প্রতিষ্ঠাতা: মুজাহিদে আযম হযরত মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.

জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ, ঢাকা-এর মুখপত্র

প্রতিষ্ঠাকালঃ ১৯৩৭ ঈসায়ী

শিক্ষা—ব্যবস্থা বদলে দিলে চিন্তা—চেতনা ও মন—মানসিকতাই বদলে যাবে

শিক্ষা—ব্যবস্থা বদলে দিলে চিন্তা—চেতনা ও মন—মানসিকতাই বদলে যাবে

সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ.

অনুবাদ : মাওলানা হেদায়াতুল হক


[৩০ অক্টোবর ১৯৮৩ ঈসায়ী সালে গোরখপুর জেলার আঞ্জুমানে তা’লীমাতে দীন—এর অধীনে ইসলামিয়া কলেজ গোরখপুরে এক বিরাট মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। আল্লামা সায়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী রহ. উক্ত মাহফিলে এই বক্তব্য পেশ করেন। মাহফিলে দীনি তা’লীমি কাউন্সিলের সেক্রেটারী জনাব ড. ইশতিয়াক হুসাইন কোরাইশী ও পরিচালক মাওলানা মাহমুদুল হাসান সাহেবসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন। হযরত নদভী রহ. কোরআনের উদ্ধৃতি দিয়ে মুসলিম জাতিকে বলেছেন, ঈমানের দাবী হলো, নিজের সন্তানের দেহের চেয়ে ঈমানের প্রতি অধিক গুরুত্ব দিতে হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পর্যন্ত ইসলাম পৌঁছে দিতে, দীনের পরম্পরা বজায় রাখতে যুগে যুগে মুসলিম জাতি অসামান্য ত্যাগ ও বিসর্জন দিয়েছে।]

হামদ ও সালাতের পর।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

یٰۤاَیُّهَا  الَّذِیْنَ  اٰمَنُوْا قُوْۤا  اَنْفُسَكُمْ وَ اَهْلِیْكُمْ  نَارًا وَّ قُوْدُهَا  النَّاسُ وَ الْحِجَارَۃُ  عَلَیْهَا مَلٰٓئِکَۃٌ  غِلَاظٌ شِدَادٌ لَّا یَعْصُوْنَ اللهَ مَاۤ  اَمَرَهُمْ وَ یَفْعَلُوْنَ مَا یُؤْمَرُوْنَ.

হে ঈমানদারগণ, তোমরা নিজেকে, নিজের পরিবারকে ওই আগুন থেকে রক্ষা করো, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর। যাতে নিয়োজিত আছে পাষাণহৃদয়, কঠোরস্বভাব ফেরেশতাগণ। আল্লাহ যা আদেশ করেন, তারা তার বিপরীত করেন না। তাদেরকে যা আদেশ করা হয়, তারা তা—ই করেন।—সুরা তাহরীম (৬৬) : ৬

প্রিয় উপস্থিতি, আমি আপনাদের সামনে কোরআনে কারীমের একটি আয়াত তেলাওয়াত করেছি। আয়াতটি পূর্বে হয়তো অনেকবার আপনাদের সামনে পড়া হয়েছে। কোরআন তেলাওয়াত করার সময়ও হয়তো আয়াতটি আপনাদের চোখে পড়েছে। তবে কোনো কিছু বারবার চোখে পড়লেই তা নিয়ে চিন্তা করা আবশ্যক নয়। আপনারা রাস্তা অতিক্রম করেন। সেখানে অনেক বছর ধরে সাইনবোর্ড ঝুলানো আছে। প্রতিদিন সাইনবোর্ডের ওপর আপনার দৃষ্টি পড়ে। আপনি চিন্তা করে দেখুন, কতবার আপনি ওই সাইনবোর্ড মনোযোগ দিয়ে পড়েছেন? সাইনবোর্ডের বিষয়টি আপনার কতটুকু স্মরণ আছে? যদি আপনাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, আপনি যে সড়ক অতিক্রম করে আসেন, তাতে কী কী বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সাইনবোর্ড ঝুলানো আছে? খুব কম লোকই তা বলতে পারবে।

