প্রতিষ্ঠাতা: মুজাহিদে আযম হযরত মাওলানা শামছুল হক ফরিদপুরী রহ.

জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ, ঢাকা-এর মুখপত্র

প্রতিষ্ঠাকালঃ ১৯৩৭ ঈসায়ী

সুন্নাহর আলোকে শাবান মাসের আমল

সুন্নাহর আলোকে শাবান মাসের আমল

মাওলানা মুহাম্মদ মামুন

 

সময় আল্লাহ পাক রাব্বুল আলামীনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সৃষ্টি। রাত, দিন, মাস, বছর সবই আল্লাহ পাক সৃষ্টি করেছেন বান্দার কল্যাণের জন্যই। তাই ইসলামের দৃষ্টিতে কোনো সময়, দিন বা মাস অশুভ নয়। অশুভ ক্ষণ বা সময় বলতে ইসলামে কিছু নেই। আল্লাহর সৃষ্টি সব দিনই শুভ। তবে কিছু সময়কে আল্লাহ তাআলা বিশেষ বৈশিষ্ট্যে মহিমান্বিত করেছেন। যেমন : সপ্তাহের সাত দিনের মধ্যে শুক্রবারের বিশেষ ফযীলত ও মর্যাদা আছে। তেমনই বছরের বারো মাসের মধ্যে রমযান মাসের বিশেষ ফযীলত ও মর্যাদা আছে। এ ফযীলতপূর্ণ দিবস, রাত্রি ও মাস বান্দার জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে অনেক বড় নেয়ামত। এ সময়ে সামান্য সময় সুন্নত অনুযায়ী নেক আমল করে অসামান্য সওয়াব লাভ করা যায়। এমনইভাবে এ সময়গুলোতে গোনাহের ক্ষতি ও ভয়াবহতাও অধিক হয়। এ সময়গুলোকে কেন্দ্র করে সমাজে কিছু বড় ধরনের ভুল—ত্রুটি দেখা যায়, যা সংশোধন করে নেওয়া প্রয়োজন। যেমন :

এক. কেউ কেউ ফরয—ওয়াজিবের চেয়ে ওই সকল নফল আমলের প্রতি বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকে, যেগুলোর ফযীলত হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।

দুই. কেউ কেউ শুধু ওই সকল মাসনূন দুআই শেখে ও আমল করে যাতে বিশেষ ফযীলতের কথা হাদীসে এসেছে। আর যে সকল দুআ নবীজির আমল হিসাবে প্রমাণিত কিন্তু তাতে বিশেষ কোনো ফযীলত উল্লেখ নেই সেসব দুআর প্রতি গুরুত্ব দেয় না। বিষয়টি কাম্য নয়। মাসনূন সকল দুআর প্রতি গুরুত্বারোপ করা চাই।

তিন. কেউ কেউ ছোট ছোট নফল আমলগুলোকে অবহেলা করে ছেড়ে দেয়, অথচ এ আমলগুলো ফযীলতপূর্ণ মাসের ছেঁায়ায় অসামান্য প্রতিদান ও সওয়াববিশিষ্ট হয়ে গেছে। এভাবে তারা সওয়াবের অনেক বড় অর্জন থেকে বঞ্চিত হয়।

চার. কেউ কেউ অনির্ভরযোগ্য বই—পুস্তকের বর্ণনা অনুযায়ী আমল করে। বিজ্ঞ আলেমের কাছ থেকে যাচাই করার প্রয়োজন মনে করে না।

পাঁচ. কেউ কেউ করণীয় আমলগুলোর প্রতি গুরুত্ব দিয়ে থাকে ঠিকই, কিন্তু বর্জনীয় বিষয়গুলোর প্রতি যত্নবান হয় না। গোনাহ থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করে না। অথচ ফযীলতপূর্ণ যে—কোনো মাস ও দিনে গোনাহের ক্ষতি ও ভয়াবহতা অধিক।

ছয়. কেউ কেউ সহীহ বুখারী অথবা সহীহ মুসলিমে না থাকার অজুহাতে আমল করে না। অথচ এ দুই গ্রন্থে আমলযোগ্য সকল হাদীস লিপিবদ্ধ করা হয়নি।

সাত. কেউ কেউ অধিক সওয়াবের কথা শুনে বলে থাকে—‘এসব জাল। এত সামান্য আমলের এত বেশি সওয়াব হতে পারে না।’ অথচ পবিত্র কোরআন বা নির্ভরযোগ্য হাদীস দ্বারা কোনো সওয়াব প্রমাণিত হলে একে মনে—প্রাণে মেনে নেওয়া এবং উক্ত নেক আমলকে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে বড় নেয়ামত জ্ঞান করে মূল্যায়ন করাই একজন মুমিনের কর্তব্য।

যে—কোনো ফযীলতপূর্ণ মাস বা দিবসের সম্মান রক্ষা করা এবং সম্মান বিনষ্ট করা থেকে হেফাজত করার জন্য উল্লিখিত ভুল—ত্রুটিগুলো সংশোধন করা আবশ্যক।

ফযীলতপূর্ণ মাসসমূহের অন্যতম হচ্ছে শাবান মাস। ইসলামী ক্যালেন্ডার অনুযায়ী শাবান হচ্ছে অষ্টম মাস। যা রমযানুল মোবারক ও রজব মাসের মাঝে এসে থাকে। দ্বীনী বিবেচনায় এই মাসটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। শাবান মাস হলো রমযানের ভূমিকা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গুরুত্বের সঙ্গে এ মাসে আমল করতেন। এর মাধ্যমে মাসটির ফযীলত ও মর্যাদা প্রমাণিত হয়।

কোন দিবস বা মাস ফযীলতপূর্ণ তা জানা যাবে কোরআন—হাদীসের মাধ্যমে। কোরআনে কারীমে রমযানকে কোরআন নাযিলের মাস বলেছে। আর রজবকে আশহুরে হুরুম তথা সম্মানিত মাসের অন্তভুর্ক্ত করেছে। যার কারণে এ দুই মাসকে গুরুত্ব দেওয়া হতো। কিন্তু এ দুই মাসের মধ্যবতীর্ মাস শাবানের বিষয়ে কোনো কিছু জানা না থাকার কারণে মানুষের মাঝে উদাসীনতা বিরাজ করছিল। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাই এই মাসকে গুরুত্ব দিয়ে অনেক বেশি আমল করেছেন। হযরত উসামা বিন যায়েদ রাযি. বলেন,

قلتُ: يا رسولَ اللهِ لم أرَك تصومُ من شهرٍ من الشُّهورِ ما تصومُ شعبانَ قال: ذاك شهرٌ يغفَلُ النَّاسُ عنه بين رجب ورمضانَ.

আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমি আপনাকে শাবানের মতো অন্য কোনো মাসে এত বেশি (নফল) রোযা রাখতে দেখি না।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, রজব ও রমযানের মাঝে এ মাসটি সম্বন্ধে মানুষ উদাসীন থাকে।—আস—সুনানুল কুবরা : ১/১২০

অতএব এ মাসের আমলগুলো আমাদের জেনে গুরুত্বসহ পালন করা জরুরি। নিম্নে এ মাসের আমল তুলে ধরা হলো :

 

১. চাঁদ দেখা এবং দিন—তারিখ গণনা করা

হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

أحصوا هلال شعبان لرمضان.

রমযানের উদ্দেশ্যে শাবানের চাঁদ দেখা এবং দিন—তারিখ গণনা করার প্রতি গুরুত্ব দাও।—জামে তিরমিযী, হাদীস নং : ৬৮০

 

২. নতুন চাঁদ দেখার পর দুআ পড়া

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নতুন চাঁদ দেখলে এ দুআ করতেন :

اَللهُ اَكْبَرُ اَللّٰهُمَّ اَهِلَّه عَلَيْنَا بَالْاَمْنِ وَالْاِيْمَانِ وَالسَّلَامَةِ وَالْاِسْلَامِ وَالتَّوْفِيْقِ لِمَا يُحِبُّ رَبُّنَا وَيَرْضىٰ رَبُّنَا وَرَبُّكَ اللهُ.

অর্থ : আল্লাহ সবচেয়ে বড়। হে আল্লাহ, আপনি এ চাঁদকে নিরাপত্তা, ঈমান, শান্তি, ইসলাম ও এমন আমলের তাওফীকের সাথে উদিত করুন, যা আমাদের রব পছন্দ করেন এবং যা দ্বারা আমাদের রব সন্তুষ্ট হবেন। হে চাঁদ, তোমার ও আমাদের সকলের রব আল্লাহ।—সুনানে দারেমী, হাদীস নং : ১৬৮৭

 

৩. হায়াতে বরকত হওয়ার দুআ করা

রজব মাস শুরু হলেই রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমযান পর্যন্ত হায়াত দীর্ঘ হওয়ার দুআ করতেন। হযরত আনাস রাযি. বলেন, যখন রজব মাস শুরু হতো তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই দুআ করতেন :

اَللّٰهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِيْ رَجَبٍ وَّشَعْبَانَ وَبَلِّغْنَا رَمَضَانَ.

