প্রতিষ্ঠাতা: মুজাহিদে আযম হযরত মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.

জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ, ঢাকা-এর মুখপত্র

প্রতিষ্ঠাকালঃ ১৯৩৭ ঈসায়ী

রমযান ও ইতিকাফ যেভাবে ধরে রাখব

রমযান ও ইতিকাফ যেভাবে ধরে রাখব

মাওলানা মুহাম্মাদ আবদুল মালেক


 

খুতবায়ে মাসনূনার পর :

আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের ফযল ও করমে আমরা রমযানুল মুবারক পেয়েছিলাম। এখন একেবারে শেষদিকে এসে পড়েছি আমরা।

আলহামদু লিল্লাহ, আমাদের রমযান শেষ হয়নি। হয়তো আগামীকালও আমরা রমযান পাব। এর সম্ভাবনাই বেশি। নতুন চাঁদের যে পজিশন, সে হিসেবে আমাদের এখান থেকে চাঁদ দেখা মুশকিল। এখন রমযান শেষ করে, রোযা শেষ করে আমরা যাচ্ছি শাওয়ালের দিকে। পহেলা শাওয়ালে ঈদুল ফিতর হবে ইনশাআল্লাহ। সবই তো চলে গেল, রমযান চলে গেল, ইতিকাফও চলে গেল। এ চলে যাওয়াটা চলে যাওয়া নয়। যদি এমনভাবে চলে যায় যে, আমাদের মধ্যে কোনো প্রভাব রেখে যায়নি, তাহলে বুঝতে হবে আমাদের আমলগুলো অনেক দুর্বল ছিল।

যদি রোযার মৌসুম শেষে আমাদের জন্য কিছু প্রভাব রেখে যায় তাহলে সফল হব। আমাদের আমল কিছুটা রূহওয়ালা হয়েছে বুঝতে পারব, ইনশাআল্লাহ।

কী রেখে যাওয়া উচিত? রমযান, ইতিকাফ ও ঈদ আমাদের মধ্যে কী প্রভাব রেখে যাবে? আমরা কী প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করব? সেটা একটু ভাবনার বিষয়।

প্রশ্নের উত্তরটা একদিক থেকে সহজ। কিন্তু এটাকে যদি আমার জিন্দেগীতে প্রয়োগ করতে চাই তাহলে একটু কষ্ট করতে হবে, একটু মোজাহাদা করতে হবে। এমনিতে প্রশ্ন ও জবাব সহজ।

কী প্রভাব রেখে গেছে? কী প্রভাব আমরা ধরে রাখব? রমযানের বরকতে আশা করি আমরা মাগফেরাত পেয়ে গেছি, ইনশাআল্লাহ। আল্লাহর রহমতের আশা করা উচিত। রমযানের বরকতে খাস মাগফেরাত আমরা পেয়েছি, এটার প্রভাব থাকতে হবে আমাদের জিন্দেগীতে। আল্লাহ রমযানের ওসিলায় আমাদেরকে পাক-সাফ করে দিয়েছেন। যত দীর্ঘ সময় পর্যন্ত আমরা সাফ থাকতে পারি সেটাই হলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এটা তো আর পোশাক নয় যে, গায়ে দিলাম, আমার অনিচ্ছায়ও এটা ময়লা হতে                   থাকবে। আমাদের সীরাত, দিল, দেমাগ, চরিত্র, ঈমান ও আমল এমন নয় যে, অনিচ্ছায় নাপাক ও ময়লা হতে থাকে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ইচ্ছাশক্তি দিয়েছেন। ইচ্ছাশক্তি প্রয়োগ করলে পাক-সাফ থাকা সম্ভব ইনশাআল্লাহ।

যদি প্রশ্ন আসে, কী ধরে রাখতে হবে আমাদের? প্রথম কথা তো এটাই, আল্লাহ যে পাক-সাফ করে দিয়েছেন, সেই পাকি এবং সাফাঈ ধরে রাখি। আল্লাহ তাআলা তাওফীক দেওয়ার মালিক।

