আজ ৩০শে নভেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ ২৫শে রবিউস সানি, ১৪৪৩ হিজরি
মাসিক নেয়ামত

জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলূম ফরিদাবাদ, ঢাকা-এর মুখপত্র

প্রতিষ্ঠাতা: মুজাহিদে আযম আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ.

হাকীমুল উম্মত : স্মৃতি ও অভিব্যক্তি

হাকীমুল উম্মত : স্মৃতি ও অভিব্যক্তি

মাওলানা আব্দুল মাজেদ দরিয়াবাদী রহ.

অনুবাদ : ওয়ালিউল্লাহ আব্দুল জলীল

 

[মার্চ ২০২১ সংখ্যায় প্রকাশের পর]

একাত্তর

সাপ্তাহিক আন—নাজম লখনৌ থেকে বের হয়। শীয়াদের বিপক্ষে কাজ করে বিশেষ খ্যাতি লাভ করেছে। ৩ আগস্টের সংখ্যায় মুতা বিবাহ বিষয়ে লম্বা প্রবন্ধ ছেপেছে। হায়দারাবাদ থেকে কোনো একজন মুতা বিবাহ নিষিদ্ধ হওয়ার বিপক্ষে কিছু সংশয় লিখে পাঠিয়েছে। এ ধারাবাহিকতায় বুখারী, মুসলিমের কিছু হাদীস দিয়েও মুতা বিবাহ জায়েয হওয়ার পক্ষে দলীল দিয়েছে। আন—নাজম জবাবি প্রবন্ধে যেখানে ভিন্ন দিক অবলম্বন করেছে সেখানে ওসব হাদীসের রাবীদেরকেও মাজরুহ করে বসেছে। এ বিষয়টি আমার কাছে বেশ মারাত্মক মনে হয়েছে। এবার মূল চিঠি দেখুন।

ম. আন—নাজমের একটি সদ্য প্রকাশিত প্রবন্ধ খামে দিয়েছি। মূল মাসআলা নিয়ে আমার কোনো কথা নেই। মুতা বিবাহকে আমিও নাজায়েয মনে করি। কিন্তু যেখানে বুখারী, মুসলিমের রাবীকে মাজরুহ (অভিযুক্ত) করা হয়েছে সেখানে মনোকষ্ট হয়েছে। সহীহাইনের রাবীকে পরিত্যাজ্য ও অগ্রহণযোগ্য স্থির হলে আমাদের হাদীসই আর থাকবে কী? এটা তো মুনকিরীনে হাদীসের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়ার নামান্তর। ইয়াহইয়া ইবনে মাইন হোন বা হাফেয যাহাবী, কার যওক (অভিরুচি)—কে ইমাম বুখারী রহ. এর যওকের বিপরীত আনা হবে। যেমনইভাবে আমি ফিকহের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রমাণ এটাকে মনে করি যে অমুক মত ইমাম আবূ হানীফা রহ. এর। এমনইভাবে হাদীসের ক্ষেত্রেও সবচেয়ে বড় সনদ এটাই মনে করি যে ইমাম বুখারী রহ. এর যওক এটা গ্রহণ করেছে। রিজাল শাস্ত্রের ইমামগণের কাছে কি ওহী আসত? শেষ পর্যন্ত তা শাস্ত্রীয় যোগ্যতাই তো। শাস্ত্রীয় যোগ্যতায় ইমাম বুখারীকে কার থেকে কম মনে করা হবে?