হে আল্লাহ, আপনি আমাদের জন্য রজব ও শাবান মাসে বরকত দান করুন এবং আমাদেরকে রমযান পর্যন্ত পেঁৗছিয়ে দেন।—মুসনাদে আহমদ : ২৩৪৬

 

৪. রমযানের শুভাগমণের অপেক্ষায় থাকা

উল্লিখিত দুআ থেকেই বোঝা যায়, রমযান লাভের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতটা ব্যাকুল হয়ে থাকতেন। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন। প্রিয় নবীর বুকে রজব—শাবানের বরকত লাভের এই যে ব্যাকুলতা; দুটি চাঁদের দূরত্বে থেকেও রমযানকে বরণ করার এই যে আকুতি, উম্মতের হৃদয়কে তা স্পর্শ না করে কি পারে! অতএব আমাদেরও উচিত এ দুআ করার পাশাপাশি রমযান লাভের জন্য ব্যাকুল হৃদয়ে অপেক্ষায় থাকা।

 

৫. সাধ্যানুযায়ী অধিক পরিমাণে নফল রোযা রাখা

বিভিন্ন সহীহ হাদীসে এসেছে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায় পুরো শাবান মাসই রোযা রাখতেন। রমযানের পর এই একটি মাসেই তিনি সবচেয়ে বেশি রোযা রাখতেন। আম্মাজান হযরত আয়েশা সিদ্দীকা রাযি. বলেন,

وَمَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم اسْتَكْمَلَ صِيَامَ شَهْرٍ قَطُّ إِلاَّ رَمَضَانَ وَمَا رَأَيْتُهُ فِى شَهْرٍ أَكْثَرَ مِنْهُ صِيَامًا فِى شَعْبَانَ.

আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রমযান ব্যতীত পূর্ণ মাস রোযা রাখতে দেখিনি। আর শাবান মাস ব্যতীত অন্য মাসে অধিক রোযা রাখতে দেখিনি।—সহীহ মুসলিম, হাদীস ২৬৯

হযরত আয়েশা রাযি. আরও বলেন,

كَانَ أَحَبَّ الشُّهُورِ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم أَنْ يَصُومَهُ شَعْبَانُ.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম—এর কাছে প্রিয় আমল ছিল শাবান মাসে রোযা রাখা।—মুসনাদে আহমদ, হাদীস ২৫৫৪৮; সুনানে আবু দাউদ, হাদীস : ২৪৩১

মাসআলা : শাবানের ১ তারিখ থেকে ২৭ তারিখ পর্যন্ত রোযা রাখার বেশ গুরুত্ব আছে। ২৮ থেকে ৩০ শাবান পর্যন্ত রোযা রাখা নিষেধ। সাধ্যানুযায়ী শাবান মাসের অধিকাংশ সময় রোযা রাখা সুন্নত।—আল—মাবসুত : ৩/১১৫; ফাতহুল কাদীর : ২/৩৫০

 

শাবান মাসে বেশি পরিমাণে রোযা রাখার কারণ

প্রথম কারণ

হযরত উসামা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

قلتُ: يا رسولَ اللهِ لم أرَك تصومُ من شهرٍ من الشُّهورِ ما تصومُ شعبانَ.

قال: ذاك شهرٌ يغفَلُ النَّاسُ عنه بين رجبَ ورمضانَ وهو شهرٌ تُرفعُ فيه الأعمالُ إلى ربِّ العالمين وأُحِبُّ أن يُرفعَ عملي وأنا صائمٌ.

আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললাম, হে আল্লাহর রাসূল, আমি আপনাকে শাবানের মতো অন্য কোনো মাসে এত বেশি (নফল) রোযা রাখতে দেখি না।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, রজব ও রমযানের মাঝে এ মাসটি সম্বন্ধে মানুষ উদাসীন থাকে। এ মাসে বান্দার আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়। আমি চাই আমার আমল এমন অবস্থায় পেঁৗছুক যে, আমি রোযাদার।—আস সুনানুন কুবরা, হাদীস ২৬৬৬

হাদীসের আলোকে জানা যায়, বান্দার আমল তিন সময়ে আল্লাহর কাছে পেশ করা হয় :

ক. দৈনিক দুইবার

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

يرفع إليه عمل الليل قبل عمل النهار وعمل النهار قبل عمل الليل.

আল্লাহর কাছে বান্দার রাতের আমল পেশ করা হয় দিনের আমলের পূর্বে। আর দিনের আমল পেশ করা হয় রাতের আমলের পূর্বে।—সহীহ মুসলিম, হাদীস নং : ৪৪৫১

আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন, বর্ণিত আছে যে রিযিক ফজরের নামাযের পর বণ্টন করা হয়। আর দিনের আমল আল্লাহর কাছে দিনের শেষভাগে পেশ করা হয়। অতএব যে ব্যক্তি সে সময় ইবাদতে বা আমলে থাকবে, তার রিযিক ও আমলে বরকত দেওয়া হবে।—ফাতহুল বারী : ৪/৫৩৬

 

খ. সাপ্তাহিক দুইবার

প্রতি সপ্তাহের সোমবার ও বৃহস্পতিবার আল্লাহর কাছে বান্দার আমল পেশ করা হয়। হাদীস শরীফে এসেছে, হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

تعرض الأعمال يوم الإثنين والخميس فأحب أن يعرض عملي وأنا صائم.

সোমবার ও বৃহস্পতিবার বান্দার আমল আল্লাহর কাছে পেশ করা হয়। তাই আমি পছন্দ করি আমার আমল এমন অবস্থায় যেন পেশ করা হয় যে আমি রোযাদার।—জামে তিরমিযী, হাদীস নং : ৭৩৮

 

গ. বাৎসরিক একবার

উসামা রাযি. এর হাদীস থেকে বোঝা গেল শাবান মাসে বান্দার সারা বছরের আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়। এটাও বোঝা গেল যে, আমল পেশ করা হয় দিনের বেলা। তাই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শাবান মাসে দিনের বেলা বেশি পরিমাণে রোযা রাখতেন এ আশায়, যেন রোযাদার অবস্থায় আমল পেশ করা হয়। তো শাবান মাসে বেশি রোযা রাখার একটি কারণ হলো এ মাসে বান্দার আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়।

দ্বিতীয় কারণ

এ মাসে পুরো বছর মৃত্যুবরণকারীদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়। আম্মাজান হযরত আশেয়া রাযি. বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায় পুরো শাবান মাস রোযা রাখতেন। তিনি একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল, শাবান মাসে রোযা রাখা আপনার কাছে এত প্রিয় কেন? নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,

إن الله يكتب فيه كل نفس ميتة تلك السنة ، فأحب أن يأتيني أجلي وأنا صائم.

আল্লাহ তাআলা এ মাসে পুরো বছর মৃত্যুবরণকারী সকল মানুষের তালিকা প্রস্তুত করেন। সুতরাং আমি চাই, আমার মৃত্যু এমন অবস্থায় আসবে যে আমি রোযাদার।—মুসনাদে আবি ইয়ালা : ৮/৩১৯; ফাতহুল বারী : ৮/৪৮৩

 

তৃতীয় কারণ

ইবনে রজব হাম্বলী রহ. বলেন, শাবান মাসের রোযা হলো রমযানের রোযার অনুশীলন। এর ফলে রমযানের রোযা রাখতে কষ্ট হয় না। কারণ, সে রমযানের আগে এক মাস রোযার অনুশীলন করে রোযায় অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে। শাবানের রোযার মাধ্যমে রমযানের রোযার স্বাদ পেয়ে গেছে আগেই। ফলে রমযানের রোযা শুরু করবে আগ্রহ, উদ্দীপনা ও শক্তি নিয়ে।—লাতায়েফুল মাআরিফ : ১৮৬

 

৬. রমযানের নফল আমলগুলো আদায় করা

রমযানে প্রত্যেক মুমিন বিভিন্ন ধরনের নেক আমল করে। যে আমলগুলো অন্য মাসেও করা যায়। শাবান মাসে এ আমলগুলো পালন করে অভ্যস্ত হয়ে গেলে রমযানে তা সহজ হয়ে যাবে। রমযানের যে আমলগুলো আমরা এখন থেকে অভ্যস্ত হতে পারি তার একটি তালিকা :

