমত, মধ্যবতীর্ দশ দিন মাগফিরাত আর শেষ দশ দিন দোজখ থেকে মুক্তির। বোঝা গেল, রমযান মাস পুরোটাই রহমত ও মাগফিরাতের। এ মাসে প্রত্যেককে নিজের মাগফিরাত ও ক্ষমার ব্যবস্থা করা উচিত। আর মাগফিরাত ও ক্ষমা লাভের উপায় হলো নেক আমল করা।

এর থেকে এটাও বোঝা যায় যে মাগফিরাত ও ক্ষমা লাভ করা বান্দার ইচ্ছাধীন বিষয়। যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

وَسَارِعُوْۤا اِلٰی مَغْفِرَۃٍ  مِّنْ رَّبِّكُمْ وَجَنَّۃٍ عَرْضُهَا السَّمٰوٰتُ وَالْاَرْضُ ۙ اُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِیْنَ.

আয়াতের সারকথা হলো, আল্লাহর মাগফিরাত ও তাঁর জান্নাতের দিকে দৌড়াতে থাকো, যাকে মুত্তাকীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। যে ব্যক্তি এ পথে চলবে, এ পথের বিধান মোতাবেক আমল করবে, সে মাগফিরাত লাভ করবে। যে এমন হবে না সে বঞ্চিত থেকে যাবে। বোঝা গেল, মাগফিরাত ও ক্ষমা লাভ করা আমাদের ইচ্ছাধীন বিষয়। আমরা চাইলে তা লাভ করতে পারি। আর তা লাভ করার উপায় হলো মুত্তাকী হয়ে যাওয়া।

 

রোযা খুবই সহজ আমল

রোযা প্রকৃতিগতভাবেই খুবই সহজ আমল। কারণ, রোযা এমন ইবাদত যাতে কিছু করতে হয় না। অন্যান্য ইবাদত যেমন : নামায, যাকাত, হজ, যিকির ইত্যাদি হলো কোনো বিষয়কে অস্তিত্বে আনা ও কোনো কাজ করার ইবাদত। এগুলোতে কিছু কাজ করতে হয়। হজে তো বহু রুকন আদায় করতে হয়। আর পুরুষদের তো নামাযের জন্য মসজিদে যেতে হয়। মসজিদে না গেলে নামায অসম্পূর্ণ থেকে যায়। মোটকথা অন্যান্য ইবাদতে কিছু করতে হয় আর রোযায় কিছু করতে হয় না। কেবল কিছু বিষয় তথা পানাহার ও স্ত্রী সম্ভোগ থেকে বিরত থাকতে হয়। আর তা করতে হয় রোযার নিয়তে। নিয়ত ছাড়া দিনভর তৃষ্ণার্ত থাকলে বা ক্ষুধায় কষ্ট করলেও রোযা হবে না। রোযা হওয়ার জন্য নিয়ত শর্ত।

যখন এ বিষয়টি বুঝে এলো যে, রোযা এমন ইবাদত যাতে কোনো কাজ করতে হয় না, তখন দেখার বিষয় হলো কাজ করে আমল অস্তিত্বে আনার আমল বেশি কঠিন, নাকি কোনো কাজ না করে আমল অস্তিত্বে আনা বেশি কঠিন। সবার বিচার—বুদ্ধি এ ক্ষেত্রে এ সিদ্ধান্তই দেবে যে, কাজ করে আমল অস্তিত্বে আনা, কাজ না করে আমল অস্তিত্বে আনার চেয়ে কঠিন।

এখানে কেউ এ আপত্তি উত্থাপন করতে পারে যে, উপরোক্ত বিষয়টি বাস্তবতার পরিপন্থি। কারণ আমরা দেখি, মানুষ রোযাকে বড় ভয় করে। বড় মুসিবত মনে করে। আর নামায পড়তে কষ্ট কীসের?

এর উত্তর হলো, রোযা কঠিন মনে হয় অপর একটি বহিরাগত কারণে। আর তা হলো, গরমের সময় দিন অনেক দীর্ঘ হয়। ফলে রোযাও দীর্ঘ হয়ে যায়। যে নামাযকে আপনি সহজ বলছেন সে নামাযও দীর্ঘ হয়ে গেলে বাপ—দাদার নাম মনে পড়ে যায়। ১৪ ঘণ্টা কেউ নামায পড়তে পারবে? তারাবীহ নামায এক ঘণ্টার চেয়ে দীর্ঘ হলেই মানুষ ঘাবড়ে যায়। বোঝা গেল নামায ততক্ষণই সহজ যতক্ষণ তা দীর্ঘ না হবে। দীর্ঘ হয়ে গেলে রোযা থেকেও কঠিন হয়ে যাবে। কারণ, রোযা অবস্থায় এত নিয়ম—কানুন নেই, যতটা নিয়ম—কানুন নামায অবস্থায় আছে। অতএব মৌলিকভাবে রোযা সহজই। কখনো দিন দীর্ঘ হওয়ার কারণে কষ্ট হয়।

আর দিন দীর্ঘ হওয়ার কারণে যে অনেকের রোযায় কষ্ট হয়, সে ব্যাপারেও অভিজ্ঞতা বলে, আলোচনার দ্বারা রোযায় কষ্ট হয়। বলে, আজ খুব গরম পড়েছে, আজ খুব পিপাসা লাগছে, আজকাল রোযা রাখা খুবই কঠিন। আজ রোযা রেখেছি এ চিন্তা মাথা থেকে সরিয়ে দিতে পারলে এবং এর কোনো আলোচনাই না তোলে এমন কোনো কাজে লেগে যেতে পারলে, যে কাজে খুব বেশি মনোযোগী থাকতে হয়, তাহলে দিন অনেক দীর্ঘ হলেও রোযায় বেশি কষ্ট হবে না। বাস্তবেই কোনো কাজে গভীরভাবে মগ্ন হওয়া গেলে পানাহার তো দূরের কথা; ক্ষুধার কথাও মনে থাকে না। পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।