এটি খুবই বিচলিত করে দেওয়ার মতো একটি আয়াত। বারবার কোনো বস্তু দেখলে তার গুরুত্ব কমে যায়, তাকে স্বাভাবিক মনে করা হয়, এই আশঙ্কাটি না থাকলে আমি জোর দিয়ে বলতাম, বড় অক্ষরে এই আয়াতটি লিখে দেয়ালে ও মসজিদে ঝুলিয়ে দেওয়া হোক।

আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

یٰۤاَیُّهَا  الَّذِیْنَ  اٰمَنُوْا

হে ওই সকল লোকেরা, যারা ঈমান এনেছো।

এই আয়াতে اٰمَنُوْا শব্দটি অতীতকালসূচক একটি ক্রিয়া। প্রতিটি শব্দে চিন্তা করুন। কোরআনের কোনো শব্দ ঘটনাচক্রে ব্যবহৃত বা অতিরিক্ত (ছন্দ মিলের জন্য বর্ধিত) নয়। কারণ কোরআন মাজীদে কোনো কাব্যচর্চা করা হয়নি।

সম্বোধনের এই মর্মটি আদায়ের জন্য বলা যেত, أيها المؤمنون হে মুমিনগণ, أيها المسلمون হে মুসলমানগণ। কিন্তু আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

یٰۤاَیُّهَا  الَّذِیْنَ  اٰمَنُوْا

হে ঐ সকল লোকেরা, যারা নিজেরা ঈমান এনেছো।

قُوْۤا  اَنْفُسَكُمْ وَ اَهْلِیْكُمْ  نَارًا وَّ قُوْدُهَا  النَّاسُ وَ الْحِجَارَۃُ

তোমরা নিজের জান, নিজের পরিবার, নিজের বন্ধু—বান্ধব, আত্মীয়—স্বজন, নিজের অধীনদেরকে ওই আগুন থেকে বাঁচাও, যার ইন্ধন হবে মানুষ ও পাথর।

আয়াতে মুসলমানদেরকে সম্বোধন করা হয়েছে। ওই সাহাবায়ে কেরামকে সম্বোধন করা হয়েছে, যারা কোরআন নাযিল হওয়ার সময় ছিলেন। তাঁরাই প্রথম সম্বোধিত ব্যক্তি। অন্যথায় কিয়ামত পর্যন্ত যত মুসলমান আসবে, নিজেকে মুসলিম দাবী করবে, তারা সবাই আয়াতের উদ্দিষ্ট। তবে প্রথম সম্বোধন ছিল তাঁদের উদ্দেশে, যারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতে হাত রেখে ঈমান এনেছেন। তাঁর হাতের স্পর্শ লাভে ধন্য হয়েছেন। যারা সাহাবী হওয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। অবশ্যই ওই সকল লোকেরাও তার অন্তভুর্ক্ত, যারা বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশ গ্রহণ করেছেন। হুদাইবিয়ার গাছ তলায় যারা নিজের জীবন বিলানোর জন্য বাইয়াত গ্রহণ করেছিলেন। যাদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

لَقَدْ رَضِیَ اللهُ  عَنِ الْمُؤْمِنِیْنَ  اِذْ یُبَایِعُوْنَکَ تَحْتَ الشَّجَرَۃِ  فَعَلِمَ مَا فِیْ قُلُوْبِهِمْ  فَاَنْزَلَ السَّکِیْنَۃَ  عَلَیْهِمْ وَ اَثَابَهُمْ  فَتْحًا قَرِیْبًا.