দ্বিতীয়ত আল্লাহ তাআলা রমযানের বরকতে আমাদেরকে তাকওয়ার নেয়ামত দান করেছেন। আমাদের তাকওয়া আগের চেয়ে মজবুত করে দিয়েছেন। এ সিফাতটাকে অক্ষুণœ রাখা। এটাকে আরও মজবুত করতে চেষ্টা করা। এ দুটো হলো মৌলিক কথা।

তৃতীয় আরেকটি মৌলিক কথা হলো, রমযানে আমরা যত ইবাদত করেছি, এক তারাবী ছাড়া কোনো ইবাদত নেই যেটা রমযানের সাথে খাস। তারাবী শুধু রমযানেই আছে, অন্য মাসে নেই। তাহাজ্জুদ বারো মাসের আমল। রমযানের বাইরে বাকি এগারো মাসে তারাবীর বিকল্প হচ্ছে তাহাজ্জুদ। রমযানে তো উভয়টিই আছে—তারাবী আছে, তাহাজ্জুদ আছে। রমযানে ইবাদতের যে আদত হয়ে গেছে সে আদতটাকে যদি আমরা ধরে রাখতে পারি ইনশাআল্লাহ তাহলে তিলাওয়াত, যিকির, দুআ, তাওবা, ইসতিগফার ও তাহাজ্জুদের নামায আমরা নিয়মিত করতে পারব। সাহরির বরকতে তাহাজ্জুদে ওঠা হয়েছে। এটা যদি আমরা হিসাব করি, রমযানে আমরা কখন শুতে যেতাম আর কখন উঠতাম? রমযানে যেহেতু সেহরী আছে তাই হাতে বেশি সময় নিয়ে উঠতাম। অন্য মাসে যদি শুধু তাহাজ্জুদের বিষয় হয় তাহলে বিশ/পঁচিশ মিনিট আগে উঠলেও হয়। তাহলে শেষ রাতের যে বরকত, তাহাজ্জুদের যে বরকত সে বরকত লাভ করতে পারব। রমযানে তো কিছু আমলের জন্য দেরিতে শোওয়া হয়। অন্য মাসে এ শোওয়াটা আরও আগেই সম্ভব। আগে ঘুমালে এবং খুব তাড়াতাড়ি না উঠে আধা ঘণ্টা আগে উঠলে খুব সহজেই তাহাজ্জুদের আমল ধরে রাখা সম্ভব। যে আমলগুলো আমরা রমযানের আকর্ষণে করেছি এ অভ্যাসের অংশবিশেষও যদি ধরে রাখি, তাহলে আমাদের তিলাওয়াত, যিকির, দুআ ও তাহাজ্জুদের অভ্যাস ধরে রাখা ইনশাআল্লাহ সম্ভব। অন্য নফলের কথা না-ই বললাম।

অন্য সময়ের তাহাজ্জুদের ফযীলত কিন্তু রমযানের তাহাজ্জুদের চেয়ে কম নয়। সামষ্টিক বিচারে তো রমযানের ফযীলত বেশি। যদি আমরা শুধু শেষ রাতের কথা ধরি, তাহলে অন্য সময়ের শেষ রাত আর রমযানের শেষ রাত একই মর্যাদার। আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের বিশেষ রহমতের যে ডাক সেটা রমযানেও আছে, অন্য মাসেও আছে।

তাহাজ্জুদের নামায বিধানগত দিক দিয়ে মুস্তাহাব বা নফল; কিন্তু তাৎপর্যের দিক দিয়ে অনেক জরুরি। বিধানগতভাবে নফল রাখাটাও আল্লাহর একটা পরীক্ষা হতে পারে। সব কি পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের মতো ফরয ঘোষণা করলেই বান্দা করবে? হয়তো আল্লাহ তাআলা এটা দেখতে চান। তাহাজ্জুদের যত বরকত, যত ফযীলত, যত গুণাগুণ এবং বান্দাকে ইসলাহ করার জন্য, ঈমান আমলের তারাক্কীর জন্য যত ফায়েদা—তা ভালোভাবে চিন্তা করলে ইনশাআল্লাহ কেউ তাহাজ্জুদ ছাড়বে না।