আ. সব ঠিক আছে। অন্য জারিহ (অভিযোগকারী) তো রাবীদের অবস্থা বর্ণনা করছেন। তাঁদের রেওয়ায়েতের অবস্থা তো বয়ান করছেন না। তাদের কোনো বর্ণনা যদি অধিক সনদের কারণে অথবা উম্মতের গ্রহণ করে নেওয়ার দ্বারা শক্তিশালী হয়ে যায় তাহলেও তা অস্বীকার করার মতো নয়। এ বর্ণনাটিও এমনই। এ বর্ণনার যে অধিক সনদ আছে তা তো স্পষ্টই। কারণ, সবাই একমত যে এটা শুরুতে হালাল ছিল। এ বিষয়টিকে অনর্থক অস্বীকার করার মানে হলো, উম্মতের বড় বড় পূর্বসূরি মনীষীদের অনর্থক মূর্খ ও স্বল্প বিদ্যা সাব্যস্ত করা। কেননা, (মুতা বিয়ে) স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ হওয়ার দলীল যখন বিদ্যমান তখন নসখ তথা রহিত হওয়ার মাধ্যমেই তো দাবি সাব্যস্ত হয়ে যাচ্ছে।

এ ধরনের অহেতুক কঠোরতার কারণেই ওই পত্রিকা এখানে পাঠাতে বারণ করে দিয়েছি। তাদের দৃষ্টি একপেশে। মাসআলার অন্য দিক সামনে থেকে গায়েব করে ফেলে।

হযরতের সত্যায়ন ও প্রত্যায়নের ফলে এমনিতেও সব দ্বীনী মাসআলায় আনন্দ লাগে। এ মাসআলায় মতৈক্যের ফলে অনেক বেশি অশ্বস্তি লাভ হয়েছে।

বয়ানুল কোরআন যখন গভীরভাবে দেখতে শুরু করি তখন ছোট ছোট অনেক কিছুই সম্পাদনাযোগ্য নজরে পড়েছে। নিঃসঙ্কোচে মাওলানার খেদমতে নিবেদন করতে থাকি। প্রথম কিস্তি সেই চিঠি দিয়েই শুরু হয়ে যায়।

ম. বয়ানুল কোরআন প্রথম খণ্ড ১৬১ পৃষ্ঠা সূরা নং ১ إلي أجله এর তরজমা আমি পাইনি। এটা কি ভুলে থেকে গেছে না এর প্রয়োজন মনে হয়নি?

আ. ‘ছোট হোক বা বড় যার সময় নির্ধারিত।’ এতে কয়েকবার কাটছাট এজন্য হয়েছে যে, তরজমা তারকীবের মতো (আরবী ব্যাকরণের গঠন অনুযায়ী) হচ্ছিল না। বিভিন্ন তরজমা দেখেছি, সবগুলোতে এ কমতিই ছিল। অবশ্য ডেপুটি সাহেবের তরজমা এ থেকে মুক্ত ছিল। তবে সেটা তরজমাই থাকেনি। শুধু সারাংশ ছিল। কয়েকবারের পর বর্তমান তরজমা স্থির হয়েছে।

ম. ৫১ নং পৃষ্ঠায় من ربكم এর তরজমাও আমি পাইনি।

আ. ‘এ বিষয়টিকে তোমাকে তোমার পরওয়ারদিগারের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের ভালো…’

বিশেষ দ্রষ্টব্য : ইদানীং মৌলভী শিব্বীর আলী বয়ানুল কোরআনের কপি তৈরি করাচ্ছে। এই দুই জায়গা—ই কপিতে যুক্ত করতে বলে দিয়েছি। নোট লিখে দিয়েছি।

ম. ৪২, ৪৩ পৃষ্ঠায় وإذا قيل لهم امنوا بما أنزل علينا এর তাফসীর হযরত মূসা আ. ও তাওরাতের মাধ্যমে করা হয়েছে। আমার অসম্পূর্ণ উপলব্ধিতে মনে হচ্ছে, আরেকটু ব্যাপক তাফসীর করে বনী ইসরাঈল ও বনী ইসরাঈলের কাছে প্রেরিত সহীফার মাধ্যমে করা যেত। তাহলে ইহুদীদের ইতিহাসের সঙ্গে বেশি সঙ্গতিপূর্ণ হতো।