(হে নবী) মুমিনগণ যখন গাছের নিচে আপনার কাছে বাইয়াত গ্রহণ করছিল, আল্লাহ তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট ছিলেন। আর যা (সত্যতা ও ইখলাস) তাঁদের অন্তরে ছিল তা আল্লাহ জেনে নিয়েছেন। তখন তিনি তাঁদের প্রতি সান্ত্বনা অবতীর্ণ করলেন এবং তাঁদেরকে দ্রুত বিজয় দান করলেন।—সুরা ফাতহ (৪৮) : ১৮

যারা এমন মহা নেয়ামতের অধিকারী হয়েছেন, কিয়ামত পর্যন্ত যারা এই সনদপ্রাপ্ত যে, আল্লাহ তাআলা তাঁদের প্রতি সন্তুষ্ট, এমন উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন লোকও আলোচ্য আয়াতের অন্তভুর্ক্ত। বাইয়াতে রিদওয়ানে অংশগ্রহণকারী, আশারায়ে মুবাশশারাও তাঁদের মধ্যে ছিলেন। বড় বড় সাহাবায়ে কেরাম, ওহুদ—বদরের শহীদ—গাজীগণও তার অন্তভুর্ক্ত।

এবার আপনাদের কাছে আমার প্রশ্ন হলো, কেউ কি তার সন্তানকে, নিজের পরিবারকে আগুনে প্রবেশ করতে দেবে? কেউ কি তাদেরকে ইচ্ছাকৃত আগুনে ঝাঁপ দিতে দেবে? তাহলে আয়াতের উদ্দেশ্য কী? আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলছেন, ‘হে ওই সকল লোক, যারা নিজে ঈমান এনেছো, এখন তোমাদের কাজ হলো, নিজেকে এবং পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করা।’

কোনো সীরাতগ্রন্থে কি আপনারা পড়েছেন, (নাউযুবিল্লাহ) কোনো সাহাবী নিজের সন্তানকে আগুনে ফেলার ইচ্ছা করেছেন? অথবা কোনো বাচ্চা আগুনে ঝাঁপ দিতে চেয়েছে আর সাহাবায়ে কেরাম রাযি. বা ওই সময়ের মুসলমান চুপ করে বসে তামাশা দেখেছেন? তাঁরা তাতে সন্তুষ্ট ছিলেন? এমন কোনো ঘটনা কি আপনাদের চোখে পড়েছে? তবে কি বিনা প্রয়োজনে এই কথাটি বলা হয়েছে, ‘হে ওই সকল লোক, যারা নিজে ঈমান এনেছো, এখন তোমাদের কাজ হলো, জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে রক্ষা করা?’ তা না হলে কোন আগুনের কথা বলা হচ্ছে? এই ঘটনা কখন ঘটেছে? নাকি ঘটনা ঘটছিল, মুসলমানের সন্তানগণ আগুনে ঝাঁপ দিতে চাচ্ছিল, আর মা—বাবা বেখবর শুয়ে ছিল? তাদের কোনো চিন্তা ছিল না, তখন আল্লাহ তাআলা ওহী নাযিল করেছেন। তারপর সবাই সতর্ক হয়েছে এবং নিজের সন্তানকে আগুনে ঝাঁপ দেওয়া থেকে রক্ষার চিন্তা করেছে? অন্যথায় এই আয়াতের উদ্দেশ্য কী?

এই আয়াতের উদ্দেশ্য কি এ ছাড়া আর কিছু হতে পারে—নিজের সন্তান ও পরিবারকে এমন কাজ থেকে রক্ষা কর, যা তাদেরকে আগুনে নিক্ষিপ্ত করবে? যে কর্মের ফলে তারা জাহান্নামে যাবে। অন্যথায় এমন কোনো মানুষ আছে, যে নিজের সন্তানকে বাহ্যিক আগুনে ঝাঁপ দিতে দেখেও তাকে বাধা দেবে না? ব্যবধান কেবল এটুকু যে, মানুষ এটা জানে না যে, এই কাজের ফলে আগুনে জ্বলতে হবে।