তাৎপর্যের দিক দিয়ে এটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ কেন? একটি বিষয় চিন্তা করলেই এর উত্তর পেয়ে যাব—

তাহাজ্জুদ হলো, আল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়া। শেষ রাতে আল্লাহ ডাকছেন। হাদীসে এর যে ভাষা ব্যক্ত করা হয়েছে—আল্লাহ তাআলা প্রথম আসমানে নেমে আসেন। এটা নিশ্চয় ভাষার অলংকার। আল্লাহর কী পরিমাণ রহমত বান্দার দিকে মুতাওয়াজ্জিহ হয়, এটাকে এত গভীর ভাষায়, এত অলংকারপূর্ণ ভাষায় নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যক্ত করেছেন।

আল্লাহ তাআলা ডাকতে থাকেন :

مَنْ يَدْعُونِي فَأَسْتَجِيبَ لَهُ، مَنْ يَسْأَلُنِي فَأُعْطِيَهُ، مَنْ يَسْتَغْفِرُنِي فَأَغْفِرَ لَهُ.

আমার কাছে প্রার্থনা করার কে আছে, যার প্রার্থনায় আমি সাড়া দেব? আমার কাছে চাওয়ার কে আছে, যার চাওয়া পূরণ করব? আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনার কে আছে, যাকে আমি ক্ষমা করব?-সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৩২১

مَنْ ذَا الَّذِي يَسْتَرْزِقُنِي فَأَرْزُقَهُ، مَنْ ذَا الَّذِي يَسْتَكْشِفُ الضُّرَّ أَكْشِفَهُ.

আমার কাছে রিযিক প্রার্থনার কেউ আছে, যাকে রিযিক দান করব। আমার কাছে বিপদ-মুক্তির প্রার্থনা করার কেউ আছে, যাকে বিপদ থেকে মুক্তি দেব।-সুনানে কুবরা, নাসায়ী ১০২৩৮, ১০২৩৭

আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমতের এমন আহ্বান চলা অবস্থায় গাফলতের মধ্যে থাকাটা কত বড় উদাসীনতা? ভাবটা হলো, আমার যেন কোনো দরকার নেই। এটা কেউ বলে না। তবে ভাবটা এমন। কোনো দিনই আমি উঠি না। আমি জানি, তাহাজ্জুদের এ মাহাত্ম্য। কিন্তু আমি গাফেল হয়ে শুয়ে থাকি। চোখ খুললেও উঠি না। সেজন্য এটা আমাদের অভ্যাসে আনা দরকার এবং এটা সম্ভব, যদি আগে ঘুমাই এবং অনেক আগে ওঠার চেষ্টা না করি। উঠেই প্রথমে কাজ হলো দুআটা পড়া :

لاَ إِلٰهَ إلاَّ اللهُ وَحْدَهٗ لاَ شَرِيْكَ لَهٗ، لَهُ الْمُلْكُ،ولَهُ الْحَمْدُ، وَهُوَ عَلٰى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ، سُبْحَانَ اللهِ وَالْحَمْدُ لِلهِ، وَلاَ إِلٰهَ إِلَّا اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ، وَلاَ حَوْلَ وَلاَ قُوَّةَ إِلَّا بِاللهِ الْعَلِيِّ الْعَظِيْمِ.

তিনটা ভিন্ন ভিন্ন দুআ। কিন্তু এখানে একসাথে। এরপর দুআ করি :

اَللّٰهُمَّ اغْفِرْ لِيْ، اَللّٰهُمَّ اغْفِرْ لِيْ.