ক. কোরআন তিলাওয়াত করা

খ. অধিক পরিমাণে নফল নামায পড়া

গ. বেশি বেশি দান—সদকা করা

ঘ. রোযাদারকে ইফতার করানো

ঙ. গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা।

চ. অনর্থক কাজ থেকে বিরত থাকা

ছ. দুআ করা।

ইবনে রজব হাম্বলী রহ. বলেন, যেহেতু শাবান মাস রমযানের ভূমিকা, তাই শাবানে ওই আমলগুলো করার বিধান দেওয়া হয়েছে, যেগুলো রমযান মাসে করতে হয়। যেমন : রোযা রাখা, কোরআন তিলাওয়াত করা ইত্যাদি। যাতে রমযানকে গ্রহণ করা হয় পূর্বপ্রস্তুতির সাথে এবং আল্লাহর আনুগত্যে অভ্যস্ত হয়ে।—লাতায়েফুল মাআরিফ : ১/১৮৬

 

৮. গাফলত ও উদাসীনতা পরিত্যাগ করা

নিষিদ্ধ গাফলতের বিভিন্ন দিক রয়েছে। যেমন : আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল থাকা, শরীয়ত সম্বন্ধে গাফেল থাকা, আমার জন্য শরীয়তের কখন কী আদেশ এবং কখন কী নিষেধ, তা থেকে গাফেল থাকা, শেষ রাতে যখন আল্লাহ বান্দাকে ডাকেন তখন গাফলতের ঘুমে নিমজ্জিত থাকা, কেয়ামতের আলামতগুলো একে একে প্রকাশ পাচ্ছে অথচ বান্দা সে বিষয়ে গাফেল, মৃত্যুর প্রস্তুতি সম্পর্কে গাফেল থাকা, মৃত্যুর স্মরণ থেকে গাফেল থাকা ইত্যাদি। এ সকল ক্ষেত্রে শরীয়তের বিধান হলো,

وَلَا تَكُنْ مِّنَ الْغٰفِلِیْنَ.

তুমি গাফেলদের অন্তভুর্ক্ত হয়ো না।—সূরা আল আরাফ, ০৭ : ২০৫

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

ذاك شهرٌ يغفَلُ النَّاسُ عنه بين رجب ورمضانَ.

রজব ও রমযানের মাঝে এ (শাবান) মাসটির ব্যাপারে মানুষ গাফেল হয়ে থাকে।—আস সুনানুন কুবরা, হাদীস ২৬৬৬

 

৯. ২৮ শাবান থেকে ৩০ শাবান পর্যন্ত রোযা না রাখা

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দিনগুলোতে রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন। কারণ, এতে রমযানের সাথে সাদৃশ্য হয়ে যায়। রমযানের সাথে শাবানের সম্পর্ক হচ্ছে ফরয নামাযের আগে সুন্নত আদায় করার মতো। সুন্নত নামায আলাদা আর ফরয নামায আলাদা। উভয়ের মাঝে বিচ্ছেদ রয়েছে। ঠিক তদ্রূপ রমযানের রোযা ফরয আর শাবানের রোযা নফল। উভয়ের মাঝে বিচ্ছেদ হলো ২৮ থেকে ৩০ শাবান পর্যন্ত রোযাবিহীন দিন। হযরত আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

لا يتقدمن أحدكم رمضان بصوم يوم أو يومين إلا أن يكون رجل كان يصوم صومه فليصم ذلك اليوم.

তোমাদের কেউ যেন রমযানের এক দু দিন আগে রোযা না রাখে। তবে কেউ যদি উক্ত দিন পূর্ব থেকে রোযা রাখত তাহলে সে উক্ত দিন যেন রোযা রাখে।—সহীহ বুখারী : হাদীস ১৯১৪

 

১০. সর্বপ্রকার শিরক বর্জন করা

 

১১. হিংসা—বিদ্বেষ পরিত্যাগ করা

 

উল্লিখিত দুটি বিধান সারা বছরের প্রতিটি মুহূর্তের জন্য প্রযোজ্য। মুসলমানকে পুরো বছরই শিরক ও হিংসা—বিদ্বেষ পোষণ করা থেকে বেঁচে থাকতে হবে। তবে শাবান মাসের বর্জনীয় বিষয়ের তালিকায় বিশেষ এ দুটি গোনাহের কথা উল্লেখ করার কারণ হলো, হাদীস শরীফে এসেছে, শাবানের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে সকল অপরাধীকে ব্যাপকভাবে ক্ষমা করা হয়। তবে দুই ধরনের মানুষকে ক্ষমা করা হয় না : এক. শিরকের অপরাধে জড়িত ব্যক্তি, দুই. হিংসা—বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যক্তি।

 

শবে বরাত

ফযীলতপূর্ণ শাবান মাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাত আছে, যাকে হাদীসের ভাষায় ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ বলা হয়েছে। অর্থাৎ ১৪ তারিখ দিবাগত রাত। আমাদের উপমহাদেশে এ রাতটিকে ‘শবে বরাত’ বলা হয়। শব্দটি ফারসি। শব অর্থ রাত, বরাত অর্থ মুক্তি। উভয়টি মিলে অর্থ হয় মুক্তির রাত। এ রাতে যেহেতু অসংখ্য অপরাধীকে ক্ষমা করে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয়, তাই তাকে শবে বরাত বা মুক্তির রাত বলা হয়। হাদীসে এ রাতের বিশেষ ফযীলতের বিবরণ এসেছে।

হযরত মুয়ায ইবনে জাবাল রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

يطلع الله الى خلقه في ليلة النصف من شعبان فيغفر لجميع خلقه الا لمشرك أو مشاحن.

আল্লাহ তাআলা শাবানের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রতি (রহমতের) দৃষ্টি দেন। অতঃপর মুশরিক (শিরকে জড়িত ব্যক্তি) ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত সকলকে ক্ষমা করে দেন।—সহীহ ইবনে হিব্বান, হাদীস নং : ৫৬৬৫; শুআবুল ঈমান, হাদীস নং : ৩৮৩৩ (হাদীসটির সনদ সহীহ ও আমলযোগ্য), অততারগীব ওয়াত তারহীব : ২/১১৮, ৩/৪৫৯, লাতায়েতুল মাআারিফ : ১৫১; মাজমাউয যাওয়ায়েদ : ৮/৬৫; শরহুল মাওয়াহিবিল লাদুন্নিয়্যা : ১০/৫৬১; সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহা : ৩/১৩৫—১৩৯

 

শবে বরাতের আমল

এক. এই রাতে এমন সব নেক আমলের ব্যাপারে যত্নবান হওয়া যার মাধ্যমে রহমত ও মাগফেরাতের উপযুক্ত হওয়া যায়।

দুই. ওই সব গোনাহ থেকে বিরত থাকতে হবে যার কারণে মানুষ আল্লাহ তাআলার রহমত ও মাগফেরাত থেকে বঞ্চিত হয়। উল্লিখিত হাদীস থেকেই এই আমল পাওয়া যায়।

তিন. আল্লাহর দরবারে বেশি বেশি ইস্তেগফার করা ও খালেস দিলে তাওবা করা। কারণ, উল্লিখিত হাদীসে এ রাতে ক্ষমার প্রতিশ্রম্নতি দেওয়া হয়েছে। যেমন শবে কদরের ফযীলতের হাদীসে ক্ষমার প্রতিশ্রম্নতি দেওয়া হয়েছে। রাসূলে কারীম সা. আয়েশা রাযি.—কে আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাওয়ার আমল শিখিয়েছেন।

চার. দুআ করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

و يرحم المسترحمين.

(এই রাতে) যারা (আল্লস্নাহর কাছে) দুআ করে রহমত চায় তিনি তাদের প্রতি রহম করেন।—শুয়াবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস নং : ৩৫৫৫৪

পাঁচ. নফল যে—কোনো আমল করা। যেমন : যিকির করা, তাসবীহ পড়া, দুরূদ পড়া, কোরআন মাজীদ তেলাওয়াত করা ইত্যাদি। হাদীস শরীফে এসেছে, হযরত আলী রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

إذا كانت ليلة النصف من شعبان ، فقوموا ليلها وصوموا نهارها.