তাহলে আয়াতের মর্ম হলো, এমন কাজ—কর্ম থেকে রক্ষা করো, যা তাদেরকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করবে। ফিকহের পরিভাষায় এগুলোকে أسباب مؤدية (আসবাবে মুআদ্দিয়াহ) বলা হয়। অর্থাৎ এমন কারণ ও অনুঘটক যা কোনো ঘটনা পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। ফুকাহায়ে কেরামের দৃষ্টিতে এগুলোও ফলাফলের অন্তভুর্ক্ত। যেমন কোনো ডাক্তার রোগীকে এমন ওষুধ দিয়েছে, যা সেবন করলে সে মৃত্যু বরণ করবে। মৃত্যু যদিও ধীরে ধীরে আসে, তবুও এই কাজটি হত্যার বরাবর। কেননা সে এমন উপকরণ বা মাধ্যম ব্যবহার করেছে, যার ফলে মৃত্যু আসা নিশ্চিত। আইনের দৃষ্টিতে সে হত্যাকারী বলে গণ্য হবে। এই কথাটি তো সহজে বুঝে আসে যে, এহেন বস্তু থেকে রক্ষা করো, যা তাকে আগুনে ফেলবে।

আমি বলব, বর্তমানে আমাদের অবস্থা এমনই। বাচ্চাদের দীনি শিক্ষার ব্যবস্থা না করা, বাচ্চাদেরকে সেই পরিবেশে ছেড়ে দেওয়া, অন্যের দয়া ও করুণার উপর ছেড়ে দেওয়া কি তাদেরকে আগুনে নিক্ষেপ করা নয়? কোমলমতি শিশুদেরকে আমরা তাদের হাতে ছেড়ে দিচ্ছি, যারা দীন শিক্ষা দিতে বাধ্য নয়, এই শিক্ষা দেওয়ার দাবীদারও নয়। বাচ্চাদেরকে ওই শিক্ষা দেওয়ার যোগ্যও তারা নয়, যে শিক্ষা ব্যতীত পরকালে মুক্তি পাওয়া অসম্ভব। আর নবীগণের আনীত শিক্ষা থেকে অজ্ঞতার ফল হলো ঈমান বরবাদের আশঙ্কা। এই শিক্ষা থেকে অজ্ঞতার ফল হলো পরকালের ধ্বংস। দেখার বিষয় হলো, এই বিষয়টি এখন কীভাবে মেনে নেওয়া হচ্ছে? বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা শুধু একটি ধর্মহীন (secular) শিক্ষাব্যবস্থাই নয়, বরং এটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পরিচালিত একটি হিন্দু আদর্শিক শিক্ষা কারিকুলাম (mythopositivelogy system fo education hindy)। হিন্দু দেবমালা তার পাঠ্যসূচীর অন্তভুর্ক্ত। ইংরেজদের যুগে সেক্যুলার শিক্ষাব্যবস্থা ছিল। তখন কুকুর বিড়ালের গল্প পড়ানো হতো। আমাদের অনেকেই ইংরেজ শাসনকালে ইংরেজি পড়েছি। তখন ভাষা শিক্ষার প্রাথমিক বইগুলো দ্বারা আকীদা বিশ্বাস প্রভাবিত হতো না। অন্তরে কোনো মাখলুকের প্রতি তাকাদ্দুস বা বিশেষ ভক্তি সৃষ্টি হতো না। এমন শিক্ষাও দেওয়া হতো না যে, এই বিশ্বজগতে কোনো মাখলুক বা সৃষ্টির কোনো হস্তক্ষেপ বা অধিকার আছে। তখন বাচ্চারা বাঘ, চিতা, বানর, শিয়াল, বিড়াল, কুকুরের গল্প পড়ত। ঘর থেকে তারা যেমন যেত, তেমনি ফিরে আসত। কিন্তু এখন অবস্থা পুরো বদলে গেছে। সরকারী সিলেবাসে আকীদার মধ্যে প্রভাবসৃষ্টিকারী বিষয়, গল্প—কাহিনী, প্রবন্ধ আছে। বইয়ে কোনো অপূর্ণতা থাকলে, মাস্টার সাহেবরা তা পূর্ণ করে দেন। ইসলামী একত্ববাদের আকীদা পরিপন্থী কিছু সম্মিলিত কাজ আছে, যা বাচ্চাদেরকে দিয়ে করানো হয়।