আ. কিন্তু এখানে একটা সমস্যা থেকে যায়। তা হলো, نؤمن بما أنزل علينا ইহুদীদের কথা। ما أنزل علينا দ্বারা তা—ই উদ্দেশ্য হতে পারে যার ওপর তারা ঈমান আনার দাবিদার ছিল। বনী ইসরাঈলের নবীগণের মধ্যে হযরত ঈসা আ.—ও ছিলেন। ইহুদীরা তাঁর কিতাব অস্বীকার করত। ব্যাপকভাবে তারা সব কিতাবে ঈমান এনেছে বললে তাদের বিশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতো না।

৫ আগস্টের চিঠি এখন গিয়ে শেষ হয়েছে। বয়ানুল কোরআন সম্পর্কে যে আবেদন—নিবেদন শুরু হয়েছিল কল্পনায়ও ছিল না এটা এত দূর গড়াবে। মাস কি অনেক বছর পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। আল্লাহ ছোট থেকে ছোট বান্দা থেকেও ছোট কিংবা বড় কাজ করিয়ে নিতে সক্ষম।

 

বাহাত্তর

১৪ আগস্টের চিঠি উত্তরসহ দেখুন।

ম. বয়ানুল কোরআন দ্বিতীয় খণ্ড ৫৮ নং পৃষ্ঠায় خالدين فيها এর তরজমা মুদ্রণে আসেনি।

আ. এখনই যুক্ত করে দিয়েছি। মুদ্রিত কপিতেও এবং খাতার মধ্যেও। যে খাতা প্রস্তুত হচ্ছিল।

ম. ইংরেজ গবেষকদের মাথার মুকুট মনে করা হয় জার্মান নলডেককে। সাম্প্রতিক কোরআন মাজীদের ওপর তার বিশাল কলেবরের প্রবন্ধ নজরে পড়েছে। এই জালেম তো অনেক আপত্তি করেছে। একটি আপত্তি নতুন পাওয়া গেছে। যা এর আগে কোথাও দেখিনি। সংক্ষেপে আপত্তি নিম্নে উল্লেখ করা হলো,

‘আরবের বাইরের অন্যান্য অঞ্চল সম্পর্কে মুহাম্মদের অজ্ঞতার অবস্থা হলো, তিনি মিশরের সজীবতার কারণ কোরআনে বৃষ্টি বলে উল্লেখ করেছেন। অথচ একটি শিশুও জানে, মিশরের সঙ্গে বৃষ্টির কোনো সম্পর্ক নেই। ওখানকার সজীবতা পুরোটাই নীলনদের প্রবাহ থেকে হয়ে থাকে।’

আপত্তি করেছে সূরা ইউসুফের عَامٌ فِيهِ يُغَاثُ النَّاسُ আয়াতে। আমি টীকায় এ জবাব দিতে যাচ্ছি,

এক. يُغَاثُ এর অর্থ কেবল বৃষ্টি দিয়ে করা ঠিক নয়। অর্থ হবে এই, মানুষের ফরিয়াদ শোনা হয়েছে, মুসীবত থেকে মুক্তি মিলেছে। একাধিক ভাষাবিদ ও মুফাসসির এ মত পোষণ করেছেন। রাগিব রহ. তার প্রসিদ্ধ অভিধান মুফরাদাতুল কোরআনে উভয় অর্থকে সহীহ আখ্যা দিয়েছেন।

قوله وإن يستغيثوا فإنه يصح أن يكون من الغيث و يصح أن يكون من الغوث و كذا يغاثوا يصح فيه المعنيان.