শাবানের ১৫ তারিখের রাত এলে তোমরা এ রাত (নফল) ইবাদত—বন্দেগী করে কাটাও এবং দিনের বেলা রোযা রাখো।—সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং : ১৩৮৪

মনে রাখতে হবে, এ রাতে  এ পরিমাণ ইবাদত করা যাতে এর দ্বারা ফরয আমলে ব্যাঘাত না ঘটে। এমন যেন না হয় সারা রাত নফলে ব্যস্ত থেকে ফজরের জামাত ছুটে গেল বা কাযা হয়ে গেল। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।

বিশুদ্ধ মতানুসারে এ রাতের সকল নফল আমল একাকী আদায় করাই নিয়ম। ফরয নামায তো পুরুষের জন্য অবশ্যই মসজিদে আদায় করতে হবে। এরপর যা কিছু নফল আমল করা হবে তা নিজ নিজ ঘরে একাকী আদায় করবে। এসব নফল আমলের জন্য দলে দলে মসজিদে এসে সমবেত হওয়ার কোনো প্রমাণ হাদীস শরীফেও নেই, আর সাহাবায়ে কেরামের যুগেও এর রেওয়াজ ছিল না।—ইকতিযাউস সিরাতিল মুসতাকীম : ২/৬৩১—৬৪১; মারাকিল ফালাহ : ২১৯

তবে যদি নিজ ঘরে আমলের পরিবেশ না থাকায় একা নিরিবিলি এবাদত করার জন্য মসজিদে চলে যায় অথবা কোনো রকমের দাওয়াত বা আহ্বান ছাড়া এমনিতেই কিছু লোক মসজিদে এসে প্রত্যেকে নিজ নিজ আমলে মশগুল থাকে তাহলে কোনো অসুবিধা নেই।

ছয়. দীর্ঘ সেজদাবিশিষ্ট নফল নামায পড়া। হযরত আয়েশা রাযি. বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাতে নামাযে দাঁড়ান এবং এত দীর্ঘ সেজদা করেন যে, আমার ধারণা হলো, তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি তখন উঠে তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নাড়া দিলাম। তাঁর বৃদ্ধাঙ্গুলি নড়ল। যখন তিনি সেজদা থেকে উঠলেন এবং নামায শেষ করলেন তখন আমাকে লক্ষ করে বললেন, হে আয়েশা, অথবা বলেছেন, হে হুমায়রা, তোমার কি এ আশঙ্কা হয়েছে যে, আল্লাহর রাসূল তোমার হক নষ্ট করবেন?

আমি উত্তরে বললাম, আল্লাহর কসম, এমনটি নয়। হে আল্লাহর রাসূল, আপনার দীর্ঘ সেজদা দেখে আমার আশঙ্কা হয়েছিল, আপনি মৃত্যুবরণ করেছেন কি না।

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি কি জানো এটা কোন রাত?

আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করলেন, এটা হলো শাবানের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত (অর্থাৎ শবে বরাত)। আল্লাহ তাআলা অর্ধ শাবানের রাতে তার বান্দাদের প্রতি বিশেষ রহমতের দৃষ্টি দেন। অতঃপর ক্ষমা প্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করেন। অনুগ্রহ প্রার্থনাকারীদের প্রতি অনুগ্রহ করেন। বিদ্বেষ পোষণকারীদের ছেড়ে দেন তাদের আপন অবস্থাতেই (অর্থাৎ পরস্পরের বিদ্বেষকে সংশোধন করে তওবা করা পর্যন্ত আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করেন না।)—শুয়াবুল ঈমান, বায়হাকী, হাদীস : ৩৫৫৪

 

এই রাতে বর্জনীয় কাজ

এক. নিজের পাপের বোঝা দেখে নিরাশ হওয়া যাবে না। এমন কথা বলা যাবে না যে, ‘এত গোনাহ কী করে মাফ হবে।’

হাদীসে কুদসীতে আছে, আল্লাহ বলেন, হে আদম—সন্তান! তুমি যা দুআ করবে, আমি বিগত জীবনের সবকিছু ক্ষমা করে দেব। আমি কারও পরোয়া করি না। হে আদম—সন্তান, তোমার পাপ যদি আসমানকেও ছুঁয়ে ফেলে আর তুমি আমার কাছে ক্ষমা চাও, আমি সব ক্ষমা করে দেব। হে আদম—সন্তান, তুমি যদি পুরো পৃথিবীর ভূমি সমপরিমাণ অপরাধ নিয়েও আমার কাছে আসো এবং শিরিকমুক্ত হয়ে আমার পথে ফিরে আসো, তাহলে আমিও এর সমপরিমাণ ক্ষমা নিয়ে হাজির হব।—জামে তিরমিযী, হাদীস নং : ৩৫৪০

দুই. আমল না করে রহমত ও মাগফিরাতের আশায় নিশ্চিন্ত বসে থাকা  যাবে না। এটা নির্বোধ মানুষের আলামত। বুদ্ধিমান মানুষ সাধ্যানুযায়ী আমল করে আশার আলো দেখে। ইমাম গাযালী রহ. বলেন, সম্ভব সকল উপায় অবলম্বনের পরই আশা ও প্রত্যাশার পর্ব।—ইহইয়াউ উলুমিদ্দীন : ৪/১৯

তিন. মসজিদ ও দোকানপাটে আলোকসজ্জা করা, পটকা ফুটানো, আতশবাজি করা নিষেধ। এ কাজগুলোতে অপচয়ের গোনাহের পাশাপাশি বিজাতীয় সংস্কৃতির অনুসরণও হয়। তাই তা শরীয়তে নিষেধ।

চার. অনেকে এ দিনে হালুয়া, রুটি বা অন্য কোনো বিশেষ খাবারের আয়োজন করে। আত্মীয়—স্বজনের মাঝে বিতরণ করে। কোথাও খিচুড়ি রান্না করে গরিব—মিসকিনদের মাঝে বিতরণ করা হয়। সাধারণ অবস্থায় এ কাজগুলো জায়েয ও ভালো কাজ হলেও এটাকে এ রাতের বিশেষ আমল মনে করা এবং এসবের পেছনে পড়ে এ রাতের মূল কাজ তওবা, ইস্তেগফার ও নফল ইবাদত থেকে বঞ্চিত হওয়া শয়তানের ধেঁাকা ছাড়া আর কিছুই নয়।

তবে কেউ যদি এ দিনে ভালো খাবার এ নিয়তে রান্না করে যে, ভালো করে খেয়ে ভালো করে ইবাদত—বন্দেগী করবে, তাহলে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু আমাদের সমাজের চিত্রটা ভিন্ন। মনে রাখতে হবে, এই রাতটা উৎসবের নয়, তওবা, ইস্তেগফার ও ইবাদত—বন্দেগীর। তাই রসম—রেওয়াজের অনুগামী হয়ে এ রাতে উপরোক্ত কাজকর্মে লিপ্ত হওয়া নিজেকে ক্ষতিগ্রস্ত করা ছাড়া আর কিছুই নয়।—আল মাদখাল লি ইবনিল হাজ্ব : ১/২৯৯, ৩০৬—৩০৭; ইমদাদুল ফাতাওয়া : ৫/২৮৯

পাঁচ. কোথাও কবরস্থান ও মাজারে আলোকসজ্জা করা হয়। ওই সব স্থানে লোকজনের ভিড় হয়, এমনকি মহিলারা জমায়েত হয়। এ কাজগুলো সব সময়ের জন্যই নিষিদ্ধ। এ দিনের আমলের অংশ হিসেবে এসব কাজ করা আরও জঘন্য ও আপত্তিকর।

ছয়. এ রাতে দলবদ্ধভাবে আমল করা সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়। কোথাও সম্মিলিত যিকিরের আয়োজন হয়, কোথাও জামাতের সাথে সালাতুত তাসবীহ পড়া হয়। এ রাতের আমল নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একাকীই করেছেন। সাহাবায়ে কেরাম থেকেও দলবদ্ধভাবে এ রাতের আমল করা প্রমাণিত নয়। অতএব আমাদেরকে বিষয়টি খেয়াল রাখতে হবে।

সাত. কেউ কেউ বিশেষ পদ্ধতিতে নামায আদায় করেন। প্রতি রাকাতে বিশেষ সূরা নির্দিষ্ট—সংখ্যকবার পড়ার প্রচলন আছে। মনে রাখতে হবে, শরীয়তে শবে বরাতের বিশেষ কোনো নামায নেই। যার পক্ষে যতটুকু সম্ভব নফল ইবাদত ও নফল নামায পড়বে। অন্যান্য সময় যে নিয়মে নফল আদায় করে সে নিয়মেই আদায় করবে।