আমি আপনাদেরকে জিজ্ঞাসা করি, মনে করুন, একটি পিচ্ছিল রাস্তা। এই রাস্তায় পা স্থির থাকে না। কোনো বাচ্চা এই রাস্তায় সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে। সামনে রাস্তায় গভীর গর্ত আছে। আবার সাইকেলের ব্রেকও কাজ করে না। বাবা দেখছে, তার সন্তান এই পথে সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে। সাইকেলের ব্রেক কাজ করে না, এ কথাটিও তার জানা আছে। সামনের গর্ত থেকে বাঁচার আর কোনো পথ নেই, এ কথাও তার জানা আছে। তাহলে এই পিতার ব্যাপারে কি বলা হবে না যে, জেনে বুঝে নিজের সন্তানকে তিনি গর্তে পড়তে দিচ্ছেন? কেউ কি এ কথা অস্বীকার করবে?

এ কথা কেউ অস্বীকার না করলে আমি আপনাদেরকে বলব, যদি স্বতন্ত্র দীনি শিক্ষার (যাকে সাইকেলের ব্রেকতুল্য বলা যায়) ব্যবস্থা না থাকে তাহলে বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থায় বাচ্চাদের ঈমান কীভাবে নিরাপদ থাকবে? দীনি শিক্ষার মধ্যেই কেবল তাদের ঈমানের নিরাপত্তা রয়েছে। স্কুলে বাচ্চারা যা—ই পড়–ক, তা সংশোধন করে যেতে হবে। বাচ্চাকে ঈমানী ও তাওহীদি ডোজ দিয়ে যেতে হবে। প্রাতঃকালীন বা সান্ধ্যকালীন মকতবে, তা’লীমের হালকায় দীনি বই—পুস্তক পড়ে শোনাতে হবে। মা—বাবা তাদেরকে প্রতিনিয়ত দীনের তালকীন করে যেতে হবে। ভালো ভালো উদ্দীপনামূলক ও শিক্ষামূলক ঘটনা শোনাতে হবে। ঘরে দীনি পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। তাহলে এটি কোনোরকম ব্রেকের স্থলাভিষিক্ত হতে পারে। যদি এমন না হয়, তাহলে আপনি যেন তার কানে বলে দিলেন, ‘স্কুলের শেখানো সব কথা মেনে নাও।’ ‘যেন’ নয়, এটিই বাস্তব। কেননা আপনি নিজে সন্তানকে স্কুলে ভর্তি করে দিলেন, অথচ তার দীনি শিক্ষার আলাদা কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করলেন না, এটা যেন আপনি তাকে উৎসাহিত করলেন, অনৈসলামিক সব কথা মানতে থাকো। এখন যদি সে তা মানতে থাকে, তার দীন শেখার ভিন্ন কোনো ব্যবস্থাও না থাকে, সে উর্দুও জানে না যে, দীনি বই—পুস্তক পড়বে, মহল্লায় কোনো মকতবও নেই, তাহলে আপনি—ই বলুন, আপনি قُوْۤا  اَنْفُسَكُمْ وَ اَهْلِیْكُمْ  نَارًا  এই আয়াতের সম্বোধিত কি না?