হে আল্লাহ, আমাকে মাফ করে দাও। হে আল্লাহ, আমাকে মাফ করে দাও।

অন্য দুআও সাথে মিলাতে পারি। হাদীস শরীফে আছে, ঘুম থেকে উঠে উক্ত দুআর কালিমাগুলো বলার পর দুআ করলে আল্লাহ তাআলা কবুল করেন। এরপর যদি সে ওযু করে নামায পড়ে আল্লাহ তার নামায কবুল করেন।-সহীহ বুখারী : ১১৫৪; সুনানে আবু দাউদ : ৫০৬০

একেবারে অগ্রীম দান। ওযু করে প্রস্তুত হয়ে আসতে একেক জনের একেক সময় লাগে। অনেকের লম্বা প্রস্তুতি লাগে। অনেকে ওযু করেই নামাযে দাঁড়িয়ে যেতে পারে। রমযানে আমরা দুটি পেয়েছি : তারাবী ও তাহাজ্জুদ। উভয়টি না ছাড়ি। একটা ধরে রাখি। তা হলো, তাহাজ্জুদ; অল্প সময়ের জন্য হলেও, কম পরিমাণে হলেও। হাদীসে একটি শব্দ আছে না, فُواق حلْبِ شاةٍ। এর অর্থ হলো, বকরির দুধ দোহন করার সময় একপর্যায়ে বকরি দুধ উঠিয়ে নেয়। বাচ্চার জন্য দুধ ধরে রাখে। মানুষ তো দুষ্ট। দুধ আসা বন্ধ হয়ে গেলে বাচ্চাকে আবার স্তনে লাগিয়ে দেয়। বাচ্চাকে দেখে যেই না দুধ ছাড়ে, অমনি বাচ্চাকে সরিয়ে দিয়ে দুধ দোয়ানো শুরু করে। এ দুই সময়ের মাঝখানের সময়টাকে বলে فُواق حلْبِ شاةٍ। খুব অল্প সময়। আপনি যদি এমন অল্প সময়ও তাহাজ্জুদে ব্যয় করেন তারও অনেক ফযীলত। আমি বারবার বলছি, যেন আপনাদের দুআর বরকতে আমার মধ্যেও আমল এসে যায়।

তিনটা কথা বললাম, আল্লাহ যে পাক-সাফ করে দিয়েছেন সেটা ধরে রাখার চেষ্টা করা।

আল্লাহ তাকওয়ার নেয়ামত আগের চেয়ে মজবুত করে দিয়েছেন সেটা ধরে রাখার চেষ্টা করা।

যে আমলগুলোর অভ্যাস গড়ে উঠেছে রমযানের বরকতে, ওটাকে একেবারে শূন্যে নামিয়ে না দেওয়া। শূন্যতে এমনিতেই যাবে না। শূন্যতে বলছি এ জন্য যে, অন্য সময়ের একদম স্বাভাবিক অবস্থায় না গিয়ে রমযানের কিছু প্রভাব যেন বাকি থাকে। তিলাওয়াত এখন অনেক পারা করেছি। অন্য সময়ে আধা পারা তিলাওয়াত করি। কেউ এক পারা করি। কেউ দুই পারা, কেউ তিন পারা—যার যে পরিমাণ আদত আছে তার চেয়ে একটু বাড়িয়ে দিই। গতবার আমার অভ্যাস ছিল এক পারা করে তিলাওয়াত করা, এবার একটু বাড়িয়ে দিই—সোয়া পারা তিলাওয়াত করার চেষ্টা করি। এভাবে রমযানের কিছু আদত ধরে রাখার চেষ্ট করি। বিশেষ করে তাহাজ্জুদের ক্ষেত্রে এটাকে বেশি বেশি প্রয়োগ করার চেষ্টা করি। যত অল্প সময়ই হোক, যত কম রাকাতই হোক। ওযু করতে যেতে যেতে দুআটা পড়ে ফেললাম। ওযু করে এসে দুই রাকাত পড়ে ফেললাম। এরপর আযান হয়ে গেছে। এতেও শেষরাতের যে বরকত ইনশাআল্লাহ সেটা পাওয়া যাবে।