ইমাম ইবনে রজব হাম্বলী রহ. বলেন, মুমিন বান্দার কর্তব্য হলো এ রাতে যিকির, দুআ ও তওবা—ইস্তেগফারের জন্য প্রস্তুত হয়ে যাবে। যত্নের সঙ্গে নফল নামায পড়বে। কেননা কখন মৃত্যু এসে যায় বলা যায় না। তাই কল্যাণের মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই তার মূল্যায়ন করা, কদর করা কর্তব্য। আল্লাহর কাছ থেকে সওয়াবের আশায় ১৫ তারিখে রোযাও রাখতে পারে। তবে অত্যন্ত জরুরি হলো ওই সব গোনাহ থেকে বেঁচে থাকা, যেগুলো এ রাতের সাধারণ ক্ষমা ও দুুআ কবুল হওয়ার প্রতিবন্ধক হয়। আল্লাহ পাক আমাদেরকে সহীহভাবে আমল করার তাওফীক দান করুন।

 

খাওয়া দাওয়া প্রসঙ্গে কিছু কথা

মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী

গুলশান দুইয়ের একটি দামি রেস্তোরাঁয় খানা খেতে বসেছি আব্বা আর আমি। সম্ভবত ১৯৯২ সালের কথা। জরুরি কাজে সেদিকে গিয়েছিলাম। খাওয়ার সময় পার হয়ে যাচ্ছিল তাই রেঁস্তোরায় বসি। আব্বা তখন জাতীয় সংসদ সদস্য। দেশের খ্যাতিমান আলেম ও ইসলামী মনীষী। খ্যাতির বিড়ম্বনা সারা জীবনই তার সাথ দিয়েছে। যেখানেই গেছেন কেউ না কেউ চিনে ফেলেছেন। পরিচিত, সঙ্গী, ছাত্র, ভক্ত, কর্মী, সমর্থক, ভোটারদের সাথে দেখা হয়ে গেছে। আমাদের পারিবারিক কাজকর্ম বাদ দিয়ে দর্শনার্থীদের সময় দিতে হয়েছে। কখনো খুশি হয়েছেন, ভালো লেগেছে, কোনো কোনো সময় ভারও বোধ হয়েছে।

খানার অর্ডার দিয়েছি। কম করে হলেও আধ ঘণ্টা লেগে যায় এদের খানা প্রস্তুত করে পরিবেশন করতে। সবার আগে স্যুপ দিয়ে গেল ওয়েটার। আমরা স্যুপ খাচ্ছিলাম। আব্বা লক্ষ করলেন, ঝকঝকে তকতকে দামি রেস্তোরাঁটির সামনে কাঁচের বাইরে একটি ছোট্ট শিশুর হাত ধরে একজন বৃদ্ধ লোক দাঁড়িয়ে। দেখে মনে হলো তারা সাহায্যপ্রার্থী। শিশু ও বৃদ্ধ মানুষটি হাতের ইশারায় রেস্তোঁরার ভেতর আব্বাকে দেখিয়ে কী যেন বলছিল। আমি কিছু বোঝার আগেই আব্বা দরজা ঠেলে বাইরে চলে গেলেন। আমি ওয়েটারকে স্যুপ খাওয়া শেষ হয়নি বলে, হন্তদন্ত হয়ে পিছু ছুটলাম। আমি পৌঁছার আগেই আব্বা ওই বুড়ো মানুষটির কাছে গিয়ে তার কথা শুনে ভেতরের দিকে আসতে শুরু করেছেন। টেবিলে বসে আমাকে বললেন, আমাদের জন্য প্রস্তুত খাবারগুলো প্যাক করে দিতে বলো। আমি কিছু না বুঝেই ওয়েটারকে তা বললাম। রাইস, চিকেন ফ্রাই, মাটন, ভেজিটেবল ইত্যাদি প্রস্তুত করে আনা হলো। আব্বা আমাকে বললেন, ‘এ ব্যাগটি বাইরের ওই বাচ্চাটির হাতে দিয়ে আয়।’ আমি আব্বার কথামতো তাই করলাম। সাথে সাথে আবার নতুন করে অর্ডার দিতে চাইলে আব্বা বললেন, শুধু স্যুপটুকু খেলে যদি তোর চলে, তাহলে আর খানার দরকার নেই। চল আমরা ঘরে ফিরেই খাব।

আমি বিল মিটিয়ে আব্বাকে নিয়ে বের হলাম। তিনি একটি পান মুখে দিয়ে আমাকে নিয়ে রিকশায় বসলেন। কথা বলতে বলতে আমরা চলছি। জানতে পারলাম, বুড়ো লোকটি নাকি আব্বাকে বলেছিল, এ রেস্টুরেন্টের সামনে তারা প্রায় দিনই ভিক্ষা করে। এ শিশুটি তার নাতি। সে সব সময়ই এসব খাবার বাইরে থেকে দেখে, কিন্তু খেতে পায় না। আজ নাকি সে তার দাদাকে বলেছে, এই মানুষটিকে খুব ভালো মনে হয়। দাদা, তুমি যদি তাকে বলতে, তাহলে তিনি হয়তো আমাকে এসব খাবার কিনে দিতেন। তারা এসব কথা বলার সময়ই সম্ভবত আব্বার চোখ সেদিকে গিয়েছিল। শিশুটি তার দিকে ইশারা করায় তিনি ব্যাপারটি বোঝার জন্য স্যুপ রেখে বাইরে ছুটে গিয়েছিলেন।

আমি এসব শুনে খুব সহজভাবে নিলাম। কারণ, এমন দৃশ্য আমার চোখে নতুন নয়। এর বহু বছর আগে একবার কিশোরগঞ্জ জামিয়া মার্কেটে বেশ কয়েকজন আলেম, ছাত্র, ভক্ত ও সমর্থক পরিবেষ্টিত হয়ে বসা ছিলেন আব্বা। আমিও বাড়ি গিয়েছিলাম বলে সে মজলিসে শরিক ছিলাম। একজন বলল, হুজুর কিছু আনাব?

বললেন, কী আনবে? কী আছে এখানে খাওয়ার মতো?

অন্য একজন বললেন, নতুন কিছু আইটেম এসেছে অমুক দোকানে।

শুনে আমি গেলাম সেখানে। অনেকগুলো স্যান্ডুইচ, পিজা, বার্গার ইত্যাদি আনলাম সবার জন্য। সমপরিমাণ জিনিস ও স্পেশাল কিছু আইটেম বাক্স ভরে এনে আব্বার পাশে রাখলাম। আব্বা বললেন, সবার জন্য যা এনেছিস এতেই তো হতো। আলাদা এত বড় বাক্স ভরে কী আনলি আবার?

বললাম, এখানে আপনি আর কতটুকু খেতে পারবেন। আম্মা আর আপনার জন্য আলাদা করে আনলাম। বাসায় নিয়ে যাব।

একটু পর একজন গরিব মহিলা দুটি ছেলে—মেয়েসহ এসে কিছু চাইল। এ সময় সবেমাত্র আমরা সবাই মিলে খাবারগুলো খেতে শুরু করেছি। কেউ একজন মহিলাটিকে চলে যেতে বললেন। আরেকজন সামান্য টাকাও দিলেন। আব্বা খেয়াল করলেন, শিশু দুটি তাদের মায়ের কাছে কিছু খেতে চাইছে। মা তাদের দিকে চোখ রাঙিয়ে একটা ধমক দিয়ে বাচ্চা দুটিকে জোর করে দূরে সরিয়ে নিতে লাগল। বাচ্চারা যেতে চায় না। আব্বা আমাকে কানে কানে বললেন, ‘এই বাক্সটি ওই বাচ্চা দুটিকে দিয়ে দে।’ বাক্সটি আমি ওই মায়ের হাতে তুলে দিলাম। বললাম, নীরবে এক জায়গায় বসে আপনি বাচ্চাদের নিয়ে এগুলো খেয়ে নিন।

আব্বা—আম্মার জন্য আমার পছন্দ করে কেনা সেরাটুকুই এদের হাতে তুলে দিতে আমার একটুও অস্বস্তি লাগেনি। কারণ, আব্বার মনোভাবটি আমি জানতাম। তাকে আমি খুব চিনতাম। এতে বরং আমি অন্যরকম এক আনন্দ ও তৃপ্তি অনুভব করেছি। আব্বা নিজের বড় পুত্রের দেওয়া সযত্ন উপহার খুব পছন্দ করতেন। নিজের পছন্দের বস্তুই সেরা, সফল ও বুদ্ধিমান লোকেরা আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দিতে পছন্দ করেন। এমন অসংখ্য ঘটনা আমাদের পিতাপুত্রের জীবনে রয়েছে। এখনো আব্বার কথা মনে পড়লে এসব চিত্র ও দৃশ্য চোখে ভাসে আর একা একা থাকলে এসব পুণ্যস্মৃতি রোমন্থন করে আমিও নয়ন জলে ভাসি। ভাবি, আব্বা এমন হবেন না কেন। তিনি তো আমার দাদা—দাদুরই সন্তান। তারাও তো যতদিন দেখেছি, এভাবেই জিন্দেগি গোজরান করেছেন। দাদুর কথা  মনে পড়লে এখনো কেঁদে বুক ভাসাই। এ মানুষটি কত যে ভালো মানুষ ছিলেন, তা বলে বোঝাতে পারব না।