লখনৌর এক নারী—সমাবেশে অনেক নারী একত্রিত হয়েছিল। আমি সেখানে বলেছিলাম, আমি আপনাদেরকে এক মায়ের ঘটনা শোনাব। একজন শিক্ষিত নারী একটি দাওয়াতে গিয়েছে। অন্য নারীরা দেখল, সে খুব অস্থির, চিন্তিত। গল্পে তার মন নেই। তার প্রিয় বান্ধবীরা সবাই বসে খোশগল্পে মত্ত। অনেকদিন পর সবাই একত্রিত হয়েছে। কিন্তু মনে হচ্ছে, এই নারীর হৃদয়—মন অন্য কোথাও পড়ে আছে। তুমি কি অসুস্থ? ভেতরে ভেতরে তোমার কোনো কষ্ট হচ্ছে? অনেকে অনেকভাবে জিজ্ঞাসা করল।

অবশেষে সে বলল, তেমন কিছু না, তবে আমি ঘরে দিয়াশলাই লুকিয়ে রাখতে ভুলে গেছি। আমার বাচ্চা ঘরে আছে। আমার বারবার চিন্তা হচ্ছে, সে তেল বের করে বারুদের সঙ্গে ঘষে নিজের কাপড়ে আগুন জ্বালিয়ে দেয় কি না?

নারীরা বলল, আল্লাহ রক্ষা করুন, তার বয়স কত?

সে জবাব দিল, দুই বছর।

একটু চিন্তা করুন, এমন বাচ্চা দিয়াশলাই বক্স খুলতে পারে কি না? খুলতে পারলেও খুলবে কি না? খুললে বারুদের দিকে ঘষা দেবে না উল্টা দিকে? এই সবকিছু সত্ত্বেও মায়ের এত চিন্তা। কবি ঠিকই বলেছেন,

عشق است وہزار بدگمانی

ইশক হাজারো দুশ্চিন্তা সৃষ্টি করে।

সে তো মা। আল্লাহ তাআলা মায়ের মধ্যে সন্তানের মমতা ঢেলে দিয়েছেন। তাই এমন অযৌক্তিক বিষয়, কালেভদ্রে দুই একটি ঘটনা হয়তো ঘটে, সেগুলোও তার সামনে ছবির মতো ভেসে উঠছে। সে দেখতে পাচ্ছে, বাচ্চা খেলতে খেলতে সেখানে চলে যাচ্ছে। দিয়াশলাই বক্স হাতে নিচ্ছে। তারপর সে তা খুলছে। বড় ভাই—বোনকে হয়তো কখনো দিয়াশলাই জ্বালাতে দেখেছে। সেও তাদের মতো করে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। এভাবে হয়তো তার কাপড়ে আগুন লেগে গেছে। কিন্তু ঘরে গিয়ে দেখল, এমন কিছুই হয়নি। অথচ এত দূরের সম্ভাবনার কারণে এই নারীকে এমন অস্থির দেখাচ্ছিল যেন সে গরম পাথরে দাঁড়ানো বা কাঁটার ওপর বসা।

দীন বিরোধী পরিবেশে দীন ও ঈমান থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কাগুলো কি জীবন নাশের আশঙ্কার চেয়ে জোরালো নয়? যে আশঙ্কা এই মায়ের মনে সৃষ্টি হয়েছিল তার চেয়েও মারাত্মক নয়? আমাদের সন্তানরা অনেকে স্কুলে পড়ছে। আপনি একদিনও তাকে বলেননি, তাওহীদ কী? নিজ এলাকায় আপনি কোনো দীনি মকতবের ব্যবস্থাও করেননি, যেখানে দীন শিখে বাচ্চা স্কুলে যাবে। তাহলে হয়তো মকতবের শিক্ষার ওসিলায় নিজের ঈমান বাঁচাতে সক্ষম হবে। ঘরেও সেই পরিবেশ নেই, মহল্লায়ও তার কোনো ব্যবস্থা নেই। এলাকায় এমন জঘন্য পরিবেশ। আর স্কুলের কথা আমি কী বলব? আমি তো আরবী মাদরাসার লোক। সেখানের অবস্থা হলো, এখন নতুন যে বাচ্চারা স্কুল থেকে আসছে, তারা দীনের মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে একেবারে অজ্ঞ। আমরা বাল্যকালে কখনো চিন্তাও করিনি যে কোনো মুসলমান বাচ্চা এই বিষয়গুলো জানবে না।