যার শেষরাতে ওঠার মজবুত অভ্যাস আছে সে বিতির শেষরাতে পড়বে। অন্যথায় শুরু রাতেই পড়বে। এশার সুন্নত পড়ার পর আরও দু-চার রাকাত নফল পড়ে বিতির পড়বে। বিতিরের নামাযের নিয়ম হলো, বিতিরের আগে কিছু নফল পড়া। আমরা যে এশার দুই রাকাত সুন্নতের পরে বিতির পড়ে ফেলি এটা মুস্তাহাব পরিপন্থি। বিতিরের মুস্তাহাব তরিকা হলো, বিতিরের আগে কমপক্ষে দুই রাকাত নফল পড়া। তারপর বিতির পড়া। শোয়ার আগে দুই রাকাত নফল পড়ে বিতির পড়লে এটাও কিয়ামুল লাইলের হালকা সাদৃশ্য হয়।

চতুর্থ কথা হলো, রমযানের প্রভাব ধরে রাখার জন্য সহজ বিষয় হলো, প্রত্যেকে নিজের কাছে নোটবুক রাখা। কেউ সুন্দর করে নিজের দেমাগে সাজিয়ে রাখতে পারলে ভালো। আমরা দুই ধরনের জিনিস নোট করতে পারি :

এক হলো, রমযানে কিছু দৃঢ় প্রতিজ্ঞা আল্লাহর সঙ্গে করা। এ রমযানের পর থেকে ওই আমলটা ভালোভাবে করব ইনশাআল্লাহ। শাওয়াল থেকে এ আমলটা করব। অমুক বদঅভ্যাসটা ছাড়া দরকার। ছাড়া হয় না। এবার ইনশাআল্লাহ ছেড়ে দেব। বেশি লম্বা তালিকা করার দরকার নেই। করণীয়র মধ্যে দু-তিনটা। বর্জনীয়র মধ্যে দু-তিনটা। এমন একটা ওয়াদা আল্লাহর সঙ্গে করা। এবং আল্লাহকে বলা, হে আল্লাহ, ওয়াদা আমি করেছি কিন্তু আমার তো শক্তি নেই। আপনি তাওফীক না দিলে আমি ওয়াদা ঠিক রাখতে পারব না। আমি শুধু আপনার রহমতের ওপর ভরসা করে ওয়াদা করছি। রমযানের বরকতে এ ওয়াদা পূরণের তাওফীক দান করুন। এভাবে অল্প কয়েকটি জিনিস লিখে রাখি। রমযানের পরেও মাঝে মাঝে দেখতে থাকি। ওয়াদা রক্ষা করছি তো। চলছে তো আল্লাহর রহমতে। করণীয়টা করছি তো। বর্জনীয়টা ছাড়ছি তো।

এটা একটা নোট করার বিষয়। এরকম দু-চারটা জিনিস নোট করে রেখে অনুশীলন করতে থাকা। ওটার বরকতে দেখা যাবে, সারা বছর আরও কিছু যুক্ত হবে। আচ্ছা এ কয়টা তো আল্লাহর রহমতে অভ্যাস হয়ে গেছে। এবার আরও দুয়েকটা চেষ্টা করি। এ মুজাহাদার বরকতে আল্লাহ তাআলা আরও আসান করে দেবেন। প্রত্যেক মুজাহাদাই কিন্তু আমার পথচলাকে আসান করে দেয়। একেবারে খণ্ডিত মুজাহাদা হলেও আল্লাহ তাআলা এটারও ফায়েদা দান করেন।

আরেকটা নোট করার বিষয় হলো, এখনকার ভালো স্মৃতিগুলো নোট করা। তিলাওয়াতে মন লেগেছিল, দুআতে মন লেগেছিল, অমুক কথা, অমুক ভালো চিন্তা মনে এসেছিল, অমুক বদঅভ্যাস, অমুক গুনাহের ব্যাপারে মনে ঘৃণা সৃষ্টি হয়েছিল—এমন স্মৃতি নোট করে রাখা। এই নোট পড়তে থাকলে এখনকার হালাতটা একটু তাজা থাকবে। এই পরিবেশের দৃশ্যটা ফুটে উঠবে চোখের সামনে। এর দ্বারা হিম্মত বাড়বে ইনশাআল্লাহ।

ওইদিন আমরা যে মুহাসাবার কথা বলেছি সেটা তো সব সময়ের বিষয়। সেটাও যদি নোট রাখেন ভালো। বলেছিলাম, হুক‚কুল ইসলাম, শুআবুল ঈমান আর কবিরা গুনাহের তালিকা রাখি। কবিরা গুনাহের একটা তালিকা আলকাউসারে (সফর ১৪৪২/অক্টোবর ২০২০ সংখ্যায়) ছেপেছে।  নিজের আমল-আখলাকের মুহাসাবার জন্য হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ তাকী উসমানী দামাত বারাকাতুহুম-এর দুটি কিতাব পড়তে থাকলে বেশ উপকারী হবে ইনশাআল্লাহ।

এক. যিকর ও ফিকর। দুই. ইসলাহী মাজালিস।

সারকথা হলো, রমযানের মাগফেরাত রহমত আল্লাহ যেটা দান করেছেন সেটা ধরে রাখার চেষ্টা করা। তাকওয়ার মধ্যে আল্লাহ যে মজবুতি ও শক্তি দান করেছেন সেটাকে ধরে রাখা। কিছু নতুন আযম-প্রতিজ্ঞা ও নিয়ত আল্লাহর ওপর ভরসা করে করা। সেগুলো নোট করে নেওয়া এবং সেগুলো দেখতে থাকা। সে আযম ও নিয়ত বাস্তবায়ন করার প্রতি যত্নবান থাকা। আরেকটা হলো, এখানকার ভালো স্মৃতিগুলো লিখে রাখা। পরে এগুলো দেখলে যেন এই ইতিকাফের নূরানী পরিবেশ আমাদের চোখের সামনে ফুটে ওঠে এবং এর প্রভাব আমরা পেতে থাকি। সপ্তাহ-দশ দিনে যেন একবার দেখি। তাহলে অবশ্যই এর ফায়েদা হবে ইনশাআল্লাহ। আরেকটা হলো, মুহাসাবা।

ইতিকাফের প্রথম দিন আমরা আলোচনা করেছি, (ইতিকাফের তাৎপর্য ধরে রাখার দিক থেকে) আমাদের সালাফের ইতিকাফ ছিল সারা জিন্দেগীর ইতিকাফ। আমাদের তো ওটা হবে না। তবে ইতিকাফের একটা স্বাদ, একটা আভাস ধরে রাখার চেষ্টা করা। ওটার সুন্দর উপায় হলো, আমরা যে মসজিদে পাঁচ বার আসি। ঠিক একামতের সময় বা একটু পরে আসার যে প্রবণতা সেটা পরিহার করি। মসজিদে আসার সময়টাকে একটু বাড়িয়ে দিই। যে নামাযের আগে সুন্নত আছে, সুন্নতের জন্যই আমাকে পাঁচ/দশ মিনিট আগে আসতে হবে। আমি চেষ্টা করি, আরেকটু আগে আসার। যে নামাযের আগে সুন্নতে মুয়াক্কাদা নেই বা সুন্নতই নেই, সে নামাযেও কিছু আগে আসার চেষ্টা করি। সালাম ফিরিয়েই তাসবীহে ফাতেমী পড়ে বের হয়ে যাচ্ছি। এভাবে বের না হয়ে আরেকটু বসে থাকি। বসে থাকলে ইতিকাফও হবে, ফেরেশতাদের দুআও পাওয়া যাবে। যে ব্যক্তি নামাযের পর মসজিদে বসে থাকে ফেরেশতারা তার জন্য দুআ করতে থাকে :

اللَّهُمَّ اغْفِرْلَهُ، اللَّهُمَّ اغْفِرْلَهُ.

আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দাও, আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দাও।

ফেরেশতাদের দুআ তো আল্লাহ কবুল করবেনই। এ হলো ইতিকাফ ধরে রাখার সহজ উপায়। এক হলো, ইতিকাফের বাস্তব রূপ ধরে রাখা। আরেক হলো, ইতিকাফের বরকত ধরে রাখা। বাস্তব রূপ যদি কিছুটা ধরে রাখি, বরকত তো আল্লাহ দেবেনই ইনশাআল্লাহ। ফরয নামায পড়ার জন্য মসজিদে তো যেতেই হবে। ফরয নামায জামাতে পড়া সুন্নাতে মুয়াক্কাদা। এটা ওয়াজিবের পর্যায়ে সুন্নতে মুয়াক্কাদা। বিশেষ জরুরত না থাকলে এই ফযীলত থেকে মাহরূম হওয়া খুবই দুঃখজনক বিষয়। এ জমানায় কমযোরী বেড়ে গেছে, ওযর বেড়ে গেছে, আবার ঈমানের দুর্বলতাও বেড়ে গেছে। সব মিলিয়ে মসজিদে আসার বিষয়টা হালকা মনে করা হয়। সাহাবায়ে কেরামের জমানায় বিষয়টা এমন ছিল না। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, আল্লাহ তাআলা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মাধ্যমে সুনানুল হুদা—হেদায়াতের সুন্নত চালু করেছেন।

হেদায়াতের সুন্নত নাম দেওয়ার কারণ কী? এ সুন্নত যে ছেড়ে দেবে সে গোমরাহ হয়ে যাবে। ওই হেদায়াতের সুন্নতের মধ্যে একটি হলো, পাঁচ ওয়াক্ত ফরয নামায মসজিদে জামাতের সাথে আদায় করা। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেছেন, ‘এ নামাযগুলো মসজিদে গিয়ে জামাতে আদায় করা সুনানুল হুদা। তোমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নত ছেড়ে দিলে গোমরাহ হয়ে যাবে।’ আমরা তো মনে করি, মানুষ শুধু আকীদার কারণে গোমরাহ হয়। আমলের কারণে গোমরাহ হওয়ার বিষয়টি এখানে এসেছে। বিভিন্ন আমলের ক্ষেত্রেও এটা আছে। কিছু আমল আছে এমন দামি ও গুরুত্বপূর্ণ যে, আমলের শিথিলতাকেও গোমরাহী বলা হয়েছে। এ বিষয় আমরা খেয়াল করি না।

অলসতার কারণে মসজিদে আসবে না—এটা হওয়া উচিত নয়। সাহাবায়ে কেরামের যুগে দুজনের ওপর ভর দিয়ে জামাতে আসার কথাও আছে। আমি বলছি, আমরা পাঁচ ওয়াক্ত নামাযের জন্য মসজিদে আসব ইনশাআল্লাহ। কোনো ওযর না থাকলে আসাটা যদি একটু আগে হয়, বের হওয়াটা যদি একটু পরে হয় তাহলে নফল ইতিকাফটা দীর্ঘ হয়। নফল ইতিকাফটা দীর্ঘ করে দিলে ফেরেশতার দুআও পাব, আমাদের সুন্নত ইতিকাফের স্মৃতিটাও তাজা থাকবে ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে আমল করার তাওফীক দান করুন।

Avatar

zobayer

একটি কমেন্ট করুন