দুই. এখানে কেবল মিশরীদের কথা বলা হচ্ছে না। সব সৃষ্টি অথবা মানুষের কথা বলা হচ্ছে। দুর্ভিক্ষ শুধু মিশরে নয় আশপাশের সমস্ত দেশে হয়েছিল। এটা ঐতিহাসিকভাবেও প্রমাণিত। কোরআনও শাম এবং ফিলিস্তিনের দুর্ভিক্ষের কথা উল্লেখ করেছে। সুতরাং বৃষ্টি অন্যান্য দেশে হলেও কোরআনে মর্মের সত্যতা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট।

তিন. মিশরে একেবারেই বৃষ্টি হয় না এমন দাবি করা ঠিক নয়। সেই ইংরেজ ভূগোলবিদরাই লিখেছে, মিশরের অমুক অঞ্চলে খুব বৃষ্টি হয়, অমুক অঞ্চলে কম হয় এবং অমুক মরু অঞ্চলে একেবারেই হয় না। এটা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে ফেরাউনরা যেখানে শাসন করত তা ছিল বৃষ্টিপ্রবণ অঞ্চল।

এ উত্তরগুলো যথেষ্ট না হলে আপনি আরও কিছু বলে দিন।

আ. মাশাআল্লাহ একদম যথেষ্ট জবাব। প্রথম উত্তরে এতটুকু নিবেদন, রেওয়ায়াতে غيث থেকেই নেওয়া হয়েছে। غوث এর মত পূর্বসূরিদের থেকে কেউ নকল করেননি। কেবল রুহুল মাআনীতে ‘কথিত আছে’ এমন দুর্বল শব্দ দিয়ে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু উত্তরের জন্য সম্ভাবনাও যথেষ্ট। আপনার মনে ধরলে আরেকটি জবাব এ—ও হতে পারে, কোরআন মাজীদ তো বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয় না। এমন কি হতে পারে না, ওই বছরে বৃষ্টির দরুনই ফসল উৎপন্ন হয়েছে অথবা বৃষ্টির দরুনই নীলনদের প্রবাহ জারি হয়েছে। এ জবাব প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্ধ না হলে যুক্ত করে দিতে পারেন। নতুবা বাদ দিয়ে দিন।

কী সময় ছিল, তাফসীরে কোরআনের আলোচনা প্রতি সপ্তাহেই অব্যাহত ছিল, এ ছাড়া দ্বীনী, ইলমী যে বিষয়ে মন চাইত বেধড়ক লিখে ফেলতাম এবং উত্তর পেয়ে খুব উপকৃত হতাম। যেন একজন স্নেহপ্রবণ, দক্ষ শিক্ষক দূরে বসে আছেন। অব্যাহতভাবে পত্র—মারফত দরস দিয়ে যাচ্ছেন।

২৫ আগস্টের চিঠি আজও পড়লে অবাক হয়ে যাই তখন এসব কথা কীভাবে মনে এসেছিল। শুকরিয়া আদায় করি যে আল্লাহ তাআলা প্রশ্ন সমাধানের কেমন অবারিত সুযোগ করে দিয়েছিলেন। খতমে নবুওয়ত—বিষয়ক আলোচনার একটি নতুন দিক এই চিঠিতে চোখে পড়ে। অবাক হয়েছি, আল্লাহ তার যে—কোনো অকর্মণ্য বান্দার দ্বারা যে কাজ ইচ্ছা করিয়ে নেন। চিঠির শেষে একটি স্বপ্নের কথাও উল্লেখ আছে। তখন এ ধরনের স্বপ্ন অনেক বেশি দেখতাম। যাই হোক পূর্ণ চিঠি উত্তরসহ আগামী সংখ্যায় আসছে।

[ঈষৎ সংক্ষেপিত। চলবে ইনশাআল্লাহ]

 

সৃষ্টিজীবের সেবা

হযরত মাওলানা সায়্যিদ আছগর হোসাইন দেওবন্দী রহ.। দারুল উলূম দেওবন্দের মান্যবর উস্তাদ। মিয়া সাহেব নামেই যিনি বেশি পরিচিত ছিলেন। ১৩৩০ হি./১৯১২ ঈ. থেকে ১৩৬৩ হি./ ১৯৪৪ ঈ. পর্যন্ত দারুল উলূম দেওবন্দে তাফসীর, হাদীস, ফিক্হসহ বিভিন্ন বিষয়ে পাঠদান করেন। কোরআন—সুন্নাহর গভীর জ্ঞানের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও প্রচণ্ড প্রচারবিমুখ ছিলেন। সুন্নতের প্রতি গভীর অনুরাগী এ বুযুর্গের জীবন ছিল খুবই সাদামাটা ও অনাড়ম্বর। বিখ্যাত তাফসীরগ্রন্থ মাআরিফুল কোরআনের সংকলক মুফতীয়ে আজম হযরত মাওলানা মুফতী শফী রহ. তাঁর কাছে বিভিন্ন বিষয়ে পাঠ গ্রহণ করেন। মিয়া সাহেব রহ. এর সঙ্গে মুফতী শফী সাহেবের গভীর সম্পর্ক ছিল।