বলুন, এই পরিস্থিতির ফল কী হবে? প্রজন্মের পর প্রজন্ম দীনের ব্যাপারে একেবারে অজ্ঞ হয়ে যাবে। তারা উর্দু পড়তে জানবে না। আজ এই অবস্থা চলছে। একটি ঐতিহাসিক মেডিকেল কলেজের এক ছাত্রকে দিয়ে একটি প্রবন্ধ বা চিঠি লেখানোর প্রয়োজন ছিল। চিন্তা করলাম, তিনি তো ডাক্তারী (ইউনানী) বই—পুস্তক পড়েন, যেগুলো সাধারণত আরবী ফারসীতে লেখা হয়েছে। বেশির চেয়ে বেশি উদুর্তে লেখা হবে। তাকে বললাম, আপনি লিখুন। তিনি লিখছিলেন। মানুষ মনে করছে, তিনি লিখে ফেলেছেন। হাতে নিয়ে দেখা গেল, তা হিন্দিতে লেখা। জিজ্ঞাসা করা হলো, আপনি ইউনানী তিব্ব পড়েন অথচ উর্দু লিখতে পারেন না?

তিনি বললেন, আমাদেরকে তো এভাবেই পড়ানো হয়েছে।

সুতরাং এমন একটি প্রজন্ম তৈরি হওয়ার শুধু আশঙ্কাই নয়, বাস্তবে তৈরি হয়ে গিয়েছে। দীনের মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে তারা অজ্ঞ। মৌলিক আকীদা সম্পর্কে অজ্ঞ। আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে আমাদের মনে যে বিশ্বাস বদ্ধমূল আছে, সে সম্পর্কে তারা অজ্ঞ। এমন প্রজন্ম তৈরি হয়ে গিয়েছে। তারা এখন যৌবনে উপনীত হচ্ছে। এখন তার সূচনা নয়, যৌবন কাল আসছে।

চোখে দেখা দৃশ্য বলছি, এক জায়গায় সীরাত বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার কথা ছিল। সেটি ছিল ইসলামিয়া স্কুল, কলেজ ও ভার্সিটি। একজন মুসলিম যুবক ছাত্রকে সীরাতের উপর বক্তব্য দিতে বলা হলো। সে হিন্দিতে লিখে নিয়ে এসেছে। উদুর্তে তা পড়েছে। শব্দ ছিল উর্দু, অথচ হস্তাক্ষর হিন্দি।

যুগশ্রেষ্ঠ দার্শনিক ও ঐতিহাসিক (philosopher historaian) আরনল্ড টুয়েন বি (arnold toynbee) লিখেছেন, এখন আর কোনো গ্রন্থালয়ে আগুন লাগানোর প্রয়োজন নেই। হস্তাক্ষর (script) পাল্টে দেওয়াই যথেষ্ট। তাতেই অতীতের সঙ্গে ওই জাতির সম্পর্ক একেবারে ছিন্ন হয়ে যাবে। জাতীয় সংস্কৃতি তার জন্য অনর্থক হয়ে যাবে। তারপর যেদিকে খুশি তাকে নিয়ে যেতে পারবে। কোনো জাতিকে তাদের অতীতের সঙ্গে, ধর্মের সঙ্গে, সংস্কৃতির সঙ্গে, কালচারের সঙ্গে যুক্ত রাখে তাদের নিজস্ব হস্তাক্ষর। হস্তাক্ষর পাল্টে দিলে পুরা প্রজন্ম পাল্টে যাবে। এখন হিন্দুস্তানে এটাই হচ্ছে। তারা জানে, ধর্মীয় যুদ্ধে দেশ বদনাম হয়, ফায়েদা কিছুই হয় না। শিক্ষা—ব্যবস্থা পাল্টে দেওয়াই যথেষ্ট।