তখনও আমি রাজধানীতে ফ্ল্যাটবাসী হইনি। খোলামেলা বাসায় থাকতাম। কিশোরগঞ্জে আমাদের বাসাটি ছিল আগের যুগের বাড়ি। দরজা—জানালা মানুষের নাগালের ভেতরে ছিল। কোনো প্রয়োজনে মানুষ আসতে, ডাকতে ও পৌঁছতে পারত। দেশেও তখন অভাবী মানুষ অধিক সংখ্যায় ছিলেন। প্রতিদিনই দরজায় কোনো—না—কোনো মানুষ হাঁক দিত। কিছু চাইত। বিশেষ করে স্বাধীনতা—উত্তর ৫/৭ বছর খাবারের জন্য মানুষ ঘরে ঘরে যেত। আমাদের বাড়িতে আসা কোনো ভিখারিকে পারতপক্ষে ফিরিয়ে দেওয়া হতো না। টাকা, চাল, কিংবা রান্না করা খাবার যতটুকুই সম্ভব দেওয়ার চেষ্টা করা হতো।

অনেক সময় এমন হতো, কেউ চারটে ভাত খেতে চেয়েছে। আর ঘরে রান্না খাবার নেই। হয় তৈরি হয়ে শেষ হয়নি অথবা সবার খাওয়া—দাওয়ার পর শেষ হয়ে গিয়েছে। তখন গ্যাসের চুলা ছিল না, ছিল লাকড়ির চুলা। ফ্রিজও তখন ঘরে ঘরে ছিল না। যাদের ছিল সেটিও ছোট—খাটো এবং জিনিসে ঠাসা। তো আমরা শত শতবার এমন দেখেছি যে, আমার দাদু নিজে খেতে বসার সময় কোনো ভিক্ষুক দু—মুঠো খাবারের জন্য হাঁক মারল, তিনি সাথে সাথে হাত গুটিয়ে নিলেন। পাতের মাখানো ভাতগুলোই শেষ। ডিশের ফ্রেশ ভাত, তরকারি, ডাল দিয়ে দিচ্ছেন ওই মানুষটিকে। নানা যুক্তিতে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেও আমরা তার এ কর্মপন্থা বদলাতে পারিনি। ‘টাকা দিয়ে দাও কিংবা চাল দিয়ে দাও’ বললেও দাদুর মন মানত না। বলতেন, ক্ষুধার্ত মানুষ, টাকা আর চাল দিলে কখন সে খানা পাবে আর খাবে। খানা পানি খেয়ে তৃপ্ত হোক। সাথে কিছু টাকা ও চালও দিয়ে দাও। বাড়ি গিয়ে আবার খেতে পারবে।

দুর্ভিক্ষের সময় আমার দাদু এভাবে ছেঁড়া কাপড় পরা কোনো নারীকে দেখলেও শাড়ি—কাপড় দিয়ে দিতেন। বহুবার নিজের জন্য তুলে রাখা সব শাড়ি অভাবি মানুষকে দিয়ে ফেলেছেন। দু—চারটি শাড়ির বেশি হলেই তিনি তা দান করে দিতেন। কেউ চাওয়ামাত্রই বিনা হিসাবে নিজের সব টাকা—পয়সা তাদের দিয়ে দিতেন। জমির আয় ও বাড়ি ভাড়ার টাকা, আব্বার টাকা সবই দাদু বাতাসের গতিতে অভাবী মানুষের মাঝে বিলিয়ে দিতেন। আমি এজন্য দাদুকে হৃদয় থেকে শ্রদ্ধা ও পছন্দ করতাম। অন্তর দিয়ে ভালোবাসতাম। অবশ্য তার মতো উদারহস্ত আমিও হতে পারিনি। নিজে না খেয়ে মানুষকে খাওয়ানো, নিজের জন্য না রেখে সব টাকা—পয়সা মানুষকে দিয়ে দেওয়ার কথা কিতাবে পড়েছি আর আমার মুরুব্বীদের জীবনে দেখেছি। এমন কাজ নিজে করা সহজ নয়।

খাওয়া—দাওয়া বা পানাহারের ব্যাপারে পবিত্র ইসলামের যে নির্দেশনা তা অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ পালন করে না। মুসলিম সমাজে এ ব্যাপারে উদাসীনতা ব্যাপক। দুনিয়ার উন্নত দেশসমূহে সাধারণত মানুষ খাওয়া—দাওয়ার ব্যাপারে যে নিয়ম—নীতি অনুসরণ করে তা অনেকটাই ইসলামের সাথে মিলে যায়। সচেতন মুসলমান এবং আল্লাহর নেক বান্দারা পানাহারের ব্যাপারে সুন্নতের নির্দেশনা পালন করে থাকেন। এ বিষয়ে আমাদের আলাদা লেখা রয়েছে। এ লেখাটি ইসলাহী দৃষ্টিকোণ থেকে কিছু বাস্তব ইতিহাস, ঘটনা ও অভিজ্ঞতা থেকে তৈরি। গল্পের ভেতর থেকে আনন্দ বা অনুভূতি নেওয়া পর্যন্তই সীমাবদ্ধ না থেকে আমরা যেন এর ভেতরকার বার্তাটি গ্রহণ করতে পারি।

অনেকেই জানেন, আমার জন্মস্থান কিশোরগঞ্জ। জীবনে প্রথম ১৫/১৬ বছর আমার সেখানেই কাটে। খুব ছোট বেলা আমাদের শহরেই এক মুরুব্বী পর্যায়ের ব্যক্তি ইন্তেকাল করেন। তিনি ও তার পরিবার আমাদের খুব পরিচিত ছিলেন। তার মৃত্যু উপলক্ষ্যে কোনো একদিন তার পরিবারের লোকেরা আত্মীয়—স্বজন, পাড়া—প্রতিবেশী ও চেনা—জানা লোকজনের জন্য বাসায় একটি খানার আয়োজন করে। তাদের দাওয়াতে যাওয়ার বিশিষ্ট লোকদের মধ্যে শহরের শীর্ষ ব্যক্তিদের অন্তভুর্ক্ত ছিলেন আমার দাদাজান ও আব্বা। দাদা যে—কোনো বিষয়ে খুব স্পষ্টবাদী ছিলেন। শরীয়তবিরোধী কাজে তার প্রতিবাদ তার ব্যক্তিগত নম্র চিত্ততার সাথে মিলত না। সুন্নতের খেলাফ কোনো কাজ দেখলে দাদা এভাবেই রেগে যেতেন যে, কোনো ব্যক্তি তার স্বাভাবিক মমতাপূর্ণ আচরণ আগে না দেখে থাকলে সে ধারণাই করতে পারবে না যে, মানুষটি ইচ্ছে করলে এভাবে রাগও করতে পারেন।

রাগ বা ক্রোধ মানুষের মধ্যে থাকেই। এটি সম্পূর্ণ নাই হয়ে যাওয়া ইসলাম সমর্থন করে না। আবার অতিরিক্ত ক্রোধ বা রাগও ইসলামে কাম্য নয়। নিয়ন্ত্রণহীন রাগ শয়তানের পক্ষ থেকে হয়ে থাকে। সেজন্য রাগ দমনের নির্দেশ ও পরামর্শ শরীয়ত দিয়েছে। ব্যক্তিগত কারণে রাগ না হওয়া উত্তম। আল্লাহর জন্য রাগ হওয়া উত্তম। শরীয়ত নির্দেশিত স্থানে ক্রোধ ও রাগ থাকা অপরিহার্য। আমার দাদাজানের চরিত্রে এসব গুণ ভারসাম্যের সাথে পাওয়া যেত। এজন্যই তিনি সর্বজনমান্য বড় আলেম ও দরবেশ হিসেবে স্বীকৃত ছিলেন।

সমাজের কুসংস্কার ও রসম—রেওয়াজ দূর করা ছিল তাঁর সারা জীবনের মিশন। দাদা স্পষ্ট ভাষায় এ দাওয়াত কেবল ফিরিয়েই দেননি, আয়োজকদের পরিষ্কার মানা করেছেন এমন অনুষ্ঠান করতে। আব্বা কোনো কারণ দেখিয়ে অন্য সব অপছন্দনীয় দাওয়াতের মতোই এটিও এড়িয়ে গেছেন। আমি এ বিষয়টি না বুঝে বন্ধু—বান্ধবের সাথে এই দাওয়াতে চলে যাই। তখন আমার বয়স ৭/৮ বছরের বেশি হবে না। যখন বাসায় ফিরি তখন আম্মা বিষয়টি জানতে পেরে মোটামুটি ঘটনাটি চেপে যান। শেষ পর্যন্ত ঘটনা চাপা থাকেনি। অন্য কারও মাধ্যমে এটি দাদার কানে চলে যায়। তখন দাদা আমাকে ডেকে সংক্ষেপে বলে দেন যে, নাসিম, তুমি কেন বুঝলে না। যে দাওয়াতে আমি এবং তোমার আব্বা গেলাম না, সেটা যে যাওয়ার মতো নয় এ বিষয়টি তোমার বোঝে আসল না কেন?