মোটকথা, রোযার সংজ্ঞায় এমন কোনো বিষয় নেই যার কারণে কষ্ট হয়। কারণ, রোযায় তিলাওয়াত, যিকির বা অন্য কোনো আমল করা জরুরি নয়। কেউ সারা দিন ঘুমিয়ে কাটালেও রোযা হয়ে যাবে। অবশ্য এমনভাবে ঘুমানো হারাম যার ফলে নামায কাযা হয়ে যায় এবং নামাযের সময় জাগ্রত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না। কেউ এমনটি করলেও নামায কাযা করার গোনাহ অবশ্যই হবে, তবে রোযা ঠিকই হয়ে যাবে। তো রোযা খুবই সহজ। এর কারণ হলো, রোযায় কোনো কাজ করতে হয় না।

রোযায় মানুষের স্বভাবগত চাহিদার প্রতিও লক্ষ রাখা হয়েছে। কারণ, আমাদের যেমন খাওয়ার ইচ্ছা হয় তেমনই কখনো না খেয়ে থাকতেও মন চায়। মানুষ পুরো বছর খেতে খেতে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। ফলে তার স্বভাব—প্রকৃতিই তখন কামনা করে যেন কিছুদিন খাওয়া—দাওয়া না করা হয়।

রোযা প্রকৃত অর্থেই সহজ। আল্লাহ পাকও রোযাকে সহজ করে তুলে ধরার প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেন,

یٰۤاَیُّهَا الَّذِیْنَ اٰمَنُوْا كُتِبَ عَلَیْكُمُ الصِّیَامُ کَمَا كُتِبَ عَلَی الَّذِیْنَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُوْنَ.

অর্থ : তোমাদের ওপর রোযা ফরয করা হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববতীর্দের ওপর রোযা ফরয করা হয়েছিল।

এ আয়াতে রোযাকে সহজ করে তুলে ধরার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে যে, রোযার নাম শুনে এত ভীত হও কেন? এ বিধান কেবল তোমাদের জন্যই বিধিবদ্ধ করা হয়নি; বরং তোমাদের পূর্ববতীর্দের ওপরও ফরয ছিল।

(রোযা সহজ হওয়ার বিষয়টি এর থেকেও বোঝা যায় যে,) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মেরাজ থেকে যখন ৫০ ওয়াক্ত নামাযের বিধান নিয়ে ফিরছিলেন তখন হযরত মূসা আ. জিজ্ঞেস করলেন, আল্লাহ তাআলা আপনার ও আপনার উম্মতের ওপর কী ফরয করেছেন?

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ৫০ ওয়াক্ত নামায।

হযরত মূসা আ. বললেন, আপনার উম্মত দুর্বল। বনী ইসরাঈলের ব্যাপারে আমার অভিজ্ঞতা হয়েছে। তারা আপনার উম্মত থেকে শক্তিশালী ছিল। তা সত্ত্বেও তারা এর চেয়েও সহজ বিধান পালন করতে পারেনি। আপনি আল্লাহকে আরও সহজ করে দেওয়ার নিবেদন করুন।

হযরত মূসা আ.—এর কথামতো হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহর কাছে নামাযের বিধান সহজ করার দরখাস্ত করলেন। শেষ পর্যন্ত পাঁচ ওয়াক্ত নামায রইল।

এখন এখানে একটি বিষয় বুঝুন যে, নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত মূসা আ.—এর কথামতো নামাযের বিধান সহজ করেছেন। তখন তিনি এ বিষয়টিও জানতে পারলেন যে, তাঁর উম্মত পূর্ববতীর্ উম্মতের তুলনায় দুর্বল। এ কারণে তিনি আল্লাহর কাছে দরখাস্ত করে ৫০ ওয়াক্ত নামায কমিয়ে পাঁচ ওয়াক্ত করেছেন। কিন্তু ৩০ দিনের রোযা কমিয়ে ৩ দিন করেননি। এর থেকে বোঝা যায়, পুরো বছরে কেবল এক মাস রোযা রাখা কঠিন কোনো বিষয় নয়। অন্যথায় নামায কমানোর অভিজ্ঞতার পর এখানেও কমানোর অনুরোধ করতেন। ৩০ দিনকে ৩ দিন করে নিতেন। সংখ্যা না কমালেও কমপক্ষে রোযার ধরনে সহজতা আনার দরখাস্ত করতেন। (উদাহরণত এমন হতে পারত, রোযা অবস্থায় পানি খাওয়ার সুযোগ থাকবে।) নামাযের বিধান এত পরিমাণ কমানোর পর রোযার বিধান না কমানোই একটি স্বতন্ত্র প্রমাণ যে, সুবহে সাদিক থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রোযা রাখা এবং পুরো বছরে এক মাস রোযা রাখা কোনো কঠিন ব্যাপার নয়। খুবই সহজ। বরং ইসলামের শুরুর দিকে ঘুমিয়ে পড়ার পর সেহরি খাওয়া হারাম ছিল। চাই কেউ এশার পরে সঙ্গে সঙ্গেই শুয়ে যাক না কেন। পরবতীর্ সময়ে এ বিধান রহিত করে সুবহে সাদিক পর্যন্ত খাওয়া—দাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এটা রোযার জন্য সহজ বিষয়।

এরপর ভেবে দেখুন, কোনো প্রেমাস্পদ তার প্রেমিককে কিংবা কোনো শাসক তার প্রজাকে কোনো সহজ কাজ করতে বললে তা পালন না করা খুবই নিন্দনীয়। কারণ মুশকিল ও কঠিন কাজে অবহেলা করা একটি পর্যায়ে ওযর হতে পারে, কিন্তু সহজ কাজে অবহেলা করার কী ওযর থাকতে পারে? এর থেকে বোঝা যায়, রমযানের রোযা না রাখা খুবই নিন্দনীয় ও মারাত্মক অপরাধ। এজন্যই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমন ব্যক্তির প্রতি বদ—দুআ করেছেন।

 