আজ থেকে ষাট বছর পূর্বে আকবর ইলাহাবাদী রহ. বলেছিলেন,

شیخ مرحوم کا قول اب مجھے یاد آتا ہے

دل بدل جائیں گے تعلیم بدل جانے سے

মরহুম শায়খের কথা এখন আমার মনে পড়ে, (তিনি বলেছিলেন) / মন—মানসিকতা বদলে যাবে শিক্ষা ও শিক্ষা—ব্যবস্থা বদলে দিলে।

একটি দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা। একটু দেরি হবে। তবে ত্রিশ—চল্লিশ বছরে এমন একটি প্রজন্ম তৈরি হয়ে যাবে, যাদের কাছে ঈমান—কুফুরের পার্থক্য, তাওহীদ—শিরকের পার্থক্য, আকীদা ও ধর্মের পার্থক্য সব অনর্থক হয়ে যাবে। তাদেরকে দীন থেকে দূরে সরাতে আর কিছুই করতে হবে না।

বাচ্চার ক্যারিয়ার নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় মুসলিম বাবা মা তার মাতৃভাষা উর্দু লেখায় না। তার দীনি শিক্ষার ব্যবস্থা করে না। ঈমানদার হয়ে এটি কীভাবে সম্ভব? মুসলমানের পরিচয় হলো, কোনোভাবে যদি সে জানতে পারে, তার সন্তানের কপালে ইসলাম নেই বা আল্লাহ না করুন সে মুসলমান থাকবে না, তাহলে সে আল্লাহ তাআলার কাছে দুআ করবে, হে আল্লাহ আপনি তাকে কল্যাণ ও নিরাপত্তার সঙ্গে উঠিয়ে নিন।

হযরত খানসা রাযি. এক মহিলা সাহাবী ছিলেন। তৎকালীন বড় একজন নারী কবি ছিলেন। খুব দরদী হৃদয়ের অধিকারী ছিলেন। তাঁর জীবদ্দশায় দুই ভাই মৃত্যু বরণ করেছে। সারা জীবন তিনি এই দুই ভাইয়ের শোকগাঁথা গেয়ে গেছেন। বলা যায় যে, কোনো ভাষায় কোনো নারীর রচিত এত অধিক পরিমাণ শোকগাঁথা পাওয়া যাবে না, যে পরিমাণ তিনি তাঁর ভাইদের স্মরণে গেয়েছেন এবং স্মরণিকা হিসেবে রেখে গেছেন। তাঁর গোটা কাব্যগ্রন্থ শুধু ভাইদের শোকগাঁথায় পূর্ণ। এমন কোমল ও সংবেদনশীল হৃদয়ের অধিকারী এই মহীয়সী এক যুদ্ধের দিন তাঁর এক ছেলেকে ডেকে বললেন, ‘বেটা, যুদ্ধে যাও। আমি তোমাকে এই দিনের জন্যই লালন পালন করেছি। যাও, আল্লাহর পথে জীবন বিলিয়ে দাও।’ তারপর দ্বিতীয় সন্তানকে, তারপর তৃতীয় সন্তানকে ডেকে একই কথা বললেন। সব সন্তানের শাহাদাতের খবর পেয়ে তিনি বললেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার যিনি আমার সন্তানদের শাহাদাত লাভের মাধ্যমে আমাকে মর্যাদাবান করেছেন।’ এটাই হলো ঈমানের শান। দীনের জন্য সবকিছু বিসর্জন দেবে মুসলমান।

বর্তমানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই প্রজন্মকে কীভাবে বাঁচানো যায়? কীভাবে তাদেরকে মুসলমান রাখা যায়?  (সে বিষয়ে চিন্তা—ভাবনা করা) সরকারী শিক্ষাব্যবস্থা সংশোধনের চেষ্টার পাশাপাশি দীনি শিক্ষার জন্য স্বতন্ত্র কোনো ব্যবস্থা থাকা আবশ্যক। আজ এটুকু বলেই আমি আমার বক্তব্য শেষ করছি। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে আমল করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

وما علينا إلا البلاغ المبين.

Avatar

zobayer

একটি কমেন্ট করুন