আমি দাদার সামনে এ নিয়ে আর কথা বললাম না। লজ্জায় মাথা নিচু করে রইলাম। দাদু এসে আমাকে উদ্ধার করলেন। আর বললেন, ছোট মানুষ, বন্ধুদের সাথে চলে গিয়েছে। তা ছাড়া ওরাও তার পরিচিত। ভবিষ্যতে আর এমন হবে না।

কথাটি রাত পর্যন্ত আব্বার কানেও পৌঁছল। ধারণা করি, দাদার বিরক্ত হওয়ার ঘটনাটি কেউ আব্বার কান পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে থাকবে। এমনও হতে পারে, গল্পচ্ছলে আম্মাই আব্বাকে বলে দিয়েছেন। রাতের খানার সময় আব্বার সাথে দেখা। তিনি শুধু বললেন, মৃত ব্যক্তির জন্য আয়োজিত অনুষ্ঠানের খানা খাওয়া ভালো না। বড় হলে সব বুঝবে। একটি কথা আছে, طعام الميت يميت القلب। মানে, মৃত ব্যক্তির উপলক্ষ্যে আয়োজিত খানা খেলে মানুষের অন্তর মরে যায়।

আব্বা ও দাদার এটুকু উপদেশই আমার জন্য সারা জীবনের আচরিত নীতিতে পরিণত হয়। আর এমন শত শত ঘটনা জীবনে আছে, যা শুধু আমাকে বলে দেওয়া হয়েছে। বাকি চার ভাই চোখ বুজে এটাকেই অনুসরণ করেছে। আর বর্তমানে ছেলে ভাতিজারাও এ নীতির ওপরই বেড়ে উঠছে। এ কথাগুলো লিখে রেখে যাচ্ছি, যাতে পরবর্তী বংশধর এবং অন্য ভাই—বন্ধুরাও এ থেকে শিক্ষা নিতে পারে। একবার এর ২/৪ বছর পর আমি কারও সাথে এক গ্রামে বেড়াতে যাই। সেখানে থাকাবস্থায় কোনো এক বিশিষ্ট ব্যক্তির মৃত্যু উপলক্ষ্যে বিশাল মেলার আয়োজন হয়। আমি যাদের বাড়ি গিয়েছিলাম তারা—সহ গ্রামের প্রায় সব মানুষ মেলায় যোগ দিতে যায়। দাদা ও আব্বার উপদেশের কথা মনে করে আমি সেই মেলায় যাওয়া থেকে বিরত থাকি। এরপর বাকি লোকজন ফিরে এসে বিশাল এই মচ্ছবের কথা বর্ণনা করে শোনায়। অনেকগুলো গরু জবেহ করে কয়েক গ্রামের মানুষকে খানা খাওয়ানো হয়েছে। এটি গরিবের জন্য সদকা বা মৃতের রুহে সওয়াব পৌঁছানোর উসিলাস্বরূপ করা হয়নি। সমাজের রীতি ও নিজেদের খুব ধনী মানুষ প্রমাণ করতে করা হয়েছে।

ছাত্রজীবনে একবার এক শিক্ষক ও কয়েকজন সহপাঠীর সাথে আমিও এক জায়গায় দাওয়াত খেতে যাই। এ সময় আমি দশ কি বারো বছরের। বয়সে ছোট হলেও মাসআলার কিতাব পড়া শুরু করেছি। যে বাড়িতে সবার সাথে গিয়েছি তাদের আমি চিনতাম। বাড়ির মূল ব্যক্তিটি কিছুদিন আগে মারা গিয়েছেন। তার অনেকগুলো ছেলে—মেয়ে। দেখে যা বুঝলাম, এক—দু জন হয়তো প্রাপ্তবয়স্ক। বাকি সবাই শিশুবয়সি। আমি কোনো একটি কারণ দেখিয়ে বাসায় ফিরে এলাম। পরদিন অন্যদের বললাম, ইসলাম জ্ঞানভিত্তিক জীবনবিধান। শরীয়তের হুকুম ছাড়া এখানে রীতি—রেওয়াজের দোহাই দিয়ে যা ইচ্ছা করা যায় না। যে বাড়িতে অপ্রাপ্তবয়স্ক ওয়ারিশ থাকে সেখানে সবকিছু স্পষ্টভাবে না জেনে কোনো পানাহার করা যায় না। মৃত ব্যক্তির খানা এমনিতেও পরিত্যাগ করা ভালো। আর নাবালক শিশুদের সম্পদ থেকে কেউ দাওয়াতে ব্যয় করা যেমন নিষেধ, কারও পক্ষে এমন দাওয়াত খাওয়াও জায়েযের পর্যায়ে থাকে না। বিষয়টি নিয়ে সেই শিক্ষক ও সহপাঠীরা খুব ভাবনায় পড়লেন। একসময় কৌশলে ওই বাড়িতে ভালো অংকের কিছু বিনিময় উপহার হিসেবে পাঠানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম।

এর কিছুদিন পর দাদার সাথে ময়মনসিংহ বেড়াতে যাই। একটি দ্বীনি সফরে তিনি সেখানে যান। বড় বড় মাদরাসায় প্রোগ্রাম হয়। কোনো কোনো স্থানে ওলামায়ে কেরামের ঘরোয়া মজলিস হয়। সে সময় আমাদের এক আত্মীয় সাম্প্রতিককালে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। দাদা সে বাসায় অল্প সময়ের জন্য যান। এমন সময়টি বেছেই তিনি গিয়েছিলেন যখন কোনো খাওয়া—দাওয়ার সময়ও না এবং দ্রুত আয়োজন করাও সম্ভব নয়। সে আত্মীয়ের অনেকগুলো শিশুসন্তান আছে, তা আমরা জানতাম। দাদা সাথের লোকজনকে পাঠিয়ে অনেকগুলো খাদ্রসামগ্রী কিনে নেন। সে বাসায় সৌজন্যবশত আমরা চা, বিস্কুট, কলা ও কেক দিয়ে নাশতা করতে বাধ্য হই। ফেরার সময় দাদা অপ্রাপ্তবয়স্ক সব শিশুকে ভালো পরিমাণ টাকা হাদিয়া দিয়ে আসেন। পথে তিনি আমাকে বলেন, ‘এ ধরনের সামাজিকতায় জায়েয—নাজায়েযের প্রতি খুব খেয়াল করে চলতে হয়। তাদের মনে কষ্টও দেওয়া যাবে না। সামনে চা—নাশতা নিয়ে এলে না খাওয়াও কঠিন আর এমন পরিবারে কিছু খাওয়াও সম্পূর্ণ নিষেধ। কারণ, ছোট শিশুরা এ বাড়ির সম্পত্তির ভাগিদার। তবে তাদের এ সম্পত্তি তারা প্রাপ্তবয়স্ক ও বুঝদার না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দিতে সক্ষম নয়। আর আমাদের সমাজে সচেতন আলেম ও শিক্ষিত দ্বীনদার লোক ছাড়া এমন পরিবারে সামাজিক ব্যয় কোন পদ্ধতিতে করা যায় বা করতে হয়, তা প্রায় লোকই জানে না। এ বিষয় খেয়াল করো। পড়ালেখা করে ভালো আলেম হও। পাশাপাশি মানুষকে সচেতন করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাও। নিজে কঠোরভাবে এ বিধানের ওপর আমল করবে।’

একবার আমি দাদার সাথে এক বিয়ের দাওয়াতে গিয়েছি। সে সময় চেয়ার—টেবিলে সহজে আলেম—ওলামারা বসতেন না। তারা নিজেদের পরিবেশে যেভাবে সুন্নতের নিকটবর্তী অবস্থায় পানাহার করতে সচেষ্ট থাকেন, দাওয়াতে গেলেও সেটাই চাইতেন। সব মানুষকে চেয়ার—টেবিলে খানা দিলেও দাদার জন্য এক রুমে বিছানায় দস্তরখান বিছিয়ে খানার ব্যবস্থা করা হলো। সম্ভবত দুয়েকজন আরও ছিলেন। প্রথমে আগেকার সময়ের নিয়মে শরবত, পিঠা, সেমাই, পায়েস ইত্যাদি দেওয়া হলো। কিছুক্ষণ পরই আনা হলো মূল খানা। আমি খুব ধীরে ধীরে পিঠা, সেমাই খেয়ে পরে আর খানা খেতে পারলাম না। খুব ছোট ছিলাম। তাই বাসায় এসে দাদুকে বললাম, খাওয়ার আগে পিঠা, সেমাই, পায়েস কেন দিল? এসব না খেলে তো আমি খানা খেতে পারতাম।

তখন দাদু আমার খাওয়ার ব্যাপারে খেয়াল না রাখার অভিযোগ তুলে দাদাকে চাপে ফেলে দেন। বলেন, আপনি ওকে বলে দিলেন না কেন যে, পিঠা, পায়েস তুমি খেয়ো না। আর খেলেও খুব সামান্য খাও। কারণ পরে সাথে সাথে খানা খেতে হবে। দাদা এমনিতেই খুব আফসোস করছিলেন। দাদুর চাপে আরও নরম হয়ে গেলেন। আমি মূল দাওয়াতটি খেতে পারিনি এটা দাদা—দাদু কেউই মেনে নিতে পারছিলেন না। তখন দাদা একটি হাসির গল্প বলেছিলেন।

বলেছিলেন, এক দাদা আর তার নাতি গিয়েছে দাওয়াত খেতে। নাতিটি খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে বার বার পানি খাচ্ছিল। খাওয়ার পর বাড়ি এসে দাদা নাতিকে একটি থাপ্পড় দিয়ে বললেন, বোকার মতো বার বার পানি খাচ্ছিলে কেন? পানিতেই তো পেট ভরে গেছে। খাবার খেলে কোথায়?

নাতি জবাব দিল, আমি আপনার চেয়ে আরও বেশি খেয়েছি। বেশি খাব বলেই তো পানি দিয়ে আমি গলা পরিষ্কার করছিলাম। আর ভালো করে খানা খেয়ে পেট ভরছিলাম।

জবাব শুনে দাদা আরও জোরে একটি থাপ্পড় দিলেন নাতিকে। বললেন, এ বুদ্ধিটি তুই আমাকে দিলি না কেন? স্বার্থপর  কোথাকার।

গল্পটি শুনে দাদু অনেক্ষণ হাসলেন। দাদা—দাদুর উভয়েরই মনটা অনেকটা হালকা হয়ে গেল। এ কথাটি আমি ভুলে গিয়েছিলাম। কিন্তু দাদা ভোলেননি। এর কিছুদিন পর শহর থেকে একটু দূরে আমাদের এক আত্মীয়ের বিয়েতে দাদার সাথে আমিও যাই। দাদা তখন জিপ চালিয়ে নেওয়া দাদার এক খাদেমকে বললেন, তুই নাসিমকে সাথে নিয়ে বস। তাকে তার সুবিধামতো ধীরে ধীরে সময় নিয়ে সব আইটেম খাওয়াবি।

আমি এই ড্রাইভার কাম খাদেমকে কাকা ডাকতাম। বলতাম কাক্কু। খুব মিশুক ও ভালো লোক ছিলেন। দাদার ছাত্র ছিলেন। লেখাপড়া শেষ করেননি। দাদাই তাকে গাড়ি চালনাসহ কিছু কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থা করে দেন। কাক্কু সেদিন আমাকে দাওয়াত খাওয়ার নিয়ম অনুশীলনের মতো করে শিখিয়ে দেন। এখনো কোথাও খানা খেলে সেদিনটির কথা মনে পড়ে।

মফস্বল শহরের প্রভাবশালী ব্যক্তির বিয়ের খানা। শত শত লোক খাওয়া—দাওয়া করছে। আমরা দাদার সাথে তার খাস কামরায় খেতে বসেছি। দাদা সারা জীবনই মিতাহারী ছিলেন। নিজের মতো করে পানাহার করতেন। সামনে সব রাখা হলে নিজে পছন্দমতো দুয়েক লোকমা খেয়ে উঠে পড়তেন। কেউ কিছু দেওয়ার বা বলার সুযোগ ছিল না। আমাদের খানার ব্যাপারে কোনো হস্তক্ষেপ না করেই নীরবে তিনি আমাদের সব ভাইকে খানার নীতি, নিয়ম ও আদব শিখিয়েছেন। বিসমিল্লাহ বলে খাওয়া। ডান হাতে খাওয়া। একসাথে খেলে নিজের পাশ থেকে নেওয়া। ভিন্ন আইটেম হলে অন্য দিকে হাত বাড়ানো। নিজে কম এবং অপেক্ষাকৃত সাধারণ খানা নেওয়া। অপর শরিককে বেশি এবং উত্তম খানা খাওয়ার সুযোগ দেওয়া। খাওয়ার সময় মুখে কোনো শব্দ তৈরি না করা। ঢেঁকুর কখনো না তোলা। সম্ভব হলে হাঁচি চেপে যাওয়া। অগত্যা দিতে হলে মুখ ঘুরিয়ে রুমাল বা হাত মুখে রেখে সতর্কভাবে দেওয়া। হাঁচির পর সম্ভব হলে ভালো করে কুলি করে আবার খাওয়া শুরু করা। খাওয়ার শুরুতে বা শেষে দস্তরখানের ওপর পাত্র রেখে হাত না ধোয়া। সবকিছু ডান হাতে ধরা। যদি গ্লাস, চামচ ইত্যাদিতে খানা লেগে অন্যদের কষ্টের সম্ভাবনা থাকে, সে পরিবেশে বাম হাতে ধরে ডান হাতে সাপোর্ট নেওয়া ইত্যাদি তিনি এমনভাবে আমাদের সবাইকে শিখিয়েছেন যে, আমরা টেরই পাইনি।

দাদা সারা জীবন খানার সময় তিন আঙুল ব্যবহার করতেন। শুধু তরকারি দিয়ে ভাত খাওয়ার সময় পাঁচ আঙুল এমনভাবে ব্যবহার করতেন যে, আঙুলের অর্ধেকের বেশি খানায় লাগত না। খাওয়ার পর তিনি হাত ধুতেন বটে তবে তার খুব বেশি পানির প্রয়োজন হতো না। সাবান ব্যবহারের বলতে গেলে প্রয়োজনই হতো না। সেদিন পোলাও থেকে শুরু করে আলু ভাজি, কোরমা, মুরগি, গরু ও খাসির তরকারি, মাছ, মুড়িঘণ্ট, লাউ দিয়ে মাছ, ডাল, ফিরনি, দই ইত্যাদি সব একটু একটু করে কাক্কু আমাকে খাওয়ান। সব মিলিয়ে আমার পরিমাণমতো খানাই হয়। তবে কোনো আইটেম বাদ পড়েনি। এর পর থেকে আমি দাওয়াতে গেলে এক চিমটি হলেও সব আইটেম নেওয়ার চেষ্টা করেছি। কেন জানি মনে এ খেয়ালটি আসে, যতগুলো আইটেম তৈরি করা হয়েছে, সবগুলোই খেয়ে না হলেও অন্তত চেখে দেখার একটি দায়িত্ব মেহমানের ওপর এসে যায়। আল্লাহর বান্দা হিসেবে তাঁর প্রেরিত ও দস্তরখানে সমবেত রিযিক কোনোটাই একটুও ছুঁয়ে না দেখাটা ভালো লাগে না। সামান্য একটু খানা নষ্ট করাও আমাদের বাড়ির সংস্কৃতিতে ছিল না। পরবর্তী জীবনে দুনিয়ার বহু দেশে অসংখ্য সমাজ ও সংস্কৃতিতে হাজার রকম দাওয়াতে অংশগ্রহণের সুযোগ আল্লাহ তাআলা দিয়েছেন। খানা নষ্ট কিংবা অপচয় করার বহু পরিবেশও সামনা করতে হয়েছে। কিন্তু বাড়ির এ সুন্দর সংস্কৃতিটি আলহামদুলিল্লাহ কোথাও হাতছাড়া করিনি।

Avatar

zobayer

একটি কমেন্ট করুন