হযরত মিয়া আছগর হোসাইন রহ. দেওবন্দেরই অতি সাধারণ এক মহল্লায় বসবাস করতেন। ঘর ছিল মাটির। বর্ষাকালে ঘরের বিভিন্ন দিক ভেঙে পড়ত। প্রতি বছরই মেরামত করতে হতো। একবার মুফতী শফী রহ. বললেন, হযরত, প্রতি বছর এ ঘর আপনি মেরামত করে যাচ্ছেন। এতে যেমন সময় ও অর্থ নষ্ট হচ্ছে তেমনই আপনার কষ্টও হচ্ছে। একবার ঘর পাকা করে নিলে প্রতি বছরের এ কষ্ট থেকে মুক্তি পেয়ে যেতেন।

এ কথা শুনে মিয়া সাহেব হাসি হাসি চেহারায় বললেন, মুফতী সাহেব তো খুব ভালো পরামর্শ দিয়েছেন! আমি সারা জীবন পার করে দিলাম। বৃদ্ধ হয়ে গেলাম। অথচ এ বুদ্ধি আমার মাথায় খেলল না!

উস্তাদের এমন কথায় মুফতী শফী রহ. লজ্জা পেয়ে গেলেন। বললেন, আমার আসলে আপনাকে পরামর্শ দেওয়ার ইচ্ছা ছিল না। আমি মূলত আপনার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও ঘর পাকা না করার রহস্য জানতে চাচ্ছিলাম। হযরত যদি দয়া করে এর হেকমত বলতেন, আমি উপকৃত হতাম।

কয়েকবার নিবেদনের পর হযরত মিয়া সাহেব রহ. মুফতী শফী সাহেবের হাত ধরে ঘরের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। বললেন, এখান থেকে আমাদের গলির ডানে—বামে লক্ষ করে দেখো, এ গলিতে একটিও কি পাকা ঘর দেখা যায়?

—না, সবই মাটির ঘর।

—এখন বলো, আমাদের এ গলিতে যখন একটিও পাকা বাড়ি নেই তখন আমি একা পাকা বাড়ি নির্মাণ করলে কি ভালো দেখাবে? প্রতিবেশীদের মনে কি কষ্ট লাগবে না? আমার এতটা সামর্থ্যও নেই যে সবার বাড়ি পাকা করে দেব। তাই মাটির ঘরেই থাকি আর প্রতি বছর ঘর মেরামত করে যাই।

আরেক বারের ঘটনা। মুফতী শফী রহ. তার প্রিয় এ উস্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে তাঁর ঘরে গেলেন। খাবারের সময় হলে দস্তরখান বিছানো হলো। রুটি—তরকারি এলো। উস্তাদ—শাগরিদ বসে খাবার খেলেন। খাওয়াপর্ব শেষে মুফতী শফী সাহেব দস্তরখান উঠাতে গেলে মিয়া সাহেব বললেন, আরে তুমি দস্তরখান উঠাতে যাচ্ছ কেন? তুমি কি দস্তরখান উঠানোর নিয়ম জানো?

মুফতী সাহেব অবাক হয়ে বললেন, হযরত, দস্তরখান উঠানো কি আর তেমন কোনো কঠিন কাজ? পারব না কেন? এটাও কি শিখতে হয় নাকি?