রোযা রাখতে অবহেলা

রোযার ক্ষেত্রে কিছু অবহেলা হয়ে থাকে। যেমন : কিছু লোক শক্তিশালী বা দুর্বল কোনো ধরনের ওযর ছাড়াই রোযা রাখে না। আমি এক ব্যক্তিকে দেখেছি, যে জীবনে কখনো রোযা রাখেনি। এ ধরনের লোক খুবই কম। এরা মনে করে আমার দ্বারা রোযা রাখা সম্ভব নয়। কতটা আফসোসের বিষয় যে, জীবনে একবার রোযা রেখেও দেখেনি। আর এ দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে বসে ছিল যে, কখনো রোযা রাখতে পারব না।

এ ধরনের ব্যক্তি একটু ভেবে দেখুক, যদি ডাক্তার তাকে বলে, আজ সারা দিন কিছু খাবেন না। খেলে অমুক কঠিন রোগ হবে। তখন ডাক্তার তো এক দিন খাবার খেতে মানা করেছিল, সে দুদিন না খেয়ে থাকবে। বলবে, এতেই সতর্কতা। আফসোস! আল্লাহ পাক শুধু দিনের বেলা খাদ্য—পানীয় পরিহার করতে বলেছেন, আর পানাহার করলে কঠিন আযাবের কথা বলেছেন। আল্লাহ পাকের কথাকে ডাক্তারের কথার সমানও মূল্যায়ন করেনি। ইন্না ল্লিাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

আমি রেলগাড়ির এক ড্রাইভারকে দেখেছি, যিনি সার্বক্ষণিক ইঞ্জিনের ভেতর থাকতেন। প্রচণ্ড গরমের মৌসুমেও তিনি রোযা রাখতেন। অনেক কৃষককে দেখা গেছে, বৈশাখ—জ্যৈষ্ঠ মাসের প্রখর রোদে সারা দিন কাজ করেও রোযা রাখে। অভিজ্ঞতা থেকে বুঝে আসে, কিছুটা অভ্যাস আর বেশি পরিমাণে হিম্মত ও দৃঢ় ইচ্ছার সম্মিলন হলেই কঠিন থেকে কঠিনতর কাজ সহজ হয়ে যায়। সুষ্ঠু রুচিবোধ ও উপলব্ধি শক্তিকে কাজে লাগালে তো রোযায় আল্লাহ পাকের সহজতা ও সাহায্য খোলা চোখেই নজরে পড়বে। এতকিছুর পরও মনোবল ভেঙে ফেলা ও বাহানা দাঁড় করানো বঞ্চনা ছাড়া কিছুই নয়।

এরপর দুর্বল মনোবলের মানুষ আবার দু—ধরনের হয়। এক ধরনের লোক হলো ভদ্র, যে রোযা না রাখলেও প্রকাশ্যে পানাহার করে না। বরং সে তার এ দোষ গোপন রাখতে চায়। প্রকাশ পাওয়াকে লজ্জার বিষয় মনে করে। আরেক ধরনের লোক অভদ্র। যাদের সামান্য লজ্জাবোধও হয় না। প্রকাশ্যে পানাহার করে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে বলে, আল্লাহর কাছে যখন কোনো কিছু গোপন করা যায় না তখন বান্দা থেকে গোপন করে কী লাভ? এ কথা কেবলই প্রতারণা। কেননা আল্লাহ তাআলা থেকে তো কোনো গোনাহ গোপন করা সম্ভবই নয়। কিন্তু মাখলুক থেকে তো গোপন করা সম্ভব। আল্লাহ তাআলা অন্যদের থেকে গোনাহ গোপন করার নির্দেশ দিয়েছেন। এ নির্দেশ অমান্য করার দ্বারা সে গোনাহ আরও মারাত্মক হয়ে যায়। তো অকারণে এহেন অন্যায় কাজে কেন লিপ্ত হয়।

 

শরঈ ওযর ব্যতীত রোযা না রাখা বা রেখে ভেঙে ফেলা

কারও অবস্থা এমন, ওযর ছাড়া তো রোযা ছাড়ে না ঠিকই; কিন্তু এ বিষয়ে কোনো ভেদাভেদ করে না যে ওযরটি কঠিন এবং শরীয়তে গ্রহণযোগ্য কি না? সামান্য অজুহাতে রোযা ছেড়ে দেয়। হয়তো একেবারেই রাখে না কিংবা রেখে ভেঙে ফেলে। একটু পিপাসা লাগল আর রোযা ভেঙে ফেলল। কেবল এক মনযিল (সাড়ে ৭৭ কিলোমিটারে কম দূরত্বের) সফর করেই রোযা ছেড়ে দেয়। কোনো মেহনত ও পরিশ্রমের কাজ করল তো রোযা ছেড়ে দিল।

এক দৃষ্টিকোণ থেকে এ ধরনের লোকেরা ওযরবিহীন যারা রোযা পরিত্যাগ করে তাদের চেয়েও বেশি নিন্দার পাত্র। কেননা ওযর ব্যতীত যারা রোযা ছেড়ে দেয় তারা নিজেদের ওযর আছে বলে মনে করে না। পাশাপাশি নিজেদের অপরাধী (গোনাহগার) মনে করে। আর এরা নিজেদের মাযুর মনে করে অপরাধমুক্ত মনে করে। অথচ শরীয়তের দৃষ্টিতে তারা মাযুর নয়। অতএব সে গোনাহগার হবে। তাদের উচিত ওই সকল লোকেদের দেখা যারা কঠিন থেকে কঠিনতর পরিস্থিতিতেও রোযা ছাড়ে না।

 

অনর্থক ওযর দাঁড় করানো

অনেকে শরঈ ওযরেই রোযা ভাঙে ঠিকই কিন্তু ভুল করে এখানে যে, কখনো এমন হয়, ওই ওযর দূর হয়ে যাওয়ার পর দিনের কিছু সময় অবশিষ্ট থাকে। শরীয়তের দৃষ্টিতে ওযর দূর হয়ে যাওয়ার পর অবশিষ্ট দিন পানাহার থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব। কিন্তু সে এর প্রতি লক্ষ রাখে না। উদাহরণত শরঈ সফর থেকে যোহরের সময় ফিরে এসেছে। কিংবা মহিলা যোহরের সময় হায়েয থেকে পবিত্র হয়েছে। তো এদের জন্য সন্ধ্যা পর্যন্ত পানাহার থেকে বিরত থাকা জরুরি। এটাই শরীয়তের নির্দেশ।

 

শরীয়তে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও রোযার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ি

কেউ কেউ রোযার ক্ষেত্রে বাড়াবাড়ির শিকার। বাহ্যত এরা দ্বীনের অধিক নিকটবতীর্। কিন্তু শরীয়তে যেহেতু পছন্দনীয় নয় তাই তাদের এমন কর্মপন্থা দ্বীনের পরিপন্থি। উদাহরণত কখনো সফরে বা অসুস্থতায় প্রাণ যায় যায় অবস্থা হয়, অর্থাৎ অত্যন্ত মাযুর হয়ে পড়ে। এরপরও নিজের দ্বীনদারি প্রকাশ করার জন্য কিংবা রোযা না রাখার চেয়ে রোযা রাখা অগ্রগণ্য মনে করে রোযা ছাড়ে না। এটা মারাত্মক ভুল। কারণ, রোযা রাখা সর্বাবস্থায় রোযা না রাখার চেয়ে অগ্রগণ্য নয়। বরং এমন কঠিন পরিস্থিতিতে বিধান এর বিপরীত। অন্যথায় ليس من البر الصيام في السفر তথা ‘সফরে রোযা রাখা কোনো নেক কাজ নয়’ এ হাদীসের কোনো অর্থই থাকে না। এটা কত মারাত্মক ভুল যে, শরীয়ত যে বিষয়টিকে অগ্রগণ্য সাব্যস্ত করেছে এ ব্যক্তি ওই বিষয়টিকে গৌণ মনে করছে। আর যাকে গৌণ সাব্যস্ত করেছে তাকে অগ্রগণ্য মনে করেছে। তাছাড়া শরীয়তের রুখসত তথা ছাড়ের বিধানের ক্ষেত্রে তার মন সংকুচিত হয়ে পড়েছে। যেন সে এটাকে অসম্পূর্ণ মনে করে। শরীয়তে অসম্পূর্ণতা আছে মনে করা কতটা গর্হিত আক্বীদা!

 

শিশুদের রোযা রাখানোর ক্ষেত্রে অভিভাবকদের অবহেলা

অনেকে নিজে রোযা রাখে ঠিকই কিন্তু রোযা রাখতে পারে এমন শিশুদের রোযা রাখানোর প্রতি খেয়াল রাখে না। কেউ কেউ নাবালেগ হওয়ার অজুহাত দাঁড় করায়। কিন্তু খুব ভালোভাবে বুঝে রাখুন, নাবালেগ হওয়ার কারণে শিশুর ওপর রোযা রাখা জরুরি নয় ঠিকই, কিন্তু এর থেকে এটা আবশ্যক হয় না যে, অভিভাবকের ওপর শিশুকে রোযা রাখানো জরুরি নয়। যেমনইভাবে বালেগ না হওয়া সত্ত্বেও শিশুকে নামাযের তাগাদা দেওয়া, এমনকি প্রহার করাও জরুরি, ঠিক তেমনই হুকুম রোযার ক্ষেত্রেও। পার্থক্য শুধু এতটুকু, নামাযে সাত বছরের শর্তারোপ করা হয়েছে আর রোযার ক্ষেত্রে রোযা সহ্য করার ক্ষমতার সঙ্গে বিষয়টিকে যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ যখন রোযার কষ্ট সহ্য করার মতো সক্ষমতা ও শক্তি হবে তখন থেকে রোযা রাখানো আবশ্যক হবে। এর কারণ হলো, একেবারে প্রথম ধাপেই কোনো বিষয়ে পূর্ণ যত্নবান হওয়া কঠিন হয়। যদি বালেগ হওয়ার পরই শরীয়তের সকল বিধান পালন করা শুরু করে তাহলে প্রথম ধাপেই তার ওপর অনেক বোঝা চেপে বসবে। এজন্য শরীয়ত ধীরে ধীরে আমলে অভ্যস্ত করার কর্মপন্থা নির্ধারণ করেছে। যেন বালেগ হওয়ার পর আমল করা কঠিন না হয়।

 

শিশুদের রোযা রাখাতে গিয়ে জুলুম করা

অনেকের আবার একেবারে ছোট, অবুঝ ও অনুপযুক্ত বাচ্চাদের রোযা রাখানোর সখ থাকে। এভাবে রোযা রাখিয়ে কেউ কেউ গর্ববোধ করে। আর কারও এভাবে রোযা রাাখিয়ে ছোটদের রোযা ভাঙানোর অনুষ্ঠানের আয়োজন করার আগ্রহ থাকে। প্রথমত এ কাজের ভিত্তিই ঠিক নয়। দ্বিতীয়ত এতে অনেক সময় এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়ে যায় (যেমন : লোক দেখানোর মনোভাব, সুনাম—সুখ্যাতি ইত্যাদি) যা গোনাহ আরও বৃদ্ধি করে।

 

রমযান ও রোযার হক

রমযানের ফাযায়েল কম—বেশি সকলেই জানে, কিন্তু রমযানের হকের ব্যাপারে খুবই অবহেলা হয়ে থাকে। এ কথা মাথায় আসেই না যে রমযানুল মুবারকের কিছু হক থাকতে পারে। এ কারণে আমরা দেখি, রমযান এলে মানুষ অন্যান্য বহু জিনিসের প্রতি খুবই গুরুত্বারোপ করে, যেমন : দুধের ব্যবস্থা করে, ঘর—দোর পরিষ্কার—পরিচ্ছন্ন করে, বরফের ব্যবস্থা রাখার চিন্তা করে, চিনি, খেজুর, সেমাই ইত্যাদি সংগ্রহ করে—সবকিছুরই ব্যবস্থা করা হয়, কিন্তু এ কথা কখনো মাথায় আসে না যে, ভাই, রমযানের বরকতময় মাস এসেছে, চলো গীবত থেকে বেঁচে থাকার কোনো ব্যবস্থা করি। এটা কোথাও হয় না যে, কয়েকজন সাথি পরামর্শ করে এ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে যে, আমাদের কেউ গীবত করতে শুরু করলে একে অন্যকে বাধা দেবে। দুনিয়ার অধিকাংশ কাজেই তো অপরের সহযোগিতা নেওয়া হয়। আর দ্বীনের কাজকে এতটাই সহজ মনে করে বসে আছে যে, কারও সহযোগিতার প্রয়োজনও মনে করে না। তাই এ কথা মাথায় আসেই না যে, আমরা পরস্পরে মিলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি।

এমনইভাবে এ চিন্তাও আমাদের মাথায় আসে না যে, কোরআন শরীফ শোনার মৌসুম আসছে। এমন কোনো হাফেয সাহেব তালাশ করা দরকার যিনি সহীহ—শুদ্ধভাবে কোরআন শরীফ তিলাওয়াত করেন। বরং তাজভীদসহ পড়ে এমন হাফেয ঠিক করা হলে বিরোধিতা করা হয় যে তারাবীহতে দেরি হবে। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যাবে না।

মোটকথা, রমযানুল মুবারকের হক আদায়ে ভীষণ অবহেলা করা হয়। এর কোনো পরোয়াই করা হয় না। হক আদায়ের গুরুত্বও আমাদের মাঝে কম। রমযানের হক সম্পর্কে মানুষের জানা—শোনাও কম। তাই এ আলোচনা খুবই জরুরি।

 

রোযাকে পূর্ণাঙ্গ ও ত্রুটিমুক্ত করার গুরুত্ব

হাদীস শরীফে এসেছে, যে ব্যক্তি অনর্থক কথা ও কাজ পরিহার করে না, তার ক্ষুধার্থ ও তৃষ্ণার্ত থাকার কোনো প্রয়োজন আল্লাহ তাআলার নেই।

এ হাদীসে এ বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে যে, রোযা অবস্থায় পানাহার ইত্যাদির চেয়ে গোনাহ ছেড়ে দেওয়ার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া বেশি জরুরি। কারণ, খাওয়া, পান করা সর্বদা হারাম নয়। বরং রোযার কারণে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নিষিদ্ধ। আর মিথ্যা কথা ও গোনাহ তো সর্বদাই হারাম। যখন তুমি মিথ্যা, গীবত, যিনা, সুদ, ঘুস ইত্যাদি দিয়ে রোযাকে ত্রুটিপূর্ণ করে ফেললে তখন তোমার ক্ষুধার্ত ও পিপাসার্ত থাকার কী প্রয়োজন আছে আল্লাহ পাকের?

এর অর্থ এই নয়, মিথ্যা, গীবত, সুদ, ঘুস দ্বারা রোযা ভেঙে যায়। না, রোযা ভাঙে না। কিন্তু এ সকল গোনাহ নিয়ে যে রোযা রাখা হয় তা এমন রোযা হয়, যেমন আপনি কাউকে বললেন, অমুক কাজের জন্য আমার একজন লোক দরকার। তো সে আপনার কাছে ল্যাংড়া, লুলা, প্যারালাইসিসে আক্রান্ত ও অবশ দেহের এক মাযুর লোককে নিয়ে এলো। যে লোক না নড়াচড়া করতে পারে আর না কোনো কাজ করতে পারে। যখন তাকে বলা হলো, ভাই, এ কাকে নিয়ে এলে?

সে উত্তরে বলল, আপনি তো একজন লোক চেয়েছেন। এ তো লোকই। কেননা মানুষের সংজ্ঞা তার ওপর প্রযোজ্য হয়।

তো এ মাযুর ও অবশ দেহের মানুষটিও মানুষই ছিল বটে, তবে কোনো কাজের মানুষ নয়। তেমনই আপনার রোযাও নিছক পারিভাষিক অর্থের রোযা। কোনো কাজের রোযা নয়। এজন্য রোযাকে পূর্ণাঙ্গ ও ত্রুটিমুক্ত করা খুবই জরুরি। অন্যথায় আমাদের রোযা নিছক নামের রোযা হবে, কাজের রোযা নয়।

 

রোযাকে পূর্ণাঙ্গ ও ত্রুটিমুক্ত করার উপায়

রোযাকে পূর্ণাঙ্গ ও ত্রুটিমুক্ত করা কোনো কঠিন ব্যাপার নয়। খুবই সহজ। এর দুটি স্তর রয়েছে :

এক. تكميل ضروري : প্রয়োজন পরিমাণ পূর্ণতা।

দুই. تكميل كامل : সম্পূর্ণরূপে পূর্ণতা।

প্রয়োজন পরিমাণ পূর্ণতার অর্থ হলো ত্রুটিপূর্ণ হওয়া থেকে মুক্ত হওয়া। অর্থাৎ রোযা এমন হবে যে, এটাকে ত্রুটিপূর্ণ বলা যায় না। আর সম্পূর্ণরূপে পূর্ণতা বলতে বোঝায়, ত্রুটি থেকে মুক্ত হওয়ার পর তাতে কিছু সৌন্দর্যের ফুল ও পাপড়িও যুক্ত হবে। যেমন : একটি সৌন্দর্য হলো নাক—মুখ ও আকৃতি সুন্দর হওয়া। রং উজ্জ্বল হওয়া। সৌন্দর্য ও শোভার আরেকটি পর্যায় হলো আকৃতি ও গঠনের সৌন্দর্যের পাশাপাশি সুন্দর পোশাক ও অলংকারে সজ্জিতও হবে। যেটাকে زينت বলা হয়। তো জরুরত পরিমাণ পূর্ণতা হলো আকৃতি ও গঠনের সৌন্দর্যের পর্যায়ের। আর সম্পূর্ণরূপে পূর্ণতা হলো সুন্দর গঠনের পাশাপাশি উত্তম পোশাক ও মূল্যবান অলংকারে সজ্জিত হওয়ার পর্যায়ের।

এখন বুঝুন, রোযার প্রয়োজনীয় পূর্ণতা কোনো কঠিন বিষয় নয়। খুবই সহজ। কারণ, এর জন্য কিছু করতে হয় না। এর সারকথা এতটুকুই, গোনাহ ছেড়ে দাও। মিথ্যা বলো না। গীবত করো না। ঝগড়া করো না। কুদৃষ্টি দিয়ো না। ঘুস নিয়ো না। সুদ খেয়ো না। আর বিষয়গুলো এমন, এতে কোনো কাজ করতে হয় না। এ পূর্ণতা ও সৌন্দর্য চুপ থাকা ও ঘুমিয়ে থাকার মাধ্যমেও লাভ হতে পারে। এর জন্য নফল নামায পড়া, তিলাওয়াত করা বা যিকির—আযকারের প্রয়োজন নেই। কেউ যদি সারা দিন ঘুমিয়ে থাকে, কেবল নামাযের সময় উঠে নামায আদায় করে নেয়, তাহলে তার রোযাকে অসম্পূর্ণ বা ত্রুটিপূর্ণ বলা যাবে না। দেখলেন তো, রোযাকে পূর্ণাঙ্গ করা কত সহজ। চুপ থাকা ও ঘুমানোর ভেতর দিয়েও তা অর্জন করা সম্ভব।

অবশ্য পরিপূর্ণ সৌন্দর্য ও কামাল অর্জনে আমলের দখল রয়েছে। এর জন্য রোযা অবস্থায় বেশি পরিমাণে কোরআন তিলাওয়াত করুন। এ সকল আমলের দ্বারা রোযায় পূর্ণতা ও কামাল বেশি আসে। তো যার পূর্ণাঙ্গ কামাল অর্জন করার হিম্মত নেই সে যেন অন্তত প্রয়োজন পরিমাণ কামাল হাতছাড়া না করে। কেননা এর জন্য কিছু করতে হয় না।

 

রমযানে গোনাহ বর্জন না করার দৃষ্টান্ত

রমযানে গোনাহ বর্জন না করার দৃষ্টান্ত এমন, মেহমানের সামনে যে খাবার পেশ করা হয় তার মধ্যে মূল হলো রুটি ও তরকারি। (আমাদের সমাজের হিসাবে ভাত ও তরকারি।) এ ছাড়া আচার, সালাদ, মুরব্বা ইত্যাদি দস্তরখানের শোভা। হজমেও সহায়ক। এগুলো মূল খাবারের স্বাদও বৃদ্ধি করে। কেউ যদি মেহমানের সামনে অতিরিক্ত জিনিস সব পেশ করল, যেমন : কয়েক ধরনের আচার আনল, কয়েক পদের মুরব্বা আনল। এ ছাড়া আর কিছুই আনল না। না রুটি, না গোশত।  যা ছিল মূল খাবার। এ মেহমান তখন কী বলবে? এ কথাই তো বলবে যে, কী খাব? মুরব্বা? আচার? খাবারের জিনিস তো একটিও নেই। এ সব তো খাবারে লাগিয়ে খাওয়ার জন্য।

ঠিক তদ্রূপ রমযানকে যদি আল্লাহ পাকের সামনে এমন অবস্থায় পেশ করা হয় যে, তাতে মূল বস্তু (তথা রোযা অবস্থায় গোনাহ বর্জন করা ও তাকওয়া অবলম্বন করা) নেই, তবে অতিরিক্ত জিনিস (অর্থাৎ তাসবীহ, নফল ইত্যাদি) আছে তো সে রোযা কীভাবে কবুল হবে? কিন্তু যদি আপনার কাছে মূল বস্তু আছে (অর্থাৎ রোযা অবস্থায় গোনাহ বর্জন করা ও তাকওয়া অবলম্বন করার আমল আছে), কিন্তু অতিরিক্ত বিষয়গুলো নেই অর্থাৎ সারা দিন কুদৃষ্টি, গীবত ও অন্যান্য সকল গোনাহ থেকে বিরত থেকেছে, উপার্জনও তার হালাল, এরপর চাই সে তাহাজ্জুদ পড়ুক বা না-ই পড়ুক, ওযীফা পড়ুক বা না-ই পড়ুক, গোনাহের ধারেকাছে ঘেঁষেনি, তাহলে এ রমযান আল্লাহর কসম ওই রমযান থেকে উত্তম যাতে তাহাজ্জুদ আছে, ওযীফাও আছে, তিলাওয়াত আছে, সবকিছু আছে কিন্তু পাশাপাশি সে গীবত করেছে, গোনাহও করেছে, গায়রে মাহরামদেরও দেখছে, অনর্থক খেল—তামাশায় লিপ্ত থেকেছে, ঝগড়া—বিবাদও করেছে, হিংসা—বিদ্বেষও পোষণ করেছে। এর চেয়ে ওই রমযান হাজার গুণে উত্তম।

 

রোযা অবস্থায় গোনাহ পরিত্যাগ করার উপায়

রোযা অবস্থায় গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার উপায়টি চারটি কাজের সমন্বয়ে গঠিত। যে তা অবলম্বন করবে গোনাহ থেকে বিরত থাকতে পারবে।

এক. প্রয়োজন ছাড়া কারও সঙ্গে মিশবে না। অর্থাৎ একাকী থাকবে।

দুই. কোনো ভালো কাজে ব্যস্ত থাকবে। যেমন : তিলাওয়াত বা অন্য কোনো নেক আমল।

তিন. সাধ্যমতো রমযান মাসে হালাল খাবারের প্রতি খুব বেশি গুরুত্ব দেবে। লজ্জার বিষয় হলো, সারা দিন হালাল জিনিস বর্জন করে সন্ধ্যায় হারাম খাবার দিয়ে ইফতার করল।

চার. নফসকে বোঝাবে এবং সময়ে সময়ে এ ধ্যান করতে থাকবে, সামান্য মজার জন্য সারা দিনের কষ্ট কেন বরবাদ করব। অভিজ্ঞতার আলোকে জানা যায়, নফসের সঙ্গে ছলনা করলে ও তাকে প্রবোধ দিলে খুব সহজে কাজ হয়। নফসকে এভাবে প্রবোধ দেবে, এক মাস তুমি এ নিয়ম পালন করো, এর পর দেখা যাবে কী হয়? ফলে এ এক মাস এ প্রবোধের কারণে মর্জিমতো কাজ করবে। এরপর এ বিষয়টিও অভিজ্ঞতার আলোকে প্রমাণিত, একটি দীর্ঘ সময় মানুষ যে কাজ করে পরে তার জন্য সে কাজ করা সহজ হয়ে যায়।

 

সেহরী ও ইফতার প্রসঙ্গে কিছু কথা

আল্লাহ তাআলা আমাদের মহব্বত করেন। তিনি আমাদের ভেতরের চাহিদার প্রতি কতটা গুরুত্ব দিয়েছেন যে, শরীয়তের নির্দেশ হলো সময় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ইফতার করা এবং শেষ সময়ে সেহরী খাওয়া মুস্তাহাব। এ বিষয়ে যুক্তি ও বুদ্ধির আশ্রয় নিলে এ সিদ্ধান্তই দেবে যে, সেহরী আগে আগে খাওয়া এবং ইফতার দেরি করে করা উত্তম হবে। যেন উপবাসের সময় দীর্ঘ হয় এবং মুজাহাদা পূর্ণ  হয়। আগে আগে ইফতার করে নেওয়া ও একেবারে শেষ সময়ে সেহরী খাওয়াকে আমাদের যুক্তি ও বুদ্ধি অধৈর্য ও লোভ আখ্যা দেবে যে, সারা দিন রোযা রেখে এমন অধৈর্য কেন হয়ে পড়ল যে, সূর্য ডুবতেই খাবারের ওপর উপুড় হয়ে পড়েছ। একটু শান্ত—শিষ্টভাবে ইফতার করা উচিত। কিন্তু শরীয়ত কারও পরোয়া না করেই ফত্ওয়া দিয়েছে, শেষ সময়ে সেহরী ও শুরু সময়ে ইফতারে বেশি সওয়াব হবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের চাহিদার প্রতি কী পরিমাণ গুরুত্ব দিয়েছেন। আমাদের মনোভাব ও চাহিদার প্রতি লক্ষ রাখাও কি আল্লাহর জিম্মাদারি? (এ কেবল তাঁর অনুগ্রহ ও দয়া।) কোনো দার্শনিক বুদ্ধিজীবী রোযার প্রচলন করলে নিশ্চিত তিনি এটাই করতেন যে, যে হেকমতে রোযার প্রচলন করা হয়েছে তার দাবিই হলো সেহরী আগে আগে খাবে আর ইফতার দেরি করে করবে। যেন মুজাহাদা পূর্ণ হয়। কিন্তু শরীয়তে এ যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। শরীয়ত তো সময় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করা ও শেষ সময়ে সেহরী খাওয়াকে রোযার পূর্ণতা আখ্যায়িত করেছে।

তবে একটি বড় ভুল করা হয় যে, অনেক জায়গায় ইফতারের আয়োজনে—যাকে ইফতারী বলা হয়—এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হয় যে, তা খেতে খেতে মাগরিবের জামাত পুরোপুরি কিংবা আংশিক ছুটে যায়। এ বিষয়টি ইচ্ছাকৃত এবং অধিকাংশ সময় হয়ে থাকে। যাকে শরীয়তের দৃষ্টিতে কোনো ওযরও সাব্যস্ত করা যায় না। জামাতের যে পরিমাণ গুরুত্ব হাদীসে এসেছে তাতে এহেন কাজ খুবই দূষণীয়। প্রথমত কথা হলো ইফতারীর এত আয়োজনের কী প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত এটাও তো সম্ভব যে, এ আয়োজন হবে নামাযের পর। সামান্য কিছু খেয়ে আগে জামাতে শরিক হয়ে যাবে।

 

রোযার কিছু জরুরি মাসায়েল

মাসআলা : মুখে রোযার নিয়ত করা ও কিছু বলা জরুরি নয়। বরং অন্তরে যখন এ খেয়াল থাকে যে আজ রোযা এবং এরপর সারাদিন কিছু খায়নি, পান করেনি, স্ত্রী সম্ভোগও করেনি তখন তার রোযা হয়ে গেছে।

মাসআলা : রমযানের রোযার নিয়ত রাতের বেলা করলে তো ঠিক আছেই। এমনকি কারও যদি এমন হয়, রাতে রোযা রাখার নিয়ত ছিল না। এমনকি সকালেও মনের অবস্থা এমনই ছিল যে আজ রোযা রাখব না। এরপর দিন আরও বাড়ার পর চিন্তা হলো, ফরয ছেড়ে দেওয়া তো ভীষণ অন্যায়। এ কথা ভেবে তখন নিয়ত করে নিল। এ নিয়ত দ্বারাও রোযা হয়ে যাবে। কিন্তু সুবহে সাদিকের পর কোনো কিছু পানাহার করলে আর এ নিয়তে রোযা হবে না। সুবহে সাদিকের পর পানাহার না করে থাকলে ঠিক দ্বিপ্রহরের এক ঘণ্টা আগে পর্যন্ত নিয়ত করে নিলে রমযানের রোযা সহীহ হয়ে যাবে।

মাসআলা : রোযাদার রোযার কথা ভুলে গিয়ে কোনো কিছু খেয়ে নিলে বা পান করলে কিংবা স্ত্রীর সঙ্গে মেলামেশা করে ফেললে রোযা ভাঙবে না।

মাসআলা : কোনো রোযাদারকে ভুলে কিছু খেতে বা পান করতে দেখল, এখন যদি ওই ব্যক্তি এতটা সামর্থ্যবান হয় যে, রোযায় তার খুব বেশি কষ্ট হবার কথা নয়, তাহলে তাকে রোযার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া ওয়াজিব। আর যদি এতটা দুর্বল হয় যে, রোযায় তার খুব কষ্ট হয়, তাহলে তাকে রোযার কথা স্মরণ করিয়ে দেবে না।

মাসআলা : দিনের বেলা ঘুমে কেউ এমন স্বপ্ন দেখল যাতে তার গোসল ফরয হলো, এতে রোযা ভাঙবে না।

মাসআলা :  রোযা অবস্থায় সুরমা, তেল ও সুগন্ধি ব্যবহার করতে কোনো সমস্যা নেই। এতে রোযার কোনো ক্ষতি হয় না।

মাসআলা : কুলি করার সময় গলায় পানি চলে গেল, আর রোযার কথাও মনে ছিল, তো রোযা ভেঙে যাবে। কাযা করতে হবে, কাফ্ফারা ওয়াজিব হবে না।

মাসআলা : নিজের অনিচ্ছায় বমি হলে রোযা ভাঙবে না। চাই বমি বেশি হোক বা কম। অবশ্য ইচ্ছাকৃত বমি করলে তা মুখ ভরা পরিমাণ হলে রোযা ভেঙে যাবে। আর বমি মুখ ভরে না হলে ইচ্ছাকৃত করলেও রোযা ভাঙবে না।

মাসআলা : রমযানে ঘটনাক্রমে কারও রোযা ভেঙে গেলে অবশিষ্ট দিন পানাহার করা জায়েয নেই। সারা দিন রোযাদারের মতো থাকা ওয়াজিব।

মাসআলা : যে অসুস্থতার কারণে রোযা রাখা খুবই কষ্টকর হয় কিংবা ক্ষতির কারণ হয়, (অর্থাৎ রোযা রাখলে রোগ বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা হয়) এমন অবস্থায় ওই ব্যক্তির জন্য রোযা না রাখা জায়েয।

মাসআলা : হানাফী মাযহাব মতে শরঈ সফর বলতে বোঝায়, নিজ অবস্থানের জায়গা থেকে তিন মনযিল (সাড়ে ৭৭ কিলোমিটার) দূরত্বের সফরে বের হলে সে রাস্তায় মুসাফির হবে। গন্তব্যে পেঁৗছে যদি ১৫ দিন বা তার বেশি থাকার নিয়ত করে তাহলে সে ওখানে আর মুসাফির থাকবে না। ১৫ দিনের কম থাকার নিয়ত করলে মুসাফির থাকবে। তো যে ব্যক্তি শরঈ মুসাফির সাব্যস্ত হলো তার জন্য রোযার সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও রোযা না রাখার সুযোগ আছে। যদিও এমন পরিস্থিতিতে রোযা রাখাই ভালো।

মাসআলা : এ ধরনের অসুস্থ বা মুসাফির ব্যক্তি যদি ওই দিনের রোযার নিয়ত না করে থাকে তাহলে তার জন্য রোযা না রাখা জায়েয। কিন্তু রোযার নিয়ত করে ফেললে প্রচণ্ড রকমের কষ্ট না হলে রোযা ভাঙা জায়েয হবে না।

মাসআলা : এ মুসাফির ও অসুস্থ ব্যক্তি যে কয়দিনের রোযা রাখেনি তা সে হিসাব করে রাখবে। সফর ও অসুস্থতা দূর হয়ে গেলে রমযানের পর কাজা আদায়ের নিয়তে ওই কয় দিনের রোযা রাখবে। সফর ও অসুস্থতার দূর হওয়ার পর যদি রমযানের আরও কিছুদিন বাকি থাকে তাহলে ওই দিনগুলোতে রমযানের অবশিষ্ট রোযা রাখবে। রমযানের পর ওই কাযা রোযাগুলো আদায় করে নেবে।

 

ফিদিয়া প্রসঙ্গ

ইসলামের শুরু যুগে যখন মানুষকে ধীরে ধীরে রোযায় অভ্যস্ত করার সুযোগ ছিল, তখন রোযা রাখার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও রোযা না রেখে ফিদিয়া দেওয়া জায়েয ছিল। পরে এ বিধান রহিত হয়ে গেছে। অবশ্য যে ব্যক্তি খুব বেশি বৃদ্ধ হয়ে গেছে কিংবা এমন অসুস্থ হয় যে সুস্থ হওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা নেই, এমন ধরনের ব্যক্তিদের জন্য এ বিধান বলবৎ আছে। তারা প্রতিটি রোযার পরিবর্তে একজন মিসকিনকে দুই বেলা পেট ভরে আহার করাবে কিংবা প্রতি রোযার পরিবর্তে একজন মিসকিনকে পৌনে দুই সের (১৬৩৬ গ্রাম) গম বা তার মূল্য দিয়ে দেবে। ফিদিয়া আদায়ের পর যদি রোযা রাখতে সমর্থ হয় বা অসুস্থ ব্যক্তি সুস্থ হয়ে যায়, তাহলে রোযাগুলোর কাযা আদায় করতে হবে। আর যে ফিদিয়া আদায় করেছিল তা রোযার পরিবর্তে যথেষ্ট না হলেও তার সওয়াব আলাদাভাবে পাবে।

 

(আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে রমযান ও রোযার হক আদায় করার তাওফীক দান করুন।)

[হাকীমুল উম্মত থানভী রহ. এর রচনা সম্ভার থেকে রমযান বিষয়ক আলোচনার সংকলন আহকামে রমাযান থেকে নির্বাচিত অংশ অনূদিত। সংকলক, মাওলানা যায়েদ মাজাহেরী নদভী। অনুবাদ করেছেন, আবু সাফফানা।]

Avatar

zobayer

একটি কমেন্ট করুন