—হ্যাঁ, দস্তরখান উঠানোও একটি জরুরি বিষয়। অবশ্যই শিখে নিতে হয়।

—তাহলে উস্তাদজী আমাকে শিখিয়ে দিন।

—হ্যাঁ, অবশ্যই শিখে নাও।

এরপর মিয়া সাহেব রহ. দস্তরখানে অবশিষ্ট গোশতের টুকরাগুলো একত্র করলেন। হাড়গুলো এক জায়গায় জমা করলেন। রুটির তুলনামূলক বড় টুকরাগুলো একদিকে আর একেবারে ছুটো টুকরাগুলো একদিকে করলেন। এরপর বললেন, এসবের জন্য আমি আলাদা আলাদা জায়গা নির্ধারণ করে রেখেছি। গোশতের টুকরা নিয়মিত এক জায়গায় রাখি। বিড়াল এসে ওখান থেকে গোশতের টুকরা খেয়ে যায়। হাড়গুলো এক জায়গায় রাখি। কুকুর এসে হাড় খেয়ে যায়। রুটির বড় টুকরাগুলো দেয়ালের ওপর এক জায়গায় রাখি। পাখি এসে ওগুলো খেয়ে ফেলে। একেবারে ছোট টুকরাগুলো পিপড়ার বাসায় ফেলে দেই। এগুলো পিপড়েরা খেয়ে নেয়।

এ হলো প্রকৃত মুসলমান ও ইসলামী সমাজের চিত্র। মাখলুকের প্রতি ভালোবাসা, দয়া ও দরদ তো প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নত। এ সুন্নত ধারণ না করে কি নবীজির প্রকৃত উম্মত হওয়া যায়? নবীর ওয়ারিশ হওয়া যায়?

এর বিপরীতে আমাদের সমাজের একটি গল্প বলি। শাইখুল ইসলাম মুফতী তাকী উসমানী দা. বা. একবার রাষ্ট্রীয় এক সেমিনারে যোগ দিতে গেলেন। অনুষ্ঠানে প্রবেশের আগে গাড়ির ড্রাইভারকে বললেন, এখানে আপনাদের খাবারের ব্যবস্থা আছে কি না, জানা নেই। আমি টাকা দিয়ে যাচ্ছি। এখানে ব্যবস্থা না থাকলে হোটেলে গিয়ে খাবার খেয়ে নেবেন।

হযরত ভেতরে চলে গেলেন। একজন সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা দেশের দারিদ্র্য—সমস্যা নিয়ে বক্তব্য দিলেন। তার বক্তব্যে দরিদ্র শ্রেণির প্রতি দরদ ও ভালোবাসা উপচে পড়ছিল। তিনি পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার নিন্দা করলেন। সমাজতন্ত্রের প্রশংসা করলেন। আলোচনাপর্ব শেষে খাবারের ব্যবস্থা করা হলো। খাওয়ার সময় মুফতী তাকী উসমানী সাহেব সে কর্মকর্তাকে বললেন, এখানে ড্রাইভারদের জন্য খাবারের কোনো ব্যবস্থা করা হয়নি!

কর্মকর্তা : হঁ্যা, সাধারণত এ ধরনের অনুষ্ঠানে ড্রাইভারদের খাবারের ব্যবস্থা থাকে না।

মুফতী সাহেব : আমরা এখানে আরামে খাওয়া—দাওয়া করছি আর আমাদের ড্রাইভাররা বাইরে ক্ষুধার্ত দাঁড়িয়ে আছে, এ বিষয়টি আমার কাছে খুবই খারাপ লাগছে।

কর্মকর্তা বলল, বিষয়টি দুঃখজনক কিন্তু এত ড্রাইভারের খাবারের ব্যবস্থা করাও তো মুশকিল ব্যাপার। তা ছাড়া এ ড্রাইভাররা এভাবে ক্ষুধার্ত থেকে অভ্যস্ত। ওরা পরে ঘরে গিয়ে খেয়ে নেবে। খুবই শীতল কণ্ঠে জবাব দিলেন।

অনুষ্ঠান শেষ হলো রাত প্রায় ১১টায়। মুফতী সাহেব ড্রাইভারের খাবারের খেঁাজ নিলে সে বলল, হুযুর, আমরা কয়েকজন অমুক হোটেলে গিয়ে খেয়ে নিয়েছি। তবে বেশিরভাগের কাছেই খাবারের টাকা ছিল না। তারা ক্ষুধার্ত বসে আছে। মালিকদের ঘরে পৌঁছে দিয়ে ঘরে গিয়ে খাবার খাবে।

—সূত্র : যিক্র ও ফিক্র :  ৭১—৭৫

 

অনন্তের পথে

দিন আসে দিন যায়। রাত এসে রাতও চলে যায়। দিন—রাতের এই আসা—যাওয়ার মধ্যেই কিছু মানুষ পৃথিবীতে আসে এবং কিছু মানুষ চলে যায়। স্বাভাবিকভাবেই আগমন মানুষকে আনন্দিত করে। বিয়োগ মানুষকে বেদনাহত করে। এজন্য মানুষ কখনো আনন্দিত হওয়ার পর বেদনাহত হয়। বেদনাহত হওয়ার পরও আনন্দিত হয়। এমন বিপরীতমুখিতাকে নিয়েই পৃথিবী মানুষকে নিয়ে ঘুরছে। আর মানুষকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে প্রতিনিয়ত,

كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ

প্রাণীমাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে।

যে কারও বিদায়ই কষ্টের। তবে ওলামায়ে কেরামের বিদায় অন্য বিদায়ের চেয়ে ভিন্ন। যিনি জীবনের সুদীর্ঘ কাল ইলমে দ্বীনের খেদমত করেছেন। ফিতনার গভীর অন্ধকারে হেদায়েতের মশাল হাতে উম্মাহকে পথ দেখিয়েছেন। নিজের সকল স্বার্থ ও সুবিধার ওপর প্রাধান্য দিয়েছেন দ্বীন, ঈমান ও উম্মাহকে। এমন মনীষীর বিদায়ে মানুষ তুলনামূলক বেশি ব্যথিত হবে, এটাই স্বাভাবিক।

গত দেড় বছরে দেশ—বিদেশের বহু মুরব্বী আলেম বিদায় নিয়েছেন। এমন বহু আলেম বিদায় নিয়েছেন যাদের প্রত্যেককে নিয়ে পত্রিকার বিশেষ সংখ্যা প্রস্তুত করা প্রয়োজন। কিন্তু অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যেন মালার সুতো ছিঁড়ে গেছে আর একের—পর—এক মুক্তা ছিটকে পড়ছে। এ অবস্থায় জাতি সত্যিই দিশেহারা। আল্লাহ অবশ্যই দ্বীন টিকিয়ে রাখবেন। তিনি অবশ্যই উপযুক্ত ব্যক্তি তৈরি করে দেবেন। কিন্তু ঝড়ের ঝাপটার পর সোজা হয়ে দাঁড়াতেও তো কিছু সময়ের প্রয়োজন হয়। জাতি যেন এক বিক্ষুব্ধ জলোচ্ছ্বাসের মুখে পড়েছে। একের—পর—এক ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে। একটি ঝাপটা সামলে উঠতে না উঠতেই আরেকটি এসে আছড়ে পড়ছে আরও তীব্র বেগে। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন।

বিদায়ী উলামায়ে কেরামের জীবন, কর্ম ও অবদান নিয়ে মাসিক নেয়ামতের বড় ধরনের কাজ করার ইচ্ছা আছে। আজকের আয়োজনে কেবল সম্প্রতি বিদায় নেওয়া কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা হলো। সামনের সংখ্যায় বিস্তারিত আলোচনা করা হবে, ইনশাআল্লাহ। পাঠকের কাছে অনুরোধ, সকলের জন্য ঈসালে সওয়াব করবেন। দুআর সময় তাঁদের কথা স্মরণ রাখবেন।

এ উপমহাদেশের হেদায়েতের বাতিঘর দারুল উলূম দেওবন্দের নায়েবে মুহতামিম ও মুহাদ্দিস হযরত মাওলানা আব্দুল খালেক সাম্ভলী সাহেব ৩০ জুলাই ২০২১ ঈ. শুক্রবার জুমার পর ইন্তেকাল করেন। ইন্তেকালের সময় হযরতের বয়স হয়েছিল ৭২ বছর। এর আগে ২১ মে শুক্রবার দারুল উলূম দেওবন্দের কার্যনির্বাহী মুহতামিম, জমিয়তে উলমায়ে হিন্দের (একাংশ) সভাপতি হযরত মাওলানা কারী সায়্যিদ উসমান মানসুরপুরী ইন্তেকাল করেন। এর আগে ১৪ এপ্রিল ২০২১ ঈ. বৃহস্পতিবার দারুল উলূম দেওবন্দের প্রবীণ মুহাদ্দিস আল্লামা হাবীবুর রহমান আজমী এবং ৩ এপ্রিল ২০২১ দারুল উলূম দেওবন্দের মুখপাত্র আদদায়ীর সম্পাদক বিশিষ্ট আদীব হযরত মাওলানা নূর আলম খলীল আমীনি ইন্তেকাল করেন। এ বছরই এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত দারুল উলূম দেওবন্দের চার বিশিষ্ট উস্তাদ বিদায় নিয়েছেন।

আমাদের দেশেও শুধু আগস্ট মাসেই উল্লেখযোগ্য কয়েকজন ব্যক্তিত্ব চিরদিনের জন্য এ অস্থায়ী ঠিকানা ত্যাগ করেছেন। ১১ আগস্ট ২০২১ বুধবার রাত ৩:৫০ মিনিটে অনন্তের কাফেলায় যোগ দিয়েছেন কুমিল্লার হোমনা থানাধীন রামকৃষ্ণপুরের বিশিষ্ট আলেম ও সমাজসেবক মাওলানা সৈয়দ মোহাম্মদ জহীরুল হক। প্রথমদিকে বড়কাটারা আশরাফুল উলূমের ফারেগ এই বনেদী বংশীয় আলেম ঐতিহাসিক দৈনিক আজাদ ও রেডিওর বহির্বিশ্ব কার্যক্রমে যোগ দেন। মাসিক মদীনা, এমদাদিয়া লাইব্রেরী ও দেশের ঐতিহ্যবাহী সংস্থায় সম্পাদক এবং ফ্রিল্যান্স গ্রন্থকার ও অসাধারণ দক্ষ ও বহুভাষী অনুবাদক হিসেবে বর্ণাঢ্য কর্মজীবন কাটান। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৩ বছর। এরপর ১৯ আগস্ট বৃহস্পতিবার হঠাৎ করেই একটি মৃত্যুসংবাদ আসে। যা বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের স্তম্ভিত করে দেয়। দেশের বৃহত্তম দ্বীনি বিদ্যাপীঠ দারুল উলূম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারীর শাইখুল হাদীস আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী অনন্তের সফরে রওনা করেছেন। বৃহস্পতিবার সকালে খুব অসুস্থতা বোধ করলে তঁকে চট্টগ্রামের সিএসসিআর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বেলা ১২টায় তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর সময় হযরতের বয়স হয়েছিল আনুমানিক ৬৮ বছর।

১৫ আগস্ট ২০২১ এক বিদূষী নারীর মৃত্যুসংবাদ আসে। তিনি সর্বজনমান্য গবেষক বহুগ্রন্থপ্রণেতা শায়েখ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহ. এর সহধর্মিণী। তিনি ছিলেন মুহাম্মদ আলী আল—হাশেমী ও আদেল আল—হাশেমীর বোন।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সকলকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসীব করুন। আমীন।

 

 

editor

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আরও পড়